রবিবার, ১০ মে, ২০২০

হুদাইবিয়ার সন্ধিই বিজয়ের সুচনা

হুদাইবিয়ার_সন্ধিই_বিজয়ের_সুচনা

সাইয়্যেদুল মুরসালীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে হোদাইবিয়ার সন্ধি এমন একটা ঘটনা, যার ফলে ঘটনাপ্রবাহে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুচিত হয় । এই ঘটনার ফলে ইসলামী আন্দোলন একলাফে সার্বজননীতার পর্যায়ে সম্প্রসারিত হবার সুযোগ পায় । এই ঘটনা দ্বারা রাসুলে আকরাম ﷺ এর সর্বউচ্চ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিচক্ষনতার প্রমান পাওয়া গেছে যে, বিদ্রোহ, বিশ্বাসঘাতক, নিকৃষ্টতম ও নিষ্ঠুরতম যুদ্ধরত শত্রুকে তিনি কতো সহজে বুদ্ধিমত্তার সাথে সমঝোতা করতে উদ্ভুদ্ধ করেছেন এবং কয়েক বছরের জন্য ইসলামবিদ্রোহীদের হাত বেধে দিয়েছিলেন । ষষ্ঠ হিজরী সাল তিক্ত-মিষ্ট নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে আসছিল । হঠাৎ এক রাতে মহানবী ﷺ একটি সুন্দর স্বপ্নে দেখলেন, মুসলমানরা মসজিদুল হারামে (পবিত্র কাবাঘরের চারদিকে) হজ্বের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করছেন । তিনি এ স্বপ্নের কথা সাহাবীদেরকে বললেন এবং একে একটি শুভ আলামত মনে করে বললেন, খুব শিগগিরই মুসলমানরা তাদের মনের আশা পূরণে সক্ষম হবেন ।
কিছু দিনের মধ্যেই তিনি মুসলমানদের উমরাহর জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং মদীনার আশে-পাশের যেসব গোত্র তখনও মূর্তিপূজক ছিল, তাদেরও আহ্বান জানালেন মুসলমানদের সফরসঙ্গী হতে । এ খবর হিজাযের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল যে, মুসলমানরা যিলকদ মাসে উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কায় রওনা হচ্ছেন ।
এই আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় সফরের আত্মিক ও নৈতিক কল্যাণের দিক ছাড়াও সামাজিক ও রাজনৈতিক কল্যাণের দিকও ছিল এবং তা সমগ্র আরবোপদ্বীপে মুসলমানদের অবস্থানকে সুদৃঢ়করণ ও হিজাযের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম প্রচারের জন্য সহায়ক ছিল । কারণ :
প্রথমত আরবের মূর্তিপূজক নানা গোত্র ভাবত, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ তাদের সকল ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধী, এমনকি তাদের অন্যতম প্রাচীন আচার হজ্ব ও উমরাহরও তিনি বিরোধী । এ কারণে তারা রাসূল ﷺ ও তাঁর প্রচারিত ধর্মের প্রতি ভীত ছিল । তাই এমন মুহূর্তে নবী করীম ﷺ ও তাঁর সঙ্গীদের উমরা পালনে যাত্রার ঘোষণায় তাদের ঐ ভয় খানিকটা দূর হলো । মুহাম্মদ ﷺ কর্মক্ষেত্রে ব্যবহারিকভাবে দেখিয়ে দিতে চাইলেন তিনি আল্লাহর ঘরের যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও একে কেন্দ্র করে আবর্তিত ধর্মীয় আচার ও অন্যান্য স্মৃতিচি‎‎হ্নগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধী তো ননই; বরং এরূপ কাজকে ফরয মনে করেন এবং আরবদের আদি পিতা হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর ন্যায় এর সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবনে সচেষ্ট । যারা ইসলামকে তাদের সব ধর্মীয় ও জাতীয় আচার-অনুষ্ঠানের একশ’ ভাগ বিরোধী মনে করত, মুহাম্মদ ﷺ চেয়েছিলেন ঐ সব দল ও গোষ্ঠীকে এভাবে আকর্ষণ করতে ও তাদের মন থেকে ভয় দূর করতে ।
দ্বিতীয়ত এভাবে যদি মুসলমানরা শত-সহস্র আরব মুশরিকের সামনে সফলতার সাথে ও স্বাধীনভাবে মসজিদুল হারামে উমরাহ পালনে সক্ষম হন, তা হলে তা ইসলামের পক্ষে প্রচারের এক বিরাট সুযোগ এনে দেবে । কারণ এ সময়ে আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুশরিকরা মুসলমানদের খবর তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে নিয়ে যাবে । ফলে যেসব স্থানে ইসলামের আহ্বান পৌঁছানো মহানবী ﷺ -এর পক্ষে সম্ভব ছিল না বা তাঁর পক্ষে কাউকে প্রচারক হিসেবে পাঠানো সম্ভব হয়ে ওঠে নি, সেখানেও তাঁর বাণী পৌঁছে যাবে । অন্ততপক্ষে এর প্রভাব কার্যকর হবে ।
তৃতীয়ত, মানবতার দুত মুহাম্মদ ﷺ যাত্রার পূর্বে মদীনায় অবস্থানকালেই হারাম মাসগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন : “আমরা শুধুই আল্লাহর ঘর যিয়ারতে যাব ।” তাই সফরের সময় বহনের জন্য আরবদের মধ্যে প্রচলিত একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র সঙ্গে না নেয়ার জন্য মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন । এ নির্দেশের ফলে অনেকেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলো । কারণ, আরবের মুশরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে অপপ্রচার চালাতো যে, তিনি কোন আরব রীতি মানেন না, তারা দেখল, রাসূলও অন্যদের মতো এ মাসগুলোতে যুদ্ধকে হারাম মনে করেন ও এই প্রাচীন রীতিকে সমর্থন করেন ।
ইসলামের মহান কাণ্ডারী মুহাম্মাদ ﷺ জানতেন, এ পদ্ধতিতে মুসলমানরা সফলতা লাভ করলে তাদের বহু প্রতীক্ষিত একটি লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে । তা ছাড়া জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত এ দল নিজ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও সুহৃদদের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পাবে । আর কুরাইশরা মক্কায় প্রবেশে মুসলমানদের বাধা দিলে সমগ্র আরবোপদ্বীপের গোত্রগুলোর কাছে অসম্মানিত হবে । কারণ আরবের সাধারণ নিরপেক্ষ গোত্রগুলোর আগত প্রতিনিধিরা দেখবে আল্লাহর ঘরের উদ্দেশে ফরয হজ্ব করতে আসা একদল নিরস্ত্র হাজীর সঙ্গে কুরাইশরা কিরূপ আচরণ করেছে; অথচ মসজিদুল হারামের ওপর সব আরবের অধিকার রয়েছে এবং কুরাইশরা কেবল তার তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে রয়েছেন ।
এর ফলে মুসলমানদের সত্যতার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটবে এবং কুরাইশদের অবৈধ শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি তারা বুঝতে পারবে । ফলে কুরাইশরা ইসলামের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে তাদেরকে সঙ্গী ও চুক্তিবদ্ধ করতে পারবে না । কারণ তারা হাজার হাজার লোকের সামনেই মুসলমানদের বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে ।
মানবতার বন্ধু মহানবী ﷺ বিষয়টির নানা দিক চিন্তা করে উমরাহর জন্য যাত্রার নির্দেশ দিলেন । চৌদ্দ থেকে আঠারো হাজার , হজ্বযাত্রী ‘যুল হুলাইফা’ নামক স্থানে ইহরাম বাঁধলেন । তাঁরা কুরবানীর জন্য সত্তরটি উট সঙ্গে নিলেন এবং উটগুলোকে কোরবানীর জন্য চিহ্নিত করে সবার কাছে নিজেদের সফরের উদ্দেশ্য বর্ণনা করলেন ।
রাসূল ﷺ কয়েকজন সংবাদ বাহককে আগেই সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন যাতে কোনো শত্রু দেখলে তারা তাঁর কাছে দ্রুত সংবাদ পৌঁছান ।
‘আসফান’ থেকে রাসূল ﷺ এর পাঠানো সংবাদবাহক সংবাদ নিয়ে এলেন :
“কুরাইশরা আপনাদের আগমন সম্পর্কে জানতে পেরেছে এবং তাদের সৈন্যদের প্রস্তুত করে লাত ও ওজ্জার (দেবতার মূর্তি) শপথ করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে যে, আপনাকে কোনক্রমেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না । কুরাইশের শীর্ষস্থানীয় নেতা ও ব্যক্তিরা মক্কার নিকটবর্তী ‘যিতুয়া’য় সমবেত হয়েছে এবং মুসলমানদের অগ্রযাত্রা রোধ করতে তাদের সাহসী যোদ্ধা খালিদ ইবনে ওয়ালীদকে দু’ শ’ সৈন্যসহ আসফানের আট মাইল দূরের ‘কারাউল গামীম’-এ নিয়োজিত করেছে । তাদের উদ্দেশ্য মুসলমানদের গতিরোধ করা, এমনকি যদি এতে তাদের নিহতও হতে হয় ।”
মহানবী ﷺ এ সংবাদ শুনে বললেন : “কুরাইশদের জন্য আফসোস ! যুদ্ধ তাদের শেষ করে দিয়েছে । হায় ! যদি কুরাইশরা আরবের মূর্তিপূজক গোত্রগুলোর সঙ্গে আমাকে মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিত ! সেক্ষেত্রে ঐ গোত্রগুলো আমার ওপর বিজয়ী হলে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতো, আর আমি তাদের ওপর বিজয়ী হলে হয় তারা ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিত, নতুবা তারা তাদের বিদ্যমান শক্তি নিয়ে আমার সাথে যুদ্ধ করত ।
আল্লাহর শপথ ! একত্ববাদী এ ধর্মের প্রচারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাব । হয় এতে আল্লাহ্ আমাদের বিজয়ী করবেন, নতুবা তাঁর পথে প্রাণ বিসর্জন দেব ।” এরপর একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শককে ডেকে এমনভাবে কাফেলাকে নিয়ে যেতে বললেন যাতে খালিদের সেনাদলের মুখোমুখি না হতে হয় । আসলাম গোত্রের একজন দিশারী কাফেলা পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছিলেন । তিনি এক দুর্গম উপত্যকা দিয়ে কাফেলাকে অতিক্রম করিয়ে ‘হুদায়বিয়া’য় পৌঁছলে মহানবী ﷺ -এর উট মাটিতে বসে পড়ল । বিশ্বনবী মুহাম্মাদ ﷺ বললেন : “এ উট আল্লাহর নির্দেশে এখানে বসে পড়েছে । এখানেই আমাদের করণীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে ।” এরপর সবাইকে বাহন হতে নেমে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিলেন ।

সময় না গড়াতেই কুরাইশ অশ্বারোহী সেনারা রাসূল ﷺ -এর নতুন পথ সম্পর্কে জানতে পেরে তাঁর অবস্থান গ্রহণের স্থানের কাছে চলে আসে । মহানবী ﷺ যাত্রা স্থগিত না করে অগ্রযাত্রার সিদ্ধান্ত নিলে অবশ্যই কুরাইশ সৈন্যদের রক্ষণব্যূহ ভেদ করে যেতে হতো । সেক্ষেত্রে তাদের হত্যা করে রক্তের ওপর দিয়ে পথ অতিক্রম করতে হতো । অথচ সবাই জানত মানবতার বন্ধু রাসূল ﷺ উমরাহ ও কাবা ঘর যিয়ারত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যে আসেন নি । তাই এ রকম কিছু ঘটলে মহানবীর ব্যক্তিত্ব ও শান্তিকামী চরিত্রের ভাবমর্যাদার ওপর আঘাত আসত । উপরন্তু আগত ঐ সৈন্যদের হত্যার মাধ্যমেই ঘটনার যবনিকাপাত ঘটতো না । কারণ সাথে সাথেই একের পর এক নতুন সেনাবাহিনী তাঁদের প্রতিরোধের জন্য আসত এবং তা অব্যাহত থাকত । অন্যদিকে মুসলমানরা তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র সঙ্গে নেন নি । এ অবস্থায় যুদ্ধ করা কখনোই কল্যাণকর হতো না । তাই আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান বাঞ্ছনীয় ছিল ।
এ কারণেই বাহন হতে নামার পর মহানবী ﷺ তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশে বলেন : “যদি আজ কুরাইশরা আমার কাছে এমন কিছু চায় যা তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক দৃঢ় করে, তবে আমি অবশ্যই তা দেব এবং সমঝোতার পথকেই বেছে নেব ।”
সবাই বিশ্বনেতা রাসূল ﷺ -এর কথা শুনলেন এবং শত্রুদের কানেও তা পৌঁছল । তারা রাসূলের চূড়ান্ত লক্ষ্য সম্পর্কে জানার সিদ্ধান্ত নিল । তাই কয়েকজনকে তাঁর কাছে পাঠাল তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানার জন্য ।
রাসূল ﷺ সকাশে কুরাইশ প্রতিনিধিদল
কুরাইশরা কয়েক দফায় রাসূলের কাছে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইল ।
সর্বপ্রথম বুদাইল খাযায়ী তার গোত্রের কয়েকজনকে নিয়ে রাসূলে আকরাম ﷺ এর কাছে এলো । মহানবী ﷺ তাদের বললেন : “আমি যুদ্ধের জন্য আসি নি; বরং আল্লাহর ঘর যিয়ারতে এসেছি ।” প্রতিনিধিদল কুরাইশ নেতাদের কাছে ফিরে গিয়ে প্রকৃত ঘটনা খুলে বলল । কিন্তু কুরাইশরা তাদের কথা সহজে বিশ্বাস করতে পারল না । তাই তারা বলল : “আল্লাহর শপথ ! আমরা তাকে কোন অবস্থায়ই মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না, এমনকি যদি সে উমরাহ করতে আসে ।”
দ্বিতীয় বার কুরাইশদের পক্ষ থেকে ‘মুকরিজ’ নামের এক ব্যক্তি মানবতার বন্ধু বিশ্বনেতা মুহাম্মাদ ﷺ এর সাথে সাক্ষাৎ করল । সেও কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বুদাইলের অনুরূপ প্রতিবেদন দিল । কিন্তু কুরাইশরা তাদের দু’জনের কথাই বিশ্বাস করল না । তৃতীয়বার আরবের তীরন্দাজ বাহিনীর নেতা হুলাইস ইবনে আলকামাকে দ্বন্দ্ব-সংশয় অবসানের লক্ষ্যে মহানবী মুহাম্মাদ ﷺ এর কাছে পাঠালো । তাকে দূর থেকে দেখেই আখেরীনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ মন্তব্য করলেন :
“এই ব্যক্তি আল্লাহর পরিচয় লাভকারী পবিত্র এক গোত্রের মানুষ । তার সামনে কুরবানীর জন্য আনা উটগুলো ছেড়ে দাও যাতে সে বুঝতে পারে আমরা যুদ্ধ করতে আসি নি । উমরাহ করা ছাড়া আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই ।” এই শীর্ণ সত্তরটি উটের উপর হুলাইসের দৃষ্টি পড়লে সে দেখল সেগুলো খাদ্যাভাবে শুকিয়ে গেছে এবং একে অপরের লোম ছিঁড়ে খাচ্ছে । সে মহানবী ﷺ এর সঙ্গে দেখা না করেই যত দ্রুত সম্ভব কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বলল : “আমরা তোমাদের সাথে এ শর্তে কখনোই চুক্তিবদ্ধ হই নি যে, আল্লাহর ঘরের যিয়ারতকারীদের বাধা দেবো । মুহাম্মদ ﷺ যিয়ারত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন নি । যে খোদার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ ! যদি মুহাম্মদ ﷺকে প্রবেশে বাধা দাও, তা হলে আমি আমার গোত্রের সব লোক (যাদের অধিকাংশই তীরন্দাজ) নিয়ে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব ।”
হুলাইসের কথায় কুরাইশরা ভীত হলো এবং চিন্তা করে তাকে বলল :“শান্ত হও । আমরা এমন পথ অবলম্বন করব, যাতে তুমি সন্তুষ্ট হও ।”
অবশেষে তারা বুদ্ধিমান, সমঝদার ও তাদের কল্যাণকামী উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফীকে মহানবী ﷺ -এর কাছে পাঠাল । সে প্রথমে কুরাইশদের প্রতিনিধি হিসেবে যেতে রাজী হয় নি । কারণ সে লক্ষ্য করেছে, পূর্ববর্তী প্রতিনিধিদের তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে ও তাদের বিশ্বাস না করে মানহানি ঘটিয়েছে । কিন্তু কুরাইশরা তাকে আশ্বস্ত করল এই বলে যে, তাদের কাছে তার বিশেষ সম্মান রয়েছে এবং তাকে তারা বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ দেবে না ।
উরওয়া ইবনে মাসউদ- রাসূল ﷺ -এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল : “বিভিন্ন দলকে নিজের চারদিকে সমবেত করেছ এ উদ্দেশ্যে যে, নিজ জন্মভূমি (মক্কা) আক্রমণ করবে ? কিন্তু জেনে রাখ, কুরাইশরা তাদের সমগ্র শক্তি নিয়ে তোমার মোকাবেলা করবে এবং কোন অবস্থায়ই তোমাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না । কিন্তু আমি ভয় পাচ্ছি, তোমার চারপাশে সমবেত এরা তোমাকে একা ফেলে পালিয়ে না যায় !”
তার এ কথা বলার সময় মহানবীﷺ এর পেছনে দাঁড়িয়ে প্রথম খলিফা আবূ বকর (রাঃ) বললেন : “তুমি ভুল করছ ।বিশ্বনবী ﷺ -এর সঙ্গীরা কখনোই তাঁকে ছেড়ে যাবে না ।” উরওয়া মুসলমানদের মানসিক শক্তি দুর্বল করার জন্য কূটনৈতিক চাল চালছিল । সে কথা বলার সময় আখেরীনবী ﷺকে অসম্মান করার লক্ষ্যে বারবার তাঁর পবিত্র দাড়ি মুবারকে হাত দিচ্ছিল । অন্যদিকে মুগীরা ইবনে শু’বা প্রতিবারই তার হাতে আঘাত করে সরিয়ে দিচ্ছিলেন ও বলছিলেন : “সম্মান ও আদব রক্ষা করে আচরণ কর । মহানবী ﷺ এর সাথে বেয়াদবী করো না ।” উরওয়া ইবনে মাসউদ রাসূল ﷺ কে প্রশ্ন করল : “এই ব্যক্তিটি কে ?”
মহানবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন : “সে তোমার ভ্রাতুষ্পুত্র শুবা’র পুত্র মুগীরা ।” উরওয়া রাগান্বিত হয়ে মুগীরাকে বলল : “হে চালবাজ প্রতারক ! আমি গতকাল তোর সম্মান কিনেছি (রক্ষা করেছি)। তুই ইসলাম গ্রহণের পর সাকীফ গোত্রের তের জনকে হত্যা করেছিস । আমি সাকীফ গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ করা থেকে রক্ষা পেতে সবার রক্তপণ শোধ করেছি ।” মহানবী ﷺ তার কথায় ছেদ টেনে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বর্ণনা দিলেন যেমনটি পূর্ববর্তী প্রতিনিধিদের কাছে দিয়েছিলেন । এরপর উরওয়ার এতক্ষণের কথার দাঁতভাঙা জবাব দিতে উঠে ওযূ করতে গেলেন । উরওয়া লক্ষ্য করল মহানবীর ওযূর পানি মাটিতে পড়ার আগেই কাড়াকাড়ি করে মুসলমানরা তা নিয়ে নিচ্ছেন । উরওয়া সেখান থেকে উঠে কুরাইশদের সমাবেশস্থল ‘যি তুয়া’র দিকে যাত্রা করল । কুরাইশদের বৈঠকে প্রবেশ করে রাসূল ﷺ এর আসার উদ্দেশ্য ও সাক্ষাতের বিবরণ পেশ করল । এরপর বলল : “আমি বড় বড় রাজা-বাদশা দেখেছি । ক্ষমতাবান সম্রাট, যেমন পারস্য ও রোম সম্রাট, আবিসিনিয়ার বাদশাহ, সবাইকে দেখেছি । কিন্তু নিজ অনুসারী ও ভক্তদের মাঝে মুহাম্মদের মতো সম্মানের অধিকারী কাউকে দেখি নি । আমি দেখেছি তাঁর অনুসারীরা তাঁর ওযূর পানি মাটিতে পড়ার আগেই বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তা ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে । যদি তাঁর কোন চুল বা লোমও মাটিতে পড়ে, তারা তা ত্বরিৎগতিতে তুলে নিচ্ছে । তাই তাঁর বিপজ্জনক মর্যাদাকর অবস্থান সম্পর্কে কুরাইশদের চিন্তা করা উচিত ।”

বিশ্বনবী আখেরী রাসুল ﷺ -এর প্রতিনিধি প্রেরণ----
বিশ্ব মুসলিমের নেতা মুহাম্মদ ﷺ -এর সঙ্গে কুরাইশ প্রতিনিধি দলগুলোর বৈঠক সফলতা লাভ করে নি । তাই স্বাভাবিকভাবে মহানবীর ভাববার সম্ভাবনা ছিল, কুরাইশদের প্রেরিত প্রতিনিধি সঠিকভাবে তথ্য পৌঁছাতে সক্ষম হয় নি বা কেউ কেউ সঠিক তথ্য সেখানে পৌঁছাক, তা চায় নি কিংবা মিথ্যুক বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে স্পষ্টভাবে বক্তব্য উপস্থাপন থেকে বিরত থেকেছে । এদিক চিন্তা করে মহানবী ﷺ সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি পৌত্তলিক দলের নেতাদের কাছে পাঠিয়ে তাঁর উদ্দেশ্য যে উমরাহ করা ছাড়া অন্য কিছু নয়, তা জানিয়ে দেবেনভ।
তিনি খাযায়া গোত্রের একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এ কাজের জন্য মনোনীত করলেন । তাঁর নাম খিরাশ ইবনে উমাইয়্যা । বিশ্বনেতা মহানবী ﷺ তাঁকে একটি উট দিয়ে কুরাইশদের কাছে যেতে বললেন । তিনি কুরাইশদের কাছে গিয়ে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেন । কিন্তু কুরাইশরা কোন দূতের প্রতি সম্মানজনক আচরণের বিশ্বজনীন নীতি অনুসরণের বিপরীতে তাঁর উটটিকে হত্যা করল ও তাঁকেও হত্যা করতে উদ্যত হলো । কিন্তু তীরন্দাজ আরবরা কুরাইশদের এ কাজ থেকে নিবৃত্ত করল । এ কাজের মাধ্যমে কুরাইশরা প্রমাণ করল, তারা শান্তি, সন্ধি ও সমঝোতার পথ অবলম্বন করতে রাজী নয়; বরং যুদ্ধ বাঁধানোর চিন্তায় রয়েছে ।
এ ঘটনার পরপরই কুরাইশদের প্রশিক্ষিত ৫০ যুবক মুসলমানদের অবস্থানের কাছে মহড়া দেয়ার দায়িত্ব পেল । সে সাথে সুযোগ পেলে মুসলমানদের সম্পদ লুট করে তাঁদের কয়েকজনকে বন্দী করে কুরাইশদের কাছে নিয়ে যেতেও তাদেরকে বলা হয়েছিল । কিন্তু তাদের এ পরিকল্পনা ব্যর্থ তো হলোই; বরং তারা সবাই মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়ে রাসূলের সামনে হাজির করা হলো । বন্দী হওয়ার আগে তারা মুসলমানদের উদ্দেশে তীর ও পাথর ছোঁড়া সত্বেও মানবতার বন্ধু মহানবী ﷺ তাঁর শান্তিকামী মনোভাব প্রমাণ করতে তাদের সবাইকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং বুঝিয়ে দিলেন, তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি ।
বিশ্বনবী আখেরী রাসুল ﷺ দ্বিতীয় বারের মতো প্রতিনিধি পাঠালেন । এতকিছু সত্বেও তিনি সন্ধি ও সমঝোতার বিষয়ে নিরাশ হলেন না এবং সংলাপের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে এবং কুরাইশ নেতাদের মতের পরিবর্তন ঘটাতে চাইলেন । তিনি এমন এক ব্যক্তিকে মনোনীত করলেন কুরাইশদের রক্তে যার হাত রঞ্জিত হয়নি । তাই হযরত আলী, যুবাইরসহ ইসলামের যে সব মহাসৈনিক আরব ও কুরাইশদের মহাবীরদের মুখোমুখি হয়ে তাদের অনেককে হত্যা করেছেন, তাঁদেরকে মনোনীত করা সমীচীন মনে করলেন না । এজন্য তিনি সর্বপ্রথম দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনে খাত্তাবের কথা চিন্তা করলেন । কারণ তিনি সেদিন পর্যন্ত কোন কুরাইশের এক ফোঁটা রক্তও ঝরান নি । কিন্তু উমর এ দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অজুহাত দেখিয়ে বললেন : “আমি আমার জীবনের বিষয়ে কুরাইশদের হতে শঙ্কিত এবং মক্কায় আমার কোন নিকটাত্মীয়ও নেই যে আমার পক্ষাবলম্বন করে আমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচাবে । তাই আমি এমন এক ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করছি, যিনি এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম । তিনি হলেন উসমান ইবনে আফ্ফান । যেহেতু তিনি উমাইয়্যা বংশের লোক এবং আবূ সুফিয়ানের নিকটাত্মীয়, সেহেতু তিনি আপনার বাণী কুরাইশদের কাছে পৌঁছানোর জন্য বেশি উপযুক্ত ।” ফলে ভবিষ্যৎ তৃতীয় খলিফা উসমান ইবনে আফ্ফান এ কাজের দায়িত্ব পেলেন এবং মক্কার দিকে রওয়ানা হলেন । তিনি পথিমধ্যে আবান ইবনে সাঈদ ইবনে আসের সাক্ষাৎ পেলেন এবং তার আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করলেন । আবান প্রতিশ্রুতি দিল, কেউ তাঁর ক্ষতি করবে না এবং সে তাঁকে নিরাপদে কুরাইশদের কাছে নিয়ে যাবে যাতে তিনি রাসূল ﷺ এর বাণী পৌঁছাতে পারেন । কিন্তু কুরাইশরা নবী করীম ﷺ এর বাণী শুনে বলল : “আমরা শপথ করেছি মুহাম্মদকে জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না । এ শপথের ফলে সংলাপের মাধ্যমে তাকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে ।” এরপর তারা উসমানকে কাবা ঘর তাওয়াফের অনুমতি দিল । কিন্তু তিনি আখেরী রাসূল
ﷺ এর সম্মানে তা থেকে বিরত থাকলেন । কুরাইশরা আরো যা করল, তা হলো তৃতীয় খলিফা উসমানকে ফিরে যেতে দিল না । সম্ভবত তারা চাইল তাঁর যাত্রা বিলম্বিত করে কোন উপায় বের করতে ।

বাইয়াতে রিদওয়ান
সাইয়্যেদুল মুরসালীন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ ﷺ -এর প্রেরিত প্রতিনিধির ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হলো এবং তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন । হঠাৎ উসমানের নিহত হওয়ার সংবাদ মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল এবং তাঁরা প্রতিশোধের জন্য গর্জে উঠলেন । মহানবী ﷺ - তাদের এই পবিত্র ও উজ্জীবিত চেতনাকে ধারণ ও দৃঢ় করার জন্য তাঁদের উদ্দেশে বললেন: “চূড়ান্ত কিছু না করা পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না ।” যেহেতু সে মুহূর্তে মুসলমানরা সমূহ বিপদের আশংকা করছিলেন এবং এজন্য তাঁরা যুদ্ধের মনোভাব নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন, সেহেতু বিশ্বনেতা আখেরী নবী মুহাম্মাদ ﷺ - সিদ্ধান্ত নিলেন মুসলমানদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুত শপথ নবায়ন করবেন । তাই নতুনভাবে তাঁদেরকে তাঁর সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি গাছের নিচে বসলেন এবং সকল সঙ্গীকে বাইয়াত (প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার জন্য শপথ) নেয়ার জন্য তাঁর হাতে হাত রাখতে আহ্বান জানালেন । তাঁরা রাসূল ﷺ -এর হাতে হাত রেখে শপথ করলেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত ইসলামের প্রতিরক্ষায় নিবেদিত থাকবেন । এটিই সেই ঐতিহাসিক ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’, যা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে :
لقد رضى الله عن المؤمنین إذ یُبایعونک تحت الشّجرة فعلم ما فِى قلوبِهم فأنزل السّکینة علیهم و أثابَهم فتحا قریبا
“আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে শপথ করল । আল্লাহ্ অবগত ছিলেন, যা তাদের অন্তরে ছিল । অতঃপর তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয় ।” (সূরা ফাত্হ : ১৮)
বাইয়াত সম্পন্ন হওয়ার পর মুসলমানরা তাঁদের করণীয় সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন । হয় কুরাইশরা তাঁদের আল্লাহর ঘরে যাওয়ার পথ খুলে দেবে, নতুবা তাঁরা মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ করবেন । মহানবী ﷺ - উসমানের আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলেন । হঠাৎ তিনি ফিরে এলেন । এটি সন্ধির সবুজ সংকেত দিল । তিনি কুরাইশদের অবস্থান সম্পর্কে রাসূল ﷺ --কে বললেন : “কুরাইশদের সমস্যা হলো তারা আল্লাহর নামে শপথ করেছে । তাই এ সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের প্রতিনিধি আপনার নিকট আসবে ।”
রাসূল ﷺ --এর সাথে কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইল ইবনে আমর-এর সাক্ষাৎ
কুরাইশদের পঞ্চম প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে সুহাইল ইবনে আমর রাসূলে আকরাম ﷺ -এর কাছে এল যাতে বিশেষ এক চুক্তির মাধ্যমে এ অচলাবস্থার অবসান হয় । সুহাইলকে দেখামাত্রই রাসূল ﷺ - বললেন : “সুহাইল কুরাইশদের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে সন্ধিচুক্তি করতে এসেছে ।” সুহাইল এসে মানবতার নেতা মহানবী ﷺ -এর সামনে বসল । সে যে বিষয়েই কথা বলছিল, তার মাধ্যমে একজন ঝানু কূটনীতিকের মতই সে মহানবী ﷺ -ভাবাবেগকে উদ্বেলিত করার চেষ্টা করছিল । সে বলল : “হে আবুল কাসেম ! মক্কা আমাদের পবিত্র স্থান এবং আমাদের জন্য সম্মানের বস্তু । আরবের সব গোত্র জানে, তুমি আমাদের সাথে যুদ্ধ করেছ । তুমি যদি এ অবস্থায় জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ কর, তবে সব আরব গোত্রই জানবে, আমরা দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েছি । তখন সব আরব সম্প্রদায় আমাদের এ ভূমি দখল করার জন্য প্ররোচিত হবে । তোমার সঙ্গে আমাদের যে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে, তার কসম দিয়ে বলছি, তোমার এ জন্মভূমি মক্কার যে মর্যাদা ও সম্মান রয়েছে...”
সুহাইল এটুকু বলতেই রাস্ট্রনায়ক মহানবী ﷺ - তার কথায় ছেদ ঘটিয়ে বললেন : “তুমি কী বলতে চাও ?” সে বলল : “কুরাইশ নেতাদের প্রস্তাব হলো : তুমি এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করে এখান থেকেই মদীনায় ফিরে যাও এবং পরের বছর উমরা করার জন্য এসো । মুসলমানরা আগামী বছর আরবের অন্যান্য গোত্রের মতই হজ্ব করার জন্য কাবা ঘরে আসতে পারবে । তাদের হজ্বের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের শর্ত হলো তারা তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না এবং সঙ্গে একটি তরবারি ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবে না ।”
বিশ্বনেতা আখেরীনবী ﷺ --এর সঙ্গে সুহাইলের আলোচনার ফলে মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে একটি ব্যাপক ও সার্বিক চুক্তি সম্পাদনের সুযোগ সৃষ্টি হলো । কিন্তু চুক্তির শর্ত নির্ধারণ ও ধারা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সে বেশ কঠোরতা অবলম্বন করছিল । কখনো কখনো তার প্রস্তাব এতটা অগ্রহণীয় ছিল যে, তা সন্ধির সম্ভাবনাই নাকচ করছিল । কিন্তু উভয় পক্ষই সন্ধির পক্ষে থাকায় তা যাতে ছিন্ন না হয়, সে চেষ্টাও ছিল ।
অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনামতে মহানবী বিশ্বনেতা ﷺ - হযরত আলী (রাঃ)কে চুক্তিপত্র লেখার নির্দেশ দেন । প্রথমে তিনি আমীরুল মুমিনীন আলী (রাঃ)-কে বলেন : “লিখ : ‘বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’” এবং আলী তা লিখলেন । কিন্তু সুহাইল বলল : “আমি এ বাক্যের সাথে পরিচিত নই । ‘রাহমান’ ও ‘রাহীম’-কে আমি চিনি না; লিখ : ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্ ! তোমার নামে’।”
রাষ্ট্রনায়ক মহানবী ﷺ - সুহাইলের কথা মেনে নিয়ে অনুরূপ লিখতে বললেন । এরপর বিশ্বনবী ﷺ -বললেন : “লিখ : এ সন্ধিচুক্তি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ এবং কুরাইশ প্রতিনিধি সুহাইলের মধ্যে সম্পাদিত হচ্ছে ।” সুহাইল বলল : “আমরা তোমার রাসূল ও নবী হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করি না । যদি তা স্বীকারই করতাম, তবে তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম না । অবশ্যই এ বিশেষণ চুক্তিপত্র থেকে মুছে দিয়ে নিজের নাম ও পিতার নাম লেখ ।” রাসূল ﷺ -এ বিষয়টিও মেনে নেবেন ও তাকে ছাড় দেবেন, এ সময় কোন কোন মুসলমান তা চান নি । কিন্তু মহানবী ﷺ -একটি উচ্চতর লক্ষ্য সামনে রেখে-যা আমরা পরে উল্লেখ করব: সুহাইলের দাবী মেনে নিয়ে হযরত আলী (রাঃ)কে ‘আল্লাহর রাসূল’ শব্দটি মুছে ফেলতে নির্দেশ দিলেন । হযরত আলী (রাঃ) অত্যন্ত সম্মান ও বিনয়ের সাথে বললেন : “হে আল্লাহর নবী ! আপনার পবিত্র নামের পাশে নবুওয়াতের স্বীকৃতিকে মুছে ফেলার মতো অসম্মানের কাজ করা থেকে আমাকে ক্ষমা করুন ।” মহানবী ﷺ - হযরত আলী (রাঃ)কে বললেন : “ঐ শব্দের ওপর আমার আঙ্গুল রাখ । আমি নিজেই তা মুছে দিই ।” আলী তা-ই করলেন এবং বিশ্বনেতা আখেরী রাসূল ﷺ - স্বহস্তে তা মুছে দিলেন ।
বিশ্বনেতা আখেরীনবী ﷺ এ সন্ধিচুক্তি লিখতে যে ব্যাপক ছাড় দেন, বিশ্বের ইতিহাসে তা বিরল । কারণ তিনি প্রবৃত্তির তাড়না ও বৈষয়িক চিন্তার অনুবর্তী ছিলেন না এবং তিনি জানতেন, মহাসত্য কখনো লেখা বা মোছার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় না । তাই সন্ধির ভিত্তি অটল রাখতে সুহাইলের সকল কঠোর শর্ত সমঝোতামূলক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে মেনে নিয়েছেন ।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
বিশ্বনবী বিশ্বনেতা আখেরী রাসুল ﷺএর শিক্ষালয়ের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ ছাত্র আমীরুল মুমিনীন আলী ইবনে আবি তালিবও অনুরূপ ইতিহাসের শিকার হন । এ দৃষ্টিতে রাসূল ﷺ-এর মানস-প্রতিবিম্বকেও জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই রাসূলের অনুরূপ পর্যায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে । হযরত আলী রাসূলের নাম মুছে ফেলতে অপারগতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাইলে তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে তাঁর ক্ষেত্রেও যে অনুরূপ ঘটনা ঘটবে, তার ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন : “হে আলী ! এদের উত্তরসূরিরাও তোমাকে এরূপ করতে বলবে এবং তুমি তাদের দ্বারা মযলুম হয়ে তা করতে বাধ্য হবে ।” এ স্মৃতি আলী (আ.)-এর মনে সিফ্ফীনের যুদ্ধের পর জাগ্রত হলো যখন আলী (রাঃ)-এর সরল ও অদূরদর্শী সৈন্যরা ধোঁকায় পড়ে প্রতারিত হয়ে আলী (রাঃ)কে সন্ধি করতে বাধ্য করল । যখন আলীর পক্ষে আবদুল্লাহ্ ইবনে আবি রাফে সন্ধিপত্রে লিখলেন, هذا ما تقاضى علیه أمیر المؤمنین على ‘আমিরুল মুমিনীন আলী যে বিষয়ে আহ্বান জানাচ্ছেন’, তখন মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে নিয়োজিত প্রতিনিধি আমর ইবনে আস ও সিরীয় সৈন্যরা আপত্তি জানিয়ে বলল : “আলী ও আলীর পিতার নাম লিখ । কারণ আমরা যদি তাকে মুমিনদের নেতা মনে করতাম, তবে তার সঙ্গে কখনো যুদ্ধে লিপ্ত হতাম না ।”
এ ক্ষেত্রে বাক-বিতণ্ডা চলতে লাগল । হযরত আলী (রাঃ) চাচ্ছিলেন না এর মাধ্যমে নিজের অদূরদর্শী সৈনিকরা নতুন বাহানা শুরু করুক । উভয় পক্ষ দীর্ঘক্ষণ বিতর্ক করেছিল । অবশেষে তাঁর একজন সেনাপতির উপর্যুপরি অনুরোধে ‘আমিরুল মুমিনীন’ শব্দটি মুছে ফেলার অনুমতি দিলেন । এরপর বললেন : الله أکبر سنّة بسنّة “আল্লাহ্ মহান ও সর্বশ্রেষ্ঠ । একই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটছে ।” তিনি এও বললেন : “এটি রাসূল ﷺ)-এর অনুসৃত রীতি এবং তাঁরই উদ্ধৃতি ।” এরপর হুদায়বিয়ার স্মৃতিচারণ করলেন ।
হুদায়বিয়ার সন্ধি-শর্ত
এখন বিশ্বনবী বিশ্বনেতা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও কুরাইশদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির বিভিন্ন শর্ত উল্লেখ করছি :
১. মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীগণ এ বছর এখান থেকেই মদীনায় ফিরে যাবেন । কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোয় স্বাধীনভাবে মক্কায় গিয়ে হজ্ব বা উমরাহ পালন করতে পারবেন । তবে শর্ত হলো এই যে, তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবেন না ও সঙ্গে সাধারণত একজন মুসাফির যাত্রী যে ধরনের তরবারি বহন করে, তা ছাড়া অন্য কোন অস্ত্র বহন করতে পারবেন না ।
২. যদি কুরাইশদের কেউ তাদের অভিভাবকদের অনুমতি ছাড়া মক্কা থেকে পালিয়ে যায় ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত হয়, মুহাম্মদ অবশ্যই তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন । কিন্তু যদি কোন মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় পালিয়ে আসে, কুরাইশরা তাকে মুসলমানদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয় ।
৩. মুসলমান ও কুরাইশরা স্বাধীনভাবে যে কোন গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবেন ।
৪. কুরাইশ ও মুসলমানরা সমগ্র আরব ভূ-খণ্ডে সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে এ মর্মে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছে যে, দশ বছর একে অপরের সাথে যুদ্ধ করবে না ও পরস্পরের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ হতে বিরত থাকবে ।
৫. মক্কার মুসলমানরা এ চুক্তির অধীনে মক্কায় স্বাধীনভাবে ইসলামী বিধান পালন করতে পারবেন এবং এক্ষেত্রে কুরাইশরা তাদের বাধা দিতে পারবে না । তাঁদের ধর্মান্তরিত করা ও মুসলমান হওয়ার কারণে তিরস্কার করতে পারবে না ।
৬. চুক্তি স্বাক্ষরকারী পক্ষদ্বয় একে অপরের ধন-সম্পদ সম্মানিত মনে করবেন এবং বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিতে পরস্পরকে দেখতে ও প্রতারণা করতে পারবেন না ।
৭. যেসব মুসলমান মদীনা থেকে মক্কায় আসবেন, তাঁদের জীবন ও ধন-সম্পদের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া হবে ।
চুক্তিপত্র দু’টি ভিন্ন পত্রে লিখিত হয় । এরপর কয়েকজন কুরাইশ ও মুসলিম প্রতিনিধি সাক্ষী হিসেবে তাতে স্বাক্ষর করেন । পরে তার একটি অনুলিপি মহানবী ﷺ-কে এবং অন্যটি সুহাইলকে দেয়া হয় ।
স্বাধীনতার বাণী
এ চুক্তিপত্রের পর্বে পর্বে স্বাধীনতা ও মুক্তির বাণী প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যার অনুরণন প্রতিটি নিরপেক্ষ বিবেকবান ব্যক্তির কানেই পৌঁছুবে । কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর হলো দ্বিতীয় শর্ত যা অনেককেই ক্রোধান্বিত করেছিল । রাসূলে আকরাম ﷺ-এর কোন কোন সঙ্গী এ বৈষম্যমূলক শর্তে চরম অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন এবং এমন কিছু কথা বলেছিলেন, যা ইসলামের নবী ও মহান নেতার প্রতি দৃষ্টিকটু ও সমালোচনামূলক । অথচ চুক্তিপত্রের এ ধারাটি উজ্জ্বল এক শিখার ন্যায় আজো প্রজ্বলিত রয়েছে । এতে ইসলামের প্রসার ও বিস্তারের পদ্ধতিতে মহানবী ﷺ-এর উন্নত চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে এবং স্বাধীনতা ও মুক্তির মৌলনীতির প্রতি ইসলামের মহান নেতার অনির্বচনীয় সম্মানের প্রকাশ পেয়েছে ।
কোন কোন সাহাবীর এ আপত্তির (‘কেন আমরা মুসলমানদের ফিরিয়ে দেব, অথচ তারা আমাদের থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য নয়’) জবাবে বলেন : “যে মুসলমান ইসলামের পতাকার নিচ থেকে র্শিকের দিকে পালিয়ে যায় এবং তাওহীদবাদী ইসলামের পবিত্র পরিবেশের ওপর মানবতার পরিপন্থী র্শিকমিশ্রিত পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেয়, সুস্পষ্ট যে, তার ঈমান সঠিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় নি এবং সে মন থেকে ইসলামকে গ্রহণ করে নি । এরূপ কোন মুসলমান আমাদের কোন কল্যাণে আসবে না । অন্যদিকে আমরা যদি আমাদের কাছে আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিকে কাফেরদের কাছে ফিরিয়ে দিই, তা হলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহ্ তার মুক্তির পথ করে দেবেন ।”
আখেরী নবী মানবতার বন্ধু বিশ্বনেতা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দৃষ্টিভঙ্গি বুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিসম্মত ছিল । সময়ের পরিক্রমায় তাঁর গৃহীত ভূমিকার যথার্থতা প্রমাণিত হয় । কারণ সময় না গড়াতেই কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারাটির মন্দ প্রভাব কুরাইশদের ওপর পড়ল । ফলে তারা নিজেরাই এ ধারা বাতিলের আহ্বান জানালো । কাজেই হুদাইবিয়ার সন্ধিই বিজয়ের সুচনা ।

শামীম বিন সাঈদী



মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৯

শবে মিরাজের পয়গাম

❝মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ)এর মিরাজ থেকে আনা মুলনীতি ও শিক্ষা❞
🔶🔷🔶🔷 🔶🔷🔶🔷🔶🔷🔶🔷🔷🔶🔷🔷🔶🔷🔷
★ শবে মিরাজের পয়গাম
১৪টি মূলনীতি পেশ করা হয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসলামী আন্দোলনের ঘোষণাপত্র দাখিল করেন ও ইসলামকে মানুষের সমগ্র জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ইমারত গড়ে তুলে ছিলেন । মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনা মুনাওয়ারায় পৌঁছে কার্যত যে রাজনৈতিক, তামাদ্দুনিক ও নৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেন এটি হচ্ছে সেই সমগ্র ব্যবস্থার ভিত্তি প্রস্তর । এ ইমারতের বুনিয়াদ রাখা হয়েছিল এ মতাদর্শের ভিত্তিতে যে, মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহই সমগ্র বিশ্বলোকের মালিক ও বাদশাহ ‌ এবং তাঁরই শরীয়াত এ রাজ্যের আইন ।

✿ ১৪টি মূলনীতিঃ
সুরা বনী ইসরাইল ২৩ -৩৭ নং আয়াতে দেওয়া ।
(১) তোমরা কারোর ইবাদাত করো না, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করো ৷
(২) পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো ৷ যদি তোমাদের কাছে তাদের কোনো একজন বা উভয় বৃদ্ধ অবস্থায় থাকে, তাহলে তাদেরকে “উহ্‌” পর্যন্তও বলো না এবং তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো আর দয়া ও কোমলতা সহকারে তাদের সামনে বিনম্র থাকো এবং দোয়া করতে থাকো এই বলেঃ হে আমার প্রতিপালক ! তাদের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা দয়া, মায়া, মমতা সহকারে শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন ৷ তোমাদের রব খুব ভালো করেই জানেন তোমাদের মনে কি আছে ৷ যদি তোমরা সৎকর্মশীল হয়ে জীবন যাপন করো, তাহলে তিনি এমন লোকদের প্রতি ক্ষমাশীল যারা নিজেদের ভুলের ব্যাপারে সতর্ক হয়ে বন্দেগীর নীতি অবলম্বন করার দিক ফিরে আসে ৷
(৩) আত্মীয়কে তার অধিকার দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকেও তাদের অধিকার দাও ৷
৪) বাজে খরচ করো না ৷ যারা বাজে খরচ করে তারা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ ৷
(৫) যদি তাদের থেকে (অর্থাৎ অভাবী, আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন ও মুসাফির) তোমাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় এজন্য যে, এখনো তুমি প্রত্যাশিত রহমতের সন্ধান করে ফিরছো, তাহলে তাদেরকে নরম জবাব দাও ৷
(৬) নিজের হাত গলায় বেঁধে রেখো না এবং তাকে একেবারে খোলাও ছেড়ে দিয়ো না, তাহলে তুমি নিন্দিত ও অক্ষম হয়ে যাবে ৷
(৮) যিনার কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ ।
(৯)আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করে দিয়েছেন, সত্য ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করো না ৷ আর যে ব্যক্তি মজলুম অবস্থায় নিহত হয়েছে তার অভিভাবককে আমি কিসাস দাবী করার অধিকার দান করেছি ৷ কাজেই হত্যার ব্যাপারে তার সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়, তাকে সাহায্য করা হবে ৷
(১০) ইয়াতীমের সম্পত্তির ধারে কাছে যেয়ো না, তবে হ্যাঁ সুদপায়ে, যে পর্যন্ত না সে বয়োপ্রাপ্ত হয়ে যায় ৷
(১১) প্রতিশ্রুতি পালন করো, অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে ৷
(১২) মেপে দেবার সময় পরিমাপ পাত্র ভরে দাও এবং ওজন করে দেবার সময় সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো ৷ এটিই ভালো পদ্ধতি এবং পরিণামের দিক দিয়েও এটিই উত্তম ৷
(১৩) এমন কোনো জিনিসের পেছনে লেগে যেয়ো না সে সম্পর্কে তোমার জ্ঞান নেই ৷ নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে ৷
(১৪) যমীনে দম্ভভরে চলো না ৷ তুমি না যমীনকে চিরে ফেলতে পারবে, না পাহাড়ের উচ্চতায় পৌঁছে যেতে পারবে ৷
🔹 ১৪টি মূলনীতির শিক্ষাঃ
একঃ এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কাঊকে বা কিছুই মা'বুদ/ইবাদত এর যোগ্য মনে করা যাবে না ।
দুইঃ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন মানা যাবে না ।
তিনঃ মাতা -পিতা প্রতি কোন অবস্থ্যাতে অসাদরন করা যাবে না এবং সদা - সর্বদা তাঁদের সাথে বিনীত ও নম্র আচরন করতে হবে ।
চারঃ মাতা - পিতার সাথে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলা যাবে না ।
পাচঃ মাতা-পিতা জন্য সর্বদা এই বলে দোয়া করতে হবে ," হে আমার প্রতিপালক ,তারা শৈশবে আমাকে যেরুপ প্রতিপালন করেছেন, আপনি তাঁদের প্রতি অনুরুপ দয়া করুন"।
ছয়ঃ মাতা - পিতার সাথে অসদাচরন করে নেক্কার হওয়ার কোন সুযোগ ইসলামের নেই।অতএব যারা নেক্কার হতে চান তাঁদের অবশ্যি আল্লাহর পরে মা বাবার সাথে উত্তম চরিত্রের হতে হবে । 
সাতঃ কখনো কোন অসতর্ক মুহুর্তে যদি কোন কারনে মাতা পিতার মনে কষ্টদায়ক কোন খারাপ আচরন ফেলে , তাৎক্ষনিক তাঁদের থেকে ক্ষমা চেয়ে তাঁদের মনের ব্যাথা দূর করে রাজি খুশি করে ফেলতে হবে। আর করবনা বলে আল্লাহর কাছেও তাওবা ইস্তেগফার করতে হবে । 
আটঃ ব্যক্তিগত অর্জিত সম্পদে নিকট আত্নীয়ের অধিকার রয়েছে । গবীব মিসকিন মুসাফিরের অধিকার রয়েছে । তাই আমাদের ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্য থেকে এই খাত গুলো বের করে ফেলতে হবে ।
নয়ঃ কোন অবস্থ্যাতেই সম্পদের অপচয় ও অপব্যায় করা যাবে না । কেননা অপচয়কারিরা শয়তানের ভাই । আর শয়তান প্রতিপালকের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ জাহেল ।
দশঃ নিকাত্নীয় গবীব মিসকিন ও সম্বলহীন মুসাফিরকে দেওয়ার মতো আর্থিক গরিব মিসকিন ও সম্বলহীন মুসাফির কে দেওয়ার মত আর্থিক অবস্থ্যা না থাকে তা হলে নরম কথায় তাঁদের সাথে কথা বলে নিতে হবে ।
এগারোঃ কৃপনতা করা যাবে না, আবার অপচয় করে নিঃস্ব ও দরিদ্র হয়ে পড়াও উচিইত নয় । কেননা এই উভয়টি আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের চরম না শুকুরি ও অপচয় ।
বারোঃ রিযিক বন্টনে কম বেশি করা আল্লাহর বিধানের স্বাভাবিক নীতি । এবং এটাও মানুষের কল্যানেই করা হয়েছে । কিন্তু আমাদের জ্ঞান নিতান্তই খুবই কম বলে আমরা এর কল্যানকারীতা বুঝতে সক্ষম নই ।
তেরোঃ আল্লাহ যেহেতু সর্বজ্ঞানী ,তাই তার বান্দাদের মধ্যে কার কিসে কল্যান নিহিত তা আল্লাহ ভাল করে জানেন । সুতরাং আল্লাহ বিধানকে বিনা চিন্তা ভাবনায় কর্মে মেনে নিতে হবে ।
চৌদ্দোঃ প্রতিশ্রুতি পালন ক্রতে হবে । অবশ্যই প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে ৷ মেপে দেবার সময় পরিমাপ পাত্র ভরে দিতে হবে এবং ওজন করে দেবার সময় সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে দিতে হবে ৷ এটিই ভালো পদ্ধতি এবং পরিণামের দিক দিয়েও এটিই আমাদের জন্য উত্তম । অহংকার /গর্ব করা যাবে না । কারন আল্লাহ পরকালে নিশ্চিতভাবেই চোখ, কান ও দিল সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্বাক্ষ্য নিবেন ।

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৮

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

একনজরে জামায়াতে ইসলামী

এই উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম । এটি অনেকের কাছে যেমন ভালবাসার আবার অনেকের কাছে সমালোচনারও । জামায়াতে ইসলামী শুধুই একটি রাজনৈতিক দল নয় । এটি কেবল সামাজিক প্রতিষ্ঠানও নয় । এটি একটি পূর্ণাংগ ইসলামী আন্দোলন । ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আল্লাহর বিধানের আলোকে গড়ে তোলার জন্য চার দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী ।


জামায়াতে ইসলামী গঠন
১৯৪১ সনের ২৬ আগস্ট বৃটিশ শাসিত দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের লাহোর সিটিতে গঠিত হয় জামায়াতে ইসলামী । প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ৭৫ জন । সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী আমীরে জামায়াত নির্বাচিত হন ।
প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণের একাংশে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীতে যাঁরা যোগদান করবেন তাঁদেরকে এই কথা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে যে, জামায়াতে ইসলামীর সামনে যেই কাজ রয়েছে তা কোন সাধারণ কাজ নয় । দুনিয়ার গোটা ব্যবস্থা তাঁদেরকে পাল্টে দিতে হবে । দুনিয়ার নীতি নৈতিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি সবকিছু পরিবর্তন করে দিতে হবে । দুনিয়ায় আল্লাহদ্রোহিতার ওপর যেই ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে তা পরিবর্তন করে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ।’

জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ও জামায়াতে ইসলামী হিন্দ
১৯৪৭ সনের ১৪ ও ১৫ই আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে দিল্লীতে বসে উপমহাদেশের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন । তখন গোটা উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য সংখ্যা ছিলো ,মাত্র ৬২৫ জন । দেশ ভাগ হলে জামায়াতে ইসলামীও ভাগ হয় । মোট ২৪০ জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ এবং ৩৮৫ জন সদস্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান কাজ শুরু করে ।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সূচনা
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ এই কথা বলে প্রচার চালিয়েছেন একটি স্বাধীন দেশ হাতে পেলে তাঁরা দেশটিকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করবেন । এতে সাধারণ মুসলিম তাদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেন । পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাবার পর তারা সেইসব কথা ভুলে যেতে থাকেন । শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে গিয়ে তারা আলোচনা শুরু করেন পাকিস্তানের জন্য বৃটিশ পার্লামেন্টারি সিস্টেম উপযোগী, না আমেরিকান প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম, তা নিয়ে । এতে ক্ষিপ্ত হয় ইসলামপন্থী মানুষরা ।

১৯৪৮ সনের এপ্রিল মাসে করাচির জাহাংগীর পার্কে জামায়াতে ইসলামীর প্রথম রাজনৈতিক জনসভা অনুষ্ঠিত হয় । এতে প্রধান বক্তা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী । তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনামূলক বক্তব্য পেশ করেন । বক্তব্যে তিনি পাকিস্তানের জন্য শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপরিষদের প্রতি চারটি দফার ভিত্তিতে ‘আদর্শ প্রস্তাব’ গ্রহণ করার উদাত্ত আহ্বান জানান ।
দফাগুলো হচ্ছে
১। সার্বভৌমত্ব আল্লাহর । সরকার আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে দেশ শাসন করবে ।
২। ইসলামী শরীয়াহ হবে দেশের মৌলিক আইন ।
৩। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক আইনগুলো ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত করে ইসলামের সাথে সংগতিশীল করা হবে ।
৪। ক্ষমতা প্রয়োগ করতে গিয়ে রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই শরীয়াহর সীমা লংঘন করবে না ।
এইভাবে জামায়াতে ইসলামী ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন শুরু করে ।

কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণার আন্দোলন
১৯৫৩ সনের জানুয়ারি মাসে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, মাজলিসে আহরার, জমিয়তে আহলে হাদীস, মুসলিম লীগ, আনজুমানে তাহাফ্ফুযে হুকুকে শিয়া প্রভৃতি দল করাচিতে একটি সম্মেলনে মিলিত হয় । জামায়াতে ইসলামী প্রস্তাব করে যে কাদিয়ানী ইস্যুটিকে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেওয়া হোক । সেই সম্মেলনে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলো না ।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ফেব্রুয়ারি মাসে করাচিতে সর্বদলীয় নির্বাহী পরিষদের মিটিং ডাকা হয় । এই মিটিংয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের’ পক্ষে প্রবল মত প্রকাশ পায় । জামায়াতে ইসলামী গোড়া থেকেই শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলো বিধায় ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশনের’ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সর্বদলীয় নির্বাহী পরিষদ থেকে বেরিয়ে আসে ।
১৯৫৩ সনের মার্চ মাসে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে কতিপয় দলের ডাইরেক্ট এ্যাকশনের ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে । এই অবনতি পাঞ্জাবেই ঘটেছিলো বেশি । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মার্শাল ল’ ঘোষণা করা হয় । কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে যায় ।
মাওলানা মওদুদীর গ্রেফতার ও ফাঁসির আদেশ
যদিও ডাইরেক্ট এ্যাকশনের বিপক্ষে ছিল জামায়াত তারপরও ১৯৫৩ সনের ২৮শে মার্চ মার্শাল ল’ কর্তৃপক্ষ সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী ও আরো কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করে । আরো বিস্ময়ের ব্যাপার, সামরিক ট্রাইব্যুনাল ১৯৫৩ সনের ৮ই মে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদীকে ফাঁসির হুকুম দেয় । জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তি এবং সকল শ্রেণীর ইসলামী ব্যক্তিত্ব এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ও বলিষ্ঠ আন্দোলনে নেমে পড়ে । ফলে সরকার মৃত্যুদণ্ড রহিত করে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদীর চৌদ্দ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের কথা ঘোষণা করে ।
তবে দুই বছর একমাস জেলে থাকার পর ১৯৫৫ সনের ২৯শে এপ্রিল সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদুদী মুক্তি লাভ করেন । তাঁকে মেরে ফেলার চক্রান্তের আসল লক্ষ্য ছিলো ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের বলিষ্ঠতম কণ্ঠটিকে স্তব্ধ করে দেওয়া । কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা ছিলো ভিন্ন । ফলে তিনি মুক্তি পান । আর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে ওঠে । গণদাবির মুখে গণপরিষদ ১৯৫৬ সনের ২৯শে ফেব্রুয়ারি একটি শাসনতন্ত্র পাস করে ।

শাসনতন্ত্র বাতিল ও পুনরায় আন্দোলন
১৯৫৮ সনের ২০শে সেপ্টেম্বর আতাউর রহমান খান সরকারের প্রতি আস্থা ভোটের জন্য পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসে । অধিবেশনে স্পিকার আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয় । স্পিকারের দায়িত্ব লাভ করেন ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী পাটোয়ারী । পরিষদে হট্টগোল চলতে থাকে । উত্তেজিত সদস্যদের আঘাতে শাহেদ আলী পাটোয়ারী মারাত্মক আহত হন । তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় । তিনি হাসপাতালে মারা যান ।
১৯৫৮ সনের ৭ই অকটোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কানদার আলী মির্যা দেশে সামরিক শাসন জারি করেন । জাতীয় পরিষদ, প্রাদেশিক পরিষদসমূহ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা ও প্রাদেশিক মন্ত্রীসভাগুলো ভেঙ্গে দেন । নয় বছরের চেষ্টাসাধনার ফসল শাসনতন্ত্রটি বাতিল করে দেন ।

প্রধান সামরিক প্রশাসক নিযুক্ত হন সেনাপ্রধান জেনারেল মুহাম্মাদ আইউব খান । ২৭ অক্টোবর আইউব খান প্রেসিডেন্ট পদটিও দখল করেন । চলতে থাকে এক ব্যক্তির স্বৈরশাসন । ১৯৬২ সনের ১লা মার্চ প্রেসিডেন্ট আইউব খান দেশের জন্য একটি নতুন শাসনতন্ত্র জারি করেন । এটি না ছিলো ইসলামিক, না ছিলো গণতান্ত্রিক । এতে বিধান রাখা হয়, দেশের প্রেসিডেন্ট, জাতীয় পরিষদের সদস্যগণ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’দের দ্বারা নির্বাচিত হবেন । আর ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ হবেন পূর্ব পাকিস্তানের ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যান ও মেম্বার মিলে ৪০ হাজার জন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ইউনিয়ন পরিষদসমূহের চেয়ারম্যান ও মেম্বার মিলে ৪০ হাজার জন । অর্থাৎ ৮০ হাজার ব্যক্তি ছাড়া দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় । এই আজগুবী শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম আওয়াজ তোলে জামায়াতে ইসলামী ।

১৯৬২ সনে রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকতবাগ ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী এই স্বৈরতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান । এতে প্রেসিডেন্ট আইউব খান ক্ষেপে যান । তাঁরই নির্দেশে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সনের ৬ই জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীকে বেআইনী ঘোষণা করে । আমীরে জামায়াত সহ মোট ৬০ জন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করা হয় ।
বন্দিদের মধ্যে ছিলেন- আমীরে জামায়াত সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী, মিয়া তুফাইল মুহাম্মাদ, নাঈম সিদ্দিকী, নাসরুল্লাহ খান আযিয, চৌধুরী গোলাম মুহাম্মাদ, মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ, মাওলানা আবদূর রহীম, অধ্যাপক গোলাম আযম, জনাব আবদুল খালেক, ইঞ্জিনিয়ার খুররম জাহ মুরাদ, অধ্যাপক হেলালুদ্দীন, মাস্টার শফিকুল্লাহ, মাওলানা এ.কিউ.এম. ছিফাতুল্লাহ, অধ্যাপক ওসমান রময্, মাস্টার আবদুল ওয়াহিদ (যশোর), আবদুর রহমান ফকির, জনাব শামসুল হক, মাওলানা মীম ফজলুর রহমান প্রমুখ ।

জনাব আব্বাস আলী খান, জনাব শামসুর রহমান ও মাওলানা এ.কে.এম. ইউসুফ জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন বিধায় গ্রেফতার হননি । এবারও জামায়াতে ইসলামীর জনশক্তি উচ্চমানের ধৈর্যের উদাহরণ পেশ করেন ।

জামায়াতে ইসলামী সরকারের অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় । স্বনামধন্য আইনজীবী মি. এ.কে. ব্রোহীর নেতৃত্বে একটি টিম মামলা পরিচালনা করে । পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে এবং পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রায় দেয় । চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে যায় । সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে রায় দেয় । ১৯৬৪ সনের ৯ই অকটোবর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ।

‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’
১৯৬৪ সনের ২০শে জুলাই ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দীনের বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আইউব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এই জোটের নাম দেওয়া হয় ‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’। এতে শরীক ছিল কাউন্সিল মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও নেযামে ইসলাম পার্টি।
১৯৬৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে ‘কম্বাইন্ড অপোজিশন পার্টিজ’ ১৯৬৫ সনের ২রা জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিতব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইউব খানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মি. মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর বোন মিস ফাতিমা জিন্নাহকে নমিনেশন দেয়।

এই সময় জামায়াতে ইসলামী ছিলো বেআইনী ঘোষিত । নেতৃবৃন্দ ছিলেন জেলখানায় । জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মাজলিসে শূরার যেইসব সদস্য জেলের বাইরে ছিলেন, তাঁরা ১৯৬৪ সনের ২ অক্টোবর একটি মিটিংয়ে একত্রিত হন ।
‘আলোচনান্তে মাজলিসে শূরা অভিমত ব্যক্ত করে যে স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মহিলাকে রাষ্ট্রপ্রধান করা সমীচীন নয় । কিন্তু এখন দেশে চলছে এক অস্বাভাবিক অবস্থা । স্বৈরশাসক আইউব খানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে মিস ফাতিমা জিন্নাহর কোন বিকল্প নেই । এমতাবস্থায় সার্বিক অবস্থার নিরিখে জামায়াতে ইসলামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিস ফাতিমা জিন্নাহকেই সমর্থন করবে ।’
স্বৈরাচারী আইয়ুবের কবলে জামায়াতে ইসলামী
আইয়ুবের শাসনামলে জামায়াতের আমীর মাওলানা মওদুদীকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয় । ১৯৬৪ সালে জাময়াতে ইসলামীকে হঠাৎ বেআইনী ঘোষণা করা হলো । জামায়াতে ইসলামী ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্রে মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধানের দাবিতে সমগ্র দেশব্যাপী স্বাক্ষর অভিযান পরিচালনা করে । এ অভিযানের ফলে মৌলিক অধিকারের দাবি তারা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল । কিন্তু আইনের খসড়া বিল পরিষদে গৃহীত হওয়া সত্ত্বে ও প্রেসিডেন্ট ইচ্ছাপূর্বক তাতে স্বাক্ষর দিতে বিলম্ব করেন ।

১৯৬৪ সালের ৬ই জানুয়ারী জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং নেতাদের গ্রেফতার করে তারপর ১০ই জানুয়ারী প্রেসিডেন্ট উক্ত বিলে স্বাক্ষর করে । কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে তার এ পদক্ষেপও জামায়াতকে খতম করতে সক্ষম হয়নি । হাইকোর্ট জামায়াত নেতাদের গ্রেফতারী এবং সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের নিষিদ্ধকরণের নিদের্শকে বাতিল ঘোষণা করে । এর আগে ১৯৫৮ সালেও সামরিক আইনে জামায়াত ৪৫ মাস নিষিদ্ধ ছিলো ।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
১৯৬৫ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভারত পাকিস্তানের উপর স্থল ও আকাশ পথে হামলা চালায় । দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয় । এমন সময় মাওলানার প্রতি চিরদিন বিরূপ-মনোভাবাপন্ন আইয়ুব খান তার কাছে যুদ্ধে সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন । মাওলানা জিহাদের উপর ক্রমাগত ছ'দিন রেডিও পাকিস্তান থেকে উদ্দীপনাময় ভাষণ দান করেন-জামায়াত কমীগণকে দেশ রক্ষার খেদমতে মাঠে নামিয়ে দেন । জামায়াতে ইসলামীর এ সময়ের নিঃস্বার্থ জাতীয় খেদমত সেনাবাহিনী ও জনগণের মন জয় করে । যুদ্ধে পাকিস্তান জয়ী হয় ।

সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫১ আসনে প্রার্থী দেয় জামায়াত । এর মধ্যে ৪ টি আসন জিতে নেয় । সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দেয় আওয়ামীলীগ এবং তারা সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভও করে । তৃতীয় সর্বোচ্চ আসনে (১২০) প্রার্থী দেয় ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি । নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে । আওয়ামীলীগের সবগুলো আসনই ছিল পূর্ব পাকিস্তানে ।
১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা
১৯৭১ সালে পূর্ব-পাকিস্তানে যা হয়েছে তা মূলত সমাজতন্ত্রী ও ভারতীয় ষড়যন্ত্রের মিলিত ফসল । তারা পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের সুযোগ গ্রহণ করেছিল । জামায়াত সেসময় একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে অবস্থান নিয়েছে, কোন সশস্ত্র গ্রুপ হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেনি । জামায়াত যুদ্ধ বন্ধে কয়েকবার চেষ্টা করেছিল, শান্তি আনার চেষ্টা করেছিল, সরকার এবং স্বাধীনতাকামীদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল কিন্তু দু-পক্ষের বাড়াবাড়িতে সেটা সম্ভব হয়নি । হত্যা খুন ধর্ষন উভয় পক্ষ করেছে । জামায়াত উভয়পক্ষের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করেছে আর বিচ্ছন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছে যারা ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে ।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ
একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য হয়েছিল, তার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি মেনে না নিতে পারলেও দেশের স্বাধীন সত্তাকে জামায়াত কর্মীগণ তখনই মেনে নিয়েছে । শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি ও শাসন পদ্ধতি সদা পরিবর্তনশীল । জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এদেশে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সংগ্রাম করছে এবং করতে থাকবে । দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণের জন্যেও জামায়াত দৃঢ়সংকল্প ।
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয় তার অধীনে মুসলমানী জীবন-যাপন সম্ভব ছিল না । এ সম্পর্কে বিভিন্ন বিদেশী সংবাদ সংস্থাও মন্তব্য করে । ইসলামের নামে দল গঠন ও ইসলামী আন্দােলন ও তৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় । গণতন্ত্রকে হত্যা করে এক দলীয় শাসন কায়েম হয় । ইসলামের জাতীয় শ্লোগান “আল্লাহু আকবর’ এর স্থানে ‘জয়বাংলা”। জাতীয় শ্লোগান হয়ে পড়েছিল । স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াত তার কার্যক্রম গোপনে পরিচালনা শুরু করে । ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন আব্বাস আলী খান ।

আবারো প্রকাশ্যে রাজনীতি
৭৫ এর পটপরিবর্তনের পর জামায়াত আবারো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে । এর মধ্যে দীর্ঘদিন নির্বাসনে থাকা অধ্যাপক গোলাম আযম দেশে ফিরে আসেন । ১৯৭৯ সালে এক সাধারণ সভায় জামায়াত পুনরায় প্রকাশ্যে কাজ করার ঘোষণা দেয় । ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মত বায়তুল মোকারমের সামনে জামায়াতের সভা হয় । প্রকাশ্যে এটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সম্মেলন ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াত ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে । স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে কোন বিরোধীদল নির্বাচনে যেতে আস্থাবান না হওয়ায় জামায়াত ১৯৮৪ সালে এক অসাধারণ নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয় । কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা । ১৯৮৪ সাল থেকেই কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে আসছে জামায়াত । ১৯৮৯ সালে সকল বিরোধীদল কেয়ারটেকার পদ্ধতিকে স্বাগত জানিয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে ।

১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে । জামায়াত রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে আসীন হয় । ১৯৯১ সালে নির্বাচনে রেকর্ড ১৮টি আসনে জিতে নেয় জামায়াত । জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে । অধ্যাপক গোলাম আজম আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতের আমির ঘোষিত হন ।
১৯৯২ সালে জামায়াতের বিরুদ্ধে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় । তারা জামায়াতকে অবৈধ ঘোষণার জন্য এবং গোলাম আযমকে অবৈধ নাগরিক হিসেবে শাস্তি দাবী করে সারাদেশে প্রচারণা চালায় । কয়েক স্থানে জামায়াতের সাথে ঘাদানিকের সংঘর্ষ হয় । ঘাদানিকের চাপে গোলাম আযম গ্রেফতার হন । ১৯৯৪ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব পুনঃস্থাপিত হয় । সে বছরই কার্যত ঘাদানিকের পতন হয় ।
১৯৯৬ সালে জামায়াত পুনরায় কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে আন্দোলন করে বিএনপির বিরুদ্ধে । বিএনপি একদলীয় নির্বাচন করে । তীব্র প্রতিবাদের মুখে আবারো নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় । ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ ।

ক্ষমতার অংশীদার
১৯৯৯ সালে আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় । ২০০১ সালে নির্বাচনে চারদলীয় জোট বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে । স্বাধীন বাংলাদেশে এই বছরই প্রথম ক্ষমতার স্বাদ পায় জামায়াত । তিনটি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পায় জামায়াত । ২০০৫ সালে জঙ্গী বিরোধী ভূমিকায় জামায়াত ব্যাপক সফলতা পায় ।

পুনরায় ক্ষমতাছাড়া এবং নির্যাতন শুরু
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ক্ষমতা ছাড়ার দিন আওয়ামীলীগ ব্যাপক আক্রমণ করে জামায়াতের উপর । এতে প্রায় ১০ জনের মত জামায়াত কর্মী নিহত হয় । ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি সেনাবাহিনী অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে কেয়ারটেকার সরকারকে পুতুল বানিয়ে রাখে । দুই বছর সেনাশাসনে রাজনীতিবিদরা চরম অপদস্থ হয় দূর্নীতির দায়ে । জামায়াত এসময় সারাদেশে একটি নির্লোভ ও সৎ দল হিসেবে স্বীকৃত হয় ।

২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সেনা কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির অঙ্গিকার করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় । ২০১০ সালের ২৯ জুন জামায়াতের ৩ শীর্ষ নেতা গ্রেফতার হন । শুরু হয় তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচার । এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে জামায়াত । ২০১৩ সালে রায় শুরু হয় । অবৈধ রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জামায়াত কর্মীরা । সারাদেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন । নিহত হন শতাধিক কর্মী । বিশেষ করে ২০১৩, ২৮ ফেব্রুয়ারী আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশের রাজপথে জীবন লুটিয়ে দেয় ৭৮ জন । পরবর্তী ৪দিনে আরো প্রায় ২০০ শত নারী পুরুষের জীবন কেড়ে নেয় পুলিশ ।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারের স্পস্ট মদদে গণজাগরণ মঞ্চ গঠিত হয় । এর বিরুদ্ধে হেফাযতে ইসলাম তৈরী হয় । হেফাযতের গনজোয়ারে অল্প কয়েকমাসের মধ্যেই গণজাগরণ মঞ্চ ভেসে যায় ।
১২ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লা শাহদাত বরণ করেন । ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একদলীয় নির্বাচন করে আওয়ামীলীগ । নজিরবিহীনভাবে ১৫৪ জন বিনা ভোটেই নির্বাচিত হয় । স্বৈরাচারী এরশাদের জাতীয় পার্টি ছাড়া সকল দল নির্বাচন বয়কট করে ।
২৩ অক্টোবর ২০১৪ সালে জামায়াতের প্রবীণ নেতা, বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক গোলাম আযম কারান্তরীন অবস্থায় শাহদাতবরণ করেন । ১১ এপ্রিল ২০১৫ সালে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান শাহদাতবরণ করেন । ২২ নভেম্বর ২০১৫ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল এবং সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোঃ মুজাহিদ শাহদাতবরণ করেন ।
১১ মে ২০১৬ সালে জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীকে অন্যায়ভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার । সারা মুসলিম জাহানে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয় । তুরস্ক তাদের দূতকে প্রত্যাহার করে নেয় । ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে শাহদাতবরণ করেন জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলী ।

মূলত ২০১৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি নির্যাতনের স্টিমরোলার চলছে । এই কয় বছরে জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মীকে শাহদাতবরণ এবং লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে কারাবরণ করতে হয় । বর্তমানে জামায়াতের আমীর মকবুল আহমাদ এবং সেক্রেটারি জেনারেল ডাঃ শফিকুর রহমান ।

সহায়ক সূত্র
১। জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস/ আব্বাস আলী খান
২। প্রবন্ধ/ রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী/ এ কে এম নাজির আহমাদ/ ছাত্রসংবাদ/ জুলাই-আগস্ট ২০১৩
৩। জামায়াতে ইসলামীর ঊনত্রিশ বছর/ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী
৪। জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য ইতিহাস এবং কর্মসূচী/ সাইয়্যেদ আবুল আ'লা মওদুদী
সৌজন্যেঃ AHMED AFGANI

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১৮

জনপ্রিয়তার এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে অদ্বিতীয়, বিশ্বে বিরল


মানুষ তার ভালো কর্ম দিয়ে অগনিত হৃদয়ে স্থান করে নেয় । জনপ্রিয় হয় । কার জনপ্রিয়তার মাত্রা কতটুকু তার সঠিক পরিমাপ করাটা সহজসাধ্য ব্যাপার নয় । এজন্য কোনো এলাকার বা কোনো দেশের বা পুরো বিশ্বের বর্তমানের বা অতীতের শীর্ষ জনপ্রিয় ব্যক্তিটি কে তা বাছাই করাটা সম্ভব হয় না । তবে মাঝে মাঝে কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা সংগঠিত হয় যা তাকে শীর্ষ জনপ্রিয় ব্যক্তির কাতারে নিয়ে যায় । বাংলাদেশে তেমনই একজন ব্যক্তি হলেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ।
বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাটলে বঙ্গবন্ধু, জিয়াউর রহমান, মাওলানা ভাসানীসহ অসংখ্য ব্যক্তির নাম পাওয়া যাবে যারা তাদের জীবদ্দশায় তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন। তাদের প্রত্যেকের বেলায় এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনাও পাওয়া যাবে যা তাদের তুমুল জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য দিবে । কিন্তু ২০১৩ সালে মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায়কে ঘিরে এই দেশে যেই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইসলামপ্রিয় ও সাধারণ জনতা তা শুধু বাংলাদেশই নয় বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল ।
১৯৪০ সালে পিরোজপুর জেলার জিয়ানগরে (ইন্দুরকানি) জন্মগ্রহন করেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী । একজন ইসলামিক স্কলার ও কোরআনের তাফসীরকারক হিসেবে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন তিনি । ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৮৯ সালে দলটির মজলিসে শূরার সদস্য হন । দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন খ্যাতিমান এই ইসলামি ব্যক্তিত্ব ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, ইসলামপ্রিয় জনতা ও সাধারণ মানুষের মাঝে মাওলানা সাঈদীর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব ঈর্ষনীয় । আর এটাই তার জন্য কাল হলো । রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বানোয়াট অভিযোগ দাঁড় করায় আওয়ামী লীগ সরকার । ওই অভিযোগে ২০১০ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয় । তিন বছর পর তার বিরুদ্ধে প্রথমে ফাঁসির আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে অপিল করা হলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয় । বলা যায়, ব্যাপক জনরোষের ভয়েই সরকার নিয়ন্ত্রিত আদালত তাকে যাবজ্জীবন দিতে বাধ্য হয় ।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় প্রদান করে । বিতর্কিত বিচারের এই ন্যাক্কারজনক রায় ঘোষণার পরই রচিত হয় বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় । রায়কে প্রত্যাখ্যান করে সারাদেশে দলমত নির্বিশেষে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে । সেদিন পুরুষের পাশাপাশি যে পরিমানে নারীরা সারাদেশে রাস্তায় নেমেছে তার দৃষ্টান্তও ইতিহাসে বিরল ।

মাওলানা সাঈদীর জনপ্রিয়তা যে শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না তার প্রমানও পাওয়া যায় সেদিন । অসংখ্য হিন্দু নারী –পুরুষও সেদিন প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে । মাওলানা সাঈদী যেই এলাকা থেকে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সেই এলাকাটিও ছিলো হিন্দু অধ্যুষিত । তাদের মাঝেও সাঈদীর জনপ্রিয়তা ছিলো আকাশচুম্বী । ফাঁসির রায় প্রত্যাখ্যান করে তারাও নেমে এসেছিলো রাস্তায় ।

সেদিন প্রতিবাদি জনতার উপর হামলে পড়ে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত সরকারের যৌথবাহিনী । সাথে ছিলো ছাত্রলীগ-যুবলীগও । নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শুধু ২৮ ফেব্রুয়ারিতেই সারাদেশে হত্যা করা হয় নারীসহ অন্তত ৭০ জনকে । একদিনে এতসংখ্যক লোকের মৃত্যু বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও হয়নি । একজন ব্যক্তির জন্য একদিনে এতলোকের প্রাণ দেয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল ।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তথ্যমতে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে পরের ৮ দিনে সারাদেশে হত্যা করা হয় মোট ২৪৭ জনকে । তবে অধিকারসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান মতে মৃতের সংখ্যা ১৫৫ । এছাড়া পুলিশের গুলিতে একই সময়ে আহত হয়েছিলেন প্রায় ৫ সহস্রাধিক, গ্রেপ্তার করা হয় প্রায় ২ সহস্রাধিক আর নিখোঁজের সংখ্যাও ছিলো অনেক ।
মাওলানা সাঈদীর প্রতি সাধারন মানুষের ভালোবাসার তীব্রতার প্রমান পাওয়া যায় দু একটি টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজ থেকে । ফুটেজগুলোতে দেখা গেছে পুলিশের গুলিতে নিজের সন্তান বা স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলেও তিনি একটুও ব্যথিত নন ।  তিনি শুধুই মাওলানা সাঈদীর মুক্তি চান, সেটা নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও ।

‘ফাঁসির দড়িতে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর আগে যেন আমার মৃত্যু হয়’- আল্লাহর কাছে এমনই আকুতি জানিয়ে আসছিলেন পুলিশের গুলিতে নিহত বগুড়ার শাজাহানপুরের সাজাপুর মণ্ডলপাড়ার দিনমজুর মেহেরাজের স্ত্রী রাজেনা বেগম । তার জানাজায় একমাত্র ছেলে রানা মিয়া উপস্থিত মুসল্লিদেরকে তার মায়ের এমন আর্তির কথা জানান । ভালোবাসার এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত তখন পত্রিকা ও টেলিভিশনের খবরগুলোতে দেখা গিয়েছে । যেগুলো একজন দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর তুমুল জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জনপ্রিয়তায় শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী একজন হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান । যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন । যার আহ্বানে ছাত্র জনতা শ্রমিক নির্বিশেষে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো । কিন্তু তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা একসময় ধ্বসে পড়ে । ক্ষমতার দাম্ভিকতা তাকে আকাশ থেকে মাটিতে নামায় । এমন জনপ্রিয় একজন ব্যক্তি অনাকাঙ্খিতভাবে পরিবারসহ খুন হলেও আমরা সারাদেশে তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি । এমনকি কথিত আছে তার জানাজায় ১৭ জন মাত্র মানুষ অংশ নিয়েছিলেন ।

কেউ কেউ বলেন তখন সেনাবাহিনীর ভয়ে মানুষ কিছু করতে পারেনি । কিন্তু আদৌ কি এটা সত্য হতে পারে ? একজন মুজিবভক্তও কি ছিলো না যিনি এই ভয়কে উপেক্ষা করে রাস্তায় নামতে পারতেন, জীবন দিতে পারতেন ? মাওলানা সাঈদীর জন্য যারা জীবন দিলেন তারা কি পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির যৌথ বাহিনীর ভয় করেননি। তখনও তো দেশটাকে থমথমে বানিয়ে রাখা হয়েছিলো । রাস্তায় নামলেই তখনও গুলি করা হতো । তারপরও কিন্তু সাঈদীভক্তরা রাস্তায় নেমেছেন । জীবন দিয়েছেন ।

মাওলানা সাঈদীর রায় ঘোষণার প্রথম দিনে প্রাণ হারিয়েছেন ৭০ জন । এত লোকের প্রাণহানির পর নিশ্চই দেশজুড়ে থমথমে ও ভয়ংকর অবস্থার তৈরি হয়েছিলো । তারপরেও কিন্তু সাঈদীভক্ত ও ইসলামপ্রিয় জনতা একটুও ভয় পায়নি । গুলি খেয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তারা রাস্তায় নামা অব্যাহত রেখেছেন বেশ কয়েকদিন । ৮ দিন ধরে যৌথবাহিনীর গুলির সামনে চলমান এই প্রতিবাদে ২৪৭ জন প্রাণও দিয়েছেন ।
বাংলাদেশের আরেকজন শীর্ষ জনপ্রিয় ব্যক্তি হলেন বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান । সেনাবাহিনীতে তার যেমন ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিলো, তেমনি সরকার গঠন করার পর নানা ব্যতিক্রমী কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তার জনপ্রিয়তা ছিলো আকাশচুম্বী । বিশেষ করে শেখ মুজিবের ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে তার ইসলাম ও জাতিয়তাবাদ ধাঁচের নীতি দেশের মানুষের কাছে খুবই প্রশংসিত হয়েছিলো । কিন্তু সেই জনপ্রিয় লোকটি রাষ্ট্রপতি থাকাকালে যখন চট্টগ্রামে সেনানিবাসে একটি ব্যর্থ সেনা অব্যুত্থানে নিহত হন, তখন খোদ চট্টগ্রামের বিএনপির নেতাকর্মীরাও এর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি । তারা ছিলো ভয়ে তটস্থ ।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমানের জানাজায় রেকর্ড সংখ্যক লোক সমাগম ঘটেছিলো । কিন্তু বিবেচ্য বিষয় হলো জানাজাটি ছিলো একটি বিশাল দলের প্রধান নেতার । যেই দলটি ক্ষমতায় রয়েছে । তাদের প্রধান নেতার জানাজায় সারাদেশ থেকে কর্মীবাহিনীর ঢল নামবে সেটাই স্বাভাবিক ছিলো । এই উপস্থিতি তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রমাণও দেয় । কিন্তু কাউকে ভালোবেসে তার জানাজায় অংশ নেয়া আর কাউকে ভালোবেসে গুলির সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দেয়া কখনোই এক ব্যাপার নয় ।
মানুষকে ভালোবেসে তার জানাজায় বিপুল মানুষের অংশ নেয়ার প্রমাণ বাংলাদেশে আরো রয়েছে । জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম ও ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর জানাজাতেও বিপুল সংখ্যক লোকের সমাগম ঘটেছিলো ।

যুগে যুগে পৃথিবীতে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটে যাদের বেলায় কবির লেখা- “এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভূবন” চরণ দুটি যেনো যথার্থ হয়ে দাঁড়ায় । মাওলানা সাঈদী তেমনই একজন ব্যক্তি, যার মরনে নয়, কেবল আদালতের একটি রায়ের বিরুদ্ধেই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষ কেঁদেছে, জীবন দিয়েছে, গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছে । তার মুক্তি চেয়ে এখনো মানুষ কেঁদে চলেছে । এমন জনপ্রিয়তার দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে অদ্বিতীয়, বিশ্বে বিরল ।
অ্যানালাইসিস বিডি ডেস্ক