মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অন্তিম সফর – আয়েশা খন্দকার।

অন্তিম সফর – আয়েশা খন্দকার।


তারিখ টা ছিল ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১লা জিলহজ্ব ১৪৩৭( সূর্য অস্ত গেলেই আরবি তারিখ অনুযায়ী নতুন দিন শুরু হয়)। রাতের কালো আধাঁর ভেদ করে ৬ টা সাদা মাইক্রো এগিয়ে যাচ্ছে একটা মহান কাজ সম্পন্ন করতে। কাজ টা হলো, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এক অনুগত গোলাম তাঁর মহান রবের আদেশ ক্রমে তাঁর দরবারে হাজির হতে যাচ্ছেন। এই মাইক্রোর যাত্রীরা সেই বান্দা কে তাঁর মহান রবের দরবারে পৌঁছে দেয়ার দুনিয়াবি শেষ কাজ গুলো সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। পথেই খবর আসলো, তিনটা মাইক্রোর বেশি যেতে দেয়া হবে না। আইনের শাসন বাস্তবান বলে কথা। মানিকগঞ্জ এর হরিরামপুর থানা চালা ইউনিয়ন পৌঁছানোর আগেই পরে কৌড়ি ইউনিয়ন। সেই খানকার কলতা বাজার এ আটকে দেয়া হলো গাড়ীর বহর। বলে রাখা ভাল প্রথম সংবাদ পাওয়ার পরই ৬ মাইক্রোর যাত্রীদের মধ্যে কাটছাট করে গাড়ীর সংখ্যা করা হলো ৫। তাতেও মন ভরছে আইন রক্ষাকারী সদস্যদের। তিন মানেই তিন। কোন নড়চড় নাই। উপরের আদেশ বলে কথা। বকুল আপা, ওসমান আর জামান ভাই ( মামার PS) এর অনেক অনুরোধে তারা ৪ মাইক্রো যেতে দিতে রাজি হলো। এবার পালা ৫ গাড়ীর লোকদের ৪ টা গাড়ীতে ঠেসে পুরে রওনা দেয়ার পালা। তখনই খবর এলো, সবার হৃদয়ের স্পন্দন, অসহায় মানুষের পরম অভিভাবক, এদেশ ইসলামী অর্থনীতির সফলতার রুপকার, ইসলামি মিডিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা মীর কাসেম আলী মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে হাজির হয়ে গেছে এই দুনিয়ার সকল মায়া ছেড়ে। যদিও সংবাদটা জন্য অধির অপেক্ষায় ছিলাম ঘড়ির কাটা রাত ১০ টা ছোঁয়ার পর থেকেই। যাহোক, আইন কর্তাদের অশেষ দয়ায় ও তাদের কড়া পাহাড়ায় রাত ১১ টার একটু আগেই পৌঁছেলাম চালায়, যেখানে চির নিদ্রয়া শায়িত হবেন আমাদের মুকুট মনি। কলতা বাজার থেকেই পুলিশ আমাদের তাদের পাহারায় আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। নিজেদের চোর ভাববো না ভি আই পি ভাববো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো প্রায় আধ কিঃমিঃ দূরে। বলা হলো গাড়ী আর সামনে যাবে না। আমরাও নিরুপায় হয়ে আধার ও ভাঙ্গা রাস্তায় মোবাইলের টর্চ লাইট ধরে এগিয়ে চললাম মীর বাড়ী মসজিদ সংলঘ্ন লেবু বাগানের দিকে। সেই বাগানে পৌঁছানোর একটু কিছু দূর আগেই আবার আইন কর্তারা হাজির আরেক রুপ মহিমায়। এবার কি ? মোবাইল জমা দিতে হবে। ডিজিটাল সরকার তো প্রযুক্তির পক্ষে, তো মোবাইলের উপর এত ক্ষেপ্যা কেন ঠিক বুঝা গেল না। পরে জানতে পারলাম, দাফন হওয়ার ছবি বা খবর যেন পৃথিবী জুড়ে না প্রচার হয় তার চেষ্টা। হায় রে, আর কত রং দেখা বাকি ? দিয়ে দিলাম মোবাইল। কিছু করার নাই। কারন, মোবাইলে সংবাদ দেয়ার চেয়ে জান্নাত গামী আল্লাহর বান্দার দাফন টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে। শেষ সময় আর কোন ঝামেলা হোক তা আমাদের কাম্য ছিল না। আমরা পৌঁছেই কবরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করতে গেলাম। দেখি আইন কর্তারা আমরা যাওয়ার আগেই পাশাপাশি দুইটা জায়গা ঠিক করে রেখেছে। তাও আবার ঘুপচি, গাছ পালায় জংগলের ভিতর যা মসজিদের টয়লেট এর একটু পাশে। যেখান থেকে দূর্গন্ধ পেতে কোন কষ্ট করার দরকার নাই। দূর্গন্ধ নিজেই এসে ধরা দিবে। ওই জায়গাটা দেখেই মনে হলো, এমন জায়গা ঠিক করা ওদের মত লোকদের দিয়েই সম্ভব। নিম্ন রুচি আর বিকৃত মানুষিকতা তাদের উপরই সাওয়ার হয় যাদের উপর্জনে হালালের চেয়ে হারামের অংশই বেশি। আর এমন মানুষদের চক্ষুশূল হবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা শহীদ মীর কাশেম আলী, এমন টাই কি স্বাভাবিক না ? আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম আমরা কোথায় কবর দিতে চাই। কর্তারা এই প্রথম সদয় হলেন আমাদের উপর। শুরু হলো শহীদ মীর কাশেম আলীর চিরস্থায়ী নিবাস তৈরির কাজ। আর চলে সেই প্রবাদসম মহান নেতার আগমনে অপেক্ষা। রাত দেড়টার দিকে খবর পেলাম, তিনি রওনা হয়ে গেছেন তাঁর অনন্ত নিবাসে শায়িত হবার জন্য। রাত তিনটার কিছু আগে বা পরে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে পদ্মার পাড়ের সেই নিবর অন্ধকার অজপাড়া গাঁয়ে বেজে উঠলো নির্মম নিষ্ঠুর নির্দয় সেই আম্বুলেন্সের তীব্র আওয়াজ। সবাইকে জানান দিল, নেতা চলে এসেছেন। এখনই যাবেন তাঁর মহান রবের দরবারে হাজির হতে। তাঁকে বহন কারী আম্বুলেন্স যতই এগিয়ে আসছে আলোর তীব্রতা ছড়িয়ে, তার আগেই চোখে পড়লো এক দল অস্ত্রধারী পুলিশ সেই এম্বুলেন্স কে পাহারা দিয়ে এগিয়ে আসছে। যিনি সারাটা জীবন শান্তির জন্য কাজ করে গেছেন, এই তাঁর প্রতিদান। হায় রে মানুষ জানলিও না কার সাথে কি আচরন করলি। জমা রইলো, হাশরের মাঠে সব হিসেব পরিষ্কার করে নেয়া হবে, ইনশা আল্লাহ ! নেতা হাজির হলেন, এবার তাঁকে হস্তান্তরের পালা! মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার মেঝ মামী কে অনুরোধ করলেন একটা ফর্মে সাইন করে মামার লাশ বুঝে নিতে। মামী বললেন, আগে লাশ দেখে তারপর সাইন। পুলিশ সুপার বললেন, আগেই সাইন করুন, তারপর দেখতে দেখা হবে। এবারও আইন বলে কথা। মামী মুকুল আপাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে গেলেন কাগজে স্বাক্ষর করতে। তারপাশে আরো ৫ জন কে স্বাক্ষর দিতে হবে। এগিয়ে গেলেন জামান ভাই, ইমরান ভাই, কামরান ভাই, ওসমান ও আমি। স্বাক্ষর শেষে নামানো হলো মামার কফিন। ডালা খুললাম আমি জামান ভাই ওসমান আর ইমরান ভাই।আরমান জান একে তো গ্রাম রাতের শেষ প্রহর। জিলহজ্বের প্রথম দিনের চাঁদ সন্ধায় দেখা দিয়েই পালিয়েছে। তারপর আবার কারফিউ দিয়ে আশে পাশে বাড়ি-ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে। তার টেনে এনে বাল্ব জালিয়ে দিলে ও সে আলো গাছ ঝোপ ঝার ঘেরা আসমান-জমীনেরমহাশুন্যতার সেই ঘন অন্ধকার দুর করতে যথেস্ট হয়নি । তার মাঝে তুমি বিহীন আমরা। আমি কোন জান্নাতি মানুষ দেখি নি – তোমার আব্বুকে দেখেছি। দেখেছি সেই ঘন আঁধারে জান্নাতি নূর। রুম্মান লিখেছে……
“পলিথিন এ মুড়ে দেয়া হয়েছে আমার মামাকে। কাঁপা কাঁপা হাতে আমি, জামান ওসমান আর বড় ভাই খুললাম সেই পলিথিন। সাথে সাথে গন্ধ পেলাম চা পাতার। সাদা ধবধবে কাফনের কাপড়ে মুড়ে রাখা।
সারা গায়ে চা পাতা ছড়িয়ে দেয়া। হাত টা কাঁপছে। তারপরও মাথার গিট টা খুলে নেয়া হলো। একে একে তিন টা কাপড় সরাতেই আমাদের শেষ দেখা দিলেন আল্লাহর গোলাম শহীদ মীর কাসেম আলী। অপার্থিব এক সুঘ্রান নাকে এসে লাগল। মানুষ মৃত্যুর পর সুন্দর হয়ে যায় শুনেছি -এটা জীবনের প্রথম দেখা। ফাঁসিতে মুখ বিকৃত হয়। আমার মামা তো দেখি অনেক সুন্দর হয়ে গেছেন। প্রশান্ত এক চিরনিদ্রা। জীবদ্দশায় অনেক ব্যস্ততা আর ছুটাছুটি ছিল। মানুষের কষ্ট দূর করার কি নিরন্তর চেষ্টা। তাই বিশ্রাম সেই ভাবে নেয়ার সুযোগটা হয়ে উঠেনি। এই তো এখনই বিশ্রাম আর প্রশান্তির জীবনটা বুঝি শুরু হয়ে গেল।
শেষ দেখার অভিমানী পর্বটা শুরু হলো মামী কে দিয়ে। প্রথম নজর দেখেই একটু চুপ করে রইলেন। মনে মনে হয় তাঁর জীবন সঙ্গীকে কিছু বললেন। বললেন অনন্ত বিরহের কিছু কথা।তারপর কি পরম যত্ন নিয়ে মামার মুখখানি তে ছোঁয়া আর পরশ দিয়ে হাত বুলিয়ে দিলেন, আর সূরা আল ফজরের এই আয়াত গুলো বাংলায় বললেন ” হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে । শামিল হয়ে যাও আমার নেক বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।এ অবস্থায় যে তোমার রব তোমার প্রতি সন্তষ্ট আর তুমি তোমার রবের প্রতি সন্তুস্ট । ” শুরা আল ফজর (২৭-৩০)।
এর পর একে মহিলারা এগিয়ে এলেন শেষ দেখা দেখার জন্য। সুমাইয়া কফিনের কাছে এসে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। কান্না শুরু করেও মামার সামনে এসে মামাকে দেখে চুপ হয়ে গেল। এত সুন্দর মুখখানি দেখে আর কান্না না আসাটাই স্বাভাবিক। সবার বেলায় তাইই হলো। জামান বলছিলেন, যদি রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর জামানায় এই মৃত্যু হতো তাহলে হয় তো আল্লাহর রাসুল (দঃ) এই কথাই বলতেন, তোমরা যদি কোন জান্নাতি কে দেখতে চাও তো মীর কাসেম আলী কে দেখে যাও”। একে একে শেষ হলো দেখার পালা। শুরু হলো জানাযার নামাজ। ভাতিজি জামাই পরিচিয়ে বহু কষ্টে হাজির হয়েছিলেন, এই শহীদী কাফেলার আরেক সঙ্গী জনাব আব্দুল হালীম। জানাযায় কেউ কেউ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলেন না। কেউ ডুকরে ডুকরে কেউ বা চিৎকার করে কেঁদেছ উঠছিলেন। শেষ হলো জানাযা। কর্তাদের তীব্র ঘৃনা নিয়ে চিৎকার দিয়ে বললাম, এই বার কি করতে হবে বলুন? বললেন, এবার দাফন করে দিন। ওসমান গেল একটু দূরে বসে থাকা মামীর অনুমতি নিতে। মামী অনুমতি দিলেন, চিরনিদ্রায় শায়িত করতে কবরে নামলাম আমি, ওসমান, মিনার ভাই সালমান আর বড় ভাইয়া। সবার শেষে মামার মুখখানি কেবলা মুখি করে উঠে এলাম মামাকে অন্ধকার ঘরে একলা শুয়ায়ে রেখে।মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো এদেশের ইসলামী আন্দোলন এর ডাইনামিক সিপাহসালার শহীদ মীর কাশেম আলীর কবর। শেষ হলো শহীদ মীর কাশেম আলীর হিরক খচিত অধ্যায়। রয়ে গেলেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। মাটি দেয়া শেষ হবার পর মুনাজাত করলেন আব্দুল হালিম ভাই। মুনাজাতের সময় হঠাৎ শুনি অন্ধকার বাগান থেকে আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার করে কান্নার রোল। যে সব মজলুম মানুষের অভিভাবক ছিলেন শহীদ মীর কাশেম আলী, তাদেরই অনেকে অথবা গ্রাম বাসী যাদের পুলিশ আসতে দেয় নাই জানাযা পরতে তারাই কান্নার সাথে চিৎকার করে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন।”
– চলবে

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অন্তরে বিচ্ছেদের হাহাকার

অন্তরে বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে একে একে ১৪টি ঈদ আব্বাকে ছাড়া অতিবাহিত করলাম । মনের মাঝে অব্যক্ত অনেক দুঃখ, বেদনা, কষ্ট । তাই গতকাল আব্বার সাথে দেখা করে ফিরে এসেও কিছু লিখতে মন চায়নি । বিষণ্ণতা মনকে আকড়ে ধরেছিলো । 

আমাদের এই দুঃখ বেদনা অনেকেই বুঝবেন না । 
ঈদ ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকল মানুষের মাঝে আনন্দের এক বার্তা নিয়ে হাজির হয় প্রতিটি বছর । আমাদের "ঈদ" যেন ঐ উচু লাল দালানের মধ্যে বন্ধি আর এবারের ঈদে বাংলার আকাশ, সন্তান হারা মায়ের আহাজারি, স্বামী হারা স্ত্রীর আর্তনাত, ভাই হারা বোনের মর্মস্পর্শী মায়াকান্না ভারী করে তুলেছে । আপনজনের বিয়োগের বেদনা নাড়া দিচ্ছে ! হৃদয়ের অজানা কোন স্থানে প্রচন্ড আঘাত এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে । আমাদের মতোন তাদের ঘরেও নেই কোন আনন্দ । 
নির্বিচারে গ্রেফতার, খুন আর গুমের কারনে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য মায়ের সন্তানের অনুপস্থিতি তাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ এনে দিতে পারেনি । সে সংখ্যা এখন অনেকের-ই অজানা । সমবেদনা জানায় অনেকে তবুও হারানো ব্যথা বা বিচ্ছেদের যন্ত্রনা কি সকলে বুঝাতে/বুঝতে পারে ? 
অনেকেই মোবাইলে এবং ফেইসবুকের ইনবক্সে ম্যাসেজ করে জানতে চেয়েছেন প্রিয় আল্লামা সাঈদী হুজুর কেমন আছেন ? সকলকে আলাদাভাবে উত্তর জানাতে পারিনি তাই একসাথে সবার উদ্দেশ্যে এই লেখা । 
ঈদ উপলক্ষে গতকাল দুপুর ২টার সময় আব্বার সাথে দেখা করেছি । অনেকেই তাঁকে একনজর দেখতে চান । জেল/কারাগার আইন অনুযায়ী আমরা তো সেই সুযোগ করে দিতে পারিনা তবে আপনাদের সালাম পৌঁছে দেই । আপনারা যে তাঁকে এখনো মন প্রান দিয়ে ভালোবাসেন-স্বরন করেন সেকথা জানাই এবং তিনিও উপলব্ধি করেন । গভীর রাতে আপনাদের চোখের পানি, আপনাদের নফল রোজা এবং সম্মানিত হাজী ভাই বোনদের পবিত্র মক্কা-মদীনা-মিনা-মুজদালিয়া-আরাফার ময়দানে কান্না জড়িত কন্ঠে দোয়ার বদৌলতে তিনি শারীরিক ভাবে সুস্থ ও মানসিক দিক থেকে দৃঢ় আছেন । আলহামদুলিল্লাহ ! আল্লাহর শাহী দরবারে লক্ষকোটি শুকরিয়া । কারাগার থেকে আপনাদেরকে সালাম এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন । সেই সাথে হতাশ না হয়ে বেশী করে আল্লাহর দরবারে ধর্না দিতে বলেছেন । গভীর রাত অর্থাৎ সূর্যদোয়ের পূর্বে এবং আসর নামাজের পর সূর্যাস্তের পূর্বে দোয়া কবুল হয় । ওই সময় গুলোতে চোখের পানি ফেলে দোয়া করা ।
যুগে-যুগে ইসলামী আন্দোলনের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন হয়েছে নানা ভাবে, নানা কৌশলে । বার বার থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে । কিন্তু কোন দলন নিপীড়নই ইসলামী আন্দোলনের পথচলা থামিয়ে দিতে পারেনি, এখনও পারবে না । আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সমস্ত ত্যাগের বিনিময়ে এই জমিনে আল্লাহর দ্বীনের পতাকা উড়বেই, ইনশাআল্লাহ ।
ইয়া আল্লাহ ! আপনার সকল গুনবাচক নামের উছিলা দিয়ে, আপনার কাছে
আবেদন করি-করুনা ভিক্ষা চাই, কুরআনের পাখি আল্লামা সাঈদীকে সুস্থ্ শরীরে, নেকহায়াত দিয়ে- জালিমের কারাগার থেকে মুক্ত করে, আমাদের মাঝে তাফসীরুল কুরআনের ময়দানে, মসজিদের আঙ্গিনায় ফিরিয়ে দেন ।
হে আল্লাহ ! প্রয়োজনে আমার জীবনের বিনিময়ে কুরআনের পাখি সহ সকল
ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদেরকে, জালিমের জুলুম নির্যাতন থেকে
মুক্তির ব্যবস্থা দিন । আমিন -ইয়া রব্বাল আলামীন ।

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মৃত্যু মানেই শেষ নয়, অনন্ত জীবনের শুরু ...

وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا
তার প্রতি সালাম আর শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে । মরিয়ামঃ ১৫
সফল উদ্যোক্তা, সমাজ সেবক, উদ্যমী  সংগঠক,  মানব দরদী মীর কাশেম আলী জন্মে ছিলেন ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর । পিতাঃ মীর তৈয়েব আলী মাতাঃ রাবেয়া আখতার । তিনি ২ পুত্র এবং ৩ কন্যার পিতা । ১৯৬৭ সালে SSCতে মেধা তালিকায় ১৫তম স্থান অধিকার করেন । ১৯৬৯ সালে HSC এবং ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন । 
১৯৭৭এর ৬ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের যাত্রা শুরু হয় । মীর কাশেম আলী শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি । ১৯৭৯তে তিনি জামায়াত ইসলামিতে যোগদান করেন এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা, কর্ম পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন । 
সফল উদ্যোক্তা মীর কাশেম একে একে গড়ে তোলেন ইসলামি ব্যাংক, ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামি ব্যাংক স্কুল এন্ড কলেজ, ইবনে সিনা হসপিটাল, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ, ফুয়াদ আল খতীব হসপিটাল, দিগন্ত টিভি, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা এবং কেয়ারী গ্রুপ । এই প্রতিষ্ঠান গুলোর মুনাফার তুলনায় তিনি বেশী মনযোগী ছিলেন মানব সেবায় ।
মহান এই ব্যাক্তিটিকে ২০১২ সালের ১৭জুন  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক জঘন্য মিথ্যা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় । গ্রফতারের পূর্বে তাঁর নামে কোথাও কোন মামলা ছিলো না । নানান ভাবে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেন । গত ৩০ আগস্ট আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতির এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বিচারপতিগন মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন । রায়ের ৫দিনের মাথায় গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০:৩৫ মিনিটে কাশিমপুর কারাগার-২এ  ফাসি কার্যকর করা হয় । إِنَّا للهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ
জন্মস্থান মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার সুতালরি গ্রামের বাড়িতে নিজের প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়ীত হয়েছেন শহীদ মীর কাসেম আলী ।


وَلَا تَقُولُوا لِمَن يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِن لَّا تَشْعُرُونَ
আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না ৷ এই ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত ৷ কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোন চেতনা থাকে না"৷ 
And do not say  about those who are killed  in the way of Allah, "They are dead" Rather, they are alive, but you perceive(it) not. Baqarah: 154

আজ পৃথিবীর সমস্ত লাল গোলাপ আপনার জন্যই ফুটেছে ! আমি বিশ্বাস করি ফেরেশতাগণ আজ আপনাকে অভিবাদন জানাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন । আপনার অন্যান্য সম্মানীত সাথীগনও আপনাকে অভিবাদন জানোর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই । ওমর আল মুখতার, সাইয়্যেদ কুতুব, কাদের মোল্লা, নিজামী থেকে শুরু করে আপনি ।
যে হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের মানুষের জন্য হৃদয়ে আকাশসম স্বপ্ন আজ সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো । আপনি হাসপাতাল গড়েছেন, ব্যাংক গড়েছেন, টিভি গড়েছেন, স্কুল, কলেজ, মসজিদ গড়েছেন আরও কত কিছু ইতিহাস অবশ্যই স্বাক্ষ্য দেবে ।
সময়টা এখন সৃষ্টিশীল মানুষদের নয় । ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ব্যাংক ডাকাত, শেয়ার মার্কেটর লুটেরারা আজ আমাদের নৈতিকতার জ্ঞান দিতে আসছে ! আসলে ক্ষমতা জিনিসটাই বুঝি এমন ।
যে জাতি যেমন তাদের নেতাও তেমন এটাই চুড়ান্ত সত্য । আপনি আসলে এই জাতির নেতা হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি । চেয়ে দেখুন, এই জাতির নেতৃত্বের চেয়ারগুলোতে কারা বসে আছে ?
আপনি দেশের বাইরে গেলেন আর এদেশের মিডিয়া পাড়ার শিয়ালগুলো হুক্কাহুয়া আওয়াজ তুললো, ‘মীর কাসিম পালিয়েছেন!”। আপনি আসলেন’ জানান দিলেন, মীর কাশেমরা পালাতে জানে না’। ইতিহাসের সকল সময়েই মীর কাশেমরা জীবন দিয়েছে কিন্তু তাদের দ্বায়িত্ব ছেড়ে পালায়নি । আপনার শুভাকাংখিরা বারবার আপনাকে দেশে ফিরতে বারণ করেছেন, তারা বলেছেন আপনি ন্যায় বিচার পাবেন না ! কিন্তু আপনি বললেন, ইসলামী আন্দোলনে হাজার হাজার কর্মী প্রাণ দিচ্ছে, নেতারা প্রাণ দেবে না তা কি করে হয় ?
আপনি জানতেন আপনার সাথে কি করা হবে । আপনি জয় করেছেন জীবনকে । মৃত্যুও আপনাকে হারাতে পারেনি । হে মহান কারিগর, আপনি জেনে রাখুন নিস্তব্ধতার এই গহীন রজনীতে পথ হারা মানুষ মীর কাশেমদের দেখানো আলোতেই পথ খুঁজে পাবে ইনশাঅাল্লাহ । ভানুমতির গল্প দিয়ে যারা তাদের বিজয় কেতন উড়াতে চায় সেই বেকুব আত্ম-অহংকারীদের জন্য আফসোস ! সেই দিন তাদের অবশ্যই আসবে যারা আজকের কৃতকর্মের জন্য সবচেয়ে বেশি আফসোস করবে !  সকলকে একদিন আল্লাহ তায়ালার নিকটে হাজিরা দিতে হবে এবং সেদিন তিনি প্রতিটা কাজের হিসেব নেবেন ।
আমাদের বিনাশ নেই । মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে ! 
প্রতিটি গভীর রাত্রি শেষে সুবহে সাদিকের আলোর মত আমরা জেগে উঠবোই । 
 
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ]

ইয়া আল্লাহ ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তাকে দয়া করুন, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখুন, তাকে মাফ করে দিন, তার মেহমানদারীকে মর্যাদাপূর্ণ করুন, তার প্রবেশস্থান কবরকে প্রশস্ত করে দিন । আর আপনি তাকে ধৌত করুন পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে, আপনি তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করুন যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করেছেন । আর তাকে তার ঘরের পরিবর্তে উত্তম ঘর, তার পরিবারের বদলে উত্তম পরিবার ও তার জোড়ের (স্ত্রী/স্বামীর) চেয়ে উত্তম জোড় প্রদান করুন । আর আপনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং তাকে কবরের আযাব [ও জাহান্নামের আযাব] থেকে রক্ষা করুন । আমিন ইয়া রব্বাল আলামীন ।
মুসলিম ২/৬৬৩, নং ৯৬৩।