বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলামঃ মাওলানা সাঈদী (পর্ব - ৪)

রোযা ও পুজার দেশে সন্ত্রাসী সৃষ্টির কৌশলঃ 

আল্লাহর আইন চালুর নামে যেসব মুসলমান নামধারী কিশোর, তরুন ও যুবকদের ব্যবহার করা হচ্ছে, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে এরা প্রায় সকলেই বাম-রাম ঘরনার ধনী পরিবারের কর্মহীন- বেকার, ভবঘুরে, হতাশাগ্রস্ত অর্থলোভী, বুদ্ধি-বিবেচনাহীন সদস্য । এদের কাছে অর্থই মুখ্য বিষয় । ইসলাম-মুসলমান, দেশ-জাতি ও মানবতার দুশমনরা এসব মোটা মাথার লোকদেরই রিক্রুট করে আল্লাহর আইন চালুর নামে সন্ত্রাস সৃষ্টির প্রশিক্ষন দিয়েছে । এসব যুবকে বন্ধু-বান্ধবের সাথে এখানে-সেখানে আড্ডা এবং নারী ও মাদকে আসক্ত করে । এরপর এসব ছেলেকে পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও পরিবারের অন্য সকল সদস্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে 'আল্লাহর আইন চালুর' নামে সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে ।
টিভি-রেডিও, ইন্টারনেট, সোস্যাল মিডিয়া এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে পেশাধারী সম্মোহনকারী আমদানী করে এদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে যে, এদের মধ্যে থেকে মানবীয় সুকুমার বৃত্তিসমুহের মৃত্যু ঘটিয়ে হৃদয়কে করা হয়েছে মায়া-মমতাশুন্য । পিতা-মাতা, ভাই-বোন দূরে থাক- নিজ জীবনের প্রতিও এমন বিতৃষ্ণা সৃষ্টি করা হয়েছে যে, নিজ জীবনকে  নিজের কাছেই এক দুর্বহ বোঝা -এই অনুভুতি এদের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে । এদেরকে এশিক্ষাও দেয়া হয় যে, জীবন নামক এই দুর্বহ বোঝা থেকে নিজেকে মুক্ত করে বেহেশতে যাবার সবথেকে সহজ পদ্ধতি হলো আল্লাহর আইন চালুর জন্য অন্য মানুষ ও নিজেকে হত্যা করা । কুরান-হাদীসের জ্ঞান বিবর্জিত বুদ্ধি-বিবেচনাহীন জাহিল এসব লোকদেরকে দীর্ঘ প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সমাজ, দেশ-জাতির প্রতি বিদ্রোহী করে গোড়ে তোলা হয়েছে । সুস্থ চিন্তার পরিবর্তে  এদের মাথায় প্রবেশ করানো হয়েছে অসুস্থ চিন্তা । অর্থাৎ এরা জীবন সম্পর্কে হতাশা ও অবসাদগ্রস্থ হয়ে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া লোক । এসব লোকদের প্রতি আমাদের করুনা হয় ।
গোয়েন্দাদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এসব যুবকেরা দীর্ঘ দিন যাবৎ পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, কেউ কেউ বছরে মাত্র দু-একবার পিতামাতা বা পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে কিছু টাকা দিয়েই আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যায় । প্রশিক্ষনের মাধ্যমে এদেরকে নিজ পরিবার-পরিজন, সমাজ ও দেশের আনুগত্য না করে একমাত্র নেতার আনুগত্যের মধ্যেই মুক্তি, এই ধারনা সৃষ্টি করা হয়েছে । সম্মোহনের মাধ্যমে মন-মস্তিস্ক, সমাজ সংসারের চেতনাশুন্য করে আল্লাহর আইন চালুর মায়াজালে বন্ধি করা হয়েছে । ফলে এসব লোকের পরিবারের অন্য সদস্যগনও এসব লোকদের প্রতি মায়া-মমতাশুন্য  হয়ে পড়েছে । এর প্রমান হিসেবে গোয়েন্দা সুত্রে সংবাদ মাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আত্মঘাতি এসব লোকের মরদেহ তাদের পরিবারের কেউ-ই গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ ও এদের সম্পর্কে কিছু শুনতেও অনিচ্ছা প্রকাশ করছে ।
এভাবে প্রশিক্ষনের মাধ্যমে সংসার, সমাজ ও দেশের প্রতি বিরাগ ভাজন করে এসব যুবকদের মাধ্যমে নিকটতম ও দুরতম ঐসব প্রতিবেশী দেশই শান্তির দেশ- বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্থির করে তুলে দুনিয়ার সম্মুখে 'অকার্যকর ও জঙ্গিরাষ্ট্র' হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে । ক্ষমতায় টিকে থাকতে জঙ্গি ইস্যু তৈরি করে বহির্বিশ্বের নাক গলানোর সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে । প্রকৃত অপরাধীদের না ধরে একে অপরের দোষারপ করা হচ্ছে । বাংলাদেশ  সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জল ভুমি, এখানে মুসলমানদের সাথে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীগন শান্তির সাথে বসবাস ও নির্বিঘ্নে আনন্দ চিত্তে শঙ্কামুক্ত মনে ধর্ম পালন করছে । মুসলমনাদের কাছে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র মাস রমজান মাসেও অত্যান্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বাংলাদেশে পুজা-পার্বণ অনুষ্ঠিত হয় । এদেশে মসজিদ-মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করছে এবং উভয়স্থানে একই সময়ে যার যার ধর্ম সে সে পালন করছে । একই অফিসে পাশাপাশি টেবিলে বসে চাকরী করছে, পরস্পরের বাড়িতে দাওয়াত খাচ্ছে, একে অপরের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, এমনকি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হবার পরও মরণাপন্ন রুগীকে নিজের দেহের রক্ত দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করছে ।

বাংলাদেশের উন্নতি, অগ্রগতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উদার গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট, শান্তিপূর্ণ  পরিবেশ যাদের কাছে অসহ্য, ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা ও বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে যারা বিরোধিতা করেছে, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষেই অস্ত্র ও এদেশের কলকারখানার যন্ত্রপাতি লুট করেছে, যারা ১৯৪৭ সালের ভূগোলিক সীমারেখা মানতে নারাজ এবং বাংলাদেশী নয়-বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, মঙ্গল প্রদীপ বা অগ্নি প্রজ্জলন ও রাখিবন্ধন সংস্কৃতির অনুসারী, বাংলাদেশের প্রতি যারা বন্ধুত্বের প্রশ্নে উত্তীর্ণ নয় এবং সাম্প্রদায়িক দুষ্টক্ষতে আক্রান্ত হবার কারনে দুনিয়াব্যাপী বদনাম অর্জন করেছে, তারাই তাদের গোয়েন্দা সংস্থা ও এদেশীয় তল্পীবাহকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে 'আল্লাহর আইন' চালুর নামে আত্মঘাতি লোকদের দ্বারা সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করে বিশ্বের কাছে এ দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থরাষ্ট্র এবং তাদেরকে দালালদেরকে আজীবন ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার অপচেস্টা করছে কিনা, এপ্রশ্ন সচেতন মহলের মনে সৃষ্টি হয়েছে । ***** চলবে *****

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলামঃ মাওলানা সাঈদী

ইসলাম-মুসলমান বনাম সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ

আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা তাঁর অনুসরণের ক্ষেত্রে দুই ধরনের পদ্ধতি দিয়েছেন । মানুষ ব্যতীত অন্যান্য সমগ্র সৃষ্টির জন্য তাঁর আইন পালন বাধ্যতামুলক করেছেন । চিন্তাবিদগণ সাধারন দৃষ্টিতে যা বুঝে তা হলো, তিনি যদি অন্যান্য সকল সৃষ্টির জন্য তাঁর আইন অনুসরন বাধ্যতামুলক না করতেন, তাহলে মানুষসহ সমগে সৃষ্টি ক্ষতিগ্রস্ত হতো, যেমন মহাশুন্যে গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, নিহারীকাপুঞ্জ, ব্লাকহোল ও অন্যান্য যা কিছুই রয়েছে, এসব কিছুর পরিভ্রমনের জন্য গতিপথ বা পরিভ্রমনের পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, এসব পথে ওগুলো চলতে বাধ্য । ওসব সৃষ্টিসমুহের পরিভ্রমনের পথে আল্লাহ তায়ালা যদি স্বধীনতা দিতেন, তাহলে পরিভ্রমনের পথে একটির সাথে আরেকটির সংঘর্ষ ছিলো অবশ্যম্ভাবী এবং সেগুলো স্বয়ং যেমন ধ্বংস হতো তেমনি অন্যান্য সৃষ্টির জন্যও মারাত্মক ক্ষতির কারন হতো ।
অপরদিকে আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা তাঁর আইন পালনের ক্ষেত্রে একমাত্র মানুষকেই স্বাধীনতা দিয়েছেন এবং সতর্ক করে দিয়ে পবিত্র কুরআনে এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, "আলো-অন্ধকারের পথ বা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে সুস্পস্ট পার্থক্য করে দেয়া হয়েছে" । কেউ ইচ্ছা করলে আলোর পথ বা সত্যপথ অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারে, এস্বাধীনতা যেমন মানুষের রয়েছে তেমনি সে অন্ধকার পথ অনুসরণ করে পৃথিবী ও আখিরাতে নিজেকে ধ্বংসও করে দিতে পারে, এ স্বাধীনতাও মানুষের রয়েছে । একই সাথে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মানব মন্ডলীকে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, "ইসলামই মানুষের জন্য একমাত্র মনোনীত জীবন ব্যবস্থা" ।
সমগ্র সৃষ্টি জগতের মালিক এ কথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, "ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো আদর্শ কেউ যদি অনুসরণ করে, তাহলে সে নিশ্চিতভাবে পৃথিবী ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে" । যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করবে, শান্তি, স্বস্তি ও সার্বিক নিরাপত্তার লক্ষে তাঁর জন্য আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা অবশ্যই বাধ্যতামুলক । আল্লাহর বিধান অনুসরণ না করে কেউ যদি নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করে, আল্লাহ তা'য়ালার কাছে তাঁর এই দাবির কানাকড়িও মুল্য নেই । কারন 'মুসলিম ও ইসলাম' এই শব্দ দুটো একটির সাথে আরেকটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত, পরস্পর সম্পুরক এবং অবিচ্ছিন্ন । এই শব্দ দুটোর মুলেই নিহিত রয়েছে মানুষের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নতি, প্রগতি, স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিভীষিকামুক্ত শঙ্কাহীন এক উন্নত জীবন যাপনের পরিবেশ ।
'ছিলমুন' শব্দ থেকে 'ইসলাম' শব্দের উৎপত্তি এবং এর অর্থ হলো শান্তি ।  আর মুসলিম শব্দের অর্থ হলো 'আত্মসমর্পণকারী' । আল্লাহ তা'য়ালা মানবমন্ডলীর শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নতি, প্রগতি, স্বস্তি, শঙ্কামুক্ত নিরাপত্তাপূর্ণ  যে বিধানাবলী দান করেছেন, এর সমষ্টির নামই হলো ইসলাম এবং এই বিধানাবলীর নিকট যে মানুষ আত্মসমর্পণ করেছে, সে-ই হলো মুসলমান ।
সহজ কথায় সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিপরীতে শান্তি, সমৃদ্ধি,  প্রগতি, স্বস্তি, উন্নতি ও নিরাপত্তা দানের নিশ্চয়তামুলক বিধানের নিকট যে মানুষ তাঁর সমগ্র সত্তাকে সমর্পণ করেছে, সেই হলো মুসলমান । এ কারনেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেনঃ 'যে ব্যক্তির হাত ও মুখের কথা থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ নয়, সে ব্যক্তি মুসলমান নয়' ।
যে আল্লাহ তা'য়ালা মানুষের নিরাপত্তার প্রতীক ও শান্তির নিশ্চয়তামুলক জীবন বিধান ইসলামকেই মানুষের জন্য একমাত্র জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করেছেন, সেই আল্লাহ তায়ালার নিরানব্বইটি নামের মধ্যে গুনবাচক নামসমুহের একটি নাম হলো 'সালাম' অর্থাৎ শান্তিদাতা । অপরদিকে রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে 'সালাম' নামের অধিকারী আল্লাহ তা'য়ালা স্বয়ং পবিত্র কুরআনে সুরা আম্বিয়ায় ঘোষণা করেছেনঃ 'হে নবী ! আপনাকে আমি সমগ্র জগতের জন্য করুণার প্রতীক হিসেবেই প্রেরণ করেছি' ।
অর্থাৎ মহান আল্লাহ বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'করুণার প্রতীক তথা নবীয়ে রহমত' উপাধি দান করেছেন । তাহলে বিষয়টি এভাবেই স্পস্ট হয়ে গেলো যে, 'শান্তিদাতা' সালাম আল্লাহ তা'য়ালা সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিপরীতে শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তা, সুখ- সমৃদ্ধি, উন্নতি-প্রগতি ও শঙ্কামুক্ত জীবন বিধান শান্তির আদর্শ ইসলামকে করুণার মূর্তপ্রতীক নবীয়ে রহমতের কাছে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি এ সর্বোত্তম আদর্শ পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করেও দেখিয়েছেন ।
আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা, নবী-রাসুলের মাধ্যমে তাঁর বান্দাদেরকে নামাজ শেষ করার আদেশও দিয়েছেন  শান্তি কামনা করার মাধ্যমে । অর্থাৎ নামাজের শেষ বৈঠকে 'আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ' মুখে উচ্চারন করেই নামাজ শেষ করতে হবে । নামাজ শেষ করেই মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে যে দোয়া করতেন সে দোয়ার অর্থ হলোঃ "হে আল্লাহ ! তুমি শান্তিময় আর তোমার নিকট থেকেই শান্তির আগমন, তুমি কল্যানময়, হে মর্যাদাবান কল্যাণময় ! তোমার কাছেই আমি শান্তির শেষ আশ্রয়স্থল জান্নাত কামনা করছি" । আল্লাহর রাসুলের শিখানো এই দোয়া অধিকাংশ আলেমগন নামাজ শেষ করেই তেলাওয়াত করেন এবং মুসলমানদের মধ্যে যারা এই দোয়া মুখস্ত করেছেন তারাও করে থাকেন ।
এরপর মুসলমানদের পরস্পরের দেখা-সাক্ষাত হলেও শান্তি কামনা করার আদেশ দেয়া হয়েছে অর্থাৎ 'আসসালামু আলাইকুম' 'তোমার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক' প্রথমে বলে তারপর অন্যান্য কুশলাদি জানতে হবে । শিশুর বাক শক্তি নেই, সে জবাব দিতে পারবে না তবুও তাকে সালাম জানাতে হবে অর্থাৎ তাঁর জন্য শান্তি কামনা করতে হবে । মানুষ ইন্তেকাল করলে জানাযা আদায় করার সকল দোয়া সমুহেও মৃতের জন্য শান্তি কামনা করতে হয় । মুসলমানদের কবর দেখলে বা জিয়ারত করার সময় কবরবাসীকে আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর অর্থাৎ কবরবাসীর জন্য শান্তি কামনা করতে হবে । 

মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম পবিত্র কা'বার দোয়া কবুলের স্থানে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন । সুরা বাকারার ১২৬ আয়াতে আছে, ইব্রাহীম যখন বলেছিলো, হে মালিক ! এ শহরকে তুমি শান্তিময় ও নিরাপত্তার নগর বানিয়ে দাও ।
যে জাতির পিতা স্বয়ং সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মহান আল্লাহর শাহী দরবারে ধরনা ধরেন, সেই জাতি কি সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদে নিজেদেরকে জড়াতে পারে ? ইসলাম মানুষকে আল্লাহ তা'য়ালার কাছে সহজ-সরল শান্তির পথ কামনা করতে শিক্ষা দিয়েছে । নামাজ আদায়কারী ব্যক্তিগন প্রত্যেকদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে বারবার সুরা ফাতিহা তেলাওয়াত করে থাকেন । এই সুরার মাধ্যমে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে থাকেনঃ 'তুমি আমাদের সহজ-সরল ও অবিচল পথটি দেখিয়ে দাও' । 
যে মুসলমান প্রত্যেকদিন ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত নামাজেই সুরা ফাতুহার মাধ্যমে ৩২বার মহান আল্লাহর কাছে কাঁতর কন্ঠে আবেদন করে "আমাদের সহজ-সরল ও অবিচল পথটি দেখাও" সেই মুসলমানের পক্ষে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী বা জঙ্গিবাদী তৎপরতার পথে অগ্রসর হওয়া কি সম্ভব ? প্রকৃত মুসলমানদের সাথে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের ঐ দুরত্ব রয়েছে, যে দুরত্ব পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে রয়েছে । ইসলামের নামে যে বা যারা সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতা চালাচ্ছে, তারা না জেনে অথবা ইসলামের দুশমনদের হাতের পুতুল হিসেবেই চালাচ্ছে । বলাবাহুল্য ইসলাম ও ইসলামপন্থিদের বদনাম করার লক্ষেই শত্রুপক্ষ মুসলিম নামধারী এসব লোককে ব্যবহার করছে ।
ইসলামের ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর প্রত্যেক পরিসরে ও মুসলিম জীবনের সুচনা এবং সমাপ্তি তথা দুনিয়া-আখিরাতের সবস্থানে শধু শান্তি কামনা ও প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে । সেই ইসলামে সন্ত্রাসবাদ আর জঙ্গিবাদের গন্ধ অনুসন্ধান করা, আল্লাহর আইন চালুর নামে মানুষ হত্যা করা, দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করা, একমাত্র মূর্খ, জাহিল, জ্ঞানপাপী, ইসলাম-মুসলমান ও দেশের শত্রুদেরই কাজ হতে পারে । আর যারা নিজেকে মুসলমান দাবি কোরে ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পথ অনুসরণ কোরে দেশে বিশৃঙ্খল ও বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তারা স্পষ্টতই ভ্রান্ত পথের অনুসারী এবং এ পথ গিয়েছে জাহান্নামে । বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এসব লোকদের জন্য আল্লাহ তা'য়ালা বলেনঃ "তাদেরকে যখনই বলা হয়েছে 'তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না' তখনই তারা বলেছে ' আমরা তো সংশোধনকারী মাত্র । (সুরা বাকারা -১১) 
সন্রাস আর জঙ্গিবাদ নির্ভর পথ অনুসরণ করে বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে মানুষ হত্যাকারীদের যখন বলা হচ্ছে, 'তোমরা কেনো এই বিপর্যয় সৃষ্টি করছো ? তারা জবাব দিচ্ছে, আমরা আল্লাহর আইন কায়েমের জন্য এই কাজ করছি' । অর্থাৎ অশান্তি সৃষ্টিকারী অন্য সকল আইন বাতিল করে আল্লাহর শান্তিময় আইন কায়েমের লক্ষে এসব করছি । এসব মূর্খ জাহিলরাই যে প্রকৃত অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, এই চেতনাই এদের মধ্যে নাই । এসব চেতনাহীন দুষ্কৃতিদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারার ১২ আয়াতে বলেনঃ "সাবধান ! প্রকৃতপক্ষে এরাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী, কিন্তু এর কোনো চেতনাই তাদের নেই" । 
ইসলামের দুশমন কর্তৃক বিভ্রান্ত হয়ে বোমাবাজ মানুষ হত্যাকারী সন্ত্রাসীরা ইসলামের নামে দেশে যে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে এবং নিজেকে যে নবীর উম্মত তথা অনুসারী হিসেবে দাবি করছে, সেই নবীয়ে রহমত সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ "রাসুলের জীবনে রয়েছে তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ" । নিশ্চয় তুমি সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী । তুমিই সবথেকে সহজ-সরল পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত ।
যে মহামানবকে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বোত্তম আদর্শের অধিকারী ও করুণার মূর্তপ্রতীক  হিসেবে সনদ দিয়েছেন, সেই মহামানব রহমাতুল্লিল আলামীনের অনুসারী হিসেবে নিজেকে দাবি করে বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে কিংবা মানুষের গলা কেটে হত্যা করে এবং নিজেকে হত্যা করে 'জান্নাতে যাবার' প্রলোভন যারা দেখাচ্ছে, তাদের পরিচয়, তারা ইসলাম-মুসলমান, দেশ-জাতি ও সমগ্র মানবতার দুশমন । সচেতন মহলের চোখগুলোকে সিসি টিভিতে পরিণত করে এদেরকে ধরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দিতে হবে এবং এদের ওপর কুরআন ঘোষিত বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের সাথে সম্পর্কিত সর্বোচ্চ দন্ড প্রয়োগ করাই বর্তমান সময়ের দাবি । ***** চলবে *****

শুক্রবার, ২৯ জুলাই, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদঃ আল্লামা সাঈদী


বর্তমান পৃথিবীতে এমন একটি দেশ নেই, যে দেশ এবং দেশের জনগন সন্ত্রাস নামক ভয়ানক দানবের আতংকে আতংকিত নয় । প্রত্যেকটি দেশেই সন্ত্রাস ক্রমাগতভাবে বিস্তৃত হচ্ছে । সন্ত্রাস নামক দানবের ভীতিকর পদচারনায় কম-বেশী পৃথিবীর প্রত্যেক জনপদেই অনুভুত হচ্ছে । পরস্পরের মধ্যে মতবিরোধ প্রতিহিংসা চরিতার্থের পর্যায়ে উপনীত হয়ে যেমন সামাজিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাস বিস্তৃত হচ্ছে তেমনি নানা মতবাদ মতাদর্শে বিশ্বাসী এক শ্রেনীর লোকজন সাংগঠনিকভাবে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড  সংঘটিত করছে । সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ যেমন নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছে, তেমনি সামস্টিকভাবেও মানুষ নিরাপত্তাহীনতার শিকার । নির্বিঘ্নে শংকামুক্ত পরিবেশে কোন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মানুষ একত্রিত হতে আতংকবোধ করছে ।
কর্মস্থল, ভ্রমণস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সভা-সমাবেশ, দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাহিরে যাতায়াতের বাহন, বিপণী কেন্দ্র ও চিত্ত বিনোদনের কেন্দ্রসমুহ এবং অন্যান্য জনসমাগমের স্থানসহ এমন একটি স্থানও নেই, যেখানে মানুষ সন্ত্রাস কিংবা জঙ্গিবাদ আতংকে তাড়িত হচ্ছে না । ভ্রান্ত বিশ্বাস ও উগ্র মতবাদ-মতাদর্শের অনুসারীরা সরকারী স্থাপনা, ধর্মীয় স্থান, বিদেশী দুতাবাস, সচিবালয়, রাজনৈতিক কার্যালয়, বিচারালয়, রেলওয়ে স্টেশন, বিমান বন্দর, শপিং সেন্টার, গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র ইত্যাদী গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমুহ এবং জনসমাগম স্থলকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালিত করে ব্যাপক প্রানহানী এবং মুল্যবান সম্পদের ক্ষতি করছে ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নাইজেরিয়ায় আমেরিকান দুতাবাসে, ভারতের পার্লামেন্ট ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে, আমেরিকার টুইন টাওয়ারে, ব্রিটেনের পাতাল রেলে, তুরস্কের বিভিন্ন বিপণীকেন্দ্র, ফ্রান্সের রেলওয়ে ষ্টেশন, জর্ডানের পাচ তারকা হোটেলে, পাকিস্তানের ধর্মীয় উপসানালয়সহ বিভিন্ন স্থানে, সৌদিআরবের নানান স্থানে, মিশরে শপিং সেন্টারে, নেপাল, শ্রিলংকা, ইরাক, ইরান ও আফগানিস্থানের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশে আদালতে, ধর্মীয় উপসানালয়, রাজনৈতিক কার্যালয় এবং সমাবেশে ব্যাপক সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে অগণিত মানুষ হত্যা করা হয়েছে, মুল্যবান সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে ও অসংখ্য মানুষকে চিরতরে পঙ্গু বানিয়ে দেয়া হয়েছে । 
সন্ত্রাসী কিংবা সেনা অভ্যুথান(!) ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থপতি রাস্টপতি শেখ মুজিবর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক, ইরানের পার্লামেন্টে বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে হত্যা করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ আলী রেজাই সহ কয়েকজন মন্ত্রী এবং পার্লামেন্টের সদস্যসহ ৮০ জনকে । এছাড়া গুপ্তঘাতক লেলিয়ে দিয়ে বেশ কয়েকজন ধর্মীয় নেতাকে ইরানে হত্যা করা হয়েছে । ফিলিপাইনের জননন্দিত প্রেসিডেন্ট বেনিনগো একুইনোকেও সন্ত্রাসীদের হাতে প্রান দিতে হয়েছে । শ্রীলংকার জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট রানা সিংহে প্রেমাদাসকে প্রান দিতে হয়েছে বোমাবাজদের হাতে । লেবাননের সাবেক প্রেসিডেন্ট রফিক হারিরীকেও সন্ত্রাসীদের হাতেই প্রান দিতে হয়েছে । মুসলিম বিশ্বের বিষফোড়া ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রবিনও সন্ত্রাসী ইয়াহুদী তরুণের হাতে নিহত হয়েছেন । আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনও সন্ত্রাসী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ।
ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য স্বাধীনতা বা স্বধিকার আন্দোলন করছে । পাঞ্জাবের শিখ সম্প্রদায় স্বধীন খালিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন গড়ে তোলে এর নেতৃত্ব দিতে থাকে আকালী দলের মাধ্যমে শিখ নেতা হরচান্দ সিং লাঙ্গোয়াল ও সুরঞ্জিত সিং বার্নলা । শিখদের স্বাধীনতা আন্দোলন দমিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে সান্ত সিং ভিন্দারনওয়ালের নেতৃত্বে পাল্টা উপদল সৃষ্টি হয় । ভারত সরকার সেই উপদলকে অর্থ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়ে সাহায্য করে । এমনকি স্বধীনতা আন্দোলনের নেতাদের হত্যা করার জন্য অস্ত্র দিয়েও সহযোগিতা করে ভারতের পরিচিত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো । 
কিন্তু শিখদের উপদলের নেতা সান্ত সিং ভিন্দারনওয়ালে এতোটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে, শিখদের পবিত্রস্থান অমৃতস্বরের 'স্বর্ণ' মন্দিরকে কেন্দ্র করে তারা এক বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে এবং সারা ভারতব্যাপী সন্রাসী তৎপরতা চালাতে থাকে । এদেরকে যে ভারত সরকার সৃষ্টি করেছিলো, তারাই অবশেষে কমান্ডো বাহিনী পাঠিয়ে স্বর্ণ মন্দিরের অভ্যন্তরেই দলবলসহ  সান্ত সিং ভিন্দারনওয়ালকে হত্যা করে । এরই পরিণতিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিকেও শিখদের হাতে প্রান হারাতে হয় ।  
শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার লক্ষে প্রায়ত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে শ্রীলংকার তামিল গেরিলাদের প্রতি সার্বিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া হয় এবং ভারতের অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তামিল গেরিলারা গোটা শ্রীলংকা জুড়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে । প্রায়ত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র রাজিব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে তিনি যখন শ্রীলঙ্কায় রাস্ট্রীয় সফরে যান, তখন গার্ড অব অনার গ্রহণকালে এক সৈনিক তার মাথা লক্ষ করে রাইফেলের ব্যাটন দিয়ে আঘত করে । সে যাত্রা তিনি রক্ষা পেলেও সেই তামিল গেরিলাদের হাতেই শেষ পর্যন্ত তিনিও মায়ের অনুরূপ পরিণতি ভোগ করেন । সন্ত্রাস নামক যে দানবকে ইন্দিরা-রাজিব গান্ধী দুধ-কলা হৃষ্টপুষ্ট  করেছিলেন, সেই দানবের ছোবলেই মাতা পুত্রকে প্রান হারাতে হয়েছে । ভারতের জনক বলে খ্যাত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে প্রথমে ১৯৩৪ সালে ২৫ জুন পুনে শহরে রেল ষ্টেশনে বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে হত্যার চেস্টা করা হয় । দ্বিতীয়বার ১৯৪৬ সালে ঐ একই পদ্ধতিতে জুন মাসে হত্যার চেষ্টা করা হয় । ১৯৪৮ সালের ২০শে জানুয়ারী তৃতীয়বার হত্যার চেষ্টা করে মদনলাল নামের এক সন্ত্রাসী । এরমাত্র ১০দিন পর ৩০শে জানুয়ারী নাথুরাম গডসে নামক এক সন্ত্রাসীর হাতে তাকে প্রান হারাতে হয় । পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানও সন্ত্রাসীদের হাতেই প্রান হারিয়েছেন ।
সাম্রাজ্যবাদী দেশসমুহের অন্যতম ঘৃণ্য নীতি হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে নানাধরনের উপদল সৃষ্টি করে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে অস্থির করে রাখা । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী বাহিনী পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে উপনীত হলো, আওয়ামীলীগ কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের সম্ভাবনা যখন উজ্জল হয়ে উঠলো ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত সরকার অত্যন্ত গোপনে দেরাডুনে আরেকটি উপদল গঠন করে । এদেরকে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরন করে । এরা নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে । তারপরের ইতিহাস আপনারা অনেকেই জানেন । অবশেষে প্রান দিতে হয়েছে স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবর রহমানকে ।
অনুরূপভাবে পরাশক্তি আমেরিকা সৌদিআরবের সরকারকে অস্থির রাখার লক্ষে সৌদি ধনকুবের উসামা বিন লাদেনকে প্রশিক্ষন দিতে থাকে । লাদেন পরিবারের সাথে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ পরিবারের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো । লাদেনকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আমেরিকা সৃষ্টি করলো আল-কায়েদা সংগঠন । এরপর তাদেরকে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে সৌদি সরকারকে অস্থির করে তোলে । এক পর্যায়ে তাদের মাধ্যমে পবিত্র কাবাঘরও দখল করিয়ে পবিত্রস্থানে রক্তপাত ঘটানো হলো ।
তৎকালীন পরাশক্তি অখন্ড রাশিয়া আফগানিস্থান দখল করার পরে বিনলাদেনকে আমেরিকা প্রচুর সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত করে আফগানিস্থানে টেনে এনে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দাড় করালো । রুশ বাহিনী আফগানিস্থান ত্যাগ করার পরে আমেরিকা ও বিন লাদেনের "মধুচন্দিমায়" ফাটল ধরলো এবং লাদেনকে উপলক্ষ করেই আফগানিস্থান ও ইরাকে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে দেশ দুটো দখল করে অগণিত মুসলমানকে (নারী-শিশু) নির্বিচারে হত্যা করলো । সেই হত্যার ধারাবাহিকতায় এখনও প্রতিদিন সে দেশে দুটোয় প্রানহানী ঘটছে । আমেরিকা বিন লাদেন  অধ্যায় যবনিকা এখানেই ঘটায়নি, নিজেদের স্বার্থে সৃষ্ট আল কায়েদাকে উপলক্ষ করে ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর সহ অন্যান্য মুসলিম দেশসমুহে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে মুসলমানদের ব্যাপক প্রানহানী ঘটানো পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই চুড়ান্ত করে ফেলেছে ।  
পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজেদের স্বার্থে সৃষ্ট নানা ধরনের জঙ্গি সংগঠনকে অর্থ ও সামরিক সাহায্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে । বর্তমানে এই সন্ত্রাসে এতোটাই ব্যাপক এবং ভয়ানক আকার ধারন করেছে যে, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মনেই চরম এক আতংক সৃষ্টি করেছে । শান্তিপ্রিয় মানুষের মন থেকে মুছে গিয়েছ স্বস্তি, নিরাপত্তাবোধ, সে স্থানে দখল করেছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা । কিন্তু দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, পৃথিবীর  যেখানেই সন্ত্রাসী তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেখানেই মুসলমানদের সাথে এই ঘৃণ্য কর্মের যোগসুত্র আবিস্কার করা  হচ্ছে । আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে সিন্ডিকেট সংবাদ একমাত্র মুসলমানদের দিকেই আঙ্গুল তুলে চিহ্নিত করা হচ্ছে, মুসলমানরাই এই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে । শুধু তাই নয়, মুসলমানদের নামের সাথে সাথে সন্ত্রাসের প্রতি অসহিস্নু সর্বোত্তম জীবন বিধান পবিত্র ইসলামের নাম যুক্ত করে বলা হচ্ছে, ইসলামী উগ্রবাদী ও ইসলামী মৌলবাদীরাই সর্বত্র সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে । كنتم خير أمة أخرجت للناس .تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر .وتؤمنون بالل 
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেনঃ- তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতী। তোমাদেরকে বের করে আনা হয়েছে এ পৃথিবীতে মানবতার কল্যানের জন্য । আর সেটা হল সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দ্বারা । আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে । যাদের সৃষ্টিই হল মানবতার কল্যান সাধনের জন্য তারা কখনো সন্ত্রাস আর জংগি বাদী হতে পারেনা । 
কিন্তু কেন এই সন্ত্রাস ? কি এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ? প্রকৃত সন্ত্রাসী কারা ? জঙ্গিবাদী দল কারা সৃষ্টি করেছে ? ক্ষেত্র বিশেষে সন্ত্রাসী তৎপরতায় মুসলিম নামধারী লোকদের কেন ব্যবহার করা হচ্ছ্বে ? সন্ত্রাসের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব কেনোইবা ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে ? এসব বিষয়ে সচেতন মানুষেরই স্পস্ট ধারনা থাকা একান্ত প্রয়োজন । আশা করি পরবর্তী ইতিহাস ভিত্তিক তাত্তিক আলোচনা পাঠ করলে সকলের কাছেই পরিস্কার হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ ।


বৃহস্পতিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলামঃ মাওলানা সাঈদী

অভিভাবক, খতীব ও ঈমামগনের দায়িত্ব


বর্তমানে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে শত্রুপক্ষ যে কৌশলে অপতৎপরতা চালাচ্ছে, তা প্রতিহত করা সরকারেরই দায়িত্ব নয় । দেশের জনগনকে নিজেদেরই স্বার্থে এ ব্যপারে পূর্ণ সচেতন হতে হবে এবং শত্রুদের দমন করার জন্য ঐকান্তিক প্রচেস্টা চালাতে হবে । এ ব্যাপারে দল, মত,  জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর নাগরিককেই এগিয়ে সাওতে হবে । 'আমার পছন্দের দল সরকারে নেই, সুতরাং সরকারের দুর্নাম হলে আমার কিছুই যায় আসে না' এই মনোভাব ত্যাগ করতে হবে । যান-বাহনে বা স্কুল অথবা মসজিদে বোমা বিস্ফোরন ঘটলে এতে শুধু সরকারি দলের লোক বা সরকারি দলের সমর্থক লোকদের সন্তানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না । সকল শ্রেনীর মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সতরাং দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে দলপ্রেম নয় দেশ প্রেমিক হিসেবে সাধ্যানুযায়ী ভুমিকা পালন করতে হবে ।
অভিভাবকগণকে লক্ষ রাখতে হবে, সন্তান কি করছে, কোথায় যাচ্ছে ? এবং কোন শ্রেনীর লোকদের সাথে মেলামেশা করছে । দল হিসেবে সন্তান, ভাই অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন এবং অধীনস্ত কর্মচারী কোন দলকে পছন্দ করছে । ইসলামের নামে কোনো ব্যাক্তি কাউকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্ত করছে কিনা সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে । কে কোন ধরনের বই পড়ছে, ফোনে আভাষে- ইঙ্গিতে জাতিসত্তা ও দেশের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন আলোচনা করছে কিনা এ ব্যাপারে অভিভাবকগনকে সচেতন ভুমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে ।


অভিভাবকগন যদি অনুভব করেন যে, তার সন্তান, ভাই অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কেউ অথবা অধীনস্থ কেউ ইসলামের লেবাসধারী হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো সংগঠনের প্রতি সহানুভূতিশীল, তাহলে তাকে প্রকৃত ইসলাম ও ইসলামী দল সম্পর্কে বুঝিয়ে ঐসব সন্রাসবাদী-জঙ্গিবাদী সংগঠনের ছোবল মুক্ত করতে হবে । আর যদি বুঝা যায় যে, আদর ভালোবাসা দিয়ে, চেস্টা সাধনা করেও এদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে ফেরানো যাবে না, তাহলে মায়া মমতা বিসর্জন দিয়ে দুনিয়া ও আখিরাতে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে এদেরকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দিন । মনে রাখবেন, আপনার অধীনস্থদের ব্যাপারে কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর আদালতে কঠিনভাবে জবাব্দিহি করতে হবে । নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ যে বান্দাকেই বেশী অথবা কম লোকের তত্ত্বাবধায়ক বানিয়েছেন, কিয়ামতের দিন অবশ্যই তাকে প্রশ্ন করা হবে যে, সে অধীনস্থ লোকদের দ্বীনের উপর চালিয়েছিল না ধ্বংস করে দিয়েছিলো । বিশেষ করে তার বাড়ির পরিবারের লোকদের ব্যাপারেও হিসেব গ্রহন করবেন ।
মায়া মমতা ও ভালোবাসার বশবর্তী হয়ে আপনজনদেরকে যদি ধ্বংসের পথ থেকে ফিরানো না হয়, তাহলে কিয়ামতের দিন এরা যখন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলবে, যারা আমাদের সঠিকপথের সন্ধান দেননি, ভুল পথে চলতে দেখেও নিষেধ করেননি, তারা আজ কোথায় ? তাদেরকে পায়ের নিচে ফেলে পিষে তারপর জাহান্নামে যাবো । তারা যা বলবে, পবিত্র কুরআনে সে কথাগলো এভাবে তুলে ধরা হয়েছেঃ আমরা তাদের পদদলিত করবো, যাতে তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয় । আস-সাজদাহ#২৯ 
শিক্ষকগন অভিভাবকদের বড় অভিভাবক । তারা শ্রেনীকক্ষে পাঠদানের সময়  ছাত্রদেরকে বুঝাবেন 'আল্লাহর আইন চালুর নামে যারা সন্ত্রাস করছে তারা আসলে আল্লাহর আইনের দুষমন । ইসলামের শত্রুদের হাতের পুতুল হিসেবেই তারা কাজ করছে । ইসলামে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান নেই এবং ইসলাম সবসময় নিয়মতান্ত্রিক পন্থাই অনুসরন করে । আদালতে বোমা মেরে বিচারক হত্যা, রেস্টুরেন্টে বিদেশি বন্ধিকরে গলা কেটে হত্যা করে বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমান করে বিদেশী আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে ।
সম্মানিত খতীব, ঈমাম ও ওয়ায়েজীনগনকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে । এভাবে যদি ইসলামের নামে শ্ত্রুপক্ষ সন্ত্রাস চালাতে থাকে তাহলে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ লোকগুলো ইসলামের ব্যাপারে ভুল ধারনা পোষণ করবে । আর এ জন্য আল্লাহর দরবারে আলেম-উলামা, পীর-মাশায়েখদেরই দায়ী হতে হবে । আলেম সমাজই ইসলাম সম্পর্কে সবথেকে বেশী জ্ঞান রাখেন এবং আল্লাহর আদালতে কোন কোন বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে, এব্যাপারেও তারা পূর্ণ সচেতন রয়েছেন । 'আল্লাহর আইন চালুর নামে যারা সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে, এ ব্যাপারে সাধারন মানুষকে প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে না করে আল্লাহর আদালতে সর্বগ্রে আলেমদেরই জবাবদিহি করতে হবে, এব্যাপারেও আলেম সমাজ সচেতন রয়েছেন ।
যারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী মাহফিলে বক্তৃতা করেন, তারা কুরআন-হাদীস দিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখবেন এবং ইসলামী জীবন বিধান শ্রোতাদের সম্মুখে তুলে ধরবেন । খতীব ও ঈমামগন সপ্তাহে একদিন অর্থাৎ জুমাবারে অনেকলোক সম্মুখে পেয়ে থাকেন । বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে খুতবায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আলোচনা করে সাধারন নাগরিকদেরকে সচেতন করুন । তাদেরকে একথা বুঝান,  যারা আল্লাহর আইন চালুর নামে বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে বা বিচার বহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে পিতামাতাকে সন্তানহারা করছে, স্ত্রীকে স্বামীহারা করছে, সন্তানকে এতিম করছে, বোনকে ভাইহারা করছে, পরিবারের উপার্জনশীল একমাত্র ব্যক্তিকে হত্যা করে গোটা পরিবারকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করছে, তারা অবশ্যই ইসলাম, মুসলমান, দেশ-জাতি ও সমগ্র মানবতার দুষমন । এদের সন্ধান পাওয়ামাত্র আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফোন করে ধরিয়ে দিন । তাদেরকে বিচারের সম্মুখিন করুন ।
সরযন্ত্রকারীরা বোমাবাজদের দিয়ে যে লক্ষ ও উদ্দেশ্য নিয়ে সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে সৃষ্টিতে নামিয়েছে, তারা যদি আল্লাহ না করুন সফল হয়, তাহলে এর প্রথম শিকার আলেম-উলাম মাশায়েখ তথা ইসলাম পন্থীদেরকেই হতে হবে । দেশের মাদরাসা গুলো বন্ধ করে দেয়া হবে । কারাগার গুলো আলেম উলামা দিয়ে পরিপূর্ণ করা হবে । সংবিধান থেকে আল্লাহর প্রতি আস্থা, বিসমিল্লাহ উঠিয়ে দেয়া হবে । নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলিহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কুটুক্তি বা কটুবাক্য প্রয়োগ করে কবিতা- সাহিত্য রচনা করা হবে । ইসলামী প্রতিষ্ঠান সমুহ বন্ধ করে দেয়া হবে । মুসলমানদের কলিজা পবিত্র কুরআনের অবমাননা করা হবে । সর্বোপরি ইসলাম ও মুসলমানদের হেয়-প্রতিপন্ন করা হবে এবং আলেম-উলামদেরকে ব্যং-বিদ্রুপের পাত্রে পরিনত করা হবে । সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যার ফলশ্রুতিতে কুরআন-হাদীসের বিধান প্রচার, প্রসার- স্বাধীনভাবে খুতবা পাঠ ও ইসলামী আন্দোলন নিসিদ্ধ ঘোষণা করা হবে ।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে ভয়াবহ এই পরিস্থিতি সাফল্যের সাথে উত্তরণের তাওফিক এনায়েত করুন । আমীন- ইয়া রব্বাল আলামীন























বুধবার, ২৯ জুন, ২০১৬

আল্লামা সাঈদীর  কারাজীবনের ৬টি বছর

২৯ জুন । বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক কালো দিন ।
আল্লামা সাঈদীর  কারাজীবনের ৬টি বছর পূর্ণ হলো আজ ।
এই ৬ বছরের মোট ২১৯০ দিনে কতোই না ঘটনা ঘটে গেছে আমাদের জীবনে । আমার আব্বা হারিয়েছেন তাঁর মমতাময়ী মাকে, তাঁর কলিজার টুকরা বড় সন্তান মাওলানা  রাফীক বিন সাঈদীকে । দুজনের দাফন তিনি দিতে পারেন নাই শুধু নয় আজও তাদের কবরটা দেখতে পারেন নাই !

২০১০ সালের এইদিনে বিশ্ব নন্দিত মুফাসসির, আল্রামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হাস্যকর এক মামলায় গ্রেফতার করে আওয়ামী সরকার । গ্রেফতার করে এই জালিম সরকার টানা ৪১ দিনের রিমান্ডে নেয় আল্লামা সাঈদীকে । তাঁর মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একজন নেতার বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন ও এতো দীর্ঘদিনের রিমান্ড মঞ্জুর রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল । অত:পর শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার করে আল্লামা সাঈদীকে 'যুদ্ধাপরাধী' বানানোর অপচেষ্টা এবং সবশেষে বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ফাঁসির রায় ও পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ঘোষনা করে ফ্যাসিবাদি আওয়ামী সরকার ।



আল্রামা সাঈদীর অপরাধ, তিনি আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করেন । তার অপরাধ, তিনি কোরআনের দাওয়াত বাংলার প্রতিটি আনাচে কানাচে পৌছে দেন । তার অপরাধ, তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে কথা বলেন । তার অপরাধ, তিনি আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেন ।  তার অপরাধ, তার কথা শোনার জন্য লাখো মানুষ জড়ো হয় । তার অপরাধ, তার মুখে কোরআনের তাফসীর শুনে সহস্রাধিক অমুসলিম ইসলাম গ্রহন করেছে। তার অপরাধ, তাকে লাখো কোটি মানুষ তাদের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে !!

প্রচণ্ড গরম ও নিঃসঙ্গ একাকিত্ব নিয়ে বর্তমানে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে বন্দী জীবন যাপন করছেন বিশ্ববরেণ্য এই আলেমে দ্বীন । ফ্যাসিবাদি এই সরকার আল্লামা সাঈদীকে বন্দী করে রাখেনি, বন্দী করে রেখেছে কোরআনের পাখিকে । বন্দী করে রখেছে, ১৬ কোটি জনতার আবেগ-অনুভুতি আর ভালোবাসাকে । বন্দী করে রেখেছে কোটি জনতার হৃদয় স্পন্দনকে ।


আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা রায় ঘোষনার পরে দেশপ্রেমিক জনতা আল্লামা সাঈদীকে কতখানি ভালোবাসে তার প্রমাণ বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে । একজন মানুষের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষনার পরে অন্যায় মৃত্যুদণ্ডের প্রতিবাদে প্রায় আড়াই শত মানুষের জীবনদানের ঘটনা পৃথিবীতে আর কখনো, কোনদিন ঘটেনি ।

আজ রমাদানের নাজাতের এই শেষ দশকে আসমান ও জমিনের মালিকের কাছে বিনয়াবনত চিত্তে আমরা প্রার্থনা করছি,


হে আরশের মালিক !!
রক্ত স্রোতে ভাসিয়ে এই জাতির ঈমানের পরীক্ষা এতো কঠোরভাবে তুমি নিও না । তোমার কাছে চাইতে কৃপণতা করব না হে পরওয়ারদিগার,
তুমি আল্লামা সাঈদীকে কুরআনের ময়দানে ফিরিয়ে দাও ।
আমরা জানি তুমি চাইলে হাজারো ‘সাঈদী’ এই দুনিয়ায় পাঠাতে পারবে
কিন্তু আমাদের তো এই মুহুর্তে সাঈদীকেই আজ বেশি প্রয়োজন !

ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন !
তোমার জাতের কসম, তোমার ইজ্জতের কসম !
তুমি আমাদের কলিজার টুকরা ‘সাঈদীকে’ আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দাও ।।
#FreeAllamaSayedee #SaveBangladesh — feeling হে আল্লাহ্‌! তুমি কুরআনের পাখিকে কুরআনের ময়দানে ফিরিয়ে দাও...

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

যে ভাষণ যুগ যুগ ধরে প্রেরণা যোগাবে : কাঠগড়ায় আল্লামা সাঈদীর সেই বিখ্যাত ভাষণ...


মাননীয় আদালত,

২০১১ সালের অক্টোবরের ৩ তারিখ এই আদালতের তদানিন্তন চেয়ারম্যান নিজামুল হক আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ পড়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমি দোষী না নির্দোষ? আপনি তখন এই আদালতের ৩ সদস্য বিশিষ্ট বিচারকদের একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ন্যায় বিচারে ভ্রষ্ট পথ অনুসরণ করেছিলেন বিধায় একরাশ গ্লানি নিয়ে স্বেচ্ছায় সরে পড়তে হয়েছে। আজ সেই চেয়ারে আপনি সম্মানিত চেয়ারম্যান। এটাই আল্লাহর বিচার।

সেদিন তখনকার চেয়ারম্যান নিজামুল হকের প্রশ্নের জবাবে আমি যা বলেছিলাম, সেখান থেকেই আমার সামান্য কিছু বক্তব্য শুরু করছি। ন্যায় বিচারের স্বার্থে আপনাদের যা শোনা জরুরী বলে আমি মনে করি। নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে আমি বলেছিলাম-আমার বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত এবং শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যাচার। আল্লাহর কসম! আমার বিরুদ্ধে রচনা করা চার সহা¯্রাধিক পৃষ্ঠার প্রতিটি পাতার প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ, প্রত্যেকটি বর্ণ মিথ্যা, মিথ্যা এবং মিথ্যা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে কোন এক দেলোয়ার শিকদারের করা অপরাধ সমূহ আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যার পাহাড় রচনা করেছেন।

আজ আমি আল্লাহর নামে শপথ নিয়ে আপনাদের সামনে বলতে চাই, সরকার ও তার রাষ্ট্র যন্ত্র কর্তৃক চিত্রিত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের হত্যাকারী, লুন্ঠন, গণ হত্যাকারী, ধর্ষক, অগ্নি সংযোগকারী, দেলোয়ার শিকদার বা ‘দেলু’ বা দেইল্যা রাজাকার আমি নই। আমি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রিয় জন্মভূমি এই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারনের নিকট চিরচেনা পবিত্র কোরআনের একজন তাফসীরকারক, কোরআনের পথে মানুষকে আহ্বানকারী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

যে আমি সেই যৌবন কাল থেকেই শান্তি ও মানবতার উৎকর্ষ সাধনে পবিত্র কুরআনের শ্বাশ্বত বানী প্রচার করার লক্ষ্যে নিজ জন্মভূমি থেকে শুরু করে বিশ্বের অর্ধশত দেশ গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত ভ্রমন করেছি, সেই আমি আজ ৭৩ বছর বয়সে জীবন সায়াহ্নে এসে সরকার ও সরকারী দলের দায়ের করা ‘ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার’ হাস্যকর ও মিথ্যা মামলায় গত ২৯ জুন ২০১০ থেকে আজ পর্যন্ত কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে মানবেতর অবস্থায় দিনাতিপাত করছি। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস !
আমার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত হানার অভিযোগ উত্থাপন এবং তজ্জন্য আমাকে তড়িৎ গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার কাজটি করলো এমন এক সরকার, যারা আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস কথাটি দেশের সংবিধানে বহাল রাখাকে সহ্য করতে না পেরে অবলীলায় তা মুছে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি। যাহোক, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই ৪২ বছরের মধ্যে আমার বিরুদ্ধে কোন বিষয়েই কোন মামলা ছিলো না। সামান্য একটি জিডিও ছিলো না। গণতন্ত্রের লেবাসধারী বর্তমান এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বদান্যতায়, মহানুভবতায় মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে আজ আমি ১৭টি মামলার আসামী। সেই জুন ২০১০ থেকে অদ্যাবধি কথিত মানবতাবিরোধী ২০ টি অপরাধের অভিযোগসহ ১৭টি মামলা আমার বিরুদ্ধে দায়ের করে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে সরকার আমাকে তাদের এক রাজনৈতিক তামাশার পাত্রে পরিণত করেছে, যা আজ দেশবাসীর কাছে মেঘমুক্ত আকাশে দ্বিপ্রহরের সূর্যের মতই স্পষ্ট।
মাননীয় আদালত,


যে ২০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আজ আপনাদের সম্মুখে আমি দন্ডায়মান, সেগুলো সরকারের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই সাজানো। ১৯৭১ সনে পিরোজপুর বা পাড়েরহাটে পাক বাহিনী যা ঘটিয়েছে, সেসব কাহিনী সৃজন করে চরম মিথ্যাবাদী ও প্রতারক এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা নীতি নৈতিকতার মূলে পদাঘাত করে আমার নামটি জুড়ে দিয়েছেন। মহান আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাসী, আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী, মৃত্যুর পরের আযাবে বিশ্বাসী, পরকাল ও জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে বিশ্বাসী কোন মুসলমানের পক্ষে এতো জঘন্য মিথ্যাচার আদৌ সম্ভব নয়। তদন্ত কর্মকর্তা এবং সহযোগিতরা তাদের সৃজিত অভিযোগগুলো প্রমানের জন্য কয়েকজন বিতর্কিত চরিত্র ভ্রষ্ট ও সরকারী সুবিধাভোগী দলীয় লোক ব্যতিত স্বাক্ষী প্রদানের জন্য কাউকেই হাজির করতে পারেননি।
এতদসত্ত্বেও প্রচন্ড ক্ষিপ্রতার সাথে এই ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিচার প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টেনেছেন। তিনি আইন-কানুন, ন্যায় বিচারের শপথ, অভিযুক্ত হিসেবে আমার বক্তব্য প্রদানের প্রাপ্য অধিকার প্রদান কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেননি বরং তিনি রায় ঘোষনার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় মহান রাব্বুল আলামিনের হস্তক্ষেপের ঘটনা। আজ সেই একদা সমাপ্তকৃত বিতর্কিত মামলার পূন: সমাপ্তির দ্বিতীয় আয়োজন। কিন্তু আমি পূর্বের ন্যায় একই উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি মামলা যেনো-তেনো প্রকারে শেষ করার সেই একই ত্রস্ততা।
মাননীয় আদালত,


এই ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৃত বিবেচনায় আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত মামলার রায় প্রকাশ করে গেছেন। সাবেক চেয়ারম্যান মিডিয়ায় প্রকাশিত স্কাইপ সংলাপকে মেনে নিয়ে অন্যায় ও বে-আইনী ভাবে পরিচালিত বিচার কার্যের সকল দায়ভার বহন করে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বিদায় হয়েছেন। ষড়যন্ত্র ও অন্যায়ভাবে বিচার কার্য্য পরিচালনার বিষয়টি তার স্কাইপি কথোপকথনে প্রকাশ পেয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে কিভাবে সরকারের চাপে পড়ে, সুপ্রীম কোর্টের জনৈক বিচারপতির প্রলোভনে পড়ে, তথাকথিত ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের ডিকটেশন অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করে এবং তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে প্রসিকিউশনের সাথে অবৈধ যোগসাজসে বিচার কার্য পরিচালনায় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, আদালতের ক্ষমতাকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে আমার পক্ষের স্বাক্ষীর অগ্রিম তালিকা জমা দিতে বাধ্য করে সেই তালিকা প্রসিকিউশন এবং তাদের মাধ্যমে সরকার, সরকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসনকে সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহন করে স্বাক্ষীদের উপর চাপ সৃষ্টি ও ভয় ভীতি দেখিয়ে স্বাক্ষ্য প্রদানের জন্য আদালতে হাজির না হওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টিসহ নানাবিধ অনিয়ম ও বে আইনী কর্মপন্থার মাধ্যমে সমগ্র বিচার কার্যটি কলুষিত করেছেন।
এছাড়া সাবেক চেয়ারম্যানের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ে সেইফ হাউজ স্ক্যান্ডাল, আদালত প্রাঙ্গন থেকে আমার স্বাক্ষীকে ডিবি পুলিশ কর্তৃক অপহরন ও গুম করার স্ক্যান্ডাল, ১৫ জন স্বাক্ষীর অনুপস্থিতিতে তদন্ত কর্মকর্তার জবানে তাদের বক্তব্য গ্রহন করার স্ক্যান্ডাল এর মতো বিষয়গুলোও আমার মামলায় প্রভাব বিস্তার করে আছে। এতো সব ষড়যন্ত্র ও স্ক্যান্ডাল জর্জরিত প্রসিডিংসকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে মূলত: সাবেক চেয়ারম্যান নিজেই পরিত্যাক্ত ও পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে দিয়ে গেছেন। সুতরাং সেই পরিত্যাজ্য বিষয়ের উপর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার কাজ নির্ভর করা যেতে পারে কিভাবে !!!

মাননীয় আদালত, দেশবাসীর কাছে, বিশেষ করে আপনাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্র এবং ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়ার পরেও এই মামলা চলে কিভাবে ? গত ২৩/০১/১৩ তারিখে ট্রাইবুনাল-২ এর চেয়ারম্যান ওবায়দুল হাসান শাহীন সাহেব বলেছেন, “এই ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। প্রধানমন্ত্রী চাইলে ট্রাইাব্যুনাল থাকবে, না চাইলে আমরা চলে যাবো।” তাহলে মাননীয় আদালত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠিত ট্রাইব্যুনাল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে বিচার পরিচালনা করবে কিভাবে ? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন বিচারকে দ্রুততর করা হবে। বিচার তাহলে কে করছে? এই ট্রাইব্যুনালের তাহলে প্রয়োজন কি? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইলো কোথায়?



মাননীয় আদালত,

আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সমূহের ব্যাপারে সাবেক চেয়ারম্যানের মতামত বা রায় তার কথোপকথনেই প্রকাশিত হয়েছে। স্কাইপি সংলাপে তিনি স্বীকার করেছেন যে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সমূহের সাথে আইনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত এই মামলাটি দেশী দরবারের মতোই। তার ভাষায়; “সাঈদীর কেইসটা ডিফারেন্ট। এই সাঈদীর কেইসটার লগে আইনের সম্পর্ক খুব বেশি না। এডা আমাদের দেশী দরবারের মতই।” ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যানের প্রকাশিত এই মতামত বা মন্তব্যের পর এই মামলা চলার নৈতিক অবস্থান কোথায় থাকে?

বিদায়ী চেয়ারম্যান আমার মামলাটি আদ্যপ্রান্ত পরিচালিত করে একে যে দেশী দরবারের সাথে তুলনা করেছেন তার সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। দেশি এই দরবার তথা গ্রাম্য শালিসী অনুষ্ঠিত হয় গ্রামের ছোট খাটো ঝগড়া বিবাদ নিয়ে। খুন, ধর্ষণ, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগের মত গুরুতর অপরাধ নিয়ে শালিশ বা দরবার হয়না।


বিদায়ী চেয়ারম্যানের ভাষায় “সরকার গেছে পাগল হইয়্যা, তারা একটা রায় চায়”। চেয়ারম্যান সাহেব ঠিকই বুঝেছিলেন যে, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সরকার আমাকে ঘায়েল করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলকভাবে কতগুলো ঘটনা সাজিয়ে, জঘন্য ও ন্যাক্কারজনক কিছু অপবাদ দিয়ে আমার বিচারের নামে প্রহসনের আশ্রয় নিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ব্যপাওে বিশ্বাসযোগ্য কোন স্বাক্ষী নেই, আমার কোন সংশ্লিষ্টতাও নেই। সুতরাং ট্রাইাব্যুনাল গঠন করে বিচার বিচার খেলা কেনো, দরবার করে মিট মাট করলেই তো চলে। এটিই ছিলো প্রাক্তন চেয়ারম্যান এর রায়।

মাননীয় আদালত,

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এর পূর্বে দু’বার ক্ষমতাসীন ছিলো। তখন আমি যুদ্ধাপরাধী ছিলাম না, আমার বিরুদ্ধে কোন মামলাও হয়নি। একটি জিডিও হয়নি বাংলাদেশের কোথাও। আর তদন্ত কর্মকর্তা এই আদালতে বলেছেন ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের পর আমি নাকি ৮৫ সাল পর্যন্ত পলাতক ছিলাম। তিনি আমাকে ছাত্র জীবন থেকে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম বলে মিথ্যচার করেছে। ১৯৭৯ সালে আমি সাধারন সমর্থক হিসেবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করি। এর পূর্বে আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থক ছিলাম না। ১৯৯০ সনের শুরু অবধি আমার রাজনৈতিক কোন পরিচয়ও ছিল না। ১৯৮৯ সালে আমি জামায়াতের মজলিসে শুরায় সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হই। এরপর জামায়াতের কর্ম পরিষদ সদস্য, নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও পরবর্তীতে তথাকথিত মানবতাবিরোধী এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে আপনার কাঠগড়ায় দাড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত আমি জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দ্বায়িত্ব পালন করছিলাম। রাজনীতিতে আমার তালিকাভূক্তি ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীর একজন সাধারন সদস্য হিসেবে। উদ্দেশ্য পবিত্র কুরআনের মর্মবানী ও আদর্শের প্রচারকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহনের বাইরে আমার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতায় সময় ব্যয় একেবারেই অনুল্লেখযোগ্য। সংকোচনহীন ভাবে বলতে গেলে, রাজনীতির জটিল সমীকরনের বিষয়ে আমার অজ্ঞতা এবং সময়ের অভাবহেতু প্রচলিত রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার অবস্থান একজন এ্যামেচার রাজনীতিবিদের পর্যায়ে।


দেশবাসী স্বাক্ষী, রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার কখনো কোনকালেই তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। বরাবরই আমার বিচরন ছিলো কোরআনের ময়দানে। জনগনকে কোরআনের দাওয়াত পৌঁছানোই ছিল আমার কাজ। আমার তাফসীর মাহফিলগুলোতে হাজারো লাখো মানুষ অংশগ্রহন করে। এইসব মাহফিল থেকে অসংখ্য অগনিত মানুষ সঠিক পথের দিশা পেয়েছে, নামাজি হয়েছে। এটাই কি আমার অপরাধ? দেশ বিদেশের লক্ষ কোটি মানুষ আমার উপর আস্থা রাখেন, আমাকে বিশ্বাস করেন, আমাকে ভালবাসেন। আমি সাঈদী লক্ষ কোটি মানুষের চোখের পানি মিশ্রিত দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত। এই ভালবাসাই কি অপরাধ? বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে আমি কোরআনের দাওয়াত বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌছে দিয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ? আমি কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহন করেছি, এটাই কি আমার অপরাধ? মাননীয় আদালত এটা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে, এ অপরাধে অপরাধী হয়ে হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে আমি রাজি আছি।
মাননীয় আদালত,


১৯৬০ সালে ছাত্র জীবন শেষ করার পর থেকেই এদেশের সর্বত্র আমি পবিত্র কুরআনের তাফসীর, সীরাত মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল ও বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে বক্তব্য রেখে আসছি। মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে, কল্যাণের পথে, হেদায়তের দিকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বিরামহীন সফর করে যুগের পর যুগ অতিবাহিত করেছি। আমার মাহফিল গুলোতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার জনতার উপচে পড়া উপস্থিতি এবং তাদের প্রান ঢালা আবেগ উচ্ছাসে অনুপ্রানিত হয়ে ৬০ এর দশক থেকেই পবিত্র কুরআন প্রচারকে আমার জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করে নিয়েছি। সেই থেকে এটিই আমার প্রধান পরিচয় যে, আমি মহাগ্রন্থ আল-কোরআন এর প্রচারক, সত্য দ্বীনের প্রচারক, মানুষকে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশিত পথে, চির শান্তির মহাসড়কে যোগদানের জন্য একজন আহবানকারী।
আমার পবিত্র কুরআনের খেদমতের সাক্ষী ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের সবুজ শ্যামল, স্বাধীন-স্বার্বভৌম এই বাংলাদেশ। মূলত ১৯৭৪ থেকে আমার তাফসীর মাহফিল সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়। প্রতি বছর ধারাবাহিকভাবে আমি তাফসীর মাহফিল করেছি দেশের বিভিন্ন শহরে। এর মধ্যে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তাফসীর মাহফিল এর কথা আমি উল্লেখ করছি: 

-চট্টগ্রাম প্যারেড গ্রাউন্ড ময়দানে প্রতি বছর ৫ দিন করে টানা ২৯ বছর। পবিত্র কাবা শরীফের সম্মানিত ইমাম এ মাহফিলে দু’বার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 

-খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দান সহ শহরের বিভিন্ন মাঠে প্রতি বছর ২ দিন করে ৩৮ বছর

-সিলেট সরকারী আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে টানা ৩৩ বছর

-রাজশাহী সরকারী মাদ্রাসা মাঠে প্রতি বছর ৩ দিন করে এক টানা ৩৫ বছর

-বগুড়া শহরে প্রতি বছর ২ দিন করে একটানা ২৫ বছর

-ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে ময়দান, মতিঝিল হাই স্কুল মাঠ ও পল্টন ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে একটানা ৩৪ বছর

-ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত বায়তুল মোকররম মসজিদ প্রাঙ্গনে সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে প্রধান বক্তা হিসেবে টানা ২০ বছর। এসব মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতেন তদানিন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতি।

-এই হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গনে ৭০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ধারাবাহিক ৪/৫ বছর মাহফিল করেছি, যেখানে সভাপতিত্ব করেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, অংশগ্রহণ করেছেন অন্যান্য বিচারক মন্ডলী 

-পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা স্টেডিয়াম, পাবনা পলিটেকনিক ইন: ময়দানসহ বিভিন্ন মাঠে প্রতি ৩ দিন করে টানা ৩৭ বছর

-কুমিল্লা পাবলিক লাইব্রেরী ময়দান ও ঈদগাহ ময়দানে প্রতি বছর ৩ দিন করে টানা ২৮ বছর


-বরিশাল স্টেডিয়াম ও পরেশ সাগর ময়দান, ঝালকাঠী স্টেডিয়াম ময়দান ও পিরোজপুর সরকারী হাইস্কুল ও স্টেডিয়াম ময়দানে প্রতি বছর ২ দিন করে ২৬ বছর
এতদ্ব্যতীত বাংলাদেশের এমন কোন জেলা বা উপজেলা নেই সেখানে আমার মাহফিল হয়নি। উল্লেখযোগ্য শহর গুলোর মাহফিলের কোন কোনটিতে উপস্থিত থাকতেন দেশের রাষ্ট্রপতি, সেনা প্রধান, বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, সংসদের স্পীকার, মন্ত্রী, এম.পি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ।

অথচ মাননীয় আদালত, প্রসিকিউশনের দাবী আমি নাকি মহান স্বাধীনতা অর্জনের পর পালিয়ে ছিলাম। মিথ্যচারেরও তো একটা সীমা থাকে!! তদন্ত কর্মকর্তা যাই রিপোর্ট করেছে প্রসিকিউশন সেটাকেই বেদবাক্য মনে করে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঈমান বিসর্জন দিয়ে সমস্ত মেধা প্রজ্ঞা খাটিয়ে মিথ্যাকে সত্য বানাবার জন্য প্রানান্ত হয়েছেন, আফসোস। নিশ্চয়ই এ মিথ্যাচারের জন্য ইহকালে এবং কঠিন হাশরের ময়দানে প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থাকে চড়া মূল্য দিতে হবে ইনশাআল্লাহ, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
মাননীয় আদালত, 


পরিশেষে বলতে চাই, আমি আমার সারা জীবন নাস্তিক্যবাদী ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে কোরআন ও হাদীসের আলোকে বক্তব্য দিয়ে এসেছি। আমার মাহফিলে জনতার ঢল নামে। আমার মাহফিলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ কিচ্ছা-কাহিনী শুনতে আসেনা। কোরআনের দাওয়াত ও রাসুল (সাঃ) এর জীবনাদর্শ জানতে আসেন। আল্লাহর স্বার্বভৌমত্ব ও একত্ববাদ এবং কোরআনের বিপ্লবী দাওয়াত প্রচারে আমি অকুন্ঠ চিত্ত। আমার এ দেহে প্রান থাকা পর্যন্ত এটিই আমার দৃঢ় অবস্থান। এর কোন হেরফের হবার নয়। সরকার এটি অবগত বিধায় তাদের ইসলাম বিদ্বেষী মিশন বাস্তবায়নে আমাকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত কওে আমাকে বিতর্কিত ও জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন করার এবং নিশ্চিহ্ন করার জন্যই আমার বিরুদ্ধে তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উত্থপন করেছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকা কালে কিংবা ৭২ থেকে ৭৫ মেয়াদকালে ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ইসলাম বিদ্বেষী বর্তমান অবস্থান ছিলনা বিধায় আমাকে তারা মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার কারণ খুঁেজ পায়নি। কিন্তু এবার ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদীদের সাথে আওয়ামী লীগ জোট বেঁধে সরকার আমাকে মানবতা বিরোধী অপরাধের মহানায়ক হিসেবে আবিস্কার করেছে।

মাননীয় আদলত,


১৯৯০ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিবছর রমযান মাসে পবিত্র মক্কা মদীনায় থাকা আমার বার্ষিক রুটিনে পরিণত হয়েছিল। রুটিন মাফিক রমযান মাসে ২০০৯ সালে আমি ওমরাহ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলে বর্তমান সরকার আমাকে মক্কা শরীফ যেতে দিল না। হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্টের রায় পাওয়ার পরও আমাকে যেতে দেয়া হয়নি। আমাকে বিদেশ যেতে আটকে দেয়ার জন্য পবিত্র রমযান মাসে দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪২ বছর পর পিরোজপুরে প্রথম বারের মত আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধসহ ২টা খুনের মামলা দায়ের করা হলো। রমযান মাসে পবিত্র মক্কা মদীনা যেতে না পেরে আমি মানসিক যন্ত্রনায় অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।


আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত মেহেরবানীতে পবিত্র হজ্জের মাত্র দু’সপ্তাহ পূর্বে সৌদী বাদশাহ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজীজ আমাকে রাজকীয় মেহমান হিসেবে হজ পালনের জন্য দাওয়াত পত্র ও যাতায়াতের টিকেট পাঠালেন। আমি দু’টা খুনের মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে হজ্জ পালনে মক্কা শরীফ পৌঁছলাম। হজ্জের দু’দিন পরে মীনা কিং প্যালেস বাদশাহ লাঞ্চের দাওয়াত দিলেন। বাদশাহর সাথে করমর্দন হলো, কুশল বিনিময় হলো, পাশাপাশি টেবিলে খানা খেলাম। আমার মনে কোন দূর্বলতা থাকলে আমার জন্য এটা খুবই সহজ ছিলো যে, বাদশাহকে বলে সৌদী আরবে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়া। কিন্তু মাননীয় আদালত, আমি তা করি নাই। হজ্জের সকল কাজ সমাধা করে দেশে ফিরে এসেছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো আমার দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। মাননীয় বিচারপতিগণ কারো নির্দেশে বা চাপে পড়ে অথবা আদর্শিক শত্রু ভেবে কারো প্রতি অবিচার করবেন না। তাঁরা আল্লাহ তায়ালা এবং নিজের সুস্থ বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই সিদ্ধান্ত নেবেন। মাননীয় আদালত, আমি আমার সে বিশ্বাস হারাতে চাই না।

মাননীয় আদালত,


স্কাইপি ষড়যন্ত্র ধরা পড়ে যাওয়ার পরে এই বিচারের উপর দেশবাসীর মতো আমার আস্থাও শুন্যের কোঠায়। তথাপি পূর্নগঠিত এই ট্রাইব্যুনালের মাননীয় বিচারপতিগন শুধুমাত্র ও একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নিকট দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহীতার অনুভূতি থেকে আপনারা আপনাদের সুবিবেচনা ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে এই মামলা নিষ্পত্তি করবেন, এই বিষয়ে আমি আশাবাদি হতে চাই, আস্থাশীল হতে চাই। বর্তমান সরকার ও সরকারীদল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাকে তাদের বিশাল প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের সকল ক্ষমতার অপব্যবহার করে, যুদ্ধাপরাধের কল্পকাহিনী তৈরী করে কোন এক দেলোয়ার শিকদারের অপরাধের দায় আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাকে আজ আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আমি একজন ব্যক্তি মাত্র। আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং মিথ্যাচার একাকার হয়ে গিয়ে আমার জন্য যে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির আবহ সৃষ্টি করেছে তা উপলদ্ধি করা কিংবা মোকাবিলা করার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই।
মাননীয় আদালত, 


আমি আজ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেপরোয়া যথেচ্ছাচার এবং তা বাস্তবায়নের এক আগ্রাসী মিথ্যাচারের শিকার। আপনাদের এই মহান আদালত রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমি ব্যক্তি সাঈদীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য তথা ন্যায় বিচার করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ। আমি আপনাদের সেই শপথ ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে আস্থাশীল থাকতে চাই।

সবশেষে আবারও রাজাধিরাজ, সম্রাটের সম্রাট, সকল বিচারপতির মহা বিচারপতি আকাশও জমীনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি, মহান আরশের মালিক, সৃষ্টিকূলের ¯্রষ্টা, সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নামে শপথ করে বলছি, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন মানবতা বিরোধী অপরাধ আমি করি নাই। আমার বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চারিতার্থ করার জন্য এবং আমাকে তাদের আদর্শিক শত্রু মনে করে সরকার কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে আমার বিরুদ্ধে শতাব্দীর জঘন্য ও নিকৃষ্টতম মিথ্যা এ মামলা পরিচালনা করেছেন। তাদের বর্নিত জঘন্য মিথ্যাচার সত্য হলে আমার মমতাময়ী মায়ের ইন্তেকালের পরে তার জানাযা এবং এর ঠিক ৮ মাস পরেই আমার জৈষ্ঠ্য সন্তান রাফীক বিন সাঈদীর নামাজে জানাযায় ঢাকা, খুলনা ও পিরোজপুরে লক্ষ মানুষের সমাগম হতোনা, জানাযায় মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নিতেন না। আমার মা ও ছেলের লাশ গোপনে গভীর রাতে ৫/১০ জন লোক নিয়ে জানাযা করে দাফন করতে হতো। মাননীয় আদালত, আমার বড় ছেলের ইন্তেকালের খবর শুনে মহান মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার, এই মামলার সরকার পক্ষের কথিত স্বাক্ষী মেজর জিয়া উদ্দীন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর শাহজাহান ওমর বীর প্রতীক আমার শহীদবাগের বাসায় গিয়ে আমার পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দিয়েছেন, ঘন্টাকাল আমার বাসায় অবস্থান করেছেন। সরকারের নীল নকশা অনুযায়ী মিথ্যাবাদী তদন্ত কর্মকর্তা চিত্রিত রাজাকার ও দূর্র্ধষ যুদ্ধাপরাধী যদি আমি হতাম, তাহলে উনাদের মত সম্মানীত মুক্তিযোদ্ধাদের আমার বাসায় যাওয়ার প্রশ্নই উঠতো না।
আমি আমার এলাকায় ৩টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছি। এতে স্বনামখ্যাত অন্তত: ২০/২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে নির্বাচনে জেতাবার জন্য দিনরাত নি:স্বার্থ পরিশ্রম করেছেন, গোটা পিরোজপুর বাসী এর স্বাক্ষী। তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য সত্য হলে এসব বীর মুক্তিযোদ্ধা তাদের মান মর্যাদা ধূলায় ধুসরিত করে আমার সাথে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে নির্বাচনী পরিশ্রম করতেন? হিন্দু সম্প্রদায় দায়ের লোকেরা আমাকে ভোট দিতেন?

মাননীয় আদালত,

আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ! আমার বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা, তার সহযোগী প্রসিকিউশন এবং মিথ্যা স্বাক্ষ্যদাতাদের হেদায়েত করো আর হেদায়েত তাদের নসীবে না থাকলে তাদের সকলকে শারিরিক, মানসিক ও পারিবারিকভাবে সে রকম অশান্তির আগুনে দগ্ধিভুত করো যেমনটি আমাকে, আমার পরিবারকে এবং বিশ্বব্যাপি আমার অগনিত ভক্তবৃন্দকে মানসিক যন্ত্রনা দিয়েছে। আর জাহান্নাম করো তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা।


হে মহান রাব্বুল আলামীন! এই আদালতের বিচারক মন্ডলীকে তোমাকে ভয় করে, পরকালের কঠিন শাস্তিকে ভয় করে, সকল প্রকার চাপ এবং কারো নির্দেশ পালন বা কাউকে খুশী করার উর্ধ্বে উঠে শুধু তোমাকে ভয় করে এবং বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে ন্যায় বিচার করার তওফিক দান করো।
মাননীয় আদালত
আমি আমার সকল বিষয় সেই মহান আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি, যিনি আমার কর্ম বিধায়ক এবং তাঁকেই আমি আমার একমাত্র অভিভাবক হিসেবে গ্রহন করেছি। সাহায্যকারী হিসেবে মহান আরশের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন-ই আমার জন্য যথেষ্ট।


মাননীয় আদালত, আমাকে কিছু কথা বলতে দেয়ায় আপনাদেরকে ধন্যবাদ।

বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০১৫

শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদকে যেভাবে বিদায় দিয়ে আসলাম....


(আমার ব্যক্তিগত  কৃতজ্ঞতাঃ যদিও লেখাটি আমার নামে প্রকাশিত হচ্ছে তবে মুল লেখনি আমার নয় ।  আমার ভুমিকা এখানে অনেকটা সংকলনের ।
আমরা যারা শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদকে শেষ বারের মত দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, তারা সকলেই একমত হয়েছি যে এই সাক্ষাতটি লিপিবদ্ধ হওয়া দরকার । তবে সেদিনের সেই ঘটনাটি যেহেতু মানসিকভাবে প্রত্যেকের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে, তাই কারও মনেই এককভাবে পুরো ঘটনাটির স্মৃতিচারন করা দু:সাধ্য ছিল । সেই পরিপ্রেক্ষিতে শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদের গোটা পরিবার বিশেষ করে আমার মা, বোন, বোন-জামাই, দুই ভাই, ভাবীরা সকলেই এবং ছোট চাচা কয়েকদফা বসে এই লেখাটি চুড়ান্ত করেছি । আমরা চেষ্টা করেছি সেদিন যা ঘটেছে বা শহীদ আলী আহসান মো: মুজাহিদ পরিবারের সদস্যদের সাথে শেষ সাক্ষাতে যা বলেছেন, যেই ভাষায় বলেছেন তাই লিপিবদ্ধ করতে । এই চেষ্টার সফল বাস্তবায়নে উপরোক্ত সকলের ভুমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করছি) । ★ Ali Ahmad Mubrur
২১ নভেম্বর রাত ৮টা । আমি তখন পুরানা পল্টনস্থ আইনজীবীদের চেম্বারে । পরিবারের বাকি সবাই উত্তরাস্থ বাসভবনে । হঠাৎ বাসা থেকে ফোন- আমাদেরকে মানে পরিবারকে নাকি শেষ সাক্ষাতের জন্য যেতে বলেছে । ডেপুটি জেলার শিরিন আমার বড় ভাই আলী আহমেদ তাজদীদকে ফোন দিয়ে রাত ৯টার মধ্যে কারাগারে পৌছতে বলেছে । আমি সাথে সাথে তাদেরকে বললাম, আমি তো কাছেই আছি । আপনারা জলদি বের হন । আমি সাথে সাথে সংগঠনের সবাইকে অবহিত করলাম এবং তাদের কাছ থেকে কিছু জানার চেষ্টা করলাম; শেষ সাক্ষাত কোন পরামর্শ আছে কিনা । আইনজীবীদেরকেও জানালাম । তারপর অযু করে কারাগারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম ।
আমাদের পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের মোট ২৫জন সদস্য সেদিন কারাগারে গিয়েছিলাম ।  রাত ১১টার দিকে আমরা সেখানে পৌছাই । ঢোকার পরে প্রয়োজনীয় তল্লাশী শেষে রাত ১১-২০ মিনিটে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামীদের সেল রজনীগন্ধায় পৌছাই । রজনীগন্ধায় সেলের একেবারে ডানকোনায় ৮ নং সেলে আব্বা থাকছেন । এর আগেও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা ও শহীদ মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানও সেই ঘরটিতেই ছিলেন । আমরা গত কয়েকমাসেও সেখানেই আব্বার সাথে সাক্ষাত করেছি । আমার আগে আব্বার এক নাতি, আমার আম্মা আর বোন আব্বার ঘরে পৌছান । আমি ৪ নম্বর ব্যক্তি হিসেবে পৌছাই, সাথে অন্যরাও । আমি ধারনা করেছিলাম, যেহেতু এত লোক যাচ্ছি শেষ সাক্ষাত । আব্বা হয়তো আমাদের জন্য তৈরী হয়ে বসে থাকবেন । কিন্তু আমরা রুমের বাইরের করিডোরে বা রুমের ভেতরে দাঁড়ানো কোন অবস্থাতেই আব্বাকে পেলাম না । ভেতরে তাকিয়ে দেখি, আব্বা শুয়ে আছেন । পরে বুঝলাম গভীর ঘুমে আছেন । ডান দিকে কাত হয়ে গালের নীচে হাত দিয়ে সবসময় যেভাবে ঘুমাতে দেখেছি সেভাবেই তিনি ঘুমাচ্ছেন । গায়ের উপর কাঁথা নেই, ছোট রুমের মাটিতে জায়নামাজের উপর শুয়ে আছেন । মাথার নীচে কোন বালিশও নেই । আমার বোন, আমরা সবাই আব্বা আব্বা বলে ডাকছি । আর আমার ভাইয়ের ছেলেরা ডাকছে দাদা দাদা বলে । কিন্তু আব্বার কোন সাড়া নেই । যেন ঘুমের সাগরে তলিয়ে আছেন তিনি । এভাবে প্রায় মিনিট খানেক ডাকাডাকির পর আব্বা একটু গুঙ্গিয়ে বললেন, কে কে আব্বা বলে ? তারপর আমাদের দেখে বললেন, ও তোমরা আসছো । এত রাতে কি ব্যাপার ? তোমাদের কি কারা কর্তৃপক্ষ ডেকেছে ? এটা কি শেষ সাক্ষাত ? ততক্ষনে তিনি উঠে বসেছেন । আমাকে তো জেল কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি । তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ । কিছুটা সময় তিনি বসেই থাকলেন । মনে হলো গভীর ঘুম থেকে উঠার জন্য, পাশাপাশি আমাদের উদ্দেশ্যে তার দিক নির্দেশনাগুলো গুছানোর জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইছেন ।
আমরা তাকে উত্তর দিলাম, জ্বী আব্বা, আমরা আমাদের শহীদ হতে যাওয়া বাবার কাছে আসছি । আমরা আমাদের গর্বের ধনের কাছে আসছি । আমার বোন বললো, আমরা আমাদের মর্যাদাবান পিতার সাথে দেখা করতে এসেছি । আমাদেরকে ওরা আজ শেষ বারের জন্য আপনাকে দেখার জন্য ডেকেছে । তিনি এভাবে বসে থাকলেন কিছুক্ষন । বসে বসেই আমাদের কথা শুনলেন । আম্মা বললেন, উঠে আসো । সব শুনে তিনি বললেন ও আচ্ছা, আলহামদুলিল্লাহ । কিছুক্ষন পর তিনি উঠলেন, দাঁড়ালেন । ফিরোজা রং এর গেঞ্জী, সাদা নীলের স্ট্রাইপ পড়া পায়জামা পড়ে ছিলেন তিনি । কিছুক্ষন স্যান্ডেল খুজলেন । পরে খুজে পেয়ে স্যান্ডেল পড়ে আমাদের সামনে দাঁড়ালেন । বললেন কে কে আসছো, কয়জন, আমিই একটু দেখি (সেই সময় লাইটের আলো কম থাকায় ভেতর দিকে ভাল দেখা যাচ্ছিলো না । সেলের লোহার দরজার বাইরে নেটের দরজা দিয়ে লাগানো ছিল । পরে আমার বড় ভাই সেই দরজাটি খুলে দিলেন । আমরা পরিবারের সদস্যরা আগে একে একে সালাম দিলাম, তারপর আত্মীয়রা । আমার বড় ভাইরা প্রত্যেকের নাম বলে দিচ্ছিলেন যে, যে কারা সেদিন সাক্ষাতে গিয়েছিল । কিন্তু আব্বা বললেন দাড়াও আমিই দেখে নেই । তারপর সবাই একটু জোরে নীজেদের নাম বলে উপস্থিতি জানান দিলেন । কিন্তু আব্বা আলাদা আলাদা করে প্রত্যেককে কাছে ডেকে তাদের সাথে হাত মিলাতে শুরু করলেন । একে একে সবাই শিকের ভেতর দিয়ে হাত মেলালেন । প্রত্যেকটা মানুষের সাথে তিনি তাদের খোজঁ খবর নিলেন । যার যা সমস্যা সেটা নিয়েই তিনি আলাপ করলেন । প্রত্যেকে সেল দিয়ে বের হয়ে থাকা তার দুটি হাত ছুয়ে সালাম দিলেন । কেউ বা চুমু দিলেন । শেষ করে বললেন, কারও সাথে মুসাবাহ করা বাদ যায়নি তো ? 
আব্বা দাঁড়ানোর পর আমি নিজ থেকেই একটা সূচনা বক্তব্য দিলাম । বললাম আব্বা আপনি শহীদ হতে যাচ্ছেন । আপনি এর মাধ্যমে নিজেকে ও আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানীত করে যাচ্ছেন । আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতেও সম্মানীত করেছেন, আখিরাতেও সম্মানীত করতে যাচ্ছেন ।অতএব মোটেও দুশ্চিন্তা করবেননা । আপনাকে আপনার আব্বা, আমার দাদা মরহুম মাওলানা আব্দুল আলী ইসলামী আন্দোলনের জন্য ওয়াকফ করে গেছেন । আমি মনে করি এরকম একজন ওয়াকফ হওয়া মানুষের সর্বোত্তম ইতি আজ হতে যাচ্ছে । কেননা আপনি আপনার ছাত্র জীবন, যৌবন, মাঝবয়স সব আন্দোলনের জন্য ব্যায় করে এখন দ্বীন কায়েমের জন্য গলায় ফাঁসির দড়ি নিচ্ছেন । আপনার শাহাদাতে সবচেয়ে খুশী হবেন আপনার পিতা মরহুম মাওলানা আব্দুল আলী । কেননা আপনি তার রেখে যাওয়া ওয়াদা অনুযায়ী জীবন যাপন করে আজ দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে যাচ্ছেন ।
আব্বা, সেলের দরজায় স্বভাবসুলভ ভংগিতে লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়েছেন । এরপর তিনি প্রথম শব্দ করলেন আলহামদুল্লিাহ । প্রথম কথা বললেন, তোমরা জেনে রাখ, কারা কর্তৃপক্ষ এখনও পর্যন্ত আমাকে জানায়নি যে তারা আজ আমার ফাঁসি কার্যকর করতে যাচ্ছে । এটা কত বড় জুলম ?  তখন একটা আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতে যাচ্ছিল । কিন্তু আব্বা বললেন, কান্নাকাটির দরকার নেই । আমি কিছু কথা বলবো ।
এরপর তিনি অত্যন্ত স্বভাবসুলভ তেজদীপ্ত বলিষ্ঠ কন্ঠে, মাথা উচু করে অনেকটা ভাষনের ভংগিমায় শুরু করলেন, নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারীম । উপস্থিত অন্যরা তখনও একটু আবেগ প্রকাশ করছিল, আব্বা আবারও বললেন নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসুলিহিল কারীম । আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, আসসালাতু আসসালামু আলা সাইয়্যেদুল মুরসালীন । ওয়ালা আলিহী ওয়া সাহবিহী আজমাইন । আম্মা বা’আদ । আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া । জেল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ যে তারা এই সাক্ষাতের সুযোগ করে দিয়েছেন । জেল কর্তৃপক্ষ আসলে অসহায় । তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এই পর্যন্ত আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছেন এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছেন । তারা আমাকে একটি লিখিত আবেদনের জন্য যথেষ্ট পীড়াপীড়ি করেন এবং বলেন এটা না হলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে । এক পর্যায়ে তারা বলেন, আপনার যা বক্তব্য আছে তাই লিখে দেন । আর সেই কারনেই এটা বলার পর আমি কনসিকুয়েন্স বুঝেও আমি তাদের সুবিধার জন্য একটি লিখিত আবেদন দিয়েছি ।
আমি প্রশ্ন করলাম, আব্বু আপনি ঐ চিঠিতে আসলে কি লিখেছেন ?
উত্তরে তিনি বললেন, আমি রাষ্ট্রপতিকে লিখেছি, আইসিটি এ্যাক্ট, যদিও এটা অবৈধ ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তারপরও এই বিচারের সময় আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সীমিত সুযোগ দেয়া হয়েছে । আমার ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইন, সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য ছিলনা । সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে ।
আমাকে ট্রাইবুনাল ৬ নং চার্জে মৃত্যুদন্ড দেয়নি । তারা চার্জ ১ কে চার্জ ৬ এর সাথে মিলিয়ে চার্জ ৬ এ মৃত্যুদন্ড দিয়েছে । আপীল বিভাগ আমাকে চার্জ  ১ থেকে বেকসুর খালাস দিয়েছে ।  চার্জ ৬ এ তারা আমার মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছে । অথচ ট্রাইবুনাল শুধু চার্জ ৬ এর জন্য আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়নি । এই চার্জে স্বাক্ষী মাত্র একজন । সে বলেনি, যে কোন বুদ্ধিজীবিকে আমি হত্যা করেছি । কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারের সন্তানও এসে বলেনি যে আমি কোন বুদ্ধিজীবিকে মেরেছি । এবং কোন বুদ্ধিজীবি পরিবারও আমার রায়ের পরও দাবী করেনি যে তারা তার পিতা হত্যার বিচার পেয়েছেন । আমার অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে যে আমি নাকি আর্মী অফিসারদের সাথে বসে পরামর্শ দিয়েছি । কিন্তু যে স্বাক্ষী এসেছে সেও বলেনি যে আমি কবে কোন আর্মি অফিসারের সাথে কোথায় বসে এই পরামর্শ করলাম ?
স্বাক্ষী বলেছে আমাকে, নিজামী সাহেব ও অধ্যাপক গোলাম আযমকে দেখেছে । সে আমাদের চিনতো না । পরে আমাদের নাম শুনেছে । অথচ এই অভিযোগটি গোলাম আযমের সাহেবের বিরুদ্ধে আনাই হয়নি । নিজামী ভাইকে যাবজ্জীবন দিয়ে শুধু আমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে । আমি নিশ্চিত যে আমার মৃত্যুদন্ডের রায় কনফার্ম করে তারপর আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করা হয়েছে । (আমরা সকলে তখন চিৎকার করে বললাম শেম)
আমাকে আমার পরিবার, সংগঠন ও দেশবাসীর কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য, কাপুরুষ প্রমান করার জন্য দিনভর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মিথ্যাচারের নাটক করা হয়েছে । এই জালিম সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই আসেনা । (এই সময় তার কন্ঠে প্রচন্ড রাগ ও ক্ষোভের সুর প্রকাশ পায়) । আমি নির্দোষ, নির্দোষ এবং নির্দোষ । আমাদের আজ তারা অন্যায় ভাবে হত্যা করতে যাচ্ছে । কত বড় স্পর্ধা তাদের যে তারা মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করার দাবী করে । অথচ তাদের নিজেদের ভেতর মানবতা নেই । তারা ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষকে মধ্যরাতে তুলে তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বলে এই তাদের শেষ সাক্ষাত এবং এরপরও তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হবে ।
তারা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত লোককেও একইভাবে মাঝরাতে তুলে তার পরিবারের সাথে সাক্ষাতের জন্য ডেকেছে । এটা কেমন মানবতা ? আমার মত তিনিও বিচারিক প্রক্রিয়ার যাবতীয় ত্রুটি ও অসংগতি নিয়ে ইংরেজীতে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখেছেন ।
তোমরা শুনে রাখো, তোমরা চলে যাওয়ার পর আজ যদি আমার ফাঁসি কার্যকর করা হয় তাহলে তা হবে ঠান্ডা মাথায় একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা । তোমরা প্রতিহিংসাপরায়ন হবানা । তোমাদের কিছুই করতে হবেনা । আজ আমার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার পর এই অন্যায় বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকের বিচার আল্লাহর দরবারে শুরু হয়ে যাবে, বিচার শুরু হয়ে গেছে । তোমাদের কারও কিছু করতে হবেনা ।
তোমাদেরকে আজ আমি আমার সত্যিকারের জন্ম তারিখ বলি । আমাদের সময় জন্মতারিখ সঠিকভাবে লিখা হতোনা । আমাদের শিক্ষকেরাই ছাত্রদের জন্ম তারিখ বসিয়ে দিতেন । আমার সত্যিকারের জন্ম তারিখ বলি । আমার জন্ম ১৪ আগষ্ট, ১৯৪৭, ২৭ রমজান । আমার চেয়ে শেখ হাসিনা মাত্র ১ মাসের ছোট । সে আমাকে ভালভাবেই চিনে । সে ভাল করেই জানে আমি কোন অন্যায় করিনি কেননা তার সাথে সাথে আমার দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস ।
আমি পবিত্র মক্কা নগরীতে ওমরাহ করেছি অসংখ্যবার । আর আল্লাহর রহমতে হজ্ব করেছি ৭ থেকে ৮ বার । আমার বাবার কবর পবিত্র নগরী মক্কায় জান্নাতুল মাওয়াতে । সেখানে তার কবর উম্মুল মুমেনীন খাদিজার (রা:) পাশে, বেশ কয়েকজন সাহাবীর কবর আছে আলাদা ঘেরাও করা, তার ঠিক পাশে । এখানে অনেক নবী রাসুলদের কবরও আছে । আমি এই পর্যন্ত যতবার ওমরাহ করেছি, যাদেরকেই সাথে নিয়েছি তাদের প্রত্যেককেই সেই কবর দেখানোর চেষ্টা করেছি । ছোট ভাই আলী আকরাম মো: ওজায়ের তখন স্বাক্ষ্য বললেন, নয়া ভাই, আমাকেও আপনি নিয়ে গেছেন । (উল্লেখ্য আব্বার সব ভাই-বোনেরা তাকে নয়া ভাই বলেন । ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় চতুর্থ ভাইকে নয়া ভাই বলা হয়) । আব্বা আবার বললেন, আমার তো ইচ্ছা হয়, আব্বার পাশে গিয়ে আমি থাকি, (একটু হেসে বলেন) তবে এখন সেটা বললে তো জেল প্রশাসন একটু বিপদে পড়েই যাবে । যাক এই ব্যাপারে আমি তো আমার বড় ছেলেকে দায়িত্ব দিয়েছি, সেই সবার সাথে আলাপ করে ঠিক করে নেবে । সেটাই ঠিক বলে মনে করি ।
এর মাঝেই মেঝ ছেলে তাহকীককে ডিউটিরত ডেপুটি জেলার বারবার সময় নিয়ে ইংগিত করছিল । আমার মেঝ ভাই তাই আব্বাকে জানায় যে, আর ৫ মিনিট সময় আছে । জেল প্রশাসন তাই বলছে । আব্বা তখন তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনারা আমাকে চিনেন । জানেন । দেখেছেনও । আজকে আমি আপনাদের কাছ থেকে আরেকটু মানবিক আচরন আশা করি । আমি আমার জরুরী কথা হয়ে গেলে ১ মিনিটও বেশী নিবোনা ।
তখন উপস্থিত সুবেদার জানান, স্যার আমরা স্বাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আমাদের সহযোগিতা করেছেন সব সময়, আমরাও আপনার সম্মান রাখার চেষ্টা করেছি ।
এর পর আব্বা আবার শুরু করলেন, এখানে আমার সন্তানেরা আছো । এখন আমি আমার পরিবারের জন্য কিছু কথা বলবো ।
তোমরা নামাজের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস থাকবা ।
তোমরা সব সময় হালাল রুজির উপর থাকবা । কষ্ট হলেও হালাল রুজির উপর থাকবা । আমি ৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম, ফুল কেবিনেট মন্ত্রী ছিলাম । আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে, আল্লাহর রহমতে আমি সেখানে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে, পরিশ্রম করে আমার দায়িত¦ পালন করেছি । কেউ আমার ব্যপারে বলতে পারবেনা যে আমি অন্যায় করেছি । অনেক দুর্নীতির মধ্যে থেকেও আমার এই পেটে (নিজের শরীরের দিকে ইংগিত করে) এক টাকার হারামও যায়নি । তোমরাও হালাল পথে থাকবা । তাতে একটু কষ্ট হলেও আল্লাহ বরকত দিবেন ।
 আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে মিলে মিশে চলবে । আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই নামাজ পড়বে, অনেকেই কম । কেউ কেউ হালাল উপার্জনের ব্যপারে অত্যধিক কড়া হবে আবার কেউ কেউ একটু দুর্বল থাকবে । শরীয়তে দুই রকম । আজিমাত এবং রুকসাত । আজিমাত হলো খুবই কড়া, কোন অবস্থাতেই সে হারামের কাছে যাবেনা । আর রুকসাত হলো পরিবেশ ও পরিস্থিতির জন্য একটু ঢিল দেবে । তাই আত্মীয়দের মধ্যে কারও আয়ে সমস্যা থাকবে, কারও নামাজে দুবর্লতা থাকবে । তাই আমাদের দায়িত্ব হলো তাদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য সবার সাথে সম্পর্ক ঠিক রেখে মিলে মিশে চলা । আমি সব সময় এভাবে চলেছি এবং তাতে ভাল ফল পেয়েছি । হাদীসে আছে, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা ।
প্রতিবেশীর হক আদায় করবে । আমার ঢাকার বাসা, ফরিদপুরের বাড়ীর প্রতিবেশীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে ।  আমার উত্তরার বাসার ব্যাপারে তো আমি আগেই লিখে দিয়েছি । মৌলিক কোন চেঞ্জ দরকার নেই । শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তোমরা সুবিধা মতো এদিক ওদিক চেঞ্জ করে নিও । ফরিদপুরের বাড়ী নিয়েও যেভাবে বলে দিয়েছি, সেভাবেই তোমরা কাজ করবে । আমরা ভাই ভাইদের মধ্যে কোন সম্পত্তি নিয়ে কখনো ঝামেলা হয়নাই । তোমরাও মিলেমিশে থাকবে । এসব নিয়ে কোন সমস্যা করবানা । শান্তির জন্য কাউকে যদি এক হাত ছাড়তেও হয়, তাও কোন ঝামেলা করবেনা, মেনে নিবে ।
বেশী বেশী করে রাসুল (সা) এর জীবনী ও সাহাবীদের জীবনী পড়বে । আমি জানি তোমরা পড়েছো, কিন্তু তাও বার বার পড়বে । বিশেষ করে পয়গম্বর-এ-মোহাম্মাদী, মানবতার বন্ধু হযরত মোহাম্মাদ (সা:), সীরাতে সারওয়ারে আলম, সীরাতুন্নবী, সীরাতে ইবনে হিশাম, রাসুলুল্লাহর বিপ্লবী জীবন । আর সাহাবীদের জীবনীর উপরও ভাল বই আছে । আগে পড়েছো জানি, তাও তোমরা পড়ে নিও ।

আমি আমার সন্তানদের উপর সন্তুষ্ট । তোমাদের ভুমিকার ব্যপারে সন্তুষ্ট । 
দেখো আমি এখানে পেপার পত্রিকা নিয়মিত পাইনা । তারপরও আমি যা চাই, যা ভাবি তোমরা তা করে ফেলো । যেমন আজকের সকালের প্রেস কনফারেন্স । এটা অনেক ভাল হয়েছে । আমাকে ছাড়াই তোমরা যে পরামর্শ করে এত সুন্দর একটা কাজ করে ফেলেছো, তাতে আমি অনেক খুশী হয়েছি । আসলে হৃদয়ের একটা টান আছে । আমি এখান থেকে যা ভাবি তোমরা কিভাবে যেন তাই করে ফেলো । তোমরা এভাবেই বুদ্ধি করে মিলে মিশে পরামর্শ করে কাজ করবে ।

আইনজীবীদেরকে আমার ধন্যবাদ ও দোয়া দেবে । তারা অনেক পরিশ্রম করেছেন । তাদের ভুমিকার ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট । আইনজীবীরা যেভাবে পরিশ্রম করেছে, অবিশ্বাস্য । ওনারা যদি টাকা নিতো তাহলে ৫-১০ কোটি টাকার কম হতোনা । কিন্তু তারা অলমোস্ট বিনা পয়সায় তারা সাহসিকতার সাথে এই আইনী লড়াই চালিয়ে গেছেন ।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মত এত বড় নেয়ামত দুনিয়াতে আর একটিও নেই । আমার জানা মতে এই সংগঠন দুটি পৃথিবীর মধ্যে সেরা সংগঠন । এই সংগঠনের ব্যপারে আমি সন্তুষ্ট । গত কয়েক বছরে অনেক নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, আমার মত জেলখানায় আছে কয়েক হাজার মানুষ । বিশেষ করে ইসলামী ছাত্রশিবির বিগত ৫ বছরে যে ভুমিকা রেখেছে, যে স্যাক্রিফাইস করেছে তা অতুলনীয় । আমার শাহাদাত এই দেশে ইসলামী আন্দোলনকে সহস্ত্রগুন বেগবান করবে এবং এর মাধ্যমে জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ ।
তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে যারা স্বাক্ষী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুইজন ছাড়া বাকি সবাই দরিদ্র । তারা মূলত অভাবের তাড়নায় এবং বিপদে পড়ে মিথ্যা স্বাক্ষ্য দিতে বাধ্য হয়েছেন । আমি তাদের সবাইকে মাফ করে দিলাম, তোমরাও কোন ক্ষোভ রাখবানা ।
তোমাদের আম্মাকে দেখে শুনে রাখবে । সে আমার চেয়ে ভাল মুসলমান, ভাল মনের মানুষ । এই ব্যাপারে আমি স্বাক্ষ্য দিচ্ছি । তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে তার সম্মানীত শ্বশুড়-শাশুড়ীকে স্মরন করেন । শাশুড়ী সেখানে উপস্থিত ছিলেন । তিনি বলেণ শ্বাশুড়ী তো মায়ের মতই । আপনি আমাকে যেভাবে স্নেহ করেছেন, তার কোন তুলনা হয়না । তারপর তিনি বললেন, আমার জানা মতে শহীদের মৃত্যুতে কষ্টের হয়না । তোমরা দোয়া করবে যাতে আমার মৃত্যু আসানের সাথে হয় । আমাকে যেন আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা পাহাড়া দিয়ে নিয়ে যান ।
এরপর তিনি উপস্থিত সবাইকে নিয়ে দোয়া করেন । মুনাজাতের মধ্যে তিনি জালিমের ধ্বংস চেয়েছেন । পরিবারের জন্য আল্লাহকে অভিভাবক বানিয়েছেন । তিনি বলেছেন, আল্লাহ যেন তার রহমতের চাদর দিয়ে যেন তার পরিবারকে ঢেকে রাখেন । ছোট মেয়ে আদরের তামরীনাকে তিনি মা বলে সম্বোধন করেন ।  তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ওখানে আমার মা, বাবা, ছোট ভাই শোয়ায়েব এবং বড় মেয়ে মুমতাহিনা আছে । শোয়ায়েব অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ ছিল এবং আব্বার খুব কাছাকাছি ছিল ।
আমার বোন তখন বলে, আব্বা একটু পরেই মুমতাহিনা (বড় মেয়ে, যে আড়াই বছর বয়সে অসুস্থতায় মারা যায়) আপনাকে রিসিভ করতে আসবে । মেঝ ভাই বললেন ফুল হাতে আসবে ইনশাল্লাহ । আর তখন আম্মা বললেন, তুমি আমার পক্ষ থেকে ওকে আদর করে দিও । আমার বড় ভাই তাজদীদ তখন বললেন, আপনি তো শহীদ হতে যাচ্ছেন । জান্নাতে শহীদের প্রবেশের সময় অনেকের জন্য আপনার সুপারিশ করার সুযোগ থাকবে । আপনি সেই তালিকায় আমাদের রাখবেন ।
তারপর পুত্রবধুদের উদ্দেশ্য করে আব্বা বললেন, আমার বউমাদের আমি সেভাবে আদর করতে পারিনি । বউমা’রাতো মাই । আমাদের বাংলা ভাষায় তো সেভাবেই বলে, বউ-মা । এই সময়, তিনি সকল পুত্রবধুর বাবা-মা’র খোজ খবর নেন এবং তাদের প্রত্যেককে তার পক্ষ থেকে সালাম জানান । পুত্রবধুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমি তোমাদের প্রতি সেভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি । বিশেষ করে ছোট বউমা জেরিনকে আমি খুব একটা সময় দিতে পারিনি । কেননা ওর বিয়ের কয়েকদিন পরেই তো আমি এখানে চলে আসি । এই সময় তিনি সকল পুত্রবধুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তোমাদের প্রতি ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারিনি । তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও ।
ঠিক একইভাবে আমার মেয়ে জামাই ফুয়াদ আর মেয়েকেও আমি সেভাবে সময় দিতে পারিনি । ওদেরকে নিয়ে একবেলাও একত্রে খাবার খাওয়ারও সুযোগ হয়নি । এই সময় তিনি মেয়ে জামাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাবা তোমার ভুমিকায় ও দায়িত্বপালনে আমি সন্তুষ্ট । তোমার মা বাবাকে আমার সালাম পৌছে দেবে । প্রতিউত্তরে মেয়ে জামাই বলেন, আব্বু আপনি আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা আমি যথাযথভাবে পালন করার চেষ্টা করবো ।
জেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন । তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের সাথে আমার কোন ভুল আচরন হলে আপনারা আমায় মাফ করে দেবেন । নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তার সেবকদের তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরন করেন এবং তার নিজের পিসির টাকাগুলো সেবকদের প্রয়োজন মাফিক বন্টন করে দেন এবং সেই ব্যাপারে জেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন ।
নিজামী ভাই ও সাইদী ভাইসহ আরও যারা আছেন সবাইকে তিনি সালাম পৌছে দিতে বলেন ।
দেশবাসীকে তিনি সালাম দেন এবং সকলের কাছে দোয়া চান । সর্বশেষে তিনি তার শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য দোয়া করেন । এরপর তিনি সকলের সাথে একে একে হাত মিলিয়ে বিদায় জানান ।
তারপর আমরা তার রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম । সেই যে আসার পথে ঘুরে তাকে দেখে আসলাম, সেটাই আমার বাবার শেষ জীবন্তকালীন ছবি । যা কোনদিন ভুলতে পারবোনা । ভুলে যাবোনা ইনশাআল্লাহ । ভুলে যাওয়া সম্ভবও নয় । এই অসম্ভব স্বচ্ছ মনের মানুষটির জন্য আপনারা দোয়া করবেন । প্রানভরে দোয়া করবেন ।


(লেখাটি দৈনিক সংগ্রামে অাজ ২৬ নভেম্বর, ২০১৫ তারিখে উপ-সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে ।