মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অন্তিম সফর – আয়েশা খন্দকার।

অন্তিম সফর – আয়েশা খন্দকার।


তারিখ টা ছিল ৩রা সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১লা জিলহজ্ব ১৪৩৭( সূর্য অস্ত গেলেই আরবি তারিখ অনুযায়ী নতুন দিন শুরু হয়)। রাতের কালো আধাঁর ভেদ করে ৬ টা সাদা মাইক্রো এগিয়ে যাচ্ছে একটা মহান কাজ সম্পন্ন করতে। কাজ টা হলো, মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের এক অনুগত গোলাম তাঁর মহান রবের আদেশ ক্রমে তাঁর দরবারে হাজির হতে যাচ্ছেন। এই মাইক্রোর যাত্রীরা সেই বান্দা কে তাঁর মহান রবের দরবারে পৌঁছে দেয়ার দুনিয়াবি শেষ কাজ গুলো সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। পথেই খবর আসলো, তিনটা মাইক্রোর বেশি যেতে দেয়া হবে না। আইনের শাসন বাস্তবান বলে কথা। মানিকগঞ্জ এর হরিরামপুর থানা চালা ইউনিয়ন পৌঁছানোর আগেই পরে কৌড়ি ইউনিয়ন। সেই খানকার কলতা বাজার এ আটকে দেয়া হলো গাড়ীর বহর। বলে রাখা ভাল প্রথম সংবাদ পাওয়ার পরই ৬ মাইক্রোর যাত্রীদের মধ্যে কাটছাট করে গাড়ীর সংখ্যা করা হলো ৫। তাতেও মন ভরছে আইন রক্ষাকারী সদস্যদের। তিন মানেই তিন। কোন নড়চড় নাই। উপরের আদেশ বলে কথা। বকুল আপা, ওসমান আর জামান ভাই ( মামার PS) এর অনেক অনুরোধে তারা ৪ মাইক্রো যেতে দিতে রাজি হলো। এবার পালা ৫ গাড়ীর লোকদের ৪ টা গাড়ীতে ঠেসে পুরে রওনা দেয়ার পালা। তখনই খবর এলো, সবার হৃদয়ের স্পন্দন, অসহায় মানুষের পরম অভিভাবক, এদেশ ইসলামী অর্থনীতির সফলতার রুপকার, ইসলামি মিডিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা মীর কাসেম আলী মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের দরবারে হাজির হয়ে গেছে এই দুনিয়ার সকল মায়া ছেড়ে। যদিও সংবাদটা জন্য অধির অপেক্ষায় ছিলাম ঘড়ির কাটা রাত ১০ টা ছোঁয়ার পর থেকেই। যাহোক, আইন কর্তাদের অশেষ দয়ায় ও তাদের কড়া পাহাড়ায় রাত ১১ টার একটু আগেই পৌঁছেলাম চালায়, যেখানে চির নিদ্রয়া শায়িত হবেন আমাদের মুকুট মনি। কলতা বাজার থেকেই পুলিশ আমাদের তাদের পাহারায় আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। নিজেদের চোর ভাববো না ভি আই পি ভাববো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের নামিয়ে দেয়া হলো প্রায় আধ কিঃমিঃ দূরে। বলা হলো গাড়ী আর সামনে যাবে না। আমরাও নিরুপায় হয়ে আধার ও ভাঙ্গা রাস্তায় মোবাইলের টর্চ লাইট ধরে এগিয়ে চললাম মীর বাড়ী মসজিদ সংলঘ্ন লেবু বাগানের দিকে। সেই বাগানে পৌঁছানোর একটু কিছু দূর আগেই আবার আইন কর্তারা হাজির আরেক রুপ মহিমায়। এবার কি ? মোবাইল জমা দিতে হবে। ডিজিটাল সরকার তো প্রযুক্তির পক্ষে, তো মোবাইলের উপর এত ক্ষেপ্যা কেন ঠিক বুঝা গেল না। পরে জানতে পারলাম, দাফন হওয়ার ছবি বা খবর যেন পৃথিবী জুড়ে না প্রচার হয় তার চেষ্টা। হায় রে, আর কত রং দেখা বাকি ? দিয়ে দিলাম মোবাইল। কিছু করার নাই। কারন, মোবাইলে সংবাদ দেয়ার চেয়ে জান্নাত গামী আল্লাহর বান্দার দাফন টা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে। শেষ সময় আর কোন ঝামেলা হোক তা আমাদের কাম্য ছিল না। আমরা পৌঁছেই কবরের জন্য জায়গা নির্ধারণ করতে গেলাম। দেখি আইন কর্তারা আমরা যাওয়ার আগেই পাশাপাশি দুইটা জায়গা ঠিক করে রেখেছে। তাও আবার ঘুপচি, গাছ পালায় জংগলের ভিতর যা মসজিদের টয়লেট এর একটু পাশে। যেখান থেকে দূর্গন্ধ পেতে কোন কষ্ট করার দরকার নাই। দূর্গন্ধ নিজেই এসে ধরা দিবে। ওই জায়গাটা দেখেই মনে হলো, এমন জায়গা ঠিক করা ওদের মত লোকদের দিয়েই সম্ভব। নিম্ন রুচি আর বিকৃত মানুষিকতা তাদের উপরই সাওয়ার হয় যাদের উপর্জনে হালালের চেয়ে হারামের অংশই বেশি। আর এমন মানুষদের চক্ষুশূল হবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা শহীদ মীর কাশেম আলী, এমন টাই কি স্বাভাবিক না ? আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলাম আমরা কোথায় কবর দিতে চাই। কর্তারা এই প্রথম সদয় হলেন আমাদের উপর। শুরু হলো শহীদ মীর কাশেম আলীর চিরস্থায়ী নিবাস তৈরির কাজ। আর চলে সেই প্রবাদসম মহান নেতার আগমনে অপেক্ষা। রাত দেড়টার দিকে খবর পেলাম, তিনি রওনা হয়ে গেছেন তাঁর অনন্ত নিবাসে শায়িত হবার জন্য। রাত তিনটার কিছু আগে বা পরে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে পদ্মার পাড়ের সেই নিবর অন্ধকার অজপাড়া গাঁয়ে বেজে উঠলো নির্মম নিষ্ঠুর নির্দয় সেই আম্বুলেন্সের তীব্র আওয়াজ। সবাইকে জানান দিল, নেতা চলে এসেছেন। এখনই যাবেন তাঁর মহান রবের দরবারে হাজির হতে। তাঁকে বহন কারী আম্বুলেন্স যতই এগিয়ে আসছে আলোর তীব্রতা ছড়িয়ে, তার আগেই চোখে পড়লো এক দল অস্ত্রধারী পুলিশ সেই এম্বুলেন্স কে পাহারা দিয়ে এগিয়ে আসছে। যিনি সারাটা জীবন শান্তির জন্য কাজ করে গেছেন, এই তাঁর প্রতিদান। হায় রে মানুষ জানলিও না কার সাথে কি আচরন করলি। জমা রইলো, হাশরের মাঠে সব হিসেব পরিষ্কার করে নেয়া হবে, ইনশা আল্লাহ ! নেতা হাজির হলেন, এবার তাঁকে হস্তান্তরের পালা! মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপার মেঝ মামী কে অনুরোধ করলেন একটা ফর্মে সাইন করে মামার লাশ বুঝে নিতে। মামী বললেন, আগে লাশ দেখে তারপর সাইন। পুলিশ সুপার বললেন, আগেই সাইন করুন, তারপর দেখতে দেখা হবে। এবারও আইন বলে কথা। মামী মুকুল আপাকে সাথে নিয়ে এগিয়ে গেলেন কাগজে স্বাক্ষর করতে। তারপাশে আরো ৫ জন কে স্বাক্ষর দিতে হবে। এগিয়ে গেলেন জামান ভাই, ইমরান ভাই, কামরান ভাই, ওসমান ও আমি। স্বাক্ষর শেষে নামানো হলো মামার কফিন। ডালা খুললাম আমি জামান ভাই ওসমান আর ইমরান ভাই।আরমান জান একে তো গ্রাম রাতের শেষ প্রহর। জিলহজ্বের প্রথম দিনের চাঁদ সন্ধায় দেখা দিয়েই পালিয়েছে। তারপর আবার কারফিউ দিয়ে আশে পাশে বাড়ি-ঘরের সব আলো নিভিয়ে দিয়েছে। তার টেনে এনে বাল্ব জালিয়ে দিলে ও সে আলো গাছ ঝোপ ঝার ঘেরা আসমান-জমীনেরমহাশুন্যতার সেই ঘন অন্ধকার দুর করতে যথেস্ট হয়নি । তার মাঝে তুমি বিহীন আমরা। আমি কোন জান্নাতি মানুষ দেখি নি – তোমার আব্বুকে দেখেছি। দেখেছি সেই ঘন আঁধারে জান্নাতি নূর। রুম্মান লিখেছে……
“পলিথিন এ মুড়ে দেয়া হয়েছে আমার মামাকে। কাঁপা কাঁপা হাতে আমি, জামান ওসমান আর বড় ভাই খুললাম সেই পলিথিন। সাথে সাথে গন্ধ পেলাম চা পাতার। সাদা ধবধবে কাফনের কাপড়ে মুড়ে রাখা।
সারা গায়ে চা পাতা ছড়িয়ে দেয়া। হাত টা কাঁপছে। তারপরও মাথার গিট টা খুলে নেয়া হলো। একে একে তিন টা কাপড় সরাতেই আমাদের শেষ দেখা দিলেন আল্লাহর গোলাম শহীদ মীর কাসেম আলী। অপার্থিব এক সুঘ্রান নাকে এসে লাগল। মানুষ মৃত্যুর পর সুন্দর হয়ে যায় শুনেছি -এটা জীবনের প্রথম দেখা। ফাঁসিতে মুখ বিকৃত হয়। আমার মামা তো দেখি অনেক সুন্দর হয়ে গেছেন। প্রশান্ত এক চিরনিদ্রা। জীবদ্দশায় অনেক ব্যস্ততা আর ছুটাছুটি ছিল। মানুষের কষ্ট দূর করার কি নিরন্তর চেষ্টা। তাই বিশ্রাম সেই ভাবে নেয়ার সুযোগটা হয়ে উঠেনি। এই তো এখনই বিশ্রাম আর প্রশান্তির জীবনটা বুঝি শুরু হয়ে গেল।
শেষ দেখার অভিমানী পর্বটা শুরু হলো মামী কে দিয়ে। প্রথম নজর দেখেই একটু চুপ করে রইলেন। মনে মনে হয় তাঁর জীবন সঙ্গীকে কিছু বললেন। বললেন অনন্ত বিরহের কিছু কথা।তারপর কি পরম যত্ন নিয়ে মামার মুখখানি তে ছোঁয়া আর পরশ দিয়ে হাত বুলিয়ে দিলেন, আর সূরা আল ফজরের এই আয়াত গুলো বাংলায় বললেন ” হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে । শামিল হয়ে যাও আমার নেক বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।এ অবস্থায় যে তোমার রব তোমার প্রতি সন্তষ্ট আর তুমি তোমার রবের প্রতি সন্তুস্ট । ” শুরা আল ফজর (২৭-৩০)।
এর পর একে মহিলারা এগিয়ে এলেন শেষ দেখা দেখার জন্য। সুমাইয়া কফিনের কাছে এসে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। কান্না শুরু করেও মামার সামনে এসে মামাকে দেখে চুপ হয়ে গেল। এত সুন্দর মুখখানি দেখে আর কান্না না আসাটাই স্বাভাবিক। সবার বেলায় তাইই হলো। জামান বলছিলেন, যদি রাসুলুল্লাহ (দঃ) এর জামানায় এই মৃত্যু হতো তাহলে হয় তো আল্লাহর রাসুল (দঃ) এই কথাই বলতেন, তোমরা যদি কোন জান্নাতি কে দেখতে চাও তো মীর কাসেম আলী কে দেখে যাও”। একে একে শেষ হলো দেখার পালা। শুরু হলো জানাযার নামাজ। ভাতিজি জামাই পরিচিয়ে বহু কষ্টে হাজির হয়েছিলেন, এই শহীদী কাফেলার আরেক সঙ্গী জনাব আব্দুল হালীম। জানাযায় কেউ কেউ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলেন না। কেউ ডুকরে ডুকরে কেউ বা চিৎকার করে কেঁদেছ উঠছিলেন। শেষ হলো জানাযা। কর্তাদের তীব্র ঘৃনা নিয়ে চিৎকার দিয়ে বললাম, এই বার কি করতে হবে বলুন? বললেন, এবার দাফন করে দিন। ওসমান গেল একটু দূরে বসে থাকা মামীর অনুমতি নিতে। মামী অনুমতি দিলেন, চিরনিদ্রায় শায়িত করতে কবরে নামলাম আমি, ওসমান, মিনার ভাই সালমান আর বড় ভাইয়া। সবার শেষে মামার মুখখানি কেবলা মুখি করে উঠে এলাম মামাকে অন্ধকার ঘরে একলা শুয়ায়ে রেখে।মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো এদেশের ইসলামী আন্দোলন এর ডাইনামিক সিপাহসালার শহীদ মীর কাশেম আলীর কবর। শেষ হলো শহীদ মীর কাশেম আলীর হিরক খচিত অধ্যায়। রয়ে গেলেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। মাটি দেয়া শেষ হবার পর মুনাজাত করলেন আব্দুল হালিম ভাই। মুনাজাতের সময় হঠাৎ শুনি অন্ধকার বাগান থেকে আল্লাহ আল্লাহ বলে চিৎকার করে কান্নার রোল। যে সব মজলুম মানুষের অভিভাবক ছিলেন শহীদ মীর কাশেম আলী, তাদেরই অনেকে অথবা গ্রাম বাসী যাদের পুলিশ আসতে দেয় নাই জানাযা পরতে তারাই কান্নার সাথে চিৎকার করে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন।”
– চলবে

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অন্তরে বিচ্ছেদের হাহাকার

অন্তরে বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে একে একে ১৪টি ঈদ আব্বাকে ছাড়া অতিবাহিত করলাম । মনের মাঝে অব্যক্ত অনেক দুঃখ, বেদনা, কষ্ট । তাই গতকাল আব্বার সাথে দেখা করে ফিরে এসেও কিছু লিখতে মন চায়নি । বিষণ্ণতা মনকে আকড়ে ধরেছিলো । 

আমাদের এই দুঃখ বেদনা অনেকেই বুঝবেন না । 
ঈদ ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকল মানুষের মাঝে আনন্দের এক বার্তা নিয়ে হাজির হয় প্রতিটি বছর । আমাদের "ঈদ" যেন ঐ উচু লাল দালানের মধ্যে বন্ধি আর এবারের ঈদে বাংলার আকাশ, সন্তান হারা মায়ের আহাজারি, স্বামী হারা স্ত্রীর আর্তনাত, ভাই হারা বোনের মর্মস্পর্শী মায়াকান্না ভারী করে তুলেছে । আপনজনের বিয়োগের বেদনা নাড়া দিচ্ছে ! হৃদয়ের অজানা কোন স্থানে প্রচন্ড আঘাত এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে । আমাদের মতোন তাদের ঘরেও নেই কোন আনন্দ । 
নির্বিচারে গ্রেফতার, খুন আর গুমের কারনে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য মায়ের সন্তানের অনুপস্থিতি তাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ এনে দিতে পারেনি । সে সংখ্যা এখন অনেকের-ই অজানা । সমবেদনা জানায় অনেকে তবুও হারানো ব্যথা বা বিচ্ছেদের যন্ত্রনা কি সকলে বুঝাতে/বুঝতে পারে ? 
অনেকেই মোবাইলে এবং ফেইসবুকের ইনবক্সে ম্যাসেজ করে জানতে চেয়েছেন প্রিয় আল্লামা সাঈদী হুজুর কেমন আছেন ? সকলকে আলাদাভাবে উত্তর জানাতে পারিনি তাই একসাথে সবার উদ্দেশ্যে এই লেখা । 
ঈদ উপলক্ষে গতকাল দুপুর ২টার সময় আব্বার সাথে দেখা করেছি । অনেকেই তাঁকে একনজর দেখতে চান । জেল/কারাগার আইন অনুযায়ী আমরা তো সেই সুযোগ করে দিতে পারিনা তবে আপনাদের সালাম পৌঁছে দেই । আপনারা যে তাঁকে এখনো মন প্রান দিয়ে ভালোবাসেন-স্বরন করেন সেকথা জানাই এবং তিনিও উপলব্ধি করেন । গভীর রাতে আপনাদের চোখের পানি, আপনাদের নফল রোজা এবং সম্মানিত হাজী ভাই বোনদের পবিত্র মক্কা-মদীনা-মিনা-মুজদালিয়া-আরাফার ময়দানে কান্না জড়িত কন্ঠে দোয়ার বদৌলতে তিনি শারীরিক ভাবে সুস্থ ও মানসিক দিক থেকে দৃঢ় আছেন । আলহামদুলিল্লাহ ! আল্লাহর শাহী দরবারে লক্ষকোটি শুকরিয়া । কারাগার থেকে আপনাদেরকে সালাম এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন । সেই সাথে হতাশ না হয়ে বেশী করে আল্লাহর দরবারে ধর্না দিতে বলেছেন । গভীর রাত অর্থাৎ সূর্যদোয়ের পূর্বে এবং আসর নামাজের পর সূর্যাস্তের পূর্বে দোয়া কবুল হয় । ওই সময় গুলোতে চোখের পানি ফেলে দোয়া করা ।
যুগে-যুগে ইসলামী আন্দোলনের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন হয়েছে নানা ভাবে, নানা কৌশলে । বার বার থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে । কিন্তু কোন দলন নিপীড়নই ইসলামী আন্দোলনের পথচলা থামিয়ে দিতে পারেনি, এখনও পারবে না । আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সমস্ত ত্যাগের বিনিময়ে এই জমিনে আল্লাহর দ্বীনের পতাকা উড়বেই, ইনশাআল্লাহ ।
ইয়া আল্লাহ ! আপনার সকল গুনবাচক নামের উছিলা দিয়ে, আপনার কাছে
আবেদন করি-করুনা ভিক্ষা চাই, কুরআনের পাখি আল্লামা সাঈদীকে সুস্থ্ শরীরে, নেকহায়াত দিয়ে- জালিমের কারাগার থেকে মুক্ত করে, আমাদের মাঝে তাফসীরুল কুরআনের ময়দানে, মসজিদের আঙ্গিনায় ফিরিয়ে দেন ।
হে আল্লাহ ! প্রয়োজনে আমার জীবনের বিনিময়ে কুরআনের পাখি সহ সকল
ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদেরকে, জালিমের জুলুম নির্যাতন থেকে
মুক্তির ব্যবস্থা দিন । আমিন -ইয়া রব্বাল আলামীন ।

রবিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

মৃত্যু মানেই শেষ নয়, অনন্ত জীবনের শুরু ...

وَسَلَامٌ عَلَيْهِ يَوْمَ وُلِدَ وَيَوْمَ يَمُوتُ وَيَوْمَ يُبْعَثُ حَيًّا
তার প্রতি সালাম আর শান্তি-যেদিন সে জন্মগ্রহণ করে এবং যেদিন মৃত্যুবরণ করবে এবং যেদিন জীবিতাবস্থায় পুনরুত্থিত হবে । মরিয়ামঃ ১৫
সফল উদ্যোক্তা, সমাজ সেবক, উদ্যমী  সংগঠক,  মানব দরদী মীর কাশেম আলী জন্মে ছিলেন ১৯৫২ সালের ৩১ ডিসেম্বর । পিতাঃ মীর তৈয়েব আলী মাতাঃ রাবেয়া আখতার । তিনি ২ পুত্র এবং ৩ কন্যার পিতা । ১৯৬৭ সালে SSCতে মেধা তালিকায় ১৫তম স্থান অধিকার করেন । ১৯৬৯ সালে HSC এবং ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন । 
১৯৭৭এর ৬ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের যাত্রা শুরু হয় । মীর কাশেম আলী শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সভাপতি । ১৯৭৯তে তিনি জামায়াত ইসলামিতে যোগদান করেন এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা, কর্ম পরিষদ ও নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলেন । 
সফল উদ্যোক্তা মীর কাশেম একে একে গড়ে তোলেন ইসলামি ব্যাংক, ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামি ব্যাংক স্কুল এন্ড কলেজ, ইবনে সিনা হসপিটাল, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ, ফুয়াদ আল খতীব হসপিটাল, দিগন্ত টিভি, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা এবং কেয়ারী গ্রুপ । এই প্রতিষ্ঠান গুলোর মুনাফার তুলনায় তিনি বেশী মনযোগী ছিলেন মানব সেবায় ।
মহান এই ব্যাক্তিটিকে ২০১২ সালের ১৭জুন  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক জঘন্য মিথ্যা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয় । গ্রফতারের পূর্বে তাঁর নামে কোথাও কোন মামলা ছিলো না । নানান ভাবে বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেন । গত ৩০ আগস্ট আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতির এস কে সিনহার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বিচারপতিগন মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন । রায়ের ৫দিনের মাথায় গতকাল ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০:৩৫ মিনিটে কাশিমপুর কারাগার-২এ  ফাসি কার্যকর করা হয় । إِنَّا للهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعونَ
জন্মস্থান মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার সুতালরি গ্রামের বাড়িতে নিজের প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়ীত হয়েছেন শহীদ মীর কাসেম আলী ।


وَلَا تَقُولُوا لِمَن يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ ۚ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَٰكِن لَّا تَشْعُرُونَ
আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না ৷ এই ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত ৷ কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোন চেতনা থাকে না"৷ 
And do not say  about those who are killed  in the way of Allah, "They are dead" Rather, they are alive, but you perceive(it) not. Baqarah: 154

আজ পৃথিবীর সমস্ত লাল গোলাপ আপনার জন্যই ফুটেছে ! আমি বিশ্বাস করি ফেরেশতাগণ আজ আপনাকে অভিবাদন জানাতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যাবেন । আপনার অন্যান্য সম্মানীত সাথীগনও আপনাকে অভিবাদন জানোর জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই । ওমর আল মুখতার, সাইয়্যেদ কুতুব, কাদের মোল্লা, নিজামী থেকে শুরু করে আপনি ।
যে হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশের মানুষের জন্য হৃদয়ে আকাশসম স্বপ্ন আজ সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো । আপনি হাসপাতাল গড়েছেন, ব্যাংক গড়েছেন, টিভি গড়েছেন, স্কুল, কলেজ, মসজিদ গড়েছেন আরও কত কিছু ইতিহাস অবশ্যই স্বাক্ষ্য দেবে ।
সময়টা এখন সৃষ্টিশীল মানুষদের নয় । ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ব্যাংক ডাকাত, শেয়ার মার্কেটর লুটেরারা আজ আমাদের নৈতিকতার জ্ঞান দিতে আসছে ! আসলে ক্ষমতা জিনিসটাই বুঝি এমন ।
যে জাতি যেমন তাদের নেতাও তেমন এটাই চুড়ান্ত সত্য । আপনি আসলে এই জাতির নেতা হওয়ার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি । চেয়ে দেখুন, এই জাতির নেতৃত্বের চেয়ারগুলোতে কারা বসে আছে ?
আপনি দেশের বাইরে গেলেন আর এদেশের মিডিয়া পাড়ার শিয়ালগুলো হুক্কাহুয়া আওয়াজ তুললো, ‘মীর কাসিম পালিয়েছেন!”। আপনি আসলেন’ জানান দিলেন, মীর কাশেমরা পালাতে জানে না’। ইতিহাসের সকল সময়েই মীর কাশেমরা জীবন দিয়েছে কিন্তু তাদের দ্বায়িত্ব ছেড়ে পালায়নি । আপনার শুভাকাংখিরা বারবার আপনাকে দেশে ফিরতে বারণ করেছেন, তারা বলেছেন আপনি ন্যায় বিচার পাবেন না ! কিন্তু আপনি বললেন, ইসলামী আন্দোলনে হাজার হাজার কর্মী প্রাণ দিচ্ছে, নেতারা প্রাণ দেবে না তা কি করে হয় ?
আপনি জানতেন আপনার সাথে কি করা হবে । আপনি জয় করেছেন জীবনকে । মৃত্যুও আপনাকে হারাতে পারেনি । হে মহান কারিগর, আপনি জেনে রাখুন নিস্তব্ধতার এই গহীন রজনীতে পথ হারা মানুষ মীর কাশেমদের দেখানো আলোতেই পথ খুঁজে পাবে ইনশাঅাল্লাহ । ভানুমতির গল্প দিয়ে যারা তাদের বিজয় কেতন উড়াতে চায় সেই বেকুব আত্ম-অহংকারীদের জন্য আফসোস ! সেই দিন তাদের অবশ্যই আসবে যারা আজকের কৃতকর্মের জন্য সবচেয়ে বেশি আফসোস করবে !  সকলকে একদিন আল্লাহ তায়ালার নিকটে হাজিরা দিতে হবে এবং সেদিন তিনি প্রতিটা কাজের হিসেব নেবেন ।
আমাদের বিনাশ নেই । মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে ! 
প্রতিটি গভীর রাত্রি শেষে সুবহে সাদিকের আলোর মত আমরা জেগে উঠবোই । 
 
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَاراً خَيْراً مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلاً خَيْراً مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجَاً خَيْراً مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ [وَعَذَابِ النَّارِ]

ইয়া আল্লাহ ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তাকে দয়া করুন, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখুন, তাকে মাফ করে দিন, তার মেহমানদারীকে মর্যাদাপূর্ণ করুন, তার প্রবেশস্থান কবরকে প্রশস্ত করে দিন । আর আপনি তাকে ধৌত করুন পানি, বরফ ও শিলা দিয়ে, আপনি তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করুন যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করেছেন । আর তাকে তার ঘরের পরিবর্তে উত্তম ঘর, তার পরিবারের বদলে উত্তম পরিবার ও তার জোড়ের (স্ত্রী/স্বামীর) চেয়ে উত্তম জোড় প্রদান করুন । আর আপনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান এবং তাকে কবরের আযাব [ও জাহান্নামের আযাব] থেকে রক্ষা করুন । আমিন ইয়া রব্বাল আলামীন ।
মুসলিম ২/৬৬৩, নং ৯৬৩।

বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০১৬

ভুমিকম্প কেন হয় ?


আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কতৃক বর্ণিত, আল্লাহর নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জিত হবে, কাউকে বিশ্বাস করে সম্পদ গচ্ছিত রাখা হবে কিন্তু তার খিয়ানত করা হবে (অর্থাৎ যার সম্পদ সে আর ফেরত পাবে না),যাকাতকে দেখা হবে জরিমানা হিসেবে, ধর্মীয় শিক্ষা ব্যতীত বিদ্যা অর্জন করা হবে, একজন পুরুষ তার স্ত্রীর আনুগত্য করবে কিন্তু তার মায়ের সাথে বিরূপ আচরণ করবে, বন্ধুকে কাছে টেনে নিবে আর পিতাকে দূরে সরিয়ে দিবে, মসজিদে উচ্চস্বরে শোরগোল (কথাবার্ত) হবে, জাতির সবচেয়ে দূর্বল ব্যক্তিটি সমাজের শাসক রুপে আবির্ভূত হবে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি জনগণের নেতা হবে, একজন মানুষ যে খারাপ কাজ করে খ্যাতি অর্জন করবে তাকে তার খারাপ কাজের ভয়ে সম্মান প্রদর্শন করা হবে, বাদ্যযন্ত্র এবং নারী শিল্পীর ব্যাপক প্রচলন হয়ে যাবে, মদ পান করা হবে (বিভিন্ন নামে মদ ছড়িয়ে পড়বে), শেষ বংশের লোকজন তাদের পূর্ববর্তী মানুষগুলোকে অভিশাপ দিবে, এমন সময় আসবে যখন তীব্র বাতাস প্রবাহিত হবে তখন একটি ভূমিকম্প সেই ভূমিকে তলিয়ে দিবে (ধ্বংস স্তুপে পরিণত হবে বা পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে) । [তিরমিযি কতৃক বর্ণিত, হাদিস নং – ১৪৪৭] এই হাদিসের মাঝে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে যে আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে জমিনে কখন ভুমিকম্পের আজাব প্রদান করা হয় এবং কেন প্রদান করা হয় ।
আল্লামা ইবনুল কাইয়ুম রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে পৃথিবীকে জীবন্ত হয়ে উঠার অনুমতি দেন, যার ফলে তখন বড় ধরণের ভূমিকম্প অনুষ্ঠিত হয় । তখন এই ভূমিকম্প মানুষকে ভীত করে । তারা মহান আল্লাহর নিকট তাওবা করে, পাপ কর্ম ছেড়ে দেয়, আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং তাদের কৃত পাপ কর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মুনাজাত করে । আগেকার যুগে যখন ভূমিকম্প হত, তখন সঠিক পথে পরিচালিত সৎকর্মশীল লোকেরা বলত, ‘মহান আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করেছেন' ।

বিজ্ঞান কী বলে ?

ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে ভূপৃষ্ঠের নীচে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় রয়েছে কঠিন ভূত্বক । ভূত্বকের নীচে প্রায় ১০০ কি.মি. পূরু একটি শীতল কঠিন পদার্থের স্তর রয়েছে । একে লিথোস্ফেয়ার (Lithosphere) বা কঠিন শিলাত্বক নামে অভিহিত করা হয় । আমাদের পৃথিবী নামের এই গ্রহের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, কঠিন শিলাত্বক (লিথোস্ফেয়ার) সহ এর ভূপৃষ্ঠ বেশ কিছু সংখ্যক শক্ত শিলাত্বকের প্লেট (Plate) এর মধ্যে খন্ড খন্ড অবস্থায় অবস্থান করছে । ভূতত্ত্ব বিজ্ঞানের আলোকে এই প্লেটের চ্যুতি বা নড়া-চড়ার দরুণ ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয় ।

ভুমিকম্প বিষয়ক কুরআনতত্ত্বঃ

ভূমিকম্প বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সূরা ‘যিলযাল’ নামে একটি সূরাই নাযিল করা হয়েছে । মানুষ শুধু কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয় এবং ভূতত্ত্ববিজ্ঞানও এই কার্যকারণ সম্পর্কেই আলোচনা করে থাকে । কিন্তু কুরআনুল কারীম একই সাথে কোন ঘটনা ঘটার কার্যকারণ বর্ণনার পাশাপাশি উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষনীয় বিষয় কি এবং এই ঘটনা থেকে অন্য আরো বড় কোন ঘটনা ঘটার সংশয়হীনতার প্রতি ইংগিত করে । ভূমিকম্প বিষয়ে কুরআনুল কারীমে দু’টি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে । একটি হল ‘যিলযাল’, যার অর্থ হল একটি বস্তুর নড়াচড়ায় অন্য আরেকটি বস্তু নড়ে ওঠা । দ্বিতীয় শব্দটি হল ‘দাক্কা’, এর অর্থ হল প্রচন্ড কোন শব্দ বা আওয়াজের কারণে কোন কিছু নড়ে ওঠা বা ঝাঁকুনি খাওয়া । পৃথিবীতে বর্তমানে যেসব ভূমিকম্প ঘটছে, তা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ভূপৃষ্ঠের অভ্যন্তরে কঠিন শিলাত্বকে চ্যুতি বা স্থানান্তরের কারণে । কিয়ামতের দিন আরেকটি ভূমিকম্পে পৃথিবী টুকরো টুকরো হয়ে ধুলিকনায় পরিণত হবে এবং তা হবে ফেরেশেতা হযরত ইসরাফিলের আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিঙ্গায় ফুৎকারের কারণে, যাকে বলা হয় ‘দাক্কা’। যা হবে এক প্রচন্ড আওয়াজ ।

পৃথিবীতে মাঝে মাঝে কঠিন শিলাত্বকের স্থানান্তরের কারণে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প আমাদেরকে এ কথার প্রতি ইংগিত করে যে, একদিন ওই ‘দাক্কা’ সংঘটিত হবে, যার নাম কেয়ামত । তখন এই চাকচিক্যময় দুনিয়ার সবকিছুই ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে । মানুষ যেন কিয়ামতকে ভুলে না যায়, দুনিয়াকেই তার আসল ঠিকানা মনে না করে, তাই মাঝে মাঝে মহান আল্লাহ ভূমিকম্পসহ আরো অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ দিয়ে মানুষকে সতর্ক করে থাকেন ।

ভুমিকম্প একটি আজাবঃ

আল্লাহ মহান পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, বলোঃ  আল্লাহ তাআলা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম, অথবা তিনি তোমাদের দল-উপদলে বিভক্ত করে একদলকে আরেক দলের শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করাতেও সম্পূর্ণরূপে সক্ষম ।” (সূরা আল আনআম : ৬৫)

আল-বুখারি তার সহিহ বর্ণনায় জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেনঃ যখন তোমদের উপর থেকে (আসমান থেকে) নাজিল হলো তখন  নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, অথবা যখন, অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব নাযিল হলো, তখন রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি তোমার সম্মূখ হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি । (সহিহ বুখারি, ৫/১৯৩)

আবূল-শায়খ আল-ইস্পাহানি এই আয়াতের তাফসিরে বর্ণনা করেন, “বলোঃ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর, তোমাদের উপর থেকে (আসমান থেকে) তীব্র শব্দ, পাথর অথবা ঝড়ো হাওয়া; আর অথবা তোমাদের পায়ের নীচ থেকে আজাব পাঠাতে সক্ষম- যার ব্যাখ্যা হলো, ভুমিকম্প এবং ভূমি ধ্বসের মাধ্যমে পৃথিবীর অভ্যন্তরে ঢুকে যাওয়া ।

বান্দার ওপর আজাব কেন আসে ?

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু  হতে বর্ণিত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেনঃ যখন আমার উম্মত যখন ১৫ টি কাজে লিপ্ত হতে শুরু করবে তখন তাদের প্রতি বালা মুসীবত আসতে আরম্ভ করবে । কাজগুলো হলোঃ
১. গণীমতের মাল ব্যাক্তিগত সম্পদে পরিণিত হবে ।
২. আমানতের সম্পদ পরিনত হবে গনীমতের মালে ।
৩. জাকাত আদায় করাকে মনে করবে জরিমানা আদায়ের ন্যায় ।
৪. স্বামী স্ত্রীর বাধ্য হবে ।
৫. সন্তান মায়ের অবাধ্য হবে ।
৬. বন্ধু-বান্ধবের সাথে স্বদব্যাবহার করা হবে ।
৭. পিতার সাথে করা হবে জুলুম ।
৮. মসজিদে উচ্চস্বরে হট্টোগোল হবে ।
৯. অসাম্মানী ব্যাক্তিকে জাতির নেতা মনে করা হবে ।
১০. ব্যাক্তিকে সম্মান করা হবে তার অনিষ্ট থেকে বাচার জন্য ।
১১. প্রকাশ্যে মদপান করা হবে ।
১২. পুরুষ রেশমী পোষাক পরবে ।
১৩. গায়িকা তৈরি করা হবে ।
১৪. বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হবে। 
১৫.পুর্ববর্তী উম্মতদের (সাহাবী, তাবে তাবেঈন) প্রতি অভিসমাপ্ত করবে পরবর্তীরা ।
এই কাজগুলি যখন পৃথিবীতে হতে শুরু হবে তখন অগ্নীবর্ষী প্রবল ঝড়, ভুমিকম্প ও কদাকৃতিতে রূপ নেয়ার অপেক্ষা করবে । এখন একটু চিন্তা করা উচিত যে আমরা এগুলোর মাঝেই লিপ্ত রয়েছি । আর যখন আমাদের উপর মুসীবত আসে তখন প্রকৃতির বা মানুষের বা অন্যান্য জিনিসের দোষ দেই । আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন আমরা হই তা আসলে আমাদের গুনাহের কারনেই এত আযাব ।

ভুমিকম্প হলে করনীয় কি?

যখন কোথাও ভূমিকম্প সংগঠিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন মানুষদের উচিত মহান আল্লাহর নিকট অতি দ্রুত তওবা করা, তাঁর নিকট নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং মহান আল্লাহকে অধিকহারে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা যেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য গ্রহণ দেখলে বলতেন, যদি তুমি এরকম কিছু দেখে থাক, তখন দ্রুততার সাথে মহান আল্লাহকে স্মরণ কর, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর । [বুখারি ২/৩০ এবং মুসলিম ২/৬২৮] বর্ণিত আছে যে, যখন কোন ভূমিকম্প সংগঠিত হতো, উমর ইবনে আব্দুল আযিয রাহিমাহুল্লাহ তার গভর্ণরদের দান করার কথা লিখে চিঠি লিখতেন ।
মহা গ্রন্থ আল-কুরআনের একাধিক আয়াতে বলা হয়েছে যে, জলে স্থলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তা মানুষেরই কৃতকর্মের ফল । আল্লাহ সুভানাহু তায়ালা মানুষের অবাধ্যতার অনেক কিছুই মাফ করে দেন । তারপরও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় ।পবিত্র কুরআন নাজিল হওয়ার পূর্বেকার অবাধ্য জাতি সমূহকে আল্লাহপাক গজব দিয়ে ধ্বংস করেছেন । সে সবের অধিকাংশ গজবই ছিল ভুমিকম্প । ভুমিকম্প এমনই একটা দুর্যোগ যা নিবারন করার মতো কোন প্রযুক্তি মানুষ আবিষ্কার করতে পারে নাই । এর পূর্বাভাষ পাওয়ার মতো কোন প্রযুক্তিও মানুষ আজ পর্যন্ত আবিষ্কার করতে পারে নাই । হাদিস শরীফেও একাধিকবার বলা হয়েছে যে, মানুষের দুষ্কর্মের জন্যই ভুমিকম্পের মতো মহা দুর্যোগ ডেকে আনে । পবিত্র কুরআন এবং হাদীসে আদ, সামুদ, কওমে লুত এবং আইকার অধিবাসীদের ভুমিকম্পের দ্বারা ধ্বংস করার কাহিনী বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণনা করা হয়েছে ।


একটু ভাবুন তো...

সামান্য এই ভূমিকম্পেই সম্পদের মায়া ছেড়ে আমরা রাস্তায় নামছি । এটা যখন আরো বাড়বে, তখন সম্পর্কের মায়াও ছেড়ে দেবো আমরা । নিজেকে বাচানোর চেষ্টায় ব্রতী হবো সবাই । যখন তার চাইতেও আরো বাড়বে তখন যেই মা দুধ খাওয়াচ্ছেন তিনিও তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দেবেন, গর্ভের শিশুকেও বের করে দেবেন । ভূমিকম্পের সময় কে কি অবস্থায় ছিলাম, কে টের পেয়েছে, কে টের পায়নি, চেয়ার টেবিল নড়ছিলো কিনা, ফ্যান দুলছিলো কিনা- এই সব গবেষণা পরে করলেও হবে । আগে করা দরকার তওবা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া । সবচেয়ে বড় কথা হল, এটি আল্লাহ কর্তৃক একটি নিদর্শন । যাতে করে মানুষ স্বীয় অপরাধ বুঝতে সক্ষম হয় । ফিরে আসে আল্লাহর পথে । আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সাথে খাটি তওবা করার তাওফিক দান করুন । আমিন ইয়া রব ।









রবিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৬

আপনি কোনটি পালন করছেন ?

আজ ঐতিহাসিক ১৫ই আগষ্ট ।

১৯৪৬ সালের এইদিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জন্ম গ্রহন করেন । খালেদা জিয়ার শুভ জন্মদিন কিন্তু  দেশের ‘চলমান সংকট, উত্তরঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি ও নেতা-কর্মীদের জেল-গুম-খুনের’ কারণে খালেদা জিয়া এ বছর জন্মদিনের অনুষ্ঠান না করার জন্য নেতা কর্মী ও ভক্তবৃন্দকে নির্দেশ দিয়েছেন । 

১৯৪৭ সালে ১৫ আগষ্ট ২০০ বছর ইংরেজদের গোলামীর জিঞ্জির থেকে ভারত স্বাধীন হয় । আজ  ভারতের মহান স্বাধীনতা দিবস । 
---
১৯৬৯ সালের ১৫ আগষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন বিভাগের মেধাবী ছাত্র আব্দুল মালেক নিহত হন । পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে তিনি তার মতামত যুক্তি সহকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেন । তার প্রতিপক্ষ ছিল তৎকালীন ছাত্রলীগ ও বাম ছাত্র সংগঠনগুলি । তারা এখনকার মতই যুক্তির বদলে শক্তিকেই বেছে নেয় ! ততকালীন রেসকোর্স ময়দানে নির্মমভাবে পিটিয়ে মাথায় ইট দিয়ে থেতলিয়ে আহত করে তাকে । পরে হাসপাতালে মারা যান তিনি । এ ঘটনায় সব শ্রেণীপেশার মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ! রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে সরকারের শিক্ষামন্ত্রীসহ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেন । তৎকালীন পাকিস্তান আওয়ামীলীগ এর জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান । তাই ইসলামী ছাত্র শিবির আজকের দিনকে "শিক্ষা দিবস" হিসেবে পালন করে ।  

সবাই জানেন, জাতীয় শোক দিবস । ১৯৭৫ সালের এইদিনে স্বপরিবারের নিহত হন স্বাধীনতার স্থপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান । এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় এই নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার । পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার মুশতাক ক্ষমতা গ্রহণ করেন । কিন্তু দূর্ভাগের বিষয় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকমীদের কাছে সেই সময়ে সামান্যতম সহানুভূতিও পাননি এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট । ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আবারও আওয়ামীলীগ রাস্ট্র ক্ষমতায় । বাংলাদেশের জনগণ বিশেষ করে যারা আগে কখনও আওয়ামী শাসন দেখেননি তারা নতুন করে তাদের শাসন স্টাইল(!) নতুন করে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছেন ।
সময় মানুষকে সম্মানিত করে আর সময়ের কারণেই মানুষ অসম্মান বয়ে আনে । সম্মানজনক জীবনই শেষ কথা নয় সম্মানের মৃত্যুও সমান গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ ।

রবিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলামঃ মাওলানা সাঈদী (পর্ব - ৬)

শক্তি প্রয়োগে আদর্শ প্রতিষ্ঠা

ইতিহাসে দেখা যায়, রাষ্ট্র বা দলীয় শক্তি প্রয়োগ করে কোনো কোনো আদর্শ দেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে । শাস্তির ভয়ে প্রকাশ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষ সে আদর্শের অনুসরণ করেছে আর আড়ালে প্রকাশ করেছে অন্ত্রের ঘৃণা । অনেক রাজা বদশাহই এ ধরনের হঠকারিতামূলক কাজ করেচ্ছেন । তারা যে বোধ-বিশ্বাস অন্তরে লালন করতেন, তাই জোরপূর্বক জাতির উপর আইন প্রয়োগ করে চাপিয়ে দিতেন । বিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নেও আমরা দেখতে পেয়েছি, ইয়াহুদী সন্তান কার্লমার্কস সৃষ্ট সমাজতন্ত্র নামক আদর্শও রাস্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার নির্মম-নিষ্ঠুর কার্যক্রম । 
কিন্তু যারা এই অবাস্তব পদ্ধতি প্রয়োগ করে আদর্শ টিকিয়ে রাখার প্রচেস্টা চালিয়েছে, তারা এ কথা ভুলে গিয়েছে যে, বিশ্বাস হলো মানুষের মনের সাথে সম্পৃক্ত । শক্তি প্রয়োগে কোনো বিশ্বাসের প্রতি মানুষের মৌখিক স্বীকৃতি আদায় করা যায় বা কিছু সময়ের জন্য পালন করানোও যায় কিন্তু হৃদয়-মনে তা প্রতিষ্ঠিত করা যায় না । মানুষ তো পরম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও নিষ্ঠার সাথে সেই আদর্শই অনুসরণ করে, যারা তা মনপ্রান দিয়ে বিশ্বাস করে । যে আদর্শের শিকড় হৃদয়- গভীরে প্রোথিত, তাই মানুষের বাহ্যিক অবয়বে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে ।
সম্রাট অশোক, সম্রাট আকবর, হালাকু খান, চেঙ্গিশ খান শক্তি প্রয়োগ করে কতো নিয়ম-নীতি চালু করেছিলেন, এসবের কোন অস্তিত্বও নেই । নিকট অতীতে সমাজতান্ত্রিক দেশসমুহে সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাদের প্রচলিত নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা তো দূরে থাক, তাদের বিশাল বিশাল মূর্তি গুলোর গলায় শিকল লাগিয়ে টেনে নামানো হয়েছে । শক্তি প্রয়োগ করে, লোভ লালসা দেখিয়ে, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা করে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা হয়, সে আদর্শ অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং এর স্থায়িত্ব নেই- ক্ষণস্থায়ী । সামান্য কিছু কালের ব্যবধানে এর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে ।
পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামই হলো ব্যতিক্রম সেই আদর্শ, যা লোভ-লালসা দেখিয়ে, প্রতারনা-প্রবঞ্চনা করে অথবা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচার-প্রসার করা হয়নি । ইসলামী আদর্শের বাহ্যিক ও অভ্যান্তরিন অনুপম গুন-বৈশিস্ট্য, নবী- রাসুলদের আকর্ষণীয় চারিত্রিক গুন এবং সাহবায়ে কেরামের আচরিত তুলনাহীন গুনাবলীর প্রতি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর মানুষ আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম কবুল করেছে । আর এভাবেই ইসলামের প্রচার -প্রসার ঘটেছে । সুতরাং সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, বোমাবাজি করে, মানুষ হত্যা করে জঙ্গি পন্থায় যারা আল্লহর আইন চালু করার চিন্তা করে, তাদের বোঝা উচিত এপথ ইসলামের নয় এবং এপথ অবলম্বন করে মানুষের মনে আল্লাহর আইনের প্রতি সম্মানবোধ, শ্রদ্ধা-ভালোবাসা সৃষ্টি করা যাবে না ।
ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর ঢাল চুরির ঘটনা ইতিহাসের পাঠক মাত্রই অবগত রয়েছেন । তার ঢাল চুরি করলো এক ইয়াহুদী, তিনি রাস্ট্রপ্রধানের পদে আসীন । রাস্ট্রশক্তি প্রয়োগ করে ইয়াহুদীকে চরম শাস্তি দিয়েই তো ঢালটি উদ্ধার করতে পারতেন কিন্তু ইসলামী শিক্ষা তাকে সে পথে অগ্রসর হতে না দিয়ে আদালতে বিচারকের কাছে পাঠিয়েছে । আদলতে সাক্ষী গ্রহনযোগ্য না হবার কারনে ইয়হুদীর পক্ষে আর ইসলামী রাস্ট্রপ্রধানের বিপক্ষে রায় দিয়েছে । রাস্ট্রপ্রধান আদালতের রায় মেনে নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছেন । পথিমধ্যে সেই ইয়াহুদী ছুটে এসে হযরত আলীকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল কন্ঠে বলছে, যাদের আদর্শ এতো সুন্দর মানুষ সৃষ্টি করেছে, আমি সেই আদর্শ গ্রহন করে মুসলমান হলাম । এই নিন আপনার ঢাল, এটি আমিই চুরি করেছিলাম ।  
ইসলাম এভাবেই প্রসারিত হয়েছে, শক্তি প্রয়োগে নয় ।  ***** চলবে *****

বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৬

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে ইসলামঃ মাওলানা সাঈদী (পর্ব - ৫)

আল্লাহর আইন- বৃটিশ ও পাকিস্তান যুগঃ

বৃটিশ এদেশকে প্রায় দুইশত বছরব্যাপী শাসন করেছে । এরপর ২৪ বছর বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে পরিচিত ছিলো । তখন তো কেউ-ই  'আল্লাহর আইন চালু'র নামে এদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি । ১৯৭১ সালে মহান  মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ স্থান করে নিলো, একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলো, দীর্ঘ এ সময়েও কেউ উক্ত দাবি তুলে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করেনি ।
১৯৯৬ সালের পরে এদেশের শাসন ক্ষমতায় যারা এলেন, তাদের শাসনামলে ১৯৯৯ সালের ৬ই মার্চ যশোরে উদীচীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হলো । একই সালের ৮ই অক্টোবর খুলনায় কাদিয়ানীদের উপাসনালয়ে বোমা নিক্ষেপ করে ৮ জনকে হত্যা করা হলো এবং ফরিদপুর জেলার এক মাজারে বোমা নিক্ষেপ করে হত্যা করা হলো ৪ জনকে । ২০০১ সালের ২০শে জানুয়ারী ঢাকার পল্টন মাঠে কমিউনিস্ট পার্টির সমাবেশে বোমা হামলা করে হত্যা করা হলো ৭ জনকে এবং  একই সময়ে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বোমা বিস্ফোরন ঘটানো হলো । ২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল পহেলা বৈশাখে ঢাকার রমনা বটমুলে নববর্ষের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করে ১০ জনকে হত্যা করা হলো । ২০০১ সালের জুন মাসের ৩ তারিখে গোপালগঞ্জের বানিয়ারচরের একটি গির্জায় বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়ে ১০ জনকে হত্যা করেছে । একই বছরের ঘটনা অর্থাৎ কয়েকদিন পর ১৫ই জুন নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরন করে হত্যা করা হয় ২২ জনকে । ২৩শে সেপ্টেম্বর বাঘেরহাটের মোল্লারহাটে বোমা বিস্ফোরন করে হত্যা করলো ৮ জনকে । ২৬শে সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে আওয়ামীলীগ সমাবেশে বোমা নিক্ষেপ করে হত্যা করলো ৪ জনকে ।
অর্থাৎ ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০১ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বোমা নিক্ষেপ করে অনেক মানুষ হত্যা করা হয়েছিলো, চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে কয়েক শত মানুষকে এবং কয়েক কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট করা হয়েছিলো । এসব বোমাবাজি যেখানে যেখানে ঘটলো বা ঘটানো হলো, সেখানের কোথাও 'আল্লাহর আইন চালু'র দাবি তুলে বোমা নিক্ষেপ হয়েছে বলে শোনা যায়নি এবং 'আল্লাহর আইন চালু'র পক্ষে কোন সংগঠনের লিফলেটও পাওয়া যায়নি । এ সময়ে বাংলাদেশের কোন একটি আদালতের  বিচারককেও হুমকি দিয়ে কেউ-ই কোনো চিঠি দিলো না, আদালতেও কেউ বোমা নিক্ষেপ করলো না এবং আত্মঘাতিকোনো লোকেরও সন্ধান পাওয়া গেলো না ।
বাংলাদেশকে 'অকার্যকর ও ব্যর্থরাষ্ট্র' হিসেবেও কোন মহল থেকে চিহ্নিত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হলো না ।
২০০১ সালের ১লা অক্টোবরের নির্বাচনে ইসলামী মুল্যবোধে বিশ্বাসী চার দলীয় ঐক্যজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শাসন ক্ষমতায় আসীন হলো । ইতিপূর্বে যখন কুকুরের মাথায় টুপি পরিয়ে ইসলামপন্থীদের অমর্যাদা করা হয়েছে, খুনের অভিযোগে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হকের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীন আলেমকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়েছে, মসজিদ মাদরাসা বন্ধ করা হয়েছে, অগণিত আলেম উলামাকে গ্রেফতার করে জেলখানা পরিপূর্ণ করা হয়েছে । সেখানে ১লা অক্টোবরের নির্বাচনের পরে আলেম-উলামাগন সম্মান মর্যাদার আসনে আসীন হয়েছেন । প্রচার মাধ্যমে তারা বক্তব্য রাখার ও সরকারী অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েছেন । প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য মন্ত্রী ও এমপিগন আলেমদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন, মাদরাসা শিক্ষার প্রতি সরকার গুরুত্ব দিয়েছিলো ও সন্ত্রাস নির্মূলের লক্ষে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছিলো ফলে বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছিলো । এই যখন দেশের বাস্তব অবস্থা, ঠিক তখনই চার দলীয় জোট সরকারের শেষ বছরে হঠাৎ করে নানা ধরনের ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম দিয়ে 'আল্লাহর আইন চালু'র নামে আত্মঘাতি বোমাবাজদের মাধ্যমে দেশে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করা  এবং সরকারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছিলো ।

ইসলামের নাম শুনলেই যাদের গাত্রদাহ শুরু হয় এবং আলেম দেখলেই যাদের নাকে কয়েকটি ভাজ দেখা যয়, কুকুরের মাথায় টুপি পরিয়ে যারা ইসলামকে ব্যং-বিদ্রুপ করে, মাদরাসাকে যারা মৌলবাদী ও সন্ত্রাসীদের আখড়া বলে চিহ্নিত করে, সংবিধানের শুরু থেকে  "বিসমিল্লাহ" মুছে দিতে চায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম থেকে যারা কুরআনের আয়াত মুছে দেয়, নাস্তিক-মুরতাদদের যারা পরম হিতৈষী -বন্ধু এবং আলেমদেরকে শত্রু মনে করে, চারদলীয় জোটকে ক্ষমতায় যাবার প্রধান বাধা মনে করে যারা, জোট ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র-এ ব্যর্থ হয়ে প্রকাশ্যে দাবি তোলে, উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের লক্ষে জাতীয় ঐক্য গড়ার লক্ষে যারা আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায়, 'আল্লাহর আইন চালু'র নামে আত্মঘাতি বোমাবাজ তাদেরই তত্ত্বাবধানে সৃষ্টি ও পরিচালিত হচ্ছে কিনা, এ প্রশ্ন বর্তমানে সর্বস্তরের নাগরিকদের মনে সৃষ্টি হয়েছে ।   ***** চলবে *****