বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

হিমালয়ের কাছে ঋণী হয়ে গেলাম

মাউন্ট এভারেস্ট

এশিয়ার একটি পর্বতমালা যা তিব্বতীয় মালভুমি থেকে ভারতীয় উপমহাদেশকে পৃথক করেছে । আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও ভূটান এশিয়ার এই পাঁচ দেশে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালায় মাউন্ট এভারেস্ট, কেটু, কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রভৃতি বিশ্বের উচ্চতম শৃঙ্গগুলি অবস্থান করছে । এই পর্বতমালা থেকে বিশ্বের তিনটি প্রধান নদী সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র তাঁদের বিভিন্ন প্রধান ও অপ্রধান উপনদীসহ উৎপন্ন হয়েছে ।

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার অপূর্ব সৃষ্টি । আজ আপনাদের সেই অপূর্ব সৃষ্টি বিস্ময়কর রাজ্যে নিয়ে যাবো, যেখানে যেতে চায় পৃথিবীর বহু মানুষ । পৃথিবীর সব মানুষ হিমালয় পর্বতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ । একবার যে জেনেছে বা শুনেছে এর সৌন্দর্য্য আর সৌকর্যের কথা, সে আর তার মায়াজাল থেকে বেরোতে পারেনি । হিমালয় মানে এক বিস্ময়কর রহস্য, এক অদ্ভুত ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য । হাজার হাজার বছর ধরে তাবৎ দুনিয়ার মানুষকে অভিভূত করে রেখেছে এই হিমালয় । হিমালয় হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা । আর সেটাও কিন্তু যে সে উঁচু নয় ! ভাবেন তো, আপনাদের বাড়ির ছাদ থেকে একটা মানুষকে কতোটুকু দেখায়, কিংবা ২০ তলা বা ৫০ তলা উঁচু বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে ? পিঁপড়ার মতো, তাই না ? কিংবা ভাবেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিল্ডিংয়ের কথা । কিন্তু সে উচ্চতাও এই পর্বতমালার কাছে নস্যি । অতো উপর থেকে মানুষ তো দূরে থাক, হাতিও দেখা যাবে না । নীল তিমির কথাও যদি ধরেন, সেও পাত্তা পাবে না । কারণ পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার বা ২৯ হাজার ৩৫ ফিট উঁচুতে রয়েছে এর চূড়া "এভারেস্ট"।
এবার চলেন ‘হিমালয়’ শব্দে ফিরে যাই । ‘হিমালয়’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষা থেকে, অর্থ তুষারের আবাস বা বাসা । (হিম+আলয়= হিমালয়, বরফের ঘর) । কারণ, এর সবচেয়ে উঁচু চূড়াগুলো সবসময় তুষার দিয়ে ঢাকা থাকে । পর্বত আর পর্বতমালার পার্থক্য তো আপনারা বোঝেন, পাহাড়ের চেয়েও উঁচু যেগুলো, সেগুলোকে আমরা বলি পর্বত । আর অনেকগুলো পর্বত একসঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকলে, সেগুলোকে একসঙ্গে আমরা বলি পর্বতমালা । হিমালয় এমনি অনেকগুলো পর্বতমালা; মোটমাট ৬৬টি পর্বত, তিনটি সমান্তরাল রেঞ্জে উঠে গেছে ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সমতল ভূমির বিপরীতে । এই বিশাল পর্বতমালাকে যদি আপনি এক বিশালাকার দানবের আকারে ভাবেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে এর দেহের মাঝে মানে এর রেঞ্জের একদম মাঝে অবস্থিত ভূটান, নেপাল আর ভারতের সিকিম প্রদেশ । আর এর বিস্তৃত অংশ এবং কয়েকটি চূড়া আছে পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তান, চীন ও তিব্বতের প্রান্ত ঘিরে ।

আচ্ছা, এবার বলেন, এতো যে উঁচু হিমালয়, সেটা তৈরি হলো কি করে ? আসলে পৃথিবীর এই উচ্চতম পর্বতমালাও কিন্তু সবসময় এতো উঁচু ছিলো না, আদিম পৃথিবীর উচ্চতম স্থান ছিলো আরেকটি । আজকের এই হিমালয় কি আর একদিনে হয়েছে ! তবে হিমালয় এই চেহারায় আসার পর থেকে প্রায় একই রকম আছে । আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে জন্ম হয় এই পর্বতমালার । মূলত এক ভয়ঙ্কর ভূমিকম্পের কারণেই জন্ম হয় এই পর্বতমালার ।
যাহোক, বলছিলাম চূড়ার কথা । হিমালয় পর্বতমালায় যে সমান্তরাল তিনটি রেঞ্জ বা সারি রয়েছে, তাতে পৃথিবীতে ২৪ হাজার ফিট উঁচু পর্বতচূড়া আছে ১০৯ টি । এই ১০৯টি চূড়ার মধ্যে ৯৬টি আছে হিমালয় পর্বতমালার ওই সমান্তরাল তিনটি রেঞ্জে । সবার দক্ষিণে যে শিখর বা চূড়াটি রয়েছে তা প্রায় ৫০০০ ফিট উঁচু, মধ্যসারির পর্বতমালাগুলোর সর্বোচ্চ উচ্চতা ৭০০০ থেকে ১৫০০০ ফিট । আর এর পরেই রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতচূড়া সম্বলিত হিমালয় রেঞ্জ । মানে, এই রেঞ্জেই আছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট ।
তবে মাউন্ট এভারেস্টকে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বলে ঘোষণা করার ব্যাপারেও কিছু মজা আছে ।
আগে সবাই জানতো, পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চূড়া হল কাঞ্চনজক্সঘা । এই পর্বতশৃঙ্গটিও হিমালয়ে, এভারেস্টের কাছাকাছি । পরে এভারেস্টের খোজ পাওয়া গেলে শুরু হল শৃঙ্গটি মাপার কাজ । এই শৃঙ্গটির উচ্চতা মেপে বের করার কাজটি করেছিলেন এক বাঙালি, রাধানাথ শিকদার, ১৮৫২ সালে । কিন্তু এতো বড়ো সিদ্ধান্ত কি আর মাপজোখ না করে মেনে নেয়া যায় ? তৎকালীন বৃটিশ ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াহ তা মাপজোখ করতে লেগে যান । কয়েক বছর ধরে চলে সেই মাপজোখের পালা । অবশেষে, ১৮৬৬ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, কাঞ্চনজক্সঘা আর পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গ নয়, দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ । সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আসলে এভারেস্ট ।

তবে মজার ব্যপার কী জানেন ? তখনো কিন্তু পর্বতশৃঙ্গটির নাম এভারেস্ট দেয়াই হয়নি । শৃঙ্গটিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ঘোষণা করার পরে ওয়াহ পড়লেন আরেকটা ঝামেলায় । শৃঙ্গটির স্থানীয় অনেক নাম আছে, কিন্তু এমন কোনো নাম নেই, যে নামটি সবার কাছে প্রচলিত । অ্যান্ড্রু ওয়াহ নিরাপদ পথে হাঁটলেন । তিনি স্থানীয় নামগুলোর কোনটিই বেছে নিলেন না । তার আগে বৃটিশ ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল যিনি ছিলেন, ওয়াহ তার নামই বেছে নিলেন, জর্জ এভারেস্টের নামে নামকরণ করা হলো পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের "মাউন্ট এভারেস্ট" বা "এভারেস্ট পর্বতশৃঙ্গ"। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে । মানবজাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরনীয় দিন । এতোদিন পর্যন্ত যে এভারেস্ট মানুষের কাছে ছিলো অজেয়, সেই সুউচ্চ শৃঙ্গটিও মানুষের পদানত হলো । তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি ১৯৫৩ সালের ২৯ মে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখে যৌথভাবে হিমালয় জয় করেন ।
তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারি
ভাবছেন উঁচু হলো তো বয়েই গেল, তাতে উঠতে কি সমস্যা ? আছে আছে, সমস্যা আছে বলেই তো বলছি । সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, মাটি থেকে যতো উপরে ওঠা যায়, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ ততো কমে আসে । আর অক্সিজেন আমাদের জন্য কতো দরকারি, তা তো জানেনই । আর মাটি থেকে এতো উপরে যে চূড়া, সেখানকার বাতাসে অক্সিজেন এর পরিমান অনেক কম, তা একবার ভাবেন । তাই পর্বত চূড়ায় উঠতে হলে ঘাড়ে করে অক্সিজেন সিলিন্ডার বয়ে নিয়ে যেতে হয়, মহাকাশচারীদের মতো । কোনো কারণে যদি ট্যাংক ছিদ্র হয়ে যায়, কিংবা ট্যাংক থেকে মাস্কে অক্সিজেন আসার নল ফুটো হয়ে যায়, তবেই মরণ ! তাছাড়া, তুষারাবৃত হিমালয়ের প্রায় সবগুলো পর্বতশৃঙ্গে ওঠার রাস্তা যথেষ্ট খাড়া । শুধু তাই নয়, সে পথে প্রায়ই নানা দুর্যোগ হয় । হঠাৎ করে হয়তো তুষার ঝড় শুরু হলো, কিংবা পাহাড়ে জমা তুষার ধ্বসে পড়লো । তবেই আর আপনাকে বাঁচতে হবে না । আর একবার রাস্তা ভুল করলে হয়েছে, আর রাস্তা খুঁজে পেতে হবে না ! ওখানে যে সবই সাদা, শুধু বরফ আর বরফ ।

ভাবছেন তাহলে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে গিয়ে মারা পড়েছে ? তবে আর বলছি কি ! হিলারি আর তেনজিং কী আর প্রথম হিমালয়ে চড়তে গিয়েছিলো ! এর আগে কতো মানুষ চূড়ায় উঠতে গিয়ে মারা পড়েছে । পরেও মারা গেছে অনেকে । তবে এখন হিমালয়ের চূড়ায় ওঠা কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে; তবুও কাজটা ভীষণই কঠিন । একই সঙ্গে ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণও বটে । যতো প্রযুক্তিই ব্যবহার করেন, একবার তুষার ঝড়ে নয়তো তুষার ধ্বসের মধ্যে যদি পরেই যান, তবে আর বাঁচার উপায় নেই । তবু মানুষ এভারেস্ট জয় করতে চায় । প্রতি বছরই অসংখ্য মানুষ নেপালে নয়তো চীনে ছুটে যায় এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখতে । আর সেই তালিকায় কোনো বাংলাদেশীর নাম ছিলো না বহুদিন । অবশেষে সেই আক্ষেপ দূর করেন 'মুসা ইব্রাহিম' । ২০১০ সালের ২৩ মে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় তিনিই প্রথম বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা ওড়ান । তারপর এভারেস্ট জয় করেছেন আরো কয়েকজন বাংলাদেশী । মুসা ইব্রাহিমের পরপরই ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ২১ মে এভারেস্ট জয় করেন এম এ মুহিত । তবে তিনি একবার এভারেস্টে চড়েই খুশি থাকেননি, গিয়েছেন দু’বার । বাংলাদেশের মেয়েরাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন ? সেই আক্ষেপও ঘুঁচে গেছে । নিশাত মজুমদার প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেন ২০১২ সালের ১৯ মে । পরে ২০১২ সালের ২৬ মে ওয়াসফিয়া নাজরীন দ্বিতীয় বাংলাদেশি নারী হিসেবে জয় করেন মাউন্ট এভারেস্ট ।

এভারেস্ট সাগরমাতা -"সাগরের মাতা", চোমোলংমা অথবা কোমোলংমা ৮,৮৪৮ মিটার । চীন ও নেপাল সীমান্তে অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ ।

কাঞ্চনজঙ্ঘা Kangchen Dzö-nga, "তুষারের পাঁচ রত্ন" ৮,৫৮৬ মিটার । বিশ্বের ৩য় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, ভারতের সর্বোচ্চ (সিকিম) এবং নেপালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ।

অন্নপূর্ণা ("শস্য দেবী) ৮,০৯১ মিটার । নেপালে অবস্থিত বিশ্বের ১০ম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ।

বাংলাদেশে

তাজিংডং (বিজয় নামেও পরিচিত) বাংলাদেশের একটি পর্বতশৃঙ্গ । সরকারিভাবে এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ । বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বান্দরবন জেলার রুমা উপজেলার সাইচল পর্বতসারিতে অবস্থিত । সরকারী হিসেবে তাজিংডং পর্বতের উচ্চতা ১,২৮০ মিটার (৪১৯৮.৪ ফুট) । [২] পূর্বে কেওক্রাডংকে দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মনে করা হত, আধুনিক গবেষণায় এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে । কেওক্রাডং বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলায় অবস্থিত । অর্থাৎ বান্দরবানেরও দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, এর উচ্চতা পরিমাপ করা হয়েছিল ১,২৩০ মিটার ।

হিমালয়ের নিকটে

ভ্রমন পিয়াসী আমি ছোটবেলায় টিভিতে তুষারপাত দেখে মনে মনে তুষার দেখার গভীর ইচ্ছে জাগতো । স্বপ্ন দেখতাম হিমালয়ের পাদদেশে গিয়ে তুষার দেখছি । ২০০৭-এ হিমালয়ের অনেকটা কাছে গিয়েও তুষার দেখার ভাগ্য হলো না । আমার অনেক বন্ধুরা ইউরোপ আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে সেই কবে । তাদের কাছে তুষারের গল্প, দেশের গল্প, টাকার গল্প শুনতাম । তাই মনে মনে একদিন সংকল্প করলাম, তুষারের দেশে যাবো একদিন । জানুয়ারির শেষ । ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে থামেলের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটার । ঘণ্টাখানেক লাগবে যেতে । গাড়ি দরবার স্কয়ারের সামনে থেকে চলে যায় । এখানে গাড়ি থামতে দেয় না । কয়েক বছর আগের ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ চোখে পড়ে । তবে দরবার স্কয়ারটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের আওতায় পড়েছে ।
আমি নতুন একটা শহরকে জানতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বেশ গল্প করি । তাই প্রথমেই বেছে নিই ট্যাক্সি চালককে । কিছু কথা বলতেই তরুন গাড়ি চালক হেসে হেসে উৎসাহের সঙ্গে বলে যাচ্ছে তার মতামত—ইংরেজি ও হিন্দি মিলিয়ে । চালককে বেশ ভারতবিদ্বেষী দেখলাম । ভারত তাদের রাজনীতিতে যথেষ্ট মাথা ঘামায় । ক্ষোভের সঙ্গে সে বলে, নেপাল উন্নত একটা রাষ্ট্র হতে পারত কিন্তু শাসকদের দুর্নীতিতে দেশের এই অবস্থা । আমি হাসি, দুর্নীতি দক্ষিণ এশিয়ার ভাইরাস রোগ । এর ভ্যাকসিন আছে কিন্তু দেওয়া যাবে না । এই নিয়ে অভিযোগ শেষ হবে না । তালিকা অনেক লম্বা ।
আমরা চারজন, আরজু, আবীর, রোকন এবং আমি । কাঠমুন্ডুর হোটেল ভাইশালিতে পৌঁছুলাম । রাত কাটিয়ে সকাল বেলা গোসল সেরে নাস্তার জন্য ডাইনিংএ গেলাম । যথারীতি গতকালের ড্রাইভার পুরুসুত্তম হাজির । আমাদেরকে পোখরা নিয়ে যাবে । প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যামের কাঠমুন্ডু শহর ছেড়ে গাড়ি তখন হাইওয়েতে । জানালাটা খুলে মুক্ত বাতাস নিচ্ছি । রাস্তার এক পাশে উচু উচু পাহাড় আর অন্যপাশে পাথর নদী । পথে চলতে চলতে চারপাশে সবুজ গাছপালা আর খরস্রোতা নদী পার হচ্ছি । ভারতবর্ষের এই এক এলাকা অর্থাৎ মোগল আর ব্রিটিশরা নেপালকে কবজা করতে পারেনি । স্বাধীন ছিল নেপাল ! ভাবতেই ভালো লাগে । তবে ব্রিটিশরাজের মিত্র ছিল নেপাল । তাই দখলের প্রয়োজন পড়েনি । লামজং ও কাস্কির মহারাজা জং বাহাদুর রানা প্রথম দক্ষিণ এশিয়ার রাজা, যিনি ১৮৫০ সালে প্রথম রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে ইউরোপ গমন করেন । চীনও নেপাল নিয়ে দখল খেলায় পিছিয়ে নাই । চীন ৩২টি বর্ডার ক্রসিং পয়েন্ট খুলে রেখেছে নেপালে । যা ভারতের খুব একটা পছন্দের নয় । নেপালিদের মাধেশি বিক্ষোভের কথা শুনেছি । শুনেছি হ্যাশট্যাগ ব্যাক অফ ইন্ডিয়ার কথাও । জ্বালানি তেলের জন্য চীনের কাছে নেপালকে নত থাকতে হয় । যাক আমি পর্যটক, নেপালের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে আমার লাভ নেই । হিমালয়ের সৌন্দর্য দেখতে এসেছি ।
বিকেল নাগাদ পোখরা পৌঁছলাম । ডিজিটাল যুগ ! হিমালয় যেতে রাতদিন দিনরাত কসরত করতে হয় না । হেলিকপ্টার ব্যবস্থা আছে । ৩০ মিনিট যেতে, মাঝে আধা ঘন্টা ঘোরাঘুরি, ৩০ মিনিট আসতে, মোট দেড় ঘন্টা । জীবনের অন্যতম স্বরনীয় ঘটনা হয়ে থাকলো ।

সকালে প্রভু হেলিকপ্টার কোম্পানির পক্ষ থেকে গাড়ি এসে আমাদেরকে এয়ারপোর্ট রওনা দিলো । উত্তেজনা বোধ করছিলাম । স্বপ্ন কি সত্যি হতে যাচ্ছে ? আমরা কি হিমালয় জয় করতে যাচ্ছি ? হাস্যকরই বটে কিন্তু আন্নপুরনা বেজ ক্যেম্প নেমে কিছুক্ষনের জন্য হতবাক হয়েছিলাম । শুভ্রতা ছেয়ে আছে গোটা পাহাড়ময় । আমি কি হিমালয় দেখবো নাকি ছবি তুলবো ! আল্লাহু আকবর ! আল্লাহু আকবর । আল্লাহু আকবর । আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার অসীম করুণায় আজ তার অপূর্ব সৃষ্টি অবাক হয়ে দুচোখ ভঁরে দেখলাম । কিছুক্ষন একে অপরের গায়ে তুষার বরফ ছোড়াছুড়ি করে ক্লান্ত হয়ে বেজ ক্যেম্প রেস্টুরেন্টে কফি খেতে ঢুকলাম । ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিলাম । কড়া এক মগ কফি হাতে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে ঐ দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায় করলাম, আলহামদুলিল্লাহ ।

বিদেশী শহরে রাতের ঘুম । খুব ভোরে ঘুম ভাঙল । জানালার পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকিয়ে স্তব্দ হয়ে গেলাম । সামনে কিছু বিদ্যুৎতিক তার, আর তারের পেছনে স্পস্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছি ম্যঙ্গো কালারের চকবারের মত একটা বিরাট পাহাড় চূড়া । কিচ্ছুখন বিমূড় হয়ে তাকিয়ে রইলাম । আহ এই তাহলে গোল্ডেন সানরাইজ ।
দ্রুত রেড়ি হতে হবে । তাড়া খেয়ে এই ঠাণ্ডা ভোরবেলা নিজের সাথে যুদ্ধ করে উষ্ণ কম্বল্টা সরিয়ে নিজেকে বাথরুমের কুসুম গরম পানিতে সঁপে দিলাম । হোটেল থেকে বের হয়ে দেখি আসেপাশের অনেক দোকানের শাটার খুলছে । বাজে মাত্র ৫ঃ৩০মিনিট, বুঝা গেল আমাদের দেশের গ্রামের মত গ্রামীন নেপালবাসীরাও , early to rise & early to sleep তত্তে বিশ্বাসী অথবা পর্যটকদের জ্বালায় বেচারারা ঘুমাতে পারে না । আমাদেরকে কাঠমুন্ডু হয়ে ঢাকা যেতে হবে ।








সারাংকোট ২০০৭ হাজী হেলাল এবং আমি (Sun rise point) 

সারাংকোট ২০০৭ মাহদী (Sun rise point) 

মাহদী এবং মাহীর 







1 টি মন্তব্য: