রবিবার, ১০ মে, ২০২০

হুদাইবিয়ার সন্ধিই বিজয়ের সুচনা

হুদাইবিয়ার_সন্ধিই_বিজয়ের_সুচনা

সাইয়্যেদুল মুরসালীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে হোদাইবিয়ার সন্ধি এমন একটা ঘটনা, যার ফলে ঘটনাপ্রবাহে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুচিত হয় । এই ঘটনার ফলে ইসলামী আন্দোলন একলাফে সার্বজননীতার পর্যায়ে সম্প্রসারিত হবার সুযোগ পায় । এই ঘটনা দ্বারা রাসুলে আকরাম ﷺ এর সর্বউচ্চ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিচক্ষনতার প্রমান পাওয়া গেছে যে, বিদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতক, নিকৃষ্টতম ও নিষ্ঠুরতম যুদ্ধরত শত্রুকে তিনি কতো সহজে বুদ্ধিমত্তার সাথে সমঝোতা করতে উদ্ভুদ্ধ করেছেন এবং কয়েক বছরের জন্য ইসলামবিদ্রোহীদের হাত বেধে দিয়েছিলেন । ষষ্ঠ হিজরী সাল তিক্ত-মিষ্ট নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে আসছিল । হঠাৎ এক রাতে মহানবী ﷺ একটি সুন্দর স্বপ্নে দেখলেন, মুসলমানরা মসজিদুল হারামে (পবিত্র কাবাঘরের চারদিকে) হজ্বের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করছেন । তিনি এ স্বপ্নের কথা সাহাবীদেরকে বললেন এবং একে একটি শুভ আলামত মনে করে বললেন, খুব শিগগিরই মুসলমানরা তাদের মনের আশা পূরণে সক্ষম হবেন ।
কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মুসলমানদের উমরাহর জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মদীনার আশে-পাশের যেসব গোত্র তখনও মূর্তিপূজক ছিল, তাদেরও আহ্বান জানালেন মুসলমানদের সফরসঙ্গী হতে । এ খবর হিজাযের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমানরা যিলকদ মাসে উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কায় রওনা হচ্ছেন ।
এই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় সফরের আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণের দিক ছাড়াও সামাজিক ও রাজনৈতিক কল্যাণের দিকও ছিল এবং তা সমগ্র আরবোপদ্বীপে মুসলমানদের অবস্থানকে সুদৃঢ়করণ ও হিজাযের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম প্রচারের জন্য সহায়ক ছিল । কারণ :
প্রথমত আরবের মূর্তিপূজক নানা গোত্র ভাবত, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ তাদের সকল ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধী, এমনকি তাদের অন্যতম প্রাচীন আচার হজ্ব ও উমরাহরও তিনি বিরোধী । এ কারণে তারা রাসূল ﷺ ও তাঁর প্রচারিত ধর্মের প্রতি ভীত ছিল । তাই এমন মুহূর্তে নবী করীম ﷺ ও তাঁর সঙ্গীদের উমরা পালনে যাত্রার ঘোষণায় তাদের ঐ ভয় খানিকটা দূর হলো । মুহাম্মদ ﷺ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিকভাবে দেখিয়ে দিতে চাইলেন তিনি আল্লাহর ঘরের যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত ধর্মীয় আচার ও অন্যান্য স্মৃতিচি‎‎হ্নগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধী তো ননই; বরং এরূপ কাজকে ফরয মনে করেন এবং আরবদের আদি পিতা হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ন্যায় এর সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনে সচেষ্ট । যারা ইসলামকে তাদের সব ধর্মীয় ও জাতীয় আচার-অনুষ্ঠানের একশ’ ভাগ বিরোধী মনে করত, মুহাম্মদ ﷺ চেয়েছিলেন ঐ সব দল ও গোষ্ঠীকে এভাবে আকর্ষণ করতে ও তাদের মন থেকে ভয় দূর করতে ।
দ্বিতীয়ত এভাবে যদি মুসলমানরা শত-সহস্র আরব মুশরিকের সামনে সফলতার সাথে ও স্বাধীনভাবে মসজিদুল হারামে উমরাহ পালনে সক্ষম হন, তা হলে তা ইসলামের পক্ষে প্রচারের এক বিরাট সুযোগ এনে দেবে । কারণ এ সময়ে আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুশরিকরা মুসলমানদের খবর তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে নিয়ে যাবে । ফলে যেসব স্থানে ইসলামের আহ্বান পৌঁছানো মহানবী ﷺ -এর পক্ষে সম্ভব ছিল না বা তাঁর পক্ষে কাউকে প্রচারক হিসেবে পাঠানো সম্ভব হয়ে ওঠে নি, সেখানেও তাঁর বাণী পৌঁছে যাবে । অন্ততপক্ষে এর প্রভাব কার্যকর হবে ।
তৃতীয়ত, মানবতার দুত মুহাম্মদ ﷺ যাত্রার পূর্বে মদীনায় অবস্থানকালেই হারাম মাসগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন : “আমরা শুধুই আল্লাহর ঘর যিয়ারতে যাব ।” তাই সফরের সময় বহনের জন্য আরবদের মধ্যে প্রচলিত একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র সঙ্গে না নেয়ার জন্য মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন । এ নির্দেশের ফলে অনেকেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো । কারণ, আরবের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাতো যে, তিনি কোন আরব রীতি মানেন না, তারা দেখল, রাসূলও অন্যদের মতো এ মাসগুলোতে যুদ্ধকে হারাম মনে করেন ও এই প্রাচীন রীতিকে সমর্থন করেন ।
ইসলামের মহান কাণ্ডারী মুহাম্মাদ ﷺ জানতেন, এ পদ্ধতিতে মুসলমানরা সফলতা লাভ করলে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে । তা ছাড়া জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত এ দল নিজ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও সুহৃদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পাবে । আর কুরাইশরা মক্কায় প্রবেশে মুসলমানদের বাধা দিলে সমগ্র আরবোপদ্বীপের গোত্রগুলোর কাছে অসম্মানিত হবে । কারণ আরবের সাধারণ নিরপেক্ষ গোত্রগুলোর আগত প্রতিনিধিরা দেখবে আল্লাহর ঘরের উদ্দেশে ফরয হজ্ব করতে আসা একদল নিরস্ত্র হাজীর সঙ্গে কুরাইশরা কিরূপ আচরণ করেছে; অথচ মসজিদুল হারামের ওপর সব আরবের অধিকার রয়েছে এবং কুরাইশরা কেবল তার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে রয়েছেন ।
এর ফলে মুসলমানদের সত্যতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটবে এবং কুরাইশদের অবৈধ শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি তারা বুঝতে পারবে । ফলে কুরাইশরা ইসলামের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে তাদেরকে সঙ্গী ও চুক্তিবদ্ধ করতে পারবে না । কারণ তারা হাজার হাজার লোকের সামনেই মুসলমানদের বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে ।
মানবতার বন্ধু মহানবী ﷺ বিষয়টির নানা দিক চিন্তা করে উমরাহর জন্য যাত্রার নির্দেশ দিলেন । চৌদ্দ থেকে আঠারো হাজার , হজ্বযাত্রী ‘যুল হুলাইফা’ নামক স্থানে ইহরাম বাঁধলেন । তাঁরা কুরবানীর জন্য সত্তরটি উট সঙ্গে নিলেন এবং উটগুলোকে কোরবানীর জন্য চিহ্নিত করে সবার কাছে নিজেদের সফরের উদ্দেশ্য বর্ণনা করলেন ।
রাসূল ﷺ কয়েকজন সংবাদ বাহককে আগেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন যাতে কোনো শত্রু দেখলে তারা তাঁর কাছে দ্রুত সংবাদ পৌঁছান ।
‘আসফান’ থেকে রাসূল ﷺ এর পাঠানো সংবাদবাহক সংবাদ নিয়ে এলেন :
“কুরাইশরা আপনাদের আগমন সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং তাদের সৈন্যদের প্রস্তুত করে লাত ও ওজ্জার (দেবতার মূর্তি) শপথ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে যে, আপনাকে কোনক্রমেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না । কুরাইশের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও ব্যক্তিরা মক্কার নিকটবর্তী ‘যিতুয়া’য় সমবেত হয়েছে এবং মুসলমানদের অগ্রযাত্রা রোধ করতে তাদের সাহসী যোদ্ধা খালিদ ইবনে ওয়ালীদকে দু’ শ’ সৈন্যসহ আসফানের আট মাইল দূরের ‘কারাউল গামীম’-এ নিয়োজিত করেছে । তাদের উদ্দেশ্য মুসলমানদের গতিরোধ করা, এমনকি যদি এতে তাদের নিহতও হতে হয় ।”
মহানবী ﷺ এ সংবাদ শুনে বললেন : “কুরাইশদের জন্য আফসোস ! যুদ্ধ তাদের শেষ করে দিয়েছে । হায় ! যদি কুরাইশরা আরবের মূর্তিপূজক গোত্রগুলোর সঙ্গে আমাকে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিত ! সেক্ষেত্রে ঐ গোত্রগুলো আমার ওপর বিজয়ী হলে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতো, আর আমি তাদের ওপর বিজয়ী হলে হয় তারা ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিত, নতুবা তারা তাদের বিদ্যমান শক্তি নিয়ে আমার সাথে যুদ্ধ করত ।
আল্লাহর শপথ ! একত্ববাদী এ ধর্মের প্রচারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাব । হয় এতে আল্লাহ্ আমাদের বিজয়ী করবেন, নতুবা তাঁর পথে প্রাণ বিসর্জন দেব ।” এরপর একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শককে ডেকে এমনভাবে কাফেলাকে নিয়ে যেতে বললেন যাতে খালিদের সেনাদলের মুখোমুখি না হতে হয় । আসলাম গোত্রের একজন দিশারী কাফেলা পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছিলেন । তিনি এক দুর্গম উপত্যকা দিয়ে কাফেলাকে অতিক্রম করিয়ে ‘হুদায়বিয়া’য় পৌঁছলে মহানবী ﷺ -এর উট মাটিতে বসে পড়ল । বিশ্বনবী মুহাম্মাদ ﷺ বললেন : “এ উট আল্লাহর নির্দেশে এখানে বসে পড়েছে । এখানেই আমাদের করণীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।” এরপর সবাইকে বাহন হতে নেমে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন ।

সময় না গড়াতেই কুরাইশ অশ্বারোহী সেনারা রাসূল ﷺ -এর নতুন পথ সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁর অবস্থান গ্রহণের স্থানের কাছে চলে আসে । মহানবী ﷺ যাত্রা স্থগিত না করে অগ্রযাত্রার সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই কুরাইশ সৈন্যদের রক্ষণব্যূহ ভেদ করে যেতে হতো । সেক্ষেত্রে তাদের হত্যা করে রক্তের ওপর দিয়ে পথ অতিক্রম করতে হতো । অথচ সবাই জানত মানবতার বন্ধু রাসূল ﷺ উমরাহ ও কাবা ঘর যিয়ারত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে আসেন নি । তাই এ রকম কিছু ঘটলে মহানবীর ব্যক্তিত্ব ও শান্তিকামী চরিত্রের ভাবমর্যাদার ওপর আঘাত আসত । উপরন্তু আগত ঐ সৈন্যদের হত্যার মাধ্যমেই ঘটনার যবনিকাপাত ঘটতো না । কারণ সাথে সাথেই একের পর এক নতুন সেনাবাহিনী তাঁদের প্রতিরোধের জন্য আসত এবং তা অব্যাহত থাকত । অন্যদিকে মুসলমানরা তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র সঙ্গে নেন নি । এ অবস্থায় যুদ্ধ করা কখনোই কল্যাণকর হতো না । তাই আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান বাঞ্ছনীয় ছিল ।
এ কারণেই বাহন হতে নামার পর মহানবী ﷺ তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বলেন : “যদি আজ কুরাইশরা আমার কাছে এমন কিছু চায় যা তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় করে, তবে আমি অবশ্যই তা দেব এবং সমঝোতার পথকেই বেছে নেব ।”
সবাই বিশ্বনেতা রাসূল ﷺ -এর কথা শুনলেন এবং শত্রুদের কানেও তা পৌঁছল । তারা রাসূলের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে জানার সিদ্ধান্ত নিল । তাই কয়েকজনকে তাঁর কাছে পাঠাল তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য ।
রাসূল ﷺ সকাশে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
কুরাইশরা কয়েক দফায় রাসূলের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইল ।
সর্বপ্রথম বুদাইল খাযায়ী তার গোত্রের কয়েকজনকে নিয়ে রাসূলে আকরাম ﷺ এর কাছে এলো । মহানবী ﷺ তাদের বললেন : “আমি যুদ্ধের জন্য আসি নি; বরং আল্লাহর ঘর যিয়ারতে এসেছি ।” প্রতিনিধিদল কুরাইশ নেতাদের কাছে ফিরে গিয়ে প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল । কিন্তু কুরাইশরা তাদের কথা সহজে বিশ্বাস করতে পারল না । তাই তারা বলল : “আল্লাহর শপথ ! আমরা তাকে কোন অবস্থায়ই মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না, এমনকি যদি সে উমরাহ করতে আসে ।”
দ্বিতীয় বার কুরাইশদের পক্ষ থেকে ‘মুকরিজ’ নামের এক ব্যক্তি মানবতার বন্ধু বিশ্বনেতা মুহাম্মাদ ﷺ এর সাথে সাক্ষাৎ করল । সেও কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বুদাইলের অনুরূপ প্রতিবেদন দিল । কিন্তু কুরাইশরা তাদের দু’জনের কথাই বিশ্বাস করল না । তৃতীয়বার আরবের তীরন্দাজ বাহিনীর নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে দ্বন্দ্ব-সংশয় অবসানের লক্ষ্যে মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ এর কাছে পাঠালো । তাকে দূর থেকে দেখেই আখেরীনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ মন্তব্য করলেন :
“এই ব্যক্তি আল্লাহর পরিচয় লাভকারী পবিত্র এক গোত্রের মানুষ । তার সামনে কুরবানীর জন্য আনা উটগুলো ছেড়ে দাও যাতে সে বুঝতে পারে আমরা যুদ্ধ করতে আসি নি । উমরাহ করা ছাড়া আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই ।” এই শীর্ণ সত্তরটি উটের উপর হুলাইসের দৃষ্টি পড়লে সে দেখল সেগুলো খাদ্যাভাবে শুকিয়ে গেছে এবং একে অপরের লোম ছিঁড়ে খাচ্ছে । সে মহানবী ﷺ এর সঙ্গে দেখা না করেই যত দ্রুত সম্ভব কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল : “আমরা তোমাদের সাথে এ শর্তে কখনোই চুক্তিবদ্ধ হই নি যে, আল্লাহর ঘরের যিয়ারতকারীদের বাধা দেবো । মুহাম্মদ ﷺ যিয়ারত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন নি । যে খোদার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ ! যদি মুহাম্মদ ﷺকে প্রবেশে বাধা দাও, তা হলে আমি আমার গোত্রের সব লোক (যাদের অধিকাংশই তীরন্দাজ) নিয়ে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব ।”
হুলাইসের কথায় কুরাইশরা ভীত হলো এবং চিন্তা করে তাকে বলল :“শান্ত হও । আমরা এমন পথ অবলম্বন করব, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও ।”
অবশেষে তারা বুদ্ধিমান, সমঝদার ও তাদের কল্যাণকামী উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফীকে মহানবী ﷺ -এর কাছে পাঠাল । সে প্রথমে কুরাইশদের প্রতিনিধি হিসেবে যেতে রাজী হয় নি । কারণ সে লক্ষ্য করেছে, পূর্ববর্তী প্রতিনিধিদের তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে ও তাদের বিশ্বাস না করে মানহানি ঘটিয়েছে । কিন্তু কুরাইশরা তাকে আশ্বস্ত করল এই বলে যে, তাদের কাছে তার বিশেষ সম্মান রয়েছে এবং তাকে তারা বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ দেবে না ।
উরওয়া ইবনে মাসউদ- রাসূল ﷺ -এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল : “বিভিন্ন দলকে নিজের চারদিকে সমবেত করেছ এ উদ্দেশ্যে যে, নিজ জন্মভূমি (মক্কা) আক্রমণ করবে ? কিন্তু জেনে রাখ, কুরাইশরা তাদের সমগ্র শক্তি নিয়ে তোমার মোকাবেলা করবে এবং কোন অবস্থায়ই তোমাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না । কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি, তোমার চারপাশে সমবেত এরা তোমাকে একা ফেলে পালিয়ে না যায় !”
তার এ কথা বলার সময় মহানবীﷺ এর পেছনে দাঁড়িয়ে প্রথম খলিফা আবূ বকর (রাঃ) বললেন : “তুমি ভুল করছ ।বিশ্বনবী ﷺ -এর সঙ্গীরা কখনোই তাঁকে ছেড়ে যাবে না ।” উরওয়া মুসলমানদের মানসিক শক্তি দুর্বল করার জন্য কূটনৈতিক চাল চালছিল । সে কথা বলার সময় আখেরীনবী ﷺকে অসম্মান করার লক্ষ্যে বারবার তাঁর পবিত্র দাড়ি মুবারকে হাত দিচ্ছিল । অন্যদিকে মুগীরা ইবনে শু’বা প্রতিবারই তার হাতে আঘাত করে সরিয়ে দিচ্ছিলেন ও বলছিলেন : “সম্মান ও আদব রক্ষা করে আচরণ কর । মহানবী ﷺ এর সাথে বেয়াদবী করো না ।” উরওয়া ইবনে মাসউদ রাসূল ﷺ কে প্রশ্ন করল : “এই ব্যক্তিটি কে ?”
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন : “সে তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র শুবা’র পুত্র মুগীরা ।” উরওয়া রাগান্বিত হয়ে মুগীরাকে বলল : “হে চালবাজ প্রতারক ! আমি গতকাল তোর সম্মান কিনেছি (রক্ষা করেছি)। তুই ইসলাম গ্রহণের পর সাকীফ গোত্রের তের জনকে হত্যা করেছিস । আমি সাকীফ গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করা থেকে রক্ষা পেতে সবার রক্তপণ শোধ করেছি ।” মহানবী ﷺ তার কথায় ছেদ টেনে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বর্ণনা দিলেন যেমনটি পূর্ববর্তী প্রতিনিধিদের কাছে দিয়েছিলেন । এরপর উরওয়ার এতক্ষণের কথার দাঁতভাঙা জবাব দিতে উঠে ওযূ করতে গেলেন । উরওয়া লক্ষ্য করল মহানবীর ওযূর পানি মাটিতে পড়ার আগেই কাড়াকাড়ি করে মুসলমানরা তা নিয়ে নিচ্ছেন । উরওয়া সেখান থেকে উঠে কুরাইশদের সমাবেশস্থল ‘যি তুয়া’র দিকে যাত্রা করল । কুরাইশদের বৈঠকে প্রবেশ করে রাসূল ﷺ এর আসার উদ্দেশ্য ও সাক্ষাতের বিবরণ পেশ করল । এরপর বলল : “আমি বড় বড় রাজা-বাদশা দেখেছি । ক্ষমতাবান সম্রাট, যেমন পারস্য ও রোম সম্রাট, আবিসিনিয়ার বাদশাহ, সবাইকে দেখেছি । কিন্তু নিজ অনুসারী ও ভক্তদের মাঝে মুহাম্মদের মতো সম্মানের অধিকারী কাউকে দেখি নি । আমি দেখেছি তাঁর অনুসারীরা তাঁর ওযূর পানি মাটিতে পড়ার আগেই বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তা ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে । যদি তাঁর কোন চুল বা লোমও মাটিতে পড়ে, তারা তা ত্বরিৎগতিতে তুলে নিচ্ছে । তাই তাঁর বিপজ্জনক মর্যাদাকর অবস্থান সম্পর্কে কুরাইশদের চিন্তা করা উচিত ।”

বিশ্বনবী আখেরী রাসুল ﷺ -এর প্রতিনিধি প্রেরণ----
বিশ্ব মুসলিমের নেতা মুহাম্মদ ﷺ -এর সঙ্গে কুরাইশ প্রতিনিধি দলগুলোর বৈঠক সফলতা লাভ করে নি । তাই স্বাভাবিকভাবে মহানবীর ভাববার সম্ভাবনা ছিল, কুরাইশদের প্রেরিত প্রতিনিধি সঠিকভাবে তথ্য পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি বা কেউ কেউ সঠিক তথ্য সেখানে পৌঁছাক, তা চায় নি কিংবা মিথ্যুক বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে স্পষ্টভাবে বক্তব্য উপস্থাপন থেকে বিরত থেকেছে । এদিক চিন্তা করে মহানবী ﷺ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি পৌত্তলিক দলের নেতাদের কাছে পাঠিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য যে উমরাহ করা ছাড়া অন্য কিছু নয়, তা জানিয়ে দেবেনভ।
তিনি খাযায়া গোত্রের একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ কাজের জন্য মনোনীত করলেন । তাঁর নাম খিরাশ ইবনে উমাইয়্যা । বিশ্বনেতা মহানবী ﷺ তাঁকে একটি উট দিয়ে কুরাইশদের কাছে যেতে বললেন । তিনি কুরাইশদের কাছে গিয়ে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেন । কিন্তু কুরাইশরা কোন দূতের প্রতি সম্মানজনক আচরণের বিশ্বজনীন নীতি অনুসরণের বিপরীতে তাঁর উটটিকে হত্যা করল ও তাঁকেও হত্যা করতে উদ্যত হলো । কিন্তু তীরন্দাজ আরবরা কুরাইশদের এ কাজ থেকে নিবৃত্ত করল । এ কাজের মাধ্যমে কুরাইশরা প্রমাণ করল, তারা শান্তি, সন্ধি ও সমঝোতার পথ অবলম্বন করতে রাজী নয়; বরং যুদ্ধ বাঁধানোর চিন্তায় রয়েছে ।
এ ঘটনার পরপরই কুরাইশদের প্রশিক্ষিত ৫০ যুবক মুসলমানদের অবস্থানের কাছে মহড়া দেয়ার দায়িত্ব পেল । সে সাথে সুযোগ পেলে মুসলমানদের সম্পদ লুট করে তাঁদের কয়েকজনকে বন্দী করে কুরাইশদের কাছে নিয়ে যেতেও তাদেরকে বলা হয়েছিল । কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনা ব্যর্থ তো হলোই; বরং তারা সবাই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়ে রাসূলের সামনে হাজির করা হলো । বন্দী হওয়ার আগে তারা মুসলমানদের উদ্দেশে তীর ও পাথর ছোঁড়া সত্বেও মানবতার বন্ধু মহানবী ﷺ তাঁর শান্তিকামী মনোভাব প্রমাণ করতে তাদের সবাইকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বুঝিয়ে দিলেন, তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি ।
বিশ্বনবী আখেরী রাসুল ﷺ দ্বিতীয় বারের মতো প্রতিনিধি পাঠালেন । এতকিছু সত্বেও তিনি সন্ধি ও সমঝোতার বিষয়ে নিরাশ হলেন না এবং সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে এবং কুরাইশ নেতাদের মতের পরিবর্তন ঘটাতে চাইলেন । তিনি এমন এক ব্যক্তিকে মনোনীত করলেন কুরাইশদের রক্তে যার হাত রঞ্জিত হয়নি । তাই হযরত আলী, যুবাইরসহ ইসলামের যে সব মহাসৈনিক আরব ও কুরাইশদের মহাবীরদের মুখোমুখি হয়ে তাদের অনেককে হত্যা করেছেন, তাঁদেরকে মনোনীত করা সমীচীন মনে করলেন না । এজন্য তিনি সর্বপ্রথম দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের কথা চিন্তা করলেন । কারণ তিনি সেদিন পর্যন্ত কোন কুরাইশের এক ফোঁটা রক্তও ঝরান নি । কিন্তু উমর এ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অজুহাত দেখিয়ে বললেন : “আমি আমার জীবনের বিষয়ে কুরাইশদের হতে শঙ্কিত এবং মক্কায় আমার কোন নিকটাত্মীয়ও নেই যে আমার পক্ষাবলম্বন করে আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচাবে । তাই আমি এমন এক ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করছি, যিনি এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম । তিনি হলেন উসমান ইবনে আফ্ফান । যেহেতু তিনি উমাইয়্যা বংশের লোক এবং আবূ সুফিয়ানের নিকটাত্মীয়, সেহেতু তিনি আপনার বাণী কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বেশি উপযুক্ত ।” ফলে ভবিষ্যৎ তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফ্ফান এ কাজের দায়িত্ব পেলেন এবং মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন । তিনি পথিমধ্যে আবান ইবনে সাঈদ ইবনে আসের সাক্ষাৎ পেলেন এবং তার আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন । আবান প্রতিশ্রুতি দিল, কেউ তাঁর ক্ষতি করবে না এবং সে তাঁকে নিরাপদে কুরাইশদের কাছে নিয়ে যাবে যাতে তিনি রাসূল ﷺ এর বাণী পৌঁছাতে পারেন । কিন্তু কুরাইশরা নবী করীম ﷺ এর বাণী শুনে বলল : “আমরা শপথ করেছি মুহাম্মদকে জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না । এ শপথের ফলে সংলাপের মাধ্যমে তাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে ।” এরপর তারা উসমানকে কাবা ঘর তাওয়াফের অনুমতি দিল । কিন্তু তিনি আখেরী রাসূল
ﷺ এর সম্মানে তা থেকে বিরত থাকলেন । কুরাইশরা আরো যা করল, তা হলো তৃতীয় খলিফা উসমানকে ফিরে যেতে দিল না । সম্ভবত তারা চাইল তাঁর যাত্রা বিলম্বিত করে কোন উপায় বের করতে ।

বাইয়াতে রিদওয়ান
সাইয়্যেদুল মুরসালীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ -এর প্রেরিত প্রতিনিধির ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলো এবং তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন । হঠাৎ উসমানের নিহত হওয়ার সংবাদ মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এবং তাঁরা প্রতিশোধের জন্য গর্জে উঠলেন । মহানবী ﷺ - তাদের এই পবিত্র ও উজ্জীবিত চেতনাকে ধারণ ও দৃঢ় করার জন্য তাঁদের উদ্দেশে বললেন: “চূড়ান্ত কিছু না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না ।” যেহেতু সে মুহূর্তে মুসলমানরা সমূহ বিপদের আশংকা করছিলেন এবং এজন্য তাঁরা যুদ্ধের মনোভাব নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন, সেহেতু বিশ্বনেতা আখেরী নবী মুহাম্মাদ ﷺ - সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলমানদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুত শপথ নবায়ন করবেন । তাই নতুনভাবে তাঁদেরকে তাঁর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি গাছের নিচে বসলেন এবং সকল সঙ্গীকে বাইয়াত (প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার জন্য শপথ) নেয়ার জন্য তাঁর হাতে হাত রাখতে আহ্বান জানালেন । তাঁরা রাসূল ﷺ -এর হাতে হাত রেখে শপথ করলেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত ইসলামের প্রতিরক্ষায় নিবেদিত থাকবেন । এটিই সেই ঐতিহাসিক ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’, যা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে :
لقد رضى الله عن المؤمنین إذ یُبایعونک تحت الشّجرة فعلم ما فِى قلوبِهم فأنزل السّکینة علیهم و أثابَهم فتحا قریبا
“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে শপথ করল । আল্লাহ্ অবগত ছিলেন, যা তাদের অন্তরে ছিল । অতঃপর তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয় ।” (সূরা ফাত্হ : ১৮)
বাইয়াত সম্পন্ন হওয়ার পর মুসলমানরা তাঁদের করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন । হয় কুরাইশরা তাঁদের আল্লাহর ঘরে যাওয়ার পথ খুলে দেবে, নতুবা তাঁরা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করবেন । মহানবী ﷺ - উসমানের আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলেন । হঠাৎ তিনি ফিরে এলেন । এটি সন্ধির সবুজ সংকেত দিল । তিনি কুরাইশদের অবস্থান সম্পর্কে রাসূল ﷺ --কে বললেন : “কুরাইশদের সমস্যা হলো তারা আল্লাহর নামে শপথ করেছে । তাই এ সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের প্রতিনিধি আপনার নিকট আসবে ।”
রাসূল ﷺ --এর সাথে কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর-এর সাক্ষাৎ
কুরাইশদের পঞ্চম প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে সুহাইল ইবনে আমর রাসূলে আকরাম ﷺ -এর কাছে এল যাতে বিশেষ এক চুক্তির মাধ্যমে এ অচলাবস্থার অবসান হয় । সুহাইলকে দেখামাত্রই রাসূল ﷺ - বললেন : “সুহাইল কুরাইশদের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে সন্ধিচুক্তি করতে এসেছে ।” সুহাইল এসে মানবতার নেতা মহানবী ﷺ -এর সামনে বসল । সে যে বিষয়েই কথা বলছিল, তার মাধ্যমে একজন ঝানু কূটনীতিকের মতই সে মহানবী ﷺ -ভাবাবেগকে উদ্বেলিত করার চেষ্টা করছিল । সে বলল : “হে আবুল কাসেম ! মক্কা আমাদের পবিত্র স্থান এবং আমাদের জন্য সম্মানের বস্তু । আরবের সব গোত্র জানে, তুমি আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছ । তুমি যদি এ অবস্থায় জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ কর, তবে সব আরব গোত্রই জানবে, আমরা দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েছি । তখন সব আরব সম্প্রদায় আমাদের এ ভূমি দখল করার জন্য প্ররোচিত হবে । তোমার সঙ্গে আমাদের যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, তার কসম দিয়ে বলছি, তোমার এ জন্মভূমি মক্কার যে মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে...”
সুহাইল এটুকু বলতেই রাস্ট্রনায়ক মহানবী ﷺ - তার কথায় ছেদ ঘটিয়ে বললেন : “তুমি কী বলতে চাও ?” সে বলল : “কুরাইশ নেতাদের প্রস্তাব হলো : তুমি এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করে এখান থেকেই মদীনায় ফিরে যাও এবং পরের বছর উমরা করার জন্য এসো । মুসলমানরা আগামী বছর আরবের অন্যান্য গোত্রের মতই হজ্ব করার জন্য কাবা ঘরে আসতে পারবে । তাদের হজ্বের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের শর্ত হলো তারা তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না এবং সঙ্গে একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবে না ।”
বিশ্বনেতা আখেরীনবী ﷺ --এর সঙ্গে সুহাইলের আলোচনার ফলে মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে একটি ব্যাপক ও সার্বিক চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ সৃষ্টি হলো । কিন্তু চুক্তির শর্ত নির্ধারণ ও ধারা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সে বেশ কঠোরতা অবলম্বন করছিল । কখনো কখনো তার প্রস্তাব এতটা অগ্রহণীয় ছিল যে, তা সন্ধির সম্ভাবনাই নাকচ করছিল । কিন্তু উভয় পক্ষই সন্ধির পক্ষে থাকায় তা যাতে ছিন্ন না হয়, সে চেষ্টাও ছিল ।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনামতে মহানবী বিশ্বনেতা ﷺ - হযরত আলী (রাঃ)কে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন । প্রথমে তিনি আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-কে বলেন : “লিখ : ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’” এবং আলী তা লিখলেন । কিন্তু সুহাইল বলল : “আমি এ বাক্যের সাথে পরিচিত নই । ‘রাহমান’ ও ‘রাহীম’-কে আমি চিনি না; লিখ : ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্ ! তোমার নামে’।”
রাষ্ট্রনায়ক মহানবী ﷺ - সুহাইলের কথা মেনে নিয়ে অনুরূপ লিখতে বললেন । এরপর বিশ্বনবী ﷺ -বললেন : “লিখ : এ সন্ধিচুক্তি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ এবং কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইলের মধ্যে সম্পাদিত হচ্ছে ।” সুহাইল বলল : “আমরা তোমার রাসূল ও নবী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করি না । যদি তা স্বীকারই করতাম, তবে তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম না । অবশ্যই এ বিশেষণ চুক্তিপত্র থেকে মুছে দিয়ে নিজের নাম ও পিতার নাম লেখ ।” রাসূল ﷺ -এ বিষয়টিও মেনে নেবেন ও তাকে ছাড় দেবেন, এ সময় কোন কোন মুসলমান তা চান নি । কিন্তু মহানবী ﷺ -একটি উচ্চতর লক্ষ্য সামনে রেখে-যা আমরা পরে উল্লেখ করব: সুহাইলের দাবী মেনে নিয়ে হযরত আলী (রাঃ)কে ‘আল্লাহর রাসূল’ শব্দটি মুছে ফেলতে নির্দেশ দিলেন । হযরত আলী (রাঃ) অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সাথে বললেন : “হে আল্লাহর নবী ! আপনার পবিত্র নামের পাশে নবুওয়াতের স্বীকৃতিকে মুছে ফেলার মতো অসম্মানের কাজ করা থেকে আমাকে ক্ষমা করুন ।” মহানবী ﷺ - হযরত আলী (রাঃ)কে বললেন : “ঐ শব্দের ওপর আমার আঙ্গুল রাখ । আমি নিজেই তা মুছে দিই ।” আলী তা-ই করলেন এবং বিশ্বনেতা আখেরী রাসূল ﷺ - স্বহস্তে তা মুছে দিলেন ।
বিশ্বনেতা আখেরীনবী ﷺ এ সন্ধিচুক্তি লিখতে যে ব্যাপক ছাড় দেন, বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল । কারণ তিনি প্রবৃত্তির তাড়না ও বৈষয়িক চিন্তার অনুবর্তী ছিলেন না এবং তিনি জানতেন, মহাসত্য কখনো লেখা বা মোছার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় না । তাই সন্ধির ভিত্তি অটল রাখতে সুহাইলের সকল কঠোর শর্ত সমঝোতামূলক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে মেনে নিয়েছেন ।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বিশ্বনবী বিশ্বনেতা আখেরী রাসুল ﷺএর শিক্ষালয়ের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ ছাত্র আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিবও অনুরূপ ইতিহাসের শিকার হন । এ দৃষ্টিতে রাসূল ﷺ-এর মানস-প্রতিবিম্বকেও জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই রাসূলের অনুরূপ পর্যায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে । হযরত আলী রাসূলের নাম মুছে ফেলতে অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলে তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর ক্ষেত্রেও যে অনুরূপ ঘটনা ঘটবে, তার ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন : “হে আলী ! এদের উত্তরসূরিরাও তোমাকে এরূপ করতে বলবে এবং তুমি তাদের দ্বারা মযলুম হয়ে তা করতে বাধ্য হবে ।” এ স্মৃতি আলী (আ.)-এর মনে সিফ্ফীনের যুদ্ধের পর জাগ্রত হলো যখন আলী (রাঃ)-এর সরল ও অদূরদর্শী সৈন্যরা ধোঁকায় পড়ে প্রতারিত হয়ে আলী (রাঃ)কে সন্ধি করতে বাধ্য করল । যখন আলীর পক্ষে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবি রাফে সন্ধিপত্রে লিখলেন, هذا ما تقاضى علیه أمیر المؤمنین على ‘আমিরুল মুমিনীন আলী যে বিষয়ে আহ্বান জানাচ্ছেন’, তখন মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে নিয়োজিত প্রতিনিধি আমর ইবনে আস ও সিরীয় সৈন্যরা আপত্তি জানিয়ে বলল : “আলী ও আলীর পিতার নাম লিখ । কারণ আমরা যদি তাকে মুমিনদের নেতা মনে করতাম, তবে তার সঙ্গে কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতাম না ।”
এ ক্ষেত্রে বাক-বিতণ্ডা চলতে লাগল । হযরত আলী (রাঃ) চাচ্ছিলেন না এর মাধ্যমে নিজের অদূরদর্শী সৈনিকরা নতুন বাহানা শুরু করুক । উভয় পক্ষ দীর্ঘক্ষণ বিতর্ক করেছিল । অবশেষে তাঁর একজন সেনাপতির উপর্যুপরি অনুরোধে ‘আমিরুল মুমিনীন’ শব্দটি মুছে ফেলার অনুমতি দিলেন । এরপর বললেন : الله أکبر سنّة بسنّة “আল্লাহ্ মহান ও সর্বশ্রেষ্ঠ । একই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ।” তিনি এও বললেন : “এটি রাসূল ﷺ)-এর অনুসৃত রীতি এবং তাঁরই উদ্ধৃতি ।” এরপর হুদায়বিয়ার স্মৃতিচারণ করলেন ।
হুদায়বিয়ার সন্ধি-শর্ত
এখন বিশ্বনবী বিশ্বনেতা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও কুরাইশদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ করছি :
১. মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীগণ এ বছর এখান থেকেই মদীনায় ফিরে যাবেন । কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোয় স্বাধীনভাবে মক্কায় গিয়ে হজ্ব বা উমরাহ পালন করতে পারবেন । তবে শর্ত হলো এই যে, তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবেন না ও সঙ্গে সাধারণত একজন মুসাফির যাত্রী যে ধরনের তরবারি বহন করে, তা ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবেন না ।
২. যদি কুরাইশদের কেউ তাদের অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে যায় ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়, মুহাম্মদ অবশ্যই তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন । কিন্তু যদি কোন মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসে, কুরাইশরা তাকে মুসলমানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয় ।
৩. মুসলমান ও কুরাইশরা স্বাধীনভাবে যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন ।
৪. কুরাইশ ও মুসলমানরা সমগ্র আরব ভূ-খণ্ডে সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে এ মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে যে, দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না ও পরস্পরের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হতে বিরত থাকবে ।
৫. মক্কার মুসলমানরা এ চুক্তির অধীনে মক্কায় স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবেন এবং এক্ষেত্রে কুরাইশরা তাদের বাধা দিতে পারবে না । তাঁদের ধর্মান্তরিত করা ও মুসলমান হওয়ার কারণে তিরস্কার করতে পারবে না ।
৬. চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় একে অপরের ধন-সম্পদ সম্মানিত মনে করবেন এবং বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিতে পরস্পরকে দেখতে ও প্রতারণা করতে পারবেন না ।
৭. যেসব মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় আসবেন, তাঁদের জীবন ও ধন-সম্পদের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হবে ।
চুক্তিপত্র দু’টি ভিন্ন পত্রে লিখিত হয় । এরপর কয়েকজন কুরাইশ ও মুসলিম প্রতিনিধি সাক্ষী হিসেবে তাতে স্বাক্ষর করেন । পরে তার একটি অনুলিপি মহানবী ﷺ-কে এবং অন্যটি সুহাইলকে দেয়া হয় ।
স্বাধীনতার বাণী
এ চুক্তিপত্রের পর্বে পর্বে স্বাধীনতা ও মুক্তির বাণী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যার অনুরণন প্রতিটি নিরপেক্ষ বিবেকবান ব্যক্তির কানেই পৌঁছুবে । কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর হলো দ্বিতীয় শর্ত যা অনেককেই ক্রোধান্বিত করেছিল । রাসূলে আকরাম ﷺ-এর কোন কোন সঙ্গী এ বৈষম্যমূলক শর্তে চরম অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা ইসলামের নবী ও মহান নেতার প্রতি দৃষ্টিকটু ও সমালোচনামূলক । অথচ চুক্তিপত্রের এ ধারাটি উজ্জ্বল এক শিখার ন্যায় আজো প্রজ্বলিত রয়েছে । এতে ইসলামের প্রসার ও বিস্তারের পদ্ধতিতে মহানবী ﷺ-এর উন্নত চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে এবং স্বাধীনতা ও মুক্তির মৌলনীতির প্রতি ইসলামের মহান নেতার অনির্বচনীয় সম্মানের প্রকাশ পেয়েছে ।
কোন কোন সাহাবীর এ আপত্তির (‘কেন আমরা মুসলমানদের ফিরিয়ে দেব, অথচ তারা আমাদের থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়’) জবাবে বলেন : “যে মুসলমান ইসলামের পতাকার নিচ থেকে র্শিকের দিকে পালিয়ে যায় এবং তাওহীদবাদী ইসলামের পবিত্র পরিবেশের ওপর মানবতার পরিপন্থী র্শিকমিশ্রিত পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেয়, সুস্পষ্ট যে, তার ঈমান সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নি এবং সে মন থেকে ইসলামকে গ্রহণ করে নি । এরূপ কোন মুসলমান আমাদের কোন কল্যাণে আসবে না । অন্যদিকে আমরা যদি আমাদের কাছে আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিকে কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দিই, তা হলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ্ তার মুক্তির পথ করে দেবেন ।”
আখেরী নবী মানবতার বন্ধু বিশ্বনেতা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দৃষ্টিভঙ্গি বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিসম্মত ছিল । সময়ের পরিক্রমায় তাঁর গৃহীত ভূমিকার যথার্থতা প্রমাণিত হয় । কারণ সময় না গড়াতেই কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারাটির মন্দ প্রভাব কুরাইশদের ওপর পড়ল । ফলে তারা নিজেরাই এ ধারা বাতিলের আহ্বান জানালো । কাজেই হুদাইবিয়ার সন্ধিই বিজয়ের সুচনা ।

শামীম বিন সাঈদী



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন