রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

যে ভাষণ যুগ যুগ ধরে প্রেরণা যোগাবে : কাঠগড়ায় আল্লামা সাঈদীর সেই বিখ্যাত ভাষণ...


মাননীয় আদালত,

২০১১ সালের অক্টোবরের ৩ তারিখ এই আদালতের তদানিন্তন চেয়ারম্যান নিজামুল হক আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি দোষী না নির্দোষ? আপনি তখন এই আদালতের ৩ সদস্য বিশিষ্ট বিচারকদের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ন্যায় বিচারে ভ্রষ্ট পথ অনুসরণ করেছিলেন বিধায় একরাশ গ্লানি নিয়ে স্বেচ্ছায় সরে পড়তে হয়েছে। আজ সেই চেয়ারে আপনি সম্মানিত চেয়ারম্যান। এটাই আল্লাহর বিচার।

সেদিন তখনকার চেয়ারম্যান নিজামুল হকের প্রশ্নের জবাবে আমি যা বলেছিলাম, সেখান থেকেই আমার সামান্য কিছু বক্তব্য শুরু করছি। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপনাদের যা শোনা জরুরী বলে আমি মনে করি। নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে আমি বলেছিলাম-আমার বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত এবং শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার। আল্লাহর কসম! আমার বিরুদ্ধে রচনা করা চার সহা¯্রাধিক পৃষ্ঠার প্রতিটি পাতার প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, প্রত্যেকটি বর্ণ মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে কোন এক দেলোয়ার শিকদারের করা অপরাধ সমূহ আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যার পাহাড় রচনা করেছেন।

আজ আমি আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে আপনাদের সামনে বলতে চাই, সরকার ও তার রাষ্ট্র যন্ত্র কর্তৃক চিত্রিত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের হত্যাকারী, লুন্ঠন, গণ হত্যাকারী, ধর্ষক, অগ্নি সংযোগকারী, দেলোয়ার শিকদার বা ‘দেলু’ বা দেইল্যা রাজাকার আমি নই। আমি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রিয় জন্মভূমি এই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারনের নিকট চিরচেনা পবিত্র কোরআনের একজন তাফসীরকারক, কোরআনের পথে মানুষকে আহ্বানকারী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

যে আমি সেই যৌবন কাল থেকেই শান্তি ও মানবতার উৎকর্ষ সাধনে পবিত্র কুরআনের শ্বাশ্বত বানী প্রচার করার লক্ষ্যে নিজ জন্মভূমি থেকে শুরু করে বিশ্বের অর্ধশত দেশ গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত ভ্রমন করেছি, সেই আমি আজ ৭৩ বছর বয়সে জীবন সায়াহ্নে এসে সরকার ও সরকারী দলের দায়ের করা ‘ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার’ হাস্যকর ও মিথ্যা মামলায় গত ২৯ জুন ২০১০ থেকে আজ পর্যন্ত কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে মানবেতর অবস্থায় দিনাতিপাত করছি। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস !
আমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার অভিযোগ উত্থাপন এবং তজ্জন্য আমাকে তড়িৎ গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার কাজটি করলো এমন এক সরকার, যারা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস কথাটি দেশের সংবিধানে বহাল রাখাকে সহ্য করতে না পেরে অবলীলায় তা মুছে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। যাহোক, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই ৪২ বছরের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে কোন বিষয়েই কোন মামলা ছিলো না। সামান্য একটি জিডিও ছিলো না। গণতন্ত্রের লেবাসধারী বর্তমান এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বদান্যতায়, মহানুভবতায় মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আজ আমি ১৭টি মামলার আসামী। সেই জুন ২০১০ থেকে অদ্যাবধি কথিত মানবতাবিরোধী ২০ টি অপরাধের অভিযোগসহ ১৭টি মামলা আমার বিরুদ্ধে দায়ের করে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে সরকার আমাকে তাদের এক রাজনৈতিক তামাশার পাত্রে পরিণত করেছে, যা আজ দেশবাসীর কাছে মেঘমুক্ত আকাশে দ্বিপ্রহরের সূর্যের মতই স্পষ্ট।
মাননীয় আদালত,


যে ২০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আজ আপনাদের সম্মুখে আমি দন্ডায়মান, সেগুলো সরকারের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সাজানো। ১৯৭১ সনে পিরোজপুর বা পাড়েরহাটে পাক বাহিনী যা ঘটিয়েছে, সেসব কাহিনী সৃজন করে চরম মিথ্যাবাদী ও প্রতারক এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা নীতি নৈতিকতার মূলে পদাঘাত করে আমার নামটি জুড়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, মৃত্যুর পরের আযাবে বিশ্বাসী, পরকাল ও জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের পক্ষে এতো জঘন্য মিথ্যাচার আদৌ সম্ভব নয়। তদন্ত কর্মকর্তা এবং সহযোগিতরা তাদের সৃজিত অভিযোগগুলো প্রমানের জন্য কয়েকজন বিতর্কিত চরিত্র ভ্রষ্ট ও সরকারী সুবিধাভোগী দলীয় লোক ব্যতিত স্বাক্ষী প্রদানের জন্য কাউকেই হাজির করতে পারেননি।
এতদসত্ত্বেও প্রচন্ড ক্ষিপ্রতার সাথে এই ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিচার প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টেনেছেন। তিনি আইন-কানুন, ন্যায় বিচারের শপথ, অভিযুক্ত হিসেবে আমার বক্তব্য প্রদানের প্রাপ্য অধিকার প্রদান কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেননি বরং তিনি রায় ঘোষনার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় মহান রাব্বুল আলামিনের হস্তক্ষেপের ঘটনা। আজ সেই একদা সমাপ্তকৃত বিতর্কিত মামলার পূন: সমাপ্তির দ্বিতীয় আয়োজন। কিন্তু আমি পূর্বের ন্যায় একই উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি মামলা যেনো-তেনো প্রকারে শেষ করার সেই একই ত্রস্ততা।
মাননীয় আদালত,


এই ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৃত বিবেচনায় আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলার রায় প্রকাশ করে গেছেন। সাবেক চেয়ারম্যান মিডিয়ায় প্রকাশিত স্কাইপ সংলাপকে মেনে নিয়ে অন্যায় ও বে-আইনী ভাবে পরিচালিত বিচার কার্যের সকল দায়ভার বহন করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বিদায় হয়েছেন। ষড়যন্ত্র ও অন্যায়ভাবে বিচার কার্য্য পরিচালনার বিষয়টি তার স্কাইপি কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে কিভাবে সরকারের চাপে পড়ে, সুপ্রীম কোর্টের জনৈক বিচারপতির প্রলোভনে পড়ে, তথাকথিত ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের ডিকটেশন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে এবং তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে প্রসিকিউশনের সাথে অবৈধ যোগসাজসে বিচার কার্য পরিচালনায় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, আদালতের ক্ষমতাকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে আমার পক্ষের স্বাক্ষীর অগ্রিম তালিকা জমা দিতে বাধ্য করে সেই তালিকা প্রসিকিউশন এবং তাদের মাধ্যমে সরকার, সরকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসনকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহন করে স্বাক্ষীদের উপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষ্য প্রদানের জন্য আদালতে হাজির না হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিসহ নানাবিধ অনিয়ম ও বে আইনী কর্মপন্থার মাধ্যমে সমগ্র বিচার কার্যটি কলুষিত করেছেন।
এছাড়া সাবেক চেয়ারম্যানের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে সেইফ হাউজ স্ক্যান্ডাল, আদালত প্রাঙ্গন থেকে আমার স্বাক্ষীকে ডিবি পুলিশ কর্তৃক অপহরন ও গুম করার স্ক্যান্ডাল, ১৫ জন স্বাক্ষীর অনুপস্থিতিতে তদন্ত কর্মকর্তার জবানে তাদের বক্তব্য গ্রহন করার স্ক্যান্ডাল এর মতো বিষয়গুলোও আমার মামলায় প্রভাব বিস্তার করে আছে। এতো সব ষড়যন্ত্র ও স্ক্যান্ডাল জর্জরিত প্রসিডিংসকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে মূলত: সাবেক চেয়ারম্যান নিজেই পরিত্যাক্ত ও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে দিয়ে গেছেন। সুতরাং সেই পরিত্যাজ্য বিষয়ের উপর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কাজ নির্ভর করা যেতে পারে কিভাবে !!!

মাননীয় আদালত, দেশবাসীর কাছে, বিশেষ করে আপনাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র এবং ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার পরেও এই মামলা চলে কিভাবে ? গত ২৩/০১/১৩ তারিখে ট্রাইবুনাল-২ এর চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান শাহীন সাহেব বলেছেন, “এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে ট্রাইাব্যুনাল থাকবে, না চাইলে আমরা চলে যাবো।” তাহলে মাননীয় আদালত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে বিচার পরিচালনা করবে কিভাবে ? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন বিচারকে দ্রুততর করা হবে। বিচার তাহলে কে করছে? এই ট্রাইব্যুনালের তাহলে প্রয়োজন কি? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইলো কোথায়?



মাননীয় আদালত,

আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সমূহের ব্যাপারে সাবেক চেয়ারম্যানের মতামত বা রায় তার কথোপকথনেই প্রকাশিত হয়েছে। স্কাইপি সংলাপে তিনি স্বীকার করেছেন যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সমূহের সাথে আইনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত এই মামলাটি দেশী দরবারের মতোই। তার ভাষায়; “সাঈদীর কেইসটা ডিফারেন্ট। এই সাঈদীর কেইসটার লগে আইনের সম্পর্ক খুব বেশি না। এডা আমাদের দেশী দরবারের মতই।” ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যানের প্রকাশিত এই মতামত বা মন্তব্যের পর এই মামলা চলার নৈতিক অবস্থান কোথায় থাকে?

বিদায়ী চেয়ারম্যান আমার মামলাটি আদ্যপ্রান্ত পরিচালিত করে একে যে দেশী দরবারের সাথে তুলনা করেছেন তার সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। দেশি এই দরবার তথা গ্রাম্য শালিসী অনুষ্ঠিত হয় গ্রামের ছোট খাটো ঝগড়া বিবাদ নিয়ে। খুন, ধর্ষণ, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগের মত গুরুতর অপরাধ নিয়ে শালিশ বা দরবার হয়না।


বিদায়ী চেয়ারম্যানের ভাষায় “সরকার গেছে পাগল হইয়্যা, তারা একটা রায় চায়”। চেয়ারম্যান সাহেব ঠিকই বুঝেছিলেন যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সরকার আমাকে ঘায়েল করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কতগুলো ঘটনা সাজিয়ে, জঘন্য ও ন্যাক্কারজনক কিছু অপবাদ দিয়ে আমার বিচারের নামে প্রহসনের আশ্রয় নিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যপাওে বিশ্বাসযোগ্য কোন স্বাক্ষী নেই, আমার কোন সংশ্লিষ্টতাও নেই। সুতরাং ট্রাইাব্যুনাল গঠন করে বিচার বিচার খেলা কেনো, দরবার করে মিট মাট করলেই তো চলে। এটিই ছিলো প্রাক্তন চেয়ারম্যান এর রায়।

মাননীয় আদালত,

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এর পূর্বে দু’বার ক্ষমতাসীন ছিলো। তখন আমি যুদ্ধাপরাধী ছিলাম না, আমার বিরুদ্ধে কোন মামলাও হয়নি। একটি জিডিও হয়নি বাংলাদেশের কোথাও। আর তদন্ত কর্মকর্তা এই আদালতে বলেছেন ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আমি নাকি ৮৫ সাল পর্যন্ত পলাতক ছিলাম। তিনি আমাকে ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম বলে মিথ্যচার করেছে। ১৯৭৯ সালে আমি সাধারন সমর্থক হিসেবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করি। এর পূর্বে আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক ছিলাম না। ১৯৯০ সনের শুরু অবধি আমার রাজনৈতিক কোন পরিচয়ও ছিল না। ১৯৮৯ সালে আমি জামায়াতের মজলিসে শুরায় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হই। এরপর জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য, নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও পরবর্তীতে তথাকথিত মানবতাবিরোধী এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে আপনার কাঠগড়ায় দাড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত আমি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দ্বায়িত্ব পালন করছিলাম। রাজনীতিতে আমার তালিকাভূক্তি ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীর একজন সাধারন সদস্য হিসেবে। উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনের মর্মবানী ও আদর্শের প্রচারকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহনের বাইরে আমার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় সময় ব্যয় একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য। সংকোচনহীন ভাবে বলতে গেলে, রাজনীতির জটিল সমীকরনের বিষয়ে আমার অজ্ঞতা এবং সময়ের অভাবহেতু প্রচলিত রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার অবস্থান একজন এ্যামেচার রাজনীতিবিদের পর্যায়ে।


দেশবাসী স্বাক্ষী, রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার কখনো কোনকালেই তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। বরাবরই আমার বিচরন ছিলো কোরআনের ময়দানে। জনগনকে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছানোই ছিল আমার কাজ। আমার তাফসীর মাহফিলগুলোতে হাজারো লাখো মানুষ অংশগ্রহন করে। এইসব মাহফিল থেকে অসংখ্য অগনিত মানুষ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে, নামাজি হয়েছে। এটাই কি আমার অপরাধ? দেশ বিদেশের লক্ষ কোটি মানুষ আমার উপর আস্থা রাখেন, আমাকে বিশ্বাস করেন, আমাকে ভালবাসেন। আমি সাঈদী লক্ষ কোটি মানুষের চোখের পানি মিশ্রিত দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত। এই ভালবাসাই কি অপরাধ? বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে আমি কোরআনের দাওয়াত বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ? আমি কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহন করেছি, এটাই কি আমার অপরাধ? মাননীয় আদালত এটা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে, এ অপরাধে অপরাধী হয়ে হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে আমি রাজি আছি।
মাননীয় আদালত,


১৯৬০ সালে ছাত্র জীবন শেষ করার পর থেকেই এদেশের সর্বত্র আমি পবিত্র কুরআনের তাফসীর, সীরাত মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল ও বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য রেখে আসছি। মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে, কল্যাণের পথে, হেদায়তের দিকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বিরামহীন সফর করে যুগের পর যুগ অতিবাহিত করেছি। আমার মাহফিল গুলোতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার জনতার উপচে পড়া উপস্থিতি এবং তাদের প্রান ঢালা আবেগ উচ্ছাসে অনুপ্রানিত হয়ে ৬০ এর দশক থেকেই পবিত্র কুরআন প্রচারকে আমার জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছি। সেই থেকে এটিই আমার প্রধান পরিচয় যে, আমি মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এর প্রচারক, সত্য দ্বীনের প্রচারক, মানুষকে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে, চির শান্তির মহাসড়কে যোগদানের জন্য একজন আহবানকারী।
আমার পবিত্র কুরআনের খেদমতের সাক্ষী ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের সবুজ শ্যামল, স্বাধীন-স্বার্বভৌম এই বাংলাদেশ। মূলত ১৯৭৪ থেকে আমার তাফসীর মাহফিল সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়। প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে আমি তাফসীর মাহফিল করেছি দেশের বিভিন্ন শহরে। এর মধ্যে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তাফসীর মাহফিল এর কথা আমি উল্লেখ করছি: 

-চট্টগ্রাম প্যারেড গ্রাউন্ড ময়দানে প্রতি বছর ৫ দিন করে টানা ২৯ বছর। পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমাম এ মাহফিলে দু’বার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 

-খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দান সহ শহরের বিভিন্ন মাঠে প্রতি বছর ২ দিন করে ৩৮ বছর

-সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে টানা ৩৩ বছর

-রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে এক টানা ৩৫ বছর

-বগুড়া শহরে প্রতি বছর ২ দিন করে একটানা ২৫ বছর

-ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে ময়দান, মতিঝিল হাই স্কুল মাঠ ও পল্টন ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে একটানা ৩৪ বছর

-ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত বায়তুল মোকররম মসজিদ প্রাঙ্গনে সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে টানা ২০ বছর। এসব মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন তদানিন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি।

-এই হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গনে ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ধারাবাহিক ৪/৫ বছর মাহফিল করেছি, যেখানে সভাপতিত্ব করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, অংশগ্রহণ করেছেন অন্যান্য বিচারক মন্ডলী 

-পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা স্টেডিয়াম, পাবনা পলিটেকনিক ইন: ময়দানসহ বিভিন্ন মাঠে প্রতি ৩ দিন করে টানা ৩৭ বছর

-কুমিল্লা পাবলিক লাইব্রেরী ময়দান ও ঈদগাহ ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে টানা ২৮ বছর


-বরিশাল স্টেডিয়াম ও পরেশ সাগর ময়দান, ঝালকাঠী স্টেডিয়াম ময়দান ও পিরোজপুর সরকারী হাইস্কুল ও স্টেডিয়াম ময়দানে প্রতি বছর ২ দিন করে ২৬ বছর
এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশের এমন কোন জেলা বা উপজেলা নেই সেখানে আমার মাহফিল হয়নি। উল্লেখযোগ্য শহর গুলোর মাহফিলের কোন কোনটিতে উপস্থিত থাকতেন দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনা প্রধান, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সংসদের স্পীকার, মন্ত্রী, এম.পি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ।

অথচ মাননীয় আদালত, প্রসিকিউশনের দাবী আমি নাকি মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর পালিয়ে ছিলাম। মিথ্যচারেরও তো একটা সীমা থাকে!! তদন্ত কর্মকর্তা যাই রিপোর্ট করেছে প্রসিকিউশন সেটাকেই বেদবাক্য মনে করে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঈমান বিসর্জন দিয়ে সমস্ত মেধা প্রজ্ঞা খাটিয়ে মিথ্যাকে সত্য বানাবার জন্য প্রানান্ত হয়েছেন, আফসোস। নিশ্চয়ই এ মিথ্যাচারের জন্য ইহকালে এবং কঠিন হাশরের ময়দানে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে চড়া মূল্য দিতে হবে ইনশাআল্লাহ, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
মাননীয় আদালত, 


পরিশেষে বলতে চাই, আমি আমার সারা জীবন নাস্তিক্যবাদী ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে কোরআন ও হাদীসের আলোকে বক্তব্য দিয়ে এসেছি। আমার মাহফিলে জনতার ঢল নামে। আমার মাহফিলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ কিচ্ছা-কাহিনী শুনতে আসেনা। কোরআনের দাওয়াত ও রাসুল (সাঃ) এর জীবনাদর্শ জানতে আসেন। আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও একত্ববাদ এবং কোরআনের বিপ্লবী দাওয়াত প্রচারে আমি অকুন্ঠ চিত্ত। আমার এ দেহে প্রান থাকা পর্যন্ত এটিই আমার দৃঢ় অবস্থান। এর কোন হেরফের হবার নয়। সরকার এটি অবগত বিধায় তাদের ইসলাম বিদ্বেষী মিশন বাস্তবায়নে আমাকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত কওে আমাকে বিতর্কিত ও জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন করার এবং নিশ্চিহ্ন করার জন্যই আমার বিরুদ্ধে তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থপন করেছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকা কালে কিংবা ৭২ থেকে ৭৫ মেয়াদকালে ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী বর্তমান অবস্থান ছিলনা বিধায় আমাকে তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার কারণ খুঁেজ পায়নি। কিন্তু এবার ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদীদের সাথে আওয়ামী লীগ জোট বেঁধে সরকার আমাকে মানবতা বিরোধী অপরাধের মহানায়ক হিসেবে আবিস্কার করেছে।

মাননীয় আদলত,


১৯৯০ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিবছর রমযান মাসে পবিত্র মক্কা মদীনায় থাকা আমার বার্ষিক রুটিনে পরিণত হয়েছিল। রুটিন মাফিক রমযান মাসে ২০০৯ সালে আমি ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলে বর্তমান সরকার আমাকে মক্কা শরীফ যেতে দিল না। হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্টের রায় পাওয়ার পরও আমাকে যেতে দেয়া হয়নি। আমাকে বিদেশ যেতে আটকে দেয়ার জন্য পবিত্র রমযান মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পর পিরোজপুরে প্রথম বারের মত আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধসহ ২টা খুনের মামলা দায়ের করা হলো। রমযান মাসে পবিত্র মক্কা মদীনা যেতে না পেরে আমি মানসিক যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।


আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত মেহেরবানীতে পবিত্র হজ্জের মাত্র দু’সপ্তাহ পূর্বে সৌদী বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজীজ আমাকে রাজকীয় মেহমান হিসেবে হজ পালনের জন্য দাওয়াত পত্র ও যাতায়াতের টিকেট পাঠালেন। আমি দু’টা খুনের মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে হজ্জ পালনে মক্কা শরীফ পৌঁছলাম। হজ্জের দু’দিন পরে মীনা কিং প্যালেস বাদশাহ লাঞ্চের দাওয়াত দিলেন। বাদশাহর সাথে করমর্দন হলো, কুশল বিনিময় হলো, পাশাপাশি টেবিলে খানা খেলাম। আমার মনে কোন দূর্বলতা থাকলে আমার জন্য এটা খুবই সহজ ছিলো যে, বাদশাহকে বলে সৌদী আরবে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া। কিন্তু মাননীয় আদালত, আমি তা করি নাই। হজ্জের সকল কাজ সমাধা করে দেশে ফিরে এসেছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো আমার দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। মাননীয় বিচারপতিগণ কারো নির্দেশে বা চাপে পড়ে অথবা আদর্শিক শত্রু ভেবে কারো প্রতি অবিচার করবেন না। তাঁরা আল্লাহ তায়ালা এবং নিজের সুস্থ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই সিদ্ধান্ত নেবেন। মাননীয় আদালত, আমি আমার সে বিশ্বাস হারাতে চাই না।

মাননীয় আদালত,


স্কাইপি ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে যাওয়ার পরে এই বিচারের উপর দেশবাসীর মতো আমার আস্থাও শুন্যের কোঠায়। তথাপি পূর্নগঠিত এই ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিগন শুধুমাত্র ও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নিকট দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহীতার অনুভূতি থেকে আপনারা আপনাদের সুবিবেচনা ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে এই মামলা নিষ্পত্তি করবেন, এই বিষয়ে আমি আশাবাদি হতে চাই, আস্থাশীল হতে চাই। বর্তমান সরকার ও সরকারীদল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাকে তাদের বিশাল প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের সকল ক্ষমতার অপব্যবহার করে, যুদ্ধাপরাধের কল্পকাহিনী তৈরী করে কোন এক দেলোয়ার শিকদারের অপরাধের দায় আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাকে আজ আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমি একজন ব্যক্তি মাত্র। আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং মিথ্যাচার একাকার হয়ে গিয়ে আমার জন্য যে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আবহ সৃষ্টি করেছে তা উপলদ্ধি করা কিংবা মোকাবিলা করার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই।
মাননীয় আদালত, 


আমি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া যথেচ্ছাচার এবং তা বাস্তবায়নের এক আগ্রাসী মিথ্যাচারের শিকার। আপনাদের এই মহান আদালত রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমি ব্যক্তি সাঈদীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য তথা ন্যায় বিচার করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ। আমি আপনাদের সেই শপথ ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে আস্থাশীল থাকতে চাই।

সবশেষে আবারও রাজাধিরাজ, সম্রাটের সম্রাট, সকল বিচারপতির মহা বিচারপতি আকাশও জমীনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি, মহান আরশের মালিক, সৃষ্টিকূলের ¯্রষ্টা, সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামে শপথ করে বলছি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন মানবতা বিরোধী অপরাধ আমি করি নাই। আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চারিতার্থ করার জন্য এবং আমাকে তাদের আদর্শিক শত্রু মনে করে সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে আমার বিরুদ্ধে শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যা এ মামলা পরিচালনা করেছেন। তাদের বর্নিত জঘন্য মিথ্যাচার সত্য হলে আমার মমতাময়ী মায়ের ইন্তেকালের পরে তার জানাযা এবং এর ঠিক ৮ মাস পরেই আমার জৈষ্ঠ্য সন্তান রাফীক বিন সাঈদীর নামাজে জানাযায় ঢাকা, খুলনা ও পিরোজপুরে লক্ষ মানুষের সমাগম হতোনা, জানাযায় মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিতেন না। আমার মা ও ছেলের লাশ গোপনে গভীর রাতে ৫/১০ জন লোক নিয়ে জানাযা করে দাফন করতে হতো। মাননীয় আদালত, আমার বড় ছেলের ইন্তেকালের খবর শুনে মহান মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার, এই মামলার সরকার পক্ষের কথিত স্বাক্ষী মেজর জিয়া উদ্দীন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর শাহজাহান ওমর বীর প্রতীক আমার শহীদবাগের বাসায় গিয়ে আমার পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিয়েছেন, ঘন্টাকাল আমার বাসায় অবস্থান করেছেন। সরকারের নীল নকশা অনুযায়ী মিথ্যাবাদী তদন্ত কর্মকর্তা চিত্রিত রাজাকার ও দূর্র্ধষ যুদ্ধাপরাধী যদি আমি হতাম, তাহলে উনাদের মত সম্মানীত মুক্তিযোদ্ধাদের আমার বাসায় যাওয়ার প্রশ্নই উঠতো না।
আমি আমার এলাকায় ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছি। এতে স্বনামখ্যাত অন্তত: ২০/২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে নির্বাচনে জেতাবার জন্য দিনরাত নি:স্বার্থ পরিশ্রম করেছেন, গোটা পিরোজপুর বাসী এর স্বাক্ষী। তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য সত্য হলে এসব বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের মান মর্যাদা ধূলায় ধুসরিত করে আমার সাথে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে নির্বাচনী পরিশ্রম করতেন? হিন্দু সম্প্রদায় দায়ের লোকেরা আমাকে ভোট দিতেন?

মাননীয় আদালত,

আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা, তার সহযোগী প্রসিকিউশন এবং মিথ্যা স্বাক্ষ্যদাতাদের হেদায়েত করো আর হেদায়েত তাদের নসীবে না থাকলে তাদের সকলকে শারিরিক, মানসিক ও পারিবারিকভাবে সে রকম অশান্তির আগুনে দগ্ধিভুত করো যেমনটি আমাকে, আমার পরিবারকে এবং বিশ্বব্যাপি আমার অগনিত ভক্তবৃন্দকে মানসিক যন্ত্রনা দিয়েছে। আর জাহান্নাম করো তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা।


হে মহান রাব্বুল আলামীন! এই আদালতের বিচারক মন্ডলীকে তোমাকে ভয় করে, পরকালের কঠিন শাস্তিকে ভয় করে, সকল প্রকার চাপ এবং কারো নির্দেশ পালন বা কাউকে খুশী করার উর্ধ্বে উঠে শুধু তোমাকে ভয় করে এবং বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে ন্যায় বিচার করার তওফিক দান করো।
মাননীয় আদালত
আমি আমার সকল বিষয় সেই মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি, যিনি আমার কর্ম বিধায়ক এবং তাঁকেই আমি আমার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে গ্রহন করেছি। সাহায্যকারী হিসেবে মহান আরশের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-ই আমার জন্য যথেষ্ট।


মাননীয় আদালত, আমাকে কিছু কথা বলতে দেয়ায় আপনাদেরকে ধন্যবাদ।

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৫

শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদকে যেভাবে বিদায় দিয়ে আসলাম....


(আমার ব্যক্তিগত  কৃতজ্ঞতাঃ যদিও লেখাটি আমার নামে প্রকাশিত হচ্ছে তবে মুল লেখনি আমার নয় ।  আমার ভুমিকা এখানে অনেকটা সংকলনের ।
আমরা যারা শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদকে শেষ বারের মত দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, তারা সকলেই একমত হয়েছি যে এই সাক্ষাতটি লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার । তবে সেদিনের সেই ঘটনাটি যেহেতু মানসিকভাবে প্রত্যেকের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে, তাই কারও মনেই এককভাবে পুরো ঘটনাটির স্মৃতিচারন করা দু:সাধ্য ছিল । সেই পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদের গোটা পরিবার বিশেষ করে আমার মা, বোন, বোন-জামাই, দুই ভাই, ভাবীরা সকলেই এবং ছোট চাচা কয়েকদফা বসে এই লেখাটি চুড়ান্ত করেছি । আমরা চেষ্টা করেছি সেদিন যা ঘটেছে বা শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদ পরিবারের সদস্যদের সাথে শেষ সাক্ষাতে যা বলেছেন, যেই ভাষায় বলেছেন তাই লিপিবদ্ধ করতে । এই চেষ্টার সফল বাস্তবায়নে উপরোক্ত সকলের ভুমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করছি) । ★ Ali Ahmad Mubrur
২১ নভেম্বর রাত ৮টা । আমি তখন পুরানা পল্টনস্থ আইনজীবীদের চেম্বারে । পরিবারের বাকি সবাই উত্তরাস্থ বাসভবনে । হঠাৎ বাসা থেকে ফোন- আমাদেরকে মানে পরিবারকে নাকি শেষ সাক্ষাতের জন্য যেতে বলেছে । ডেপুটি জেলার শিরিন আমার বড় ভাই আলী আহমেদ তাজদীদকে ফোন দিয়ে রাত ৯টার মধ্যে কারাগারে পৌছতে বলেছে । আমি সাথে সাথে তাদেরকে বললাম, আমি তো কাছেই আছি । আপনারা জলদি বের হন । আমি সাথে সাথে সংগঠনের সবাইকে অবহিত করলাম এবং তাদের কাছ থেকে কিছু জানার চেষ্টা করলাম; শেষ সাক্ষাত কোন পরামর্শ আছে কিনা । আইনজীবীদেরকেও জানালাম । তারপর অযু করে কারাগারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম ।
আমাদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের মোট ২৫জন সদস্য সেদিন কারাগারে গিয়েছিলাম ।  রাত ১১টার দিকে আমরা সেখানে পৌছাই । ঢোকার পরে প্রয়োজনীয় তল্লাশী শেষে রাত ১১-২০ মিনিটে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সেল রজনীগন্ধায় পৌছাই । রজনীগন্ধায় সেলের একেবারে ডানকোনায় ৮ নং সেলে আব্বা থাকছেন । এর আগেও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ও শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানও সেই ঘরটিতেই ছিলেন । আমরা গত কয়েকমাসেও সেখানেই আব্বার সাথে সাক্ষাত করেছি । আমার আগে আব্বার এক নাতি, আমার আম্মা আর বোন আব্বার ঘরে পৌছান । আমি ৪ নম্বর ব্যক্তি হিসেবে পৌছাই, সাথে অন্যরাও । আমি ধারনা করেছিলাম, যেহেতু এত লোক যাচ্ছি শেষ সাক্ষাত । আব্বা হয়তো আমাদের জন্য তৈরী হয়ে বসে থাকবেন । কিন্তু আমরা রুমের বাইরের করিডোরে বা রুমের ভেতরে দাঁড়ানো কোন অবস্থাতেই আব্বাকে পেলাম না । ভেতরে তাকিয়ে দেখি, আব্বা শুয়ে আছেন । পরে বুঝলাম গভীর ঘুমে আছেন । ডান দিকে কাত হয়ে গালের নীচে হাত দিয়ে সবসময় যেভাবে ঘুমাতে দেখেছি সেভাবেই তিনি ঘুমাচ্ছেন । গায়ের উপর কাঁথা নেই, ছোট রুমের মাটিতে জায়নামাজের উপর শুয়ে আছেন । মাথার নীচে কোন বালিশও নেই । আমার বোন, আমরা সবাই আব্বা আব্বা বলে ডাকছি । আর আমার ভাইয়ের ছেলেরা ডাকছে দাদা দাদা বলে । কিন্তু আব্বার কোন সাড়া নেই । যেন ঘুমের সাগরে তলিয়ে আছেন তিনি । এভাবে প্রায় মিনিট খানেক ডাকাডাকির পর আব্বা একটু গুঙ্গিয়ে বললেন, কে কে আব্বা বলে ? তারপর আমাদের দেখে বললেন, ও তোমরা আসছো । এত রাতে কি ব্যাপার ? তোমাদের কি কারা কর্তৃপক্ষ ডেকেছে ? এটা কি শেষ সাক্ষাত ? ততক্ষনে তিনি উঠে বসেছেন । আমাকে তো জেল কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি । তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ । কিছুটা সময় তিনি বসেই থাকলেন । মনে হলো গভীর ঘুম থেকে উঠার জন্য, পাশাপাশি আমাদের উদ্দেশ্যে তার দিক নির্দেশনাগুলো গুছানোর জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইছেন ।
আমরা তাকে উত্তর দিলাম, জ্বী আব্বা, আমরা আমাদের শহীদ হতে যাওয়া বাবার কাছে আসছি । আমরা আমাদের গর্বের ধনের কাছে আসছি । আমার বোন বললো, আমরা আমাদের মর্যাদাবান পিতার সাথে দেখা করতে এসেছি । আমাদেরকে ওরা আজ শেষ বারের জন্য আপনাকে দেখার জন্য ডেকেছে । তিনি এভাবে বসে থাকলেন কিছুক্ষন । বসে বসেই আমাদের কথা শুনলেন । আম্মা বললেন, উঠে আসো । সব শুনে তিনি বললেন ও আচ্ছা, আলহামদুলিল্লাহ । কিছুক্ষন পর তিনি উঠলেন, দাঁড়ালেন । ফিরোজা রং এর গেঞ্জী, সাদা নীলের স্ট্রাইপ পড়া পায়জামা পড়ে ছিলেন তিনি । কিছুক্ষন স্যান্ডেল খুজলেন । পরে খুজে পেয়ে স্যান্ডেল পড়ে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন । বললেন কে কে আসছো, কয়জন, আমিই একটু দেখি (সেই সময় লাইটের আলো কম থাকায় ভেতর দিকে ভাল দেখা যাচ্ছিলো না । সেলের লোহার দরজার বাইরে নেটের দরজা দিয়ে লাগানো ছিল । পরে আমার বড় ভাই সেই দরজাটি খুলে দিলেন । আমরা পরিবারের সদস্যরা আগে একে একে সালাম দিলাম, তারপর আত্মীয়রা । আমার বড় ভাইরা প্রত্যেকের নাম বলে দিচ্ছিলেন যে, যে কারা সেদিন সাক্ষাতে গিয়েছিল । কিন্তু আব্বা বললেন দাড়াও আমিই দেখে নেই । তারপর সবাই একটু জোরে নীজেদের নাম বলে উপস্থিতি জানান দিলেন । কিন্তু আব্বা আলাদা আলাদা করে প্রত্যেককে কাছে ডেকে তাদের সাথে হাত মিলাতে শুরু করলেন । একে একে সবাই শিকের ভেতর দিয়ে হাত মেলালেন । প্রত্যেকটা মানুষের সাথে তিনি তাদের খোজঁ খবর নিলেন । যার যা সমস্যা সেটা নিয়েই তিনি আলাপ করলেন । প্রত্যেকে সেল দিয়ে বের হয়ে থাকা তার দুটি হাত ছুয়ে সালাম দিলেন । কেউ বা চুমু দিলেন । শেষ করে বললেন, কারও সাথে মুসাবাহ করা বাদ যায়নি তো ? 
আব্বা দাঁড়ানোর পর আমি নিজ থেকেই একটা সূচনা বক্তব্য দিলাম । বললাম আব্বা আপনি শহীদ হতে যাচ্ছেন । আপনি এর মাধ্যমে নিজেকে ও আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানীত করে যাচ্ছেন । আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতেও সম্মানীত করেছেন, আখিরাতেও সম্মানীত করতে যাচ্ছেন ।অতএব মোটেও দুশ্চিন্তা করবেননা । আপনাকে আপনার আব্বা, আমার দাদা মরহুম মাওলানা আব্দুল আলী ইসলামী আন্দোলনের জন্য ওয়াকফ করে গেছেন । আমি মনে করি এরকম একজন ওয়াকফ হওয়া মানুষের সর্বোত্তম ইতি আজ হতে যাচ্ছে । কেননা আপনি আপনার ছাত্র জীবন, যৌবন, মাঝবয়স সব আন্দোলনের জন্য ব্যায় করে এখন দ্বীন কায়েমের জন্য গলায় ফাঁসির দড়ি নিচ্ছেন । আপনার শাহাদাতে সবচেয়ে খুশী হবেন আপনার পিতা মরহুম মাওলানা আব্দুল আলী । কেননা আপনি তার রেখে যাওয়া ওয়াদা অনুযায়ী জীবন যাপন করে আজ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন ।
আব্বা, সেলের দরজায় স্বভাবসুলভ ভংগিতে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়েছেন । এরপর তিনি প্রথম শব্দ করলেন আলহামদুল্লিাহ । প্রথম কথা বললেন, তোমরা জেনে রাখ, কারা কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত আমাকে জানায়নি যে তারা আজ আমার ফাঁসি কার্যকর করতে যাচ্ছে । এটা কত বড় জুলম ?  তখন একটা আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল । কিন্তু আব্বা বললেন, কান্নাকাটির দরকার নেই । আমি কিছু কথা বলবো ।
এরপর তিনি অত্যন্ত স্বভাবসুলভ তেজদীপ্ত বলিষ্ঠ কন্ঠে, মাথা উচু করে অনেকটা ভাষনের ভংগিমায় শুরু করলেন, নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারীম । উপস্থিত অন্যরা তখনও একটু আবেগ প্রকাশ করছিল, আব্বা আবারও বললেন নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারীম । আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, আসসালাতু আসসালামু আলা সাইয়্যেদুল মুরসালীন । ওয়ালা আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমাইন । আম্মা বা’আদ । আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া । জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন । জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায় । তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন । তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে । এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন । আর সেই কারনেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি ।
আমি প্রশ্ন করলাম, আব্বু আপনি ঐ চিঠিতে আসলে কি লিখেছেন ?
উত্তরে তিনি বললেন, আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে । আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিলনা । সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে ।
আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদন্ড দেয়নি । তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মৃত্যুদন্ড দিয়েছে । আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ  ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে ।  চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে । অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়নি । এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন । সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি । কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি । এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন । আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি । কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম ?
স্বাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে । সে আমাদের চিনতো না । পরে আমাদের নাম শুনেছে । অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের সাহেবের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি । নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে । আমি নিশ্চিত যে আমার মৃত্যুদন্ডের রায় কনফার্ম করে তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে । (আমরা সকলে তখন চিৎকার করে বললাম শেম)
আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমান করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে । এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা । (এই সময় তার কন্ঠে প্রচন্ড রাগ ও ক্ষোভের সুর প্রকাশ পায়) । আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ । আমাদের আজ তারা অন্যায় ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে । কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে । অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই । তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে ।
তারা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত লোককেও একইভাবে মাঝরাতে তুলে তার পরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকেছে । এটা কেমন মানবতা ? আমার মত তিনিও বিচারিক প্রক্রিয়ার যাবতীয় ত্রুটি ও অসংগতি নিয়ে ইংরেজীতে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছেন ।
তোমরা শুনে রাখো, তোমরা চলে যাওয়ার পর আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা । তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হবানা । তোমাদের কিছুই করতে হবেনা । আজ আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে । তোমাদের কারও কিছু করতে হবেনা ।
তোমাদেরকে আজ আমি আমার সত্যিকারের জন্ম তারিখ বলি । আমাদের সময় জন্মতারিখ সঠিকভাবে লিখা হতোনা । আমাদের শিক্ষকেরাই ছাত্রদের জন্ম তারিখ বসিয়ে দিতেন । আমার সত্যিকারের জন্ম তারিখ বলি । আমার জন্ম ১৪ আগষ্ট, ১৯৪৭, ২৭ রমজান । আমার চেয়ে শেখ হাসিনা মাত্র ১ মাসের ছোট । সে আমাকে ভালভাবেই চিনে । সে ভাল করেই জানে আমি কোন অন্যায় করিনি কেননা তার সাথে সাথে আমার দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস ।
আমি পবিত্র মক্কা নগরীতে ওমরাহ করেছি অসংখ্যবার । আর আল্লাহর রহমতে হজ্ব করেছি ৭ থেকে ৮ বার । আমার বাবার কবর পবিত্র নগরী মক্কায় জান্নাতুল মাওয়াতে । সেখানে তার কবর উম্মুল মুমেনীন খাদিজার (রা:) পাশে, বেশ কয়েকজন সাহাবীর কবর আছে আলাদা ঘেরাও করা, তার ঠিক পাশে । এখানে অনেক নবী রাসুলদের কবরও আছে । আমি এই পর্যন্ত যতবার ওমরাহ করেছি, যাদেরকেই সাথে নিয়েছি তাদের প্রত্যেককেই সেই কবর দেখানোর চেষ্টা করেছি । ছোট ভাই আলী আকরাম মো: ওজায়ের তখন স্বাক্ষ্য বললেন, নয়া ভাই, আমাকেও আপনি নিয়ে গেছেন । (উল্লেখ্য আব্বার সব ভাই-বোনেরা তাকে নয়া ভাই বলেন । ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় চতুর্থ ভাইকে নয়া ভাই বলা হয়) । আব্বা আবার বললেন, আমার তো ইচ্ছা হয়, আব্বার পাশে গিয়ে আমি থাকি, (একটু হেসে বলেন) তবে এখন সেটা বললে তো জেল প্রশাসন একটু বিপদে পড়েই যাবে । যাক এই ব্যাপারে আমি তো আমার বড় ছেলেকে দায়িত্ব দিয়েছি, সেই সবার সাথে আলাপ করে ঠিক করে নেবে । সেটাই ঠিক বলে মনে করি ।
এর মাঝেই মেঝ ছেলে তাহকীককে ডিউটিরত ডেপুটি জেলার বারবার সময় নিয়ে ইংগিত করছিল । আমার মেঝ ভাই তাই আব্বাকে জানায় যে, আর ৫ মিনিট সময় আছে । জেল প্রশাসন তাই বলছে । আব্বা তখন তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনারা আমাকে চিনেন । জানেন । দেখেছেনও । আজকে আমি আপনাদের কাছ থেকে আরেকটু মানবিক আচরন আশা করি । আমি আমার জরুরী কথা হয়ে গেলে ১ মিনিটও বেশী নিবোনা ।
তখন উপস্থিত সুবেদার জানান, স্যার আমরা স্বাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আমাদের সহযোগিতা করেছেন সব সময়, আমরাও আপনার সম্মান রাখার চেষ্টা করেছি ।
এর পর আব্বা আবার শুরু করলেন, এখানে আমার সন্তানেরা আছো । এখন আমি আমার পরিবারের জন্য কিছু কথা বলবো ।
তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা ।
তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা । কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা । আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম । আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত¦ পালন করেছি । কেউ আমার ব্যপারে বলতে পারবেনা যে আমি অন্যায় করেছি । অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি । তোমরাও হালাল পথে থাকবা । তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন ।
 আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে । আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম । কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে । শরীয়তে দুই রকম । আজিমাত এবং রুকসাত । আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা । আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে । তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়ে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে । তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা । আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি । হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা ।
প্রতিবেশীর হক আদায় করবে । আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে ।  আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি । মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই । শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও । ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে । আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন সম্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয়নাই । তোমরাও মিলেমিশে থাকবে । এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা । শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে ।
বেশী বেশী করে রাসুল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে । আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে । বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসুলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন । আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে । আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও ।

আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট । তোমাদের ভুমিকার ব্যপারে সন্তুষ্ট । 
দেখো আমি এখানে পেপার পত্রিকা নিয়মিত পাইনা । তারপরও আমি যা চাই, যা ভাবি তোমরা তা করে ফেলো । যেমন আজকের সকালের প্রেস কনফারেন্স । এটা অনেক ভাল হয়েছে । আমাকে ছাড়াই তোমরা যে পরামর্শ করে এত সুন্দর একটা কাজ করে ফেলেছো, তাতে আমি অনেক খুশী হয়েছি । আসলে হৃদয়ের একটা টান আছে । আমি এখান থেকে যা ভাবি তোমরা কিভাবে যেন তাই করে ফেলো । তোমরা এভাবেই বুদ্ধি করে মিলে মিশে পরামর্শ করে কাজ করবে ।

আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে । তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন । তাদের ভুমিকার ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট । আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য । ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতোনা । কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় তারা সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন ।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই । আমার জানা মতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন । এই সংগঠনের ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট । গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ । বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভুমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয় । আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্ত্রগুন বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ ।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র । তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন । আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবানা ।
তোমাদের আম্মাকে দেখে শুনে রাখবে । সে আমার চেয়ে ভাল মুসলমান, ভাল মনের মানুষ । এই ব্যাপারে আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি । তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে তার সম্মানীত শ্বশুড়-শাশুড়ীকে স্মরন করেন । শাশুড়ী সেখানে উপস্থিত ছিলেন । তিনি বলেণ শ্বাশুড়ী তো মায়ের মতই । আপনি আমাকে যেভাবে স্নেহ করেছেন, তার কোন তুলনা হয়না । তারপর তিনি বললেন, আমার জানা মতে শহীদের মৃত্যুতে কষ্টের হয়না । তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আসানের সাথে হয় । আমাকে যেন আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যান ।
এরপর তিনি উপস্থিত সবাইকে নিয়ে দোয়া করেন । মুনাজাতের মধ্যে তিনি জালিমের ধ্বংস চেয়েছেন । পরিবারের জন্য আল্লাহকে অভিভাবক বানিয়েছেন । তিনি বলেছেন, আল্লাহ যেন তার রহমতের চাদর দিয়ে যেন তার পরিবারকে ঢেকে রাখেন । ছোট মেয়ে আদরের তামরীনাকে তিনি মা বলে সম্বোধন করেন ।  তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ওখানে আমার মা, বাবা, ছোট ভাই শোয়ায়েব এবং বড় মেয়ে মুমতাহিনা আছে । শোয়ায়েব অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ ছিল এবং আব্বার খুব কাছাকাছি ছিল ।
আমার বোন তখন বলে, আব্বা একটু পরেই মুমতাহিনা (বড় মেয়ে, যে আড়াই বছর বয়সে অসুস্থতায় মারা যায়) আপনাকে রিসিভ করতে আসবে । মেঝ ভাই বললেন ফুল হাতে আসবে ইনশাল্লাহ । আর তখন আম্মা বললেন, তুমি আমার পক্ষ থেকে ওকে আদর করে দিও । আমার বড় ভাই তাজদীদ তখন বললেন, আপনি তো শহীদ হতে যাচ্ছেন । জান্নাতে শহীদের প্রবেশের সময় অনেকের জন্য আপনার সুপারিশ করার সুযোগ থাকবে । আপনি সেই তালিকায় আমাদের রাখবেন ।
তারপর পুত্রবধুদের উদ্দেশ্য করে আব্বা বললেন, আমার বউমাদের আমি সেভাবে আদর করতে পারিনি । বউমা’রাতো মাই । আমাদের বাংলা ভাষায় তো সেভাবেই বলে, বউ-মা । এই সময়, তিনি সকল পুত্রবধুর বাবা-মা’র খোজ খবর নেন এবং তাদের প্রত্যেককে তার পক্ষ থেকে সালাম জানান । পুত্রবধুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি তোমাদের প্রতি সেভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি । বিশেষ করে ছোট বউমা জেরিনকে আমি খুব একটা সময় দিতে পারিনি । কেননা ওর বিয়ের কয়েকদিন পরেই তো আমি এখানে চলে আসি । এই সময় তিনি সকল পুত্রবধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তোমাদের প্রতি ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি । তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও ।
ঠিক একইভাবে আমার মেয়ে জামাই ফুয়াদ আর মেয়েকেও আমি সেভাবে সময় দিতে পারিনি । ওদেরকে নিয়ে একবেলাও একত্রে খাবার খাওয়ারও সুযোগ হয়নি । এই সময় তিনি মেয়ে জামাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাবা তোমার ভুমিকায় ও দায়িত্বপালনে আমি সন্তুষ্ট । তোমার মা বাবাকে আমার সালাম পৌছে দেবে । প্রতিউত্তরে মেয়ে জামাই বলেন, আব্বু আপনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা আমি যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবো ।
জেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন । তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের সাথে আমার কোন ভুল আচরন হলে আপনারা আমায় মাফ করে দেবেন । নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সেবকদের তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করেন এবং তার নিজের পিসির টাকাগুলো সেবকদের প্রয়োজন মাফিক বন্টন করে দেন এবং সেই ব্যাপারে জেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন ।
নিজামী ভাই ও সাইদী ভাইসহ আরও যারা আছেন সবাইকে তিনি সালাম পৌছে দিতে বলেন ।
দেশবাসীকে তিনি সালাম দেন এবং সকলের কাছে দোয়া চান । সর্বশেষে তিনি তার শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য দোয়া করেন । এরপর তিনি সকলের সাথে একে একে হাত মিলিয়ে বিদায় জানান ।
তারপর আমরা তার রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম । সেই যে আসার পথে ঘুরে তাকে দেখে আসলাম, সেটাই আমার বাবার শেষ জীবন্তকালীন ছবি । যা কোনদিন ভুলতে পারবোনা । ভুলে যাবোনা ইনশাআল্লাহ । ভুলে যাওয়া সম্ভবও নয় । এই অসম্ভব স্বচ্ছ মনের মানুষটির জন্য আপনারা দোয়া করবেন । প্রানভরে দোয়া করবেন ।


(লেখাটি দৈনিক সংগ্রামে অাজ ২৬ নভেম্বর, ২০১৫ তারিখে উপ-সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে ।

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে

إِنَّا للهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ
“নিঃসন্দেহ আমরা আল্লাহ্‌র জন্যে, আর অবশ্যই আমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তনকারী ।

আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে । 

প্রিয় ভাইয়েরা, আমার স্যারের শাহাদাতে চোখের পানি কেউ ফেলো না;
ওরা আমাদের গর্বের ধন, ওরা মাবুদের প্রিয়জন । শাহাদাত ঈমানের চরম চাওয়া, 
শাহাদাত মুমিনের পরম পাওয়া ।
আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাঁর রক্তকে ইসলামের জন্য কবুল করুন । মহান আল্লাহ তাকে শাহদাতের মর্যাদায় জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান হিসেবে কবুল করুন । আমিন ইয়া রব ।


রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৫

কেন ডিভিশন চাইলাম ...!


আজ কিছু পত্রিকার রিপোর্ট দেখলাম, 'হঠাৎ কেন ডিভিশন চাইলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী' । রহস্য আর রহস্য ! আছে শিরোনামে রহস্য, আছে রিপোর্টের মধ্যেও রহস্য ! কোনো কোনো পত্রিকা রিপোর্ট এমন করেছে যে রিপোর্ট পড়ে মনে হয়, ডিভিশন চাওয়াটাও যেন একটি অপরাধ (!)
পত্রিকার রিপোর্টের আলোকে কেন আমরা ডিভিশন চাইলাম সে বিষয়ে বিবেকবানদের কাছে আমি এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি । কারন, এক শ্রেণীর মানুষ এই আবেদনের মধ্যে 'সরকারের সাথে জামায়াতের আঁতাত' এর গন্ধ খুঁজে পাবেন । কেউবা আবার এর প্রতিবাদে রাস্তা বন্ধ করে 'মঞ্চ' খুলে 'পদ্মা মেঘনা যমুনা, এই আবেদন মানিনা' শ্লোগান তুলে রাজপথ প্রকম্পিত (!) করে তুলতে পারেন ।

"আমার প্রানপ্রিয় পিতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ট্রাইব্যুনালের রায় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ডিভিশন-১ প্রাপ্ত বন্দী হিসেবে কারাগারে অন্তরীন ছিলেন। রায় হওয়ার পরপরই আমার পিতার ডিভিশন বাতিল হয়ে যায় । এরপর আপীল বিভাগ ট্রাইব্যুনালের রায় কমিয়ে যাবজ্জীবন করার পর জেল কোডের ১৫ নং অধ্যায়ের ক্লাসিফিকেশন শিরোনামের অধীন ৬১৭ নম্বর বিধি মোতাবেক আমার পিতা ডিভিশন-২ পাওয়ার অধিকারী হন । কারাগারে বহু সংখ্যক ডিভিশন-২ প্রাপ্ত কয়েদী রয়েছেন । কিন্তু গত এক বছরেও কারা কর্তৃপক্ষ আমার পিতাকে তার প্রাপ্য ডিভিশন-২ প্রদান করেননি ।

আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী দীর্ঘ ৩৯ বছর যাবত ডায়াবেটিক রোগে আক্রান্ত । তিনি একই সাথে হৃদরোগেও আক্রান্ত । ২০০৩ সালে সর্ব প্রথম তার হার্টের করোনারী আর্টারীতে দুটি ব্লক ধরা পড়ে । একটিতে ৭০% অন্যটিতে ৯০% । তখন তার আর্টারীতে ২টি রিং স্থাপন করা হয় । এরপর আওয়ামী সরকার কর্তৃক অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করার পর ২০১২ সালে তিনি বুকে তীব্র ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন । তখন আবারো আমার পিতার আর্টারীতে ৩টি ব্লক ধরা পড়ে । একটিতে ৯৯%, একটিতে ৯৫% এবং অন্যটিতে ৮০%। এরই প্রেক্ষিতে তাৎক্ষনিকভাবে ডাক্তারের সিদ্ধান্তে তার আর্টারীতে ৩টি রিং স্থাপন করা হয় । পূর্বের ২টি এবং এখনকার ৩টি নিয়ে বর্তমানে সর্বমোট ৫টি রিং আমার পিতার করোনারী আর্টারীতে স্থাপন করা আছে ।
এছাড়া আমার বাবা আর্থাইটিস রোগেও আক্রান্ত । এ কারনে হাঁটু ও কোমড়ে রয়েছে তার তীব্র ব্যাথা । সরকার কর্তৃক অন্যায়ভাবে তাকে গ্রেফতারের পূর্বে তিনি নিয়মিত ফিজিওথেরাপী নিতেন । গ্রেফতার হওয়ার পর সেই রকম থেরাপী নেয়ার সুযোগ আর আমার পিতার হয়নি । যে কারনে তার হাঁটু ও কোমড়ের ব্যাথা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে । 

আমার আব্বার বয়স এখন ৭৬ চলছে । 
এই বয়সেও উপরোক্ত নানাবিধ শারীরিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও গত ৫ বছরে বিনা চিকিৎসার পরও শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবাণীতে এবং আপনাদের নেক দোয়ায় তিনি ভালোই আছেন । তবে বয়স ও অসুখজনিত সমস্যার কারনে তিনি শারীরিক কষ্টে আছেন । এখন তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারেন না । কারো সাহায্য ছাড়া বিছানা থেকে একা উঠে দাঁড়াতে পারেন না। ডায়াবেটিক কন্ট্রোল রাখার জন্য তার নিয়মিত হাঁটার প্রয়োজন হয় কিন্তু এখন তিনি কারো সাহায্য ছাড়া হাঁটতেও পারেন না ।
এমতাবস্থায়, সংসদ সদস্য ছিলেন শুধু এই কারনে নয় বরং পিতার প্রতি দ্বায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থেকে পিতাকে অসুস্থতাজনিত শারীরিক কষ্ট থেকে সামান্য প্রশান্তি দেয়ার প্রত্যাশায় ব্যাকুল সন্তান হিসেবে পরিবারের পক্ষ থেকে মাসুদ সাঈদী গত ৯ আগষ্ট ২০১৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমার পিতার প্রাপ্য ডিভিশন চেয়ে আবেদন করে । কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, দুই মাস পার হয়ে গেলেও অদ্যাবধি সেই আবেদনের কোন উত্তর এখনো আমরা পাইনি ।
এই আবেদনের মধ্যে কোন দল নেই-মত নেই, রাজনীতি নেই-কুটনীতিও নেই । আছে শুধু পিতার প্রতি সন্তানের ব্যাকুলতা, আছে শুধু পিতার প্রতি সন্তানের নিখাঁদ শ্রদ্ধা আর ভালবাসা ।

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ঈদুল আযহা ও কঙ্কর নিক্ষেপঃ

হজ্জের ধারাবাহিক কাজ
১০ই জিলহজ্জ অর্থাৎ ৯ই জিলহজ্জ রাতে ও ফজর বাদ যা করনীয়ঃ
মুযদালিফায় এসে এশার ওয়াক্তে মাগরিব ও এশা একত্রে (এশার নামাজ কসর) আদায় করে এখানেই খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করতে হয় । মুযদালিফায় রাত্রী যাপন করা ওয়াজিব । সমগ্র রাত তাসবীহ, তাহলীল, তেলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে অতিবাহিত করা উচিত । এখান থেকেই ৩দিনের জন্য সত্তুরটি পাথর সংগ্রহ করতে হয় । মুলত; পাথর ৪৯টি কঙ্কর প্রয়োজন । যদি ১২ তারিখ মিনা ত্যাগ করা না হয়, তবেই অতিরিক্ত ২১টি কংকর রাখতে হয় ১৩ই জিলহজ্জের জন্য । ফযরের নামাজ মুযদালিফায় আদায় করে মিনায় শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হউন । এইদিনে জামারাতুল আকাবা অর্থাৎ বড় শয়তানকে ৭টি পাথর নিক্ষেপ শেষ করে ক্বেরান বা তামাত্তু হজ্জ পালনকারীদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব । ভীড়ের কারনে এইদিন করতে না পারলে ১২ জিলহজ্জ সূর্যাস্ত যাবার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কুরবানী করা যাবে । কুরবানী হলে চুল কাটাতে হবে এবং এহরাম খুলে সাধারন পোশাক পরিধান করতে পারবেন । এরপর তাওয়াফে ইফাদার জন্য মক্কায় গিয়ে তাওয়াফে যিয়ারত শেষ করে পুনরায় মিনায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে ।
 কুরবানী বা দম
কুরবানী করা ওয়াজিব । এটি শুধু হজ্জ আদায়কারীর জন্যই নয়, প্রত্যেক সাম্রথবান মুসলমানদের প্রতিই কুরবানী করা ওয়াজিব । নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কুরবানীর পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই তা মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে কবুল হয়ে যায় । হযরত আবু সাইদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেনঃ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহাকে বলেনঃ হে ফাতিমা ! তোমার কুরবানীর পশুর কাছে দাঁড়িয়ে থাকো কারন, কুরবানীর পশুর যে রক্ত মাটিতে পড়বে তার পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালা পূর্বের গুনাহ গুলো ক্ষমা করে দেবেন । একথা শুনে হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা জানতে চাইলেন,  এ সুসংবাদ কি শুধু নবী পরিবার সদস্যেদের জন্য না সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য ? আখেরী নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ নবী পরিবারের সদস্য এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য । (জামিউল ফাওয়ায়েদ)
সাহাবায়ে কেরাম নবী মুহাম্মাদূর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে জানতে চাইলেন, কুরবানী কোন প্রথা ? মানবতার দূত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন এটা তোমাদের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত । সাহাবায়ে কেরাম বললেনঃ এতে আমাদের জন্য কি সাওয়াব ?্রাহমাতুল্লিল আলামীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ পশুর প্রত্যেক পশমের জন্য একটি করে সাওয়াব পাওয়া যাবে । (তিরমিযী) ।

হাজীদের জন্য কুরবানীর অত্যান্ত সুব্যবস্থা করা হয়েছে । হজ্জে গিয়ে কুরবানীর পশু ক্রয় করে কুরবানী দেয়ায় নানা জটিলতা রয়েছে । সৌদি সরকার কুরবানীর অর্থ জমা নিয়ে তাদের নিজেদের উদ্দোগেই কুরবানী করে থাকেন । এব্যবস্থার মাধ্যমে কুরবানী দাতাকে কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় না । অবশ্য কোন হাজী সাহেব যদি চান নিজেই পশু ক্রয় করে কুরবানী দিবেন তাহলে তিনি তাও দিতে পারেন অথবা আপনার এজেন্সীর প্রতিনিধির মাধ্যমে দিতে পারেন ।
১১ই জিলহজ্জ তারিখে করনীয়ঃ
এইদিন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার পর সূর্যাস্তের পূর্বে ৩টি জামারায় ৭টি করে মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয় । ১০ তারিখে তাওয়াফে যিয়ারত করা সম্ভব না হলে এইদিন তাওয়াফে যিয়ারত করতে পারেন । আর তাওয়াফে যিয়ারত করা থাকলে কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে পুনরায় মিনায় যেতে হবে এবং সেখানে রাত যাপন করতে হবে ।
১২ই জিলহজ্জ তারিখে করনীয়ঃ
১১ই জিলহজ্জ তারিখের মতোই তিনটি স্তম্ভে সাতটি করে মোট একুশটি পাথর নিক্ষেপ করতে হবে । প্রথমে ছোট জামরায়, তারপর মাঝারি জামরায় এরপর জামরাতুল আকাবা অর্থাৎ বড় জামরায় পাথর নিক্ষেপ করে দোয়া করুন । এক্ষেত্রে কোন হাজী যদি বার্ধক্য কিংবা শারিরীক অসুস্থতার জন্য নিজ হাতে কঙ্কর নিক্ষেপে অক্ষম হন তাহলে সে নিজের পক্ষ থেকে কাউকে পাথর নিক্ষেপের দ্বায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন । 
আজ মিনা থেকে আপনার আবাসস্থল মক্কায় চলে যেতে পারেন । মনে রাখবেন,  তাওয়াফে ইফাদা ও কুরবানী করা না হয়ে থাকলে এইদিনে অবশ্যই মাগরিবের পূর্বে তাওয়াফ ও কুরবানী সম্পন্ন করতে হবে ।

১৩ই জিলহজ্জ মিনা ত্যাগ না করে থাকলে পুনরায় এখান থেকে পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে যেতে হবে । পূর্বের অনুরূপ ৩টি স্তম্ভে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে । এইদিন যদি কেউ মক্কা ছেড়ে নিজ দেশে অথবা মদীনায় যেতে চাইলে তাকে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে । নারীদের হায়েজ নেফাসের সমস্যা থাকলে তারা বিদায়ী তাওয়াফ না করেই নিজ দেশ বা মদীনায় যেতে পারবেন । 
উল্লেখ্যঃ  তিন স্থানে প্রতীকী শয়তানের প্রতি পাথর বা কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব । কেউ যদি কঙ্কর নিক্ষেপে অক্ষম হয় তাহলে তাকে পৃথকভাবে কুরবানী (দম) দিতে হবে । অর্থাৎ এমনিতেই তো ঈদুল আযহার দিন কুরবানী দিতেই হয়, পাথর নিক্ষেপ করতে না পারলে তাকে আরেকটি কুরবানী বা দম দিতে হবে । পাথর/ কঙ্কর নিক্ষেপের মর্ম হলো, মুসলিমগন একথা প্রমান করে যে, তাদের জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে শয়তানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, মুসলিমগনও অনুরূপভাবে বাতিলী বা শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে একতা বদ্ধ হয়ে ইসলামের বিপরিত শক্তির বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন ।  
 ------(চলবে) 
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"

হজ্জের খুতবায় গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শাইখঃ

'আল্লাহকে ভয় করে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করুন'
সর্বক্ষণিক আল্লাহর ভয় অন্তরে জাগ্রত করে ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করুন । পবিত্র হজ্জ উপলক্ষে আরাফাত ময়দানে আজ বুধবার সমবেত লাখ লাখ হাজীর উদ্দেশে দেয়া খুতবায় সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আল শায়খ মুসলিম উম্মাহর নেতাদের প্রতি এ আহবান জানান ।
তিনি আরো বলেন,আল্লাহর দেওয়া আমানতগুলো রক্ষা এবং আল্লাহকে ভয় করে যার যার অবস্থানে থেকে অর্পিত দায়িত্বসমূহ যথাযথভাবে পালন করা তাদের দায়িত্ব । নিশ্চয়ই আল্লাহ উত্তম প্রতিদানকারী ।
তিনি বলেন, হে মুসলিম ভাইয়েরা, তোমরা আল্লাহর দরবারে দৃঢ় চিত্তে শুকরিয়া আদায় কর যে তোমরা আজ আরাফাতের ময়দানে শামিল হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছ ।
খুতবায় তিনি বলেন, কুরআন হাদিসের মূলনীতির ভিত্তিতে বিশ্ব মুসলিমকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রুজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে এবং মুসলমানদের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রেখে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনোনিবেশ করতে হবে । মুসলমানদের ঈমান আক্বীদা রক্ষার্থে সর্বদা আল্লাহর ওপর ভরসা এবং ইবাদত বান্দেগীর মাধ্যমে দিনাতিপাত করতে হবে । 
তিনি মুসলিম বিশ্বকে মুসলমান নামধারী সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান । তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা আজ টার্গেট করেছে আমাদের মুসলিম যুব সমাজকে ।ওদের হাত থেকে রেহাই পায় না মসজিদ ও অবুঝ শিশু । যুব সমাজের মন মগজ ধোলাই করে তাদের বিপথগামী করছে । হে যুব সমাজ তোমরা তোমাদের জ্ঞান বুদ্ধি দিয়ে দেশ ও মুসলিম জাতি গঠনে এগিয়ে আস । তিনি মুসলমান সম্প্রদায়কে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন । গণমাধ্যমকে মানুষের উপকারে কাজে লাগাবার কথা বলেন । গ্র্যান্ড মুফতি মিডিয়ার মাধ্যমে মুসলমানদের ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান । মিডিয়ার মাধ্যমে সত্যকে তুলে ধরার কথা বলেন তিনি ।
খুতবায় শরণার্থীদের তিনি বলেন, তোমরা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ কর, তওবা কর নিশ্চই আল্লাহ তোমাদের জমিন তোমাদের হাতে ফিরিয়ে দেবেন । 
খুতবায় সৌদি গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আল শাইখ বলেন, ইসলাম এসেছে সুশৃংখল লক্ষ্য নিয়ে; যার মধ্যে ‘মানুষ পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে জুলুম করবে না । ইসলাম মানুষের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করে । মহানবী (সা.) হচ্ছেন মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ । নামাজ আদায় করো। আল্লাহকে ভয় করো । আল্লাহ প্রদত্ত আমানত সমুহ হেফাজত করো । বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের সাহায্য করো । 
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল আরাফাতের ময়দান । ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা হজের অন্যতম ফরজ ।

সূর্যোদয়ের পর থেকে মিনায় অবস্থানরত প্রায় ৩০ লাখেরও বেশি ধর্মপ্রাণ মুসলমান আরাফাতের ময়দানে অবস্থান নিতে শুরু করেন । সূর্য পশ্চিমাকাশে হেলে পড়ার পর খুতবা পেশ করেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আল শায়খ ।
তিনি কঠোর নিরাপত্তা ও সুন্দর পরিবেশে হজ আয়োজনে দুই পবিত্র মসজিদের খতিব, কিং সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, সোমালিয়া, ইয়েমেনসহ মুসলিম বিশ্বের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মহান প্রভুর দরবারে মোনাজাত করেন ।

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

মুযদালিফায় রাত যাপন ও কঙ্কর সংগ্রহঃ

ঘুমের কাছে যারা দুর্বল তারা ইচ্ছে করলে মুযদালিফায় ঘুমাতেও পারেন । কিছু সময় ঘুমিয়ে সমগ্র রাত মহান আল্লাহর তাসবীহ তাহলীল কুরআন তেলাওয়াত এবং দোয়ার মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করাই উত্তম । ইসলামী চিন্তাবীদগন বলেছেন মুযদালিফা থেকেই পাথর সংগ্রহ করা মুস্তাহাব । 
মুজদালিফায় এসে প্রথমে মাগরিব ও এশা নামাজ আদায় করে তারপর ৪৯টি কঙ্কর বা পাথর সংগ্রহ করা উচিত । অনেকেই আগে পাথর সংগ্রহ করে তারপর নামাজ আদায় করেন, এটা ঠিক নয় । তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ুন । কান্না কাটি করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করুন । হয়তো জীবনে আর কখনো আপনি এখানে আসতে না পারেন । হয়তো পবিত্র এই ময়দানে আপনার শেষ আসা । দোয়া করুন দেশ মাটি মা মানুষের জন্য । শান্তির জন্য । স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য । মহান আল্লাহ আপনার হজ্জ, উমরাহ, রোজা এবং সকল এবাদত,  নেক চাওয়া  কবুল করুন । আমিন ।। -------(চলবে) 
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"