সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

ট্রাইবুনালে সাঈদীর পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু দিনের বক্তব্য

ট্রাইবুনালে সাঈদীর পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরুর দিন বক্তব্য (১৮.১১.২০১২)

আইন ও বিচারের নামে অনিয়মের সবকিছুই ঘটেছে এ পবিত্র আদালত অঙ্গনে । স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিচারকে দ্রুততর করা হবে । বিচার তাহলে কোথায় ? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইলো কোথায় ? আমাকে ৪০ বছর আগে সংঘটিত কিছু অপরাধের ব্যাপারে অভিযুক্ত করা হয়েছে ।
এসব অপরাধের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না । পিরোজপুরের লাখো মানুষ আমার এ কথার সাক্ষী । আমি এর আগেও আপনাদের সামনে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি । অভিযুক্ত হিসেবে অভিযোগের জবাব দেয়াটা ছিল আমার সাংবিধানিক অধিকার । কিন্তু আমাকে আমার এ অধিকার থেকে আপনারা বঞ্চিত করেছেন । আমাকে কথা বলতে না দিয়েই, অভিযোগের ব্যাপারে আমার জবাব না শুনেই আপনারা কথিত এ বিচার চালিয়ে যাচ্ছেন । অথচ, এ ট্রাইব্যুনালেই দিনের পর দিন কিছু সুবিধাভোগী সাক্ষী, এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ৯ দিন ধরে একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটরের আরগুমেন্ট আপনি শুনেছেন । শুধু আমার কথাই আপনারা শুনতে চাচ্ছেন না, কিন্তু আপনারা আমারই কথিত বিচারে ব্যস্ত আছেন । আজকে আমার পক্ষের আরগুমেন্ট শুরু হওয়ার দিন ধার্য আছে । এই ট্রাইব্যুনালে আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাব কি না তা আমার জানা নেই । তাই আজকে আমি কিছু কথা বলার জন্য মনস্থির করেছি ।
এরআগে এই তথাকথিত মামলার আইও এবং একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটর আমার ব্যাপারে নানাবিধ অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন । তারা একই অসত্য কথা বারবার বলছেন, আগেও বলেছেন এখনও বলছেন । আমি কোরআনে কারিমের সূরা বাকারার ৪২নং আয়াতটি এখানে উল্লেখ করতে চাই । আল্লাহতায়ালা বলেছেন (এ সময় চেয়ারম্যান বলেন, প্লিজ, প্লিজ সাঈদী সাহেব, শোনানোর দরকার নেই, এগুলো আমরা শুনেছি আগে।) (তখন সাঈদী বলেন,) আপনি কোরআনে কারিমের আয়াত কেন শুনবেন না ? (চেয়ারম্যান বলেন, এখন বইলেন না, পরে শুনব, এগুলো আগেও শুনেছি।) মাওলানা সাঈদী পবিত্র কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার পোশাক দিয়ে ঢেকে দিও না ।’ বিজ্ঞ প্রসিকিউটর যে কথাগুলো এখানে বলেছেন, যে কথাগুলোর সরাসরি উনার কোনো জ্ঞান নেই, নিজে দেখেননি, নিজে শোনেনওনি । তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে এসব অসত্য বক্তব্য গ্রহণ করেছেন । এ ব্যাপারে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যে ব্যাপারে তোমার সরাসরি কোনো জ্ঞান নেই, তুমি দেখনি সেই ব্যাপারে তুমি বলতে যেও না ।’ একটি হাদিসে সাক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, আমি নবী করীমকে (সা.) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এমন এক মুসলমানের বিরুদ্ধে এমন স্বাক্ষ্য প্রদান করল যে অন্যায় সে করেনি, সে স্বাক্ষ্য প্রদানকারী ব্যক্তি নিজেই নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল ।’
মাননীয় আদালত, সূরা হুজুরাতে আল্লাহতায়ালা কী বলেছেন দেখেন, (এ পর্যায়ে চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক আবারও থামার জন্য বললে সাঈদী বলেন,) -চেয়ারম্যান সাহেব আপনি শোনেন মেহেরবানী করে । সূরা হুজুরাতের ৬নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা যদি কোনো পাপাচারী, দুষ্ট প্রকৃতের লোক তোমাদের কাছে কোনো তথ্য নিয়ে আসে, তবে তোমরা তার সত্যতা পরখ করে দেখবে । (কখনও যেন এমন না হয়) যে, না জেনে তোমরা কোনো একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেললে এবং এর পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরই অনুতপ্ত হতে হলো।’ মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা মায়েদার ৮ নং আয়াতে পুনরায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, (আরবি) ‘হে ঈমানদারগণ ! তোমরা সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও । কোনো দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এমন উত্তেজিত না করে দেয়, যার কারণে তোমরা যাতে ইনসাফ (তথা ন্যায়বিচার) থেকে সরে না যাও।’
মাননীয় আদালত, আমি আমার কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম আপনার কাছে, বিচারকদের অভিযুক্তের কথা শুনতে হয় । আপনি হজ্জ্ব করে এসেছেন, আপনাদের আমি ঈমানদার ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করতে চাই । আপনি একদিন বলেছিলেন, আমি ফজরের নামাজ পড়ে অমুক পত্রিকাটি পড়ি, আমি পত্রিকাটির নাম নিলাম না । আবার একদিন এই ট্রাইব্যুনালে আপনি বলেছেন, আল্লাহ আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন, এ দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে । সে প্রসঙ্গে নবী করীম (সা.) কী বলেছেন শোনেন, (আরবি) ‘হজরত আলী (রা) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন : ‘যদি দুটি পক্ষ কোনো মোকদ্দমা তোমাদের কাছে নিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির অর্থাত্ অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শ্রবণ না করে অভিযোগকারীর অনুকূলে কোনো রায় দেবে না । হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর এই নির্দেশ আমি সারা জীবন পালন করেছি । সুতরাং আপনি বিচারক, আপনি বিচার করবেন কীভাবে ? একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ এলো আর অভিযুক্তের কাছ থেকে যদি তার কোনো কথা না শোনেন, জিজ্ঞাসাবাদ না করেন, তাহলে আপনি সঠিক বিচার কীভাবে করবেন !’ আর যেভাবে আপনি বিচার ত্বরান্বিত করছেন তাতে তো জাতি এটা ভাবতেই পারে যে, আগে তো সাধারণ মন্ত্রীরা বলতেন, আগে তো বুদ্ধিজীবীরা বলতেন, এখন তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন—বিচার দ্রুততর করা হবে । বিচার তাহলে কোথায় ? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইল কোথায় ?
এজন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করব, রসুলের বিশুদ্ধ এই হাদিস অনুযায়ী আমার কথা আপনার শোনা উচিত । আমি অভিযুক্ত; আমাকে বলা হয়েছে, আমি পনের বছর পালিয়ে ছিলাম । আমি কোথায় ছিলাম ? আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ আড়াই মাস পর্যন্ত যশোরে রওশনের বাড়িতে ছিলাম । সেই যশোরে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা রওশনের কাছ থেকে তার কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করেন নাই, তাকে সাক্ষী বানান নাই । তাকে সাক্ষী করা হয় নাই; কারণ মিথ্যা বলতে সে রাজি হয় নাই । সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতি-সেক্রেটারিকে সাক্ষী করা হয়েছে । বলা হচ্ছে, আমি ত্রিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছি, আমি পিরোজপুরে ঘরবাড়ি ভেঙেছি, নিয়মিত ধর্ষণ করেছি । এই কাজটা যে লোকটা করে, সেই লোককে সেই এলাকার মুসলমানরা তার পেছনে নামাজ পড়ে কী করে? তাকে ভোট দেয় কী করে ? আমি পিরোজপুরের এমন কোনো মসজিদ নাই যে মসজিদে আমাকে দিয়ে ইমামতি করানো হয় নাই । এসব কথা যদি আমার কাছ থেকে না শোনেন, তাহলে আপনারা সুবিচার করবেন কীভাবে ?
আপনি বিচারপতি । আপনার মানবিক সত্তার কাছে আমার দাবি, আপনার মুখের কথাই আইন । আপনাদের আল্লাহতায়ালা অনেক মর্যাদা দিয়েছে ন। যে ব্যক্তি আজকের প্রধানমন্ত্রী, অসম্ভব নয় তিনি আজকের এই কাঠগড়ায় আপনার সামনে এসে দাঁড়াবেন । আজ যিনি প্রেসিডেন্ট, অসম্ভব নয় তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে আসামির বেশে দাঁড়াবেন । আপনাদের এই ক্ষমতা আল্লাহতায়ালা দান করেছেন । এখন আপনি যদি আমার বক্তব্য না শোনেন, তাহলে আমি আজকের মতো শেষ হাদিসটি শোনাই আপনাদের । বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ শরিফে এই হাদিসটি বর্ণনা করা হয়েছে । নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘বিচারক তিন প্রকার হয়ে থাকে । তার মধ্যে শুধুমাত্র একশ্রেণীর বিচারক জান্নাত লাভ করবে । আর বাকি দুই শ্রেণী যাবে জাহান্নামে । যে বিচারক জান্নাতে যাবে সে এমন ব্যক্তি, যে প্রকৃত সত্যকে বুঝতে পেরেছে, অতঃপর সে অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করেছে । দ্বিতীয় সেই বিচারক, যে প্রকৃত সত্য জানতে বা বুঝতে পেরেও রায় দেয়ার ব্যাপারে অবিচার ও জুলুম করেছে, সে জাহান্নামে যাবে । আর তৃতীয় সেই বিচারক, যে অজ্ঞতাবশত ফয়সালা করেছে, সেও জাহান্নামে যাবে ।’
হাদিস বিশারদগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী বিচারকদের আসন যেন পুলসিরাতের ওপর স্থাপন করা, যার নিচে জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড আর সম্মুখপানে জান্নাত লাভের অফুরন্ত নেয়ামতের হাতছানি । এখন বিচারকবৃন্দ সুবিচার অথবা জুলুম করার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রকৃত গন্তব্য বেছে নিতে পারেন । এখন আপনারা ডিসিশন নিতে পারেন কোনদিকে আপনারা যাবেন । জুলুমের মাধ্যমে এটাকে শেষ করবেন, না আপনি জান্নাতের পথ বেছে নেবেন ।
আমার কথা বলার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম ।
আইন ও বিচারের নামে অনিয়মের সবকিছুই ঘটেছে এই পবিত্র আদালত অঙ্গনে । তারপরও আমি সুবিচারের প্রত্যাশায় আপনাদের ন্যায়পরায়ণতা ও হক বিচারিক সিদ্ধান্তের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি । একই সঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ফয়সালার প্রতীক্ষায় আছি । মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে নবী আপনি বলুন ! সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা (চিরতরে) বিলুপ্ত হয়ে গেছে । অবশ্যই মিথ্যাকে বিলুপ্ত হতেই হবে ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন