মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৫

চিন্তা কি, মরলে শহীদ, বাচলে গাজী ।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়ার সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল-মুহাম্মাদ কামারুজজামানকে দেখেছিলাম কাশিমপুর কারাগার-২, ফাসির সেল এর ২১ নাম্বার রুমে । আমাকে প্রথম গ্রেফতারের পর কাশিমপুর কারাগারের ফাসির সেল ১১ নম্বার রুমে রাখা হয়েছিলো । সেখানে বসেই ২৮ ফেব্রুয়ারীতে আব্বার বিরুদ্ধে শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যা অপবাদের, ন্যায়ভ্রষ্ট রায় শুনেছিলাম । সেখানে বসেই  মুহাম্মাদ কামারুজজামান চাচার বিরুদ্ধে দেয়া ন্যায়ভ্রষ্ট রায় শুনেছি । সেদিন ছিলো ৯ মে ২০১৩ । রায়ের দিন সকালে কাশিমপুর ডিভিশন থেকে  কামারুজ্জামান সাহেবকে ট্রাইবুনালে হাজির করে । রায় ঘোষণার পর পরই কাশিমপুর নিয়ে আসে ।
ডিভিশন বাতিল হয়ে যায়, তাকে দেয়া হয় ফাসির সেলে । আমার রুমের ঠিক পেছনের রুমে । সন্ধ্যা হয়ে যাওয়াতে ঐ দিন আমাদের দেখা হয়নি ।
পরদিন বিকালে আমার লকআপ খুললো কিন্তু কামারুজজামানের রুম লক । তিনি বের হতে পারবেন না । ২৪ ঘণ্টা লকআপ, ঊপরের নির্দেশ । আমার ঐদিকটায় যাওয়া নিষেধ করে দেয়া  হলো । মন তো মানে না । চাচাকে দেখতে খুব ইচ্ছা করছে । কি করি ? ৬টায় লকআপ টাইম, এসময় কারারক্ষীদের বদলি হয় । অদল বদলের এক ফাকে চাচাকে দেখে আসলাম । আলহামদুলিল্লাহ, তিনি তখন একবিন্দুও বিচলিত ছিলেন না । তার কথায় কোন দুশ্চিন্তা ছিলো না । তাকে বরং অনেক দৃঢ় মনে হয়েছে । আমি জিজ্ঞেস করলাম কিছু কি লাগবে ? শুধু বললেনঃ দোয়া করো যেন সুস্থ থাকি, দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে কস্ট হয় চেয়ার হলে ভালো হতো । আমি জানালাম চেয়ার নাই, টুল হলে চলবে ? তিনি বললে্‌ চলবে । ব্যাস, রুমে চলে আসলাম । সেবক কে দিয়ে টুল পাঠিয়ে দিলাম । ৯ দিন পর, আমি ১৮ মে জামিন পেলাম । বিদায় নিতে তার কাছে গিয়েছিলাম । আব্বাকে সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব দিয়েছিলো । তারপর আর দেখা হয়নি । আপিল বিভাগে সেই একই রায় । রিভিউ আপিল খারিজ । যে কোন মুহূর্তে কিছু একটা অঘটন ঘটতে পারে । গতকাল থেকে
ইলেক্ট্রনিক্স এবং প্রিন্টিং মিডিয়া অতিমাত্রায় তৎপর ।
আলহামদুলিল্লাহ...
যার মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে হয়তো কয়েক ঘন্টার মধ্যেই চলে যাবেন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে । তিনি তখন এবং এখনও বিচলিত নন  । হাসিমুখে বিদায় জানাচ্ছেন পরিবারকে ।  বলে দিয়েছেন আল্লাহই সবচেয়ে বড় অভিবাবক । অথচ তাঁকে দিয়ে প্রানভিক্ষা চাওয়ার কতরকম প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে । আইনমন্ত্রী বলছেন মাত্র দুই ঘন্টা সময় পাবেন । টিভিতে দেখানো হচ্ছে কফিন ঢুকছে ।  কাফনের কাপড় ঢুকে গেছে । ফাঁসির দড়ি পরানোর মই কারাগারে ঢুকছে ।
বাইরে অপেক্ষা করছে শত শত পুলিশ ।  সাংবাদিক সহ হাজারো উৎসুক জনতা । কিন্তু যার জন্য এতকিছু হচ্ছে তিনি একদম স্বাভাবিক । তার পরিবার, সন্তানরা স্বাভাবিক ।
একবার ভাবুনতো আল্লাহর কত খালেস বান্দা হলে এমনটা হয়া যায় ।  সত্যের পথে জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে একদল লোক পিছু হটার পথ নেয় আর আরেক দল হয় আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ।  আমরা যেনো আরো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারি । আল্লাহ তায়ালা নবি রাসুল আর পাঠাবেননা কিন্তু তাঁদের কার্যক্রম কি বন্ধ থাকবে... ? কক্ষনো না । যুগে যুগে যারা জান্নাতি পাখি হয়ে চলে গেছে তাঁদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে । আল্লাহ যেন আমাদেরকে জান্নাতিদের দলে জায়গা করে দেন । আমিন ।। আর জাহান্নামের লাকড়ি হওয়ার জন্য ফেরাউন, নমরুদ,  আবুজেহেলদের দলে আজকের জালিমেরা যুক্ত হতে থাকবে ।
শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা বলেছেনঃ নাবুয়াতের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, শাহাদাতের দরজা বন্ধ হয়নি । কামারুজ্জামান বললেনঃ যেদিন থেকে ইসলামী আন্দোলনের নাম লিখেছি, সেদিন থেকে শহীদ হওয়ার বাসনা লালন করছি । ক্ষমা চাইবো আল্লাহর কাছে যিনি আমাকে সৃস্টি করেছেন ।
শুধু বলতে চাই, মালিক তুমি জান্নাতে তোমার পাশে আমার একটি ঘর বানিয়ে দিও । 

সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৫

যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তোমরা তাদেরকে মৃত বলোনা

হে ঐ সমস্ত লোকেরা, যারা ঈমান এনেছো ! তোমরা সবর করো এবং সালাত দ্বারা সাহায্য শক্তি অর্জন করো । নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে থাকেন । যারা "ফি সাবিলিল্লাহ"
আল্লাহর পথে নিহত হয়, তোমরা তাদেরকে মৃত বলোনা; প্রকৃত পক্ষে তারা জীবিত । কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পারো না । আর অবশ্য অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা নেবো ভয় ভীতি দিয়ে, ক্ষুধা অনাহার দিয়ে এবং অর্থ সম্পদ, যান প্রান ও ফল ফসলের ক্ষয় ক্ষতি দিয়ে । তবে সুসংবাদ দাও, 'সবর' অবলম্বনকারীদের । যারা বিপদ মুসিবতে আক্রান্ত হলে বলেঃ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিচশয়ই আমরা তারই কাছে ফিরে যাবো । এরা সেই সব লোক, যাদের প্রতি তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে বর্ষিত হয় ক্ষমা ও করুনা এবং রহমত । আর তারাই হেদায়েত প্রাপ্ত ।
(সুরা আল-বাক্বারাহ-১৫৩-১৫৭)
O you who have believed, seek help through patience and prayer. Indeed, Allah is with the patient. And do not say, about those who are killed in the way of Allah, "They are dead" Rather they are alive, but you perceive it not. And We will surely test you with something of fear and hunger and a loss of wealth, and lives and fruits, but give good tidings to the patient. Who when disaster strikes them, say, " Indeed, we belong to Allah, and indeed to Him we will return." Those are the ones upon whom are blessings from their Lord and mercy. And it is those who are the rightly guided.
(Sura al-Baqarah- 153-157)

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০১৫

বাংলাদেশে ইসলামী পুনজাগরনে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদান

বাংলাদেশে ইসলামী পুনজাগরনে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদান ।

আরশে আযীমে পৌঁছে গেলো জনকের আবেদন ।
৬ ফেব্রুয়ারী শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী । সেদিন প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে র‍্যালি বের হবে রাজধানী ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনিস্টিটিউটে শিবির এক সেমিনার আয়োজন করেছিলো । আল্লামা সাঈদী সেই অনুষ্ঠানের ছিলেন প্রধান অতিথি । শহীদ বাগের বাসা থেকে বায়তুল মোকাররম রওনা দিবেন এমন সময় পিরোজপুর থেকে ফোনের মাধ্যমে পৌঁছেছিলো সেই ভয়াবহ
বিশ্ব নন্দিত মুফাসসীরে কুরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, তার হৃদয়ের সবটুকু মমতা উজার করে আপন পিতা মাতার খেদমত করতেন । তার সম্মানিত পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী ছিলেন মহান আল্লাহর একনিষ্ঠ প্রেমিক । ফজরের নামাজ আদায় করে তিনি স্থান ত্যাগ করতেন না । কোরআন তেলাওয়াত অথবা হাদীসে বর্ণিত আল্লাহুর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো দোয়া দুরুদ পড়তেন । সূর্য উদিত হবার পরে তিনি ইশরাকের নামাজ আদায় করতেন । তারপর দয়াময় মেহেরবান আল্লাহর শাহী দরবারে দুহাত উঠাতেন । কলিজার টুকরা সন্তানের জন্য অশ্রু ধারায় বুক ভাসিয়ে আল্লাহর কাছে নিবেদন করতেন, হে আল্লাহ! তুমি আমার সন্তান দেলাওয়ারকে তোমার পক্ষ থেকে তোমার দ্বীনকে বুঝার মতো জ্ঞান দান করো । তোমার দ্বীনের দাঈ হিসেবে কবুল করে নাও । আমার দেলাওয়ারকে তুমি "সুলতানু্ল ওয়ায়েজীন" বানিয়ে দাও ।
আরশে আযীমের মালিক মহান আল্লাহ তার প্রেমিকের দোয়া মঞ্জুর করে নিয়েছেন । আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার প্রেমিকের সন্তান দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সুলতানুল ওয়ায়েজীন অর্থাৎ বক্তা সম্রাট বানিয়েছেন । তার পিতা মাওলানা ইউসুফ সাঈদী (রাহঃ) একবার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার সন্তান দেলাওয়ার মেঘের উপর আসীন হয়ে বক্তৃতা করছেন । মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে এই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিলো বলেই ধারনা করা যায় । কারন আল্লামা সাঈদী এমন এক সময়, এমন এক পরিবেশে কুরআনের বিপ্লবী দাওয়াত নিয়ে ময়দানে এসেছিলেন যখন চারিদিকে বিরাজ করছিলো বাতিল সৃষ্ট অন্ধকারের ঘনঘটা । এই অন্ধকার বলিষ্ঠ কদমে দলিত মথিত করে এগিয়ে যাচ্ছেন । যে পিতা প্রানভরে আপন সন্তানের জন্য দোয়া করতেন, সেই পিতা আর এই পৃথিবীতে নেই । মহান আল্লাহর ডাকে সেই গর্বিত পিতা পৃথিবী ত্যাগ করেছেন ১৯৮৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী ।  
৬ ফেব্রুয়ারী শহীদি কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী । সেদিন প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে র‍্যালি বের হবে রাজধানী ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনিস্টিটিউটে  শিবির এক সেমিনার আয়োজন করেছিলো । আল্লামা সাঈদী সেই অনুষ্ঠানের ছিলেন প্রধান অতিথি । শহীদ বাগের বাসা থেকে বায়তুল মোকাররম রওনা দিবেন এমন সময় পিরোজপুর থেকে ফোনের মাধ্যমে পৌঁছেছিলো সেই ভয়াবহ শোকের সংবাদ - তার প্রিয় শ্রদ্ধেয় জনক আর নেই ।
কিন্তু মহান আল্লাহর ফয়সালা ছিলো ভিন্ন । স্নেহদাতা পিতার ইন্তেকালের মুহূর্তে  তিনি তার পাশে থাকতে পারেন নি । তার শ্রদ্ধেয় পিতার ইন্তেকাল পূর্ব অবস্থার কথা তার মমতাময়ী মা এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'আমার সন্তানের পিতা প্রবল জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন । শেষ মুহূর্তে তিনি খুবই অস্থিরতা প্রকাশ করছিলেন, এবং কখনো কখনো তিনি জ্ঞানহারা হয়ে যেতেন । জ্ঞান ফিরে আসিতেই আদরের সন্তান দেলাওয়ার এসেছে কিনা জানতে চাইতেন । আমি তার জীবন সাথী হিসেবে আসার পর থেকেই দেখেছি, তিনি মহান আল্লাহ তায়ালাকে অত্যন্ত ভয় করতেন এবং তাহাজ্জুদের নামাজ কাজা করতেন না । ইন্তেকালের পূর্বে মুমিনের মৃত্যুর সকল চিহ্ন তার চেহারায় ফুটে উঠলো । আমি লক্ষ করলাম, দেলাওয়ার বাইরে থেকে বাড়িতে এলে ওকে দেখে তার মুখে যেমন স্নিগ্ধ হাসি ফূটতো, ইন্তেকাল পূর্ব মুহূর্তে  ঠিক সেই হাসিই ফুটে উঠলো এবং তিনি এমনভাবে তাকালেন যে, মনে হচ্ছে যেন তিনি প্রিয় দেলাওয়ারকে দেখছেন । এরপর তিনি শুন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন । মনে হলো যেন তিনি দেলাওয়ারের হাত যেভাবে ধরতেন, ঠিক সেভাবেই কিছু একটা ধরলেন এবং বুকের উপর রাখলেন । আমি তাকিয়ে রয়েছি তার স্নিগ্ধ মুখের দিকে । তিনি হাসছেন । এ অবস্থাতেই তিনি চোখ বন্ধ করলেন । আমি দেখলাম, তার কপাল ঘেমে গেলো । তারপরই অনুভব করলাম, দেলাওয়ারের আব্বা আর নেই ' । আল্লামা সাঈদী বলেন, 'সংবাদ পেয়ে আমি যখন পিরোজপুর বাড়িতে পৌঁছে আব্বাকে দেখলাম, তখন আমার মনে হলো, আমি যেন জীবিত ঘুমন্ত আব্বাকে দেখছি । মুখে ফূটে রয়েছে মধুর হাসি । আব্বার শরীরে হাত দিয়ে দেখলাম, তখনও তার শরীর উষ্ণ এবং কবরে নামানোর সময়েও তার শরীর হালকা হালকা উষ্ণই ছিলো ।
পৃথিবীতে যতদিন এই কামেল পুরুষ অবস্থান করেছিলেন, ততোদিন তিনি হৃদয়-মন উজাড় করে তার খেদমত করেছেন । কর্মব্যাপদেশে বাড়ীতে অবস্থান করা আল্লামা সাঈদীর তেমন সম্ভব হয়নি । যতক্ষন বাড়িতে থেকেছেন ততোক্ষনই তিনি মাতা পিতার সান্নিধ্যে থেকে তাদের সেবা যত্ন করেছেন । বিদেশ থেকে বা দেশেরই অন্যস্থান থেকে বাড়িতে এসেই মাতার কুশলাদি জেনেছেন । তার আব্বা ডাকের সাড়া দেয়া সেই  স্নেহদাতা পিতা আর রইলো না । গোটা পৃথিবীব্যাপী তিনি আব্বা আব্বা বলে আর্তচিৎকার  করলেও তার করুন আর্তনাদে সাড়া দেয়ার মতো আর কেউ রইলো না । মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা মাওলানা ইউসুফ সাঈদীকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন । আমীন ইয়া রাব্বুল আলামীন ।

মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০১৫

উদিত হলো সেই সৌভাগ্য শশী

উদিত হলো সেই সৌভাগ্য শশী

আল্লামা সাঈদীঃ হাজার কোটি প্রদীপ জ্বালায় -নিজে অমর অক্ষয় ।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সৃষ্টি এই বিশাল বিস্তীর্ণ পৃথিবী একটি সুবাসিত পুস্প কানন বিশেষ । পুস্পের এই কাননে কতো না হাজার ফুল প্রতিদিন ফোটে । সব ফুলই দৃষ্টি নন্দন হয়না, দিগন্ত  মাঝে ছড়িয়ে দেবার মতো সৌরভ মহান আল্লাহ সব ফুলের ভিতরে দান করেন না । সমস্ত ফুলের ঘ্রানে সব মানুষ মাতোয়ারা হয় না । কোন ফুল অবহেলা অনাদরে ঝরে যায় । অনাদরে অবহেলায় ঝরে যাওয়া ফুলের সংখ্যা এ পৃথিবীতে বেশী । কিন্তু এমন কতকগুলো বিরল ফুল এ পৃথিবীতে ফুটেছে যার ফোটার অপেক্ষায় এ আকাশ এ পৃথিবী, পৃথিবীর প্রতিটি অনু-পরমানু শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপেক্ষা করেছে । অবশেষে প্রতিক্ষার প্রহর অতিবাহিত হয়েছে, কাংক্ষিত ফুল ফুটেছে, পৃথিবী নামক পুস্প কানন সুবাসিত হয়েছে । এই কাংক্ষিত-প্রতিক্ষীত জান্নাতী ফুল গূলো ছিলেন মহান আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসুলগন ।
নবী কারিম  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সেই জান্নাতী ফুলগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ । তিনি এমন এক প্রদীপ, তার জান্নাতী আলো থেকে শতকোটি প্রদীপ জ্বলে উঠেছে কিন্তু তার আলো কখনো শেষ হবার নয় । কবির ভাষায়ঃ সে যে হাজার কোটি প্রদীপ জ্বালায় -নিজে অমর অক্ষয় ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আদর্শ প্রচার প্রসার ও প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন, তা কোন কালের গন্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় । তার আদর্শের সৌরভে পৃথিবীকে আমোদিত করার মহান আল্লাহর অদৃশ্য ব্যবস্থাপনায় মুসলিম মিল্লাতের এই বাগানে কিছু বিরল ফুল প্রতিটি যুগেই ফুটেছে । আগামীতেও ফুটতে থাকবে ।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সেই বিরল ফুলগুলোর একটি । এই সাঈদী নামক ফুলের সৌরভ দিক দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে । সে ফুলের মন মাতানো সৌরভে মহাসত্যের ওপরে শতাব্দী সঞ্চিত আবর্জনা দুরিভুত হয় । মহাসত্যের দিকে ধেয়ে আসা বাতিল তার ঘৃণ্য কুৎসিত হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় । আল্লামা সাঈদী সেই দুর্লভ ফুল, যার প্রচেস্টায় দুরভিত হচ্ছিলো মুসলিম জাতির ওপরে পুঞ্জিভুত আবর্জনার স্তুপ । যার ব্জ্র হুংকারে অভিশপ্ত বাতিল শক্তি তার ঘৃণ্য কালো থাবা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছিলো ।
মহাসত্যের শত্রুদের হৃদকম্পন জাগবে যার বলিষ্ঠ কন্ঠে-সেই মনিষী মায়ের কোল আলো করে  পৃথিবীতে এলেন পবিত্র রমযান মাসে । মহাসত্যের দ্যুতি বিকিরনের পবিত্র মাস । রমযান-রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস । অশুভ শক্তির শেষ ঠিকানা জাহান্নামের দুয়ার বন্ধ করার এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করার মাস । রমযান মাস সেই মহা সউভাগ্যবান মাস- যে মাসে সত্য আর মিথ্যার পার্থক্যকারী -গোটা মানব জাতির জীবন বিধান মহাগ্রন্থ আল কোরআন হেরার রাজ তোরনে শোষিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানবতার মুক্তির দিশারী বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছিলো । আল-কোরআন এসেছিলো রমযান মাসে আর কোরআনের অকুতভয় সৈনিক আল্লামা সাঈদীকেও পৃথিবী নামক পুস্প কাননের ফুল হিসেবে ফোটানোর জন্য এই পবিত্র মাসকেই আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা নির্বাচিত করলেন । 
সেদিন ছিলো ১৯৪০ সনের ফেব্রুয়ারী মাসের ২ তারিখ ।  বরকতে পরিপূর্ণ সেই পবিত্র রমযান মাসের ৭ তারিখ বৃহস্পতি বার । ক্ষণপূর্বে আকাশের পূর্ব প্রান্তে পূর্বাশার ইশারা দেখা দিয়েছিলো । প্রকৃতি জুড়ে বিরাজ করছিলো শীতের আমেজ । শত সহস্র কন্ঠে তাওহিদের বলিষ্ঠ ঘোষণা- ফগরের আযান ধ্বনিত হলো । ফজরের নামায শেষে শুরু হলো সেই কাংখিত দিনের । তরুণ তপন উদিত হলো । শীতের পরিবেশে ছড়িয়ে দিলো মিস্টি মধুর আবেশ । ক্রমশ আলোকিত হয়ে উঠলো অন্ধকার এই পৃথিবী । সদ্য উদিত সূর্য তার সোনালী আভায়  পৃথিবীকে সজীব করে তুললো যেই মুহূর্তে- আল কোরআনের জান্নাতী আলোয় যিনি পথহারা মানুষকে আলোকিত করবেন, পৃথিবী নামক পুস্প কাননে ঠিক সেই মুহূর্তে ফুটলো সেই বিরল ফুল । রত্নগর্ভা জননীর কোল আলোকিত করে এলেন অপরুপ সেই শিশু । তার দুকানে শুনিয়ে দেয়া হলো তাওহিদের ঘোষণা । এই ঘোষণার মধ্যদিয়ে অলক্ষে শিশুকে যেন জানিয়ে দেয়া হলো, তাওহীদের এই ঘোষণা তোমাকেই বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে হবে ।
ইসলামী সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ মুসলিম শিশুর অর্থবহ নামকরন । বড় হয়ে ওই সুন্দর নামেই পরিচিতি পাবে । আল্লাহর ওলী ভারতের ফুরফুরা শরীফের মরহুম পীর হযরত মাওলানা আবু জাফর সিদ্দিকী আল কোরাইশী (রাহঃ) দাওয়াতী সফরে এদেশে আগমন করলেন । শিশুর পিত্রালয়ে দাওয়াত দেয়া হলে, তিনি সে দাওয়াত কবুল করে আগমন করলেন । তাকে নাম রাখার অনুরোধ করলে, অপরুপ শিশুকে গভীর মমতায় তিনি কোলে তুলে নিলেন ।  তিনি শিশুর নাম রাখলেন "দেলাওয়ার" ।  "দেলাওয়ার" শব্দটি ফার্সি ভাষার, এর শব্দার্থ "যুদ্ধে বিজয়ী বীর" । কালের বিবর্তনে বর্তমানের  "দেলাওয়ার" আল্লাহর কোরআনের লড়াকু সৈনিক-ইসলামের বীর যোদ্ধা । সাঈদী হলো তার পূর্ব পুরুষের উপাধি । বংশ পরম্পরায় তার নামের সাথেও যুক্ত হলো এই উপাধি । 
পরিপূর্ণ নাম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, যে নাম শুনলে কোরআন প্রেমিকদের হৃদয়ে এক জান্নাতি আবেশের সৃষ্টি হয় । গভীর শ্রদ্ধায় পরম মমতায় কন্ঠ হতে নির্গত হয় সে নামটি । তার পিতা হযরত মাওলানা ইউসুফ সাঈদী (রাহঃ) ছিলেন তার যুগের সুবক্তা ও কামেলে পীর । শিশু সাঈদীর পিতা মাতা উভয়ের জীবন-যাপন প্রনালী ছিলো পূর্ণ ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক । সুতরাং সেই শৈশব থেকেই  সাঈদীর কোমল কচি হৃদয়ে ইসলামী ভাবধারার পূর্ণ চিত্র অঙ্কিত হয়েছিলো । শিশু সাঈদী যখন শিক্ষা ধারন করার ক্ষমতা অর্জন করলো, পিতা তাকে জ্ঞানার্জনের জন্য ভর্তি করে দিলেন পিরোজপুরে নিজ প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় ।  
জ্ঞানার্জনের জগতে শিশু সাঈদী প্রবেশ করলেন । জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা তাকে জ্ঞানের গভীর জগতের দিকে টেনে নিয়ে গেলো । তিনি ভর্তি হলেন উপমাহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শরসিনা মাদরাসায় । সেখান থেকে খুলনা আলীয়া মাদরাসায় লেখা পড়া করলেন । ছাত্র জীবনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় কোরআনের এই নির্ভীক সৈনিক অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন । তার বক্তৃতা প্রদানের কৌশল, স্পষ্ট উচ্চারন, সাবলীল ভাষা, শব্দ চয়নে নৈপুণ্যতা ও বাচন ভঙ্গি শ্রোতাদেরকে বিমোহিত করতো । ১৯৬২ সনে তিনি মাদরাসার স্রবচ্চো ডিগ্রী অর্জন করেন । তিনি অনুভব করলেন পাশ্চত্যের বস্তুবাদ আর জড়বাদী জীবন দর্শন বর্তমানে মুসলিম জাতিকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করছে । কাল মার্কসের নাস্তিক্যবাদী দর্শন সমাজতন্ত্র মুসলমানদেরকে নাস্তিকে পরিনত করছে । সুতরাং বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত মতবাদ-মতাদর্শের মোকাবেলায় ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতে হলে এসব মতবাদের নিগুঢ় তত্ব জেনে এর দুর্বলতা সমুহ মানব জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে । 
বিশাল কর্মময় জীবনে নিজ গ্রামের বাইরে তিনি সর্বপ্রথম বক্তৃতা করেন পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠি স্কুলের ময়দানে । তার কর্মের ময়দান কুসুমাস্তীর্ণ নয়- কণ্টকাকীর্ণ এই ময়দান । এ ময়দানে পা রাখার অর্থই হলো শাহাদাতের উত্তপ্ত ময়দানে পা রাখা । 
"ইয়ে শাহাদাত গাহে উলফত মে কদম রাখনা 
লোগ সমাঝতা হ্যায়, আছান হ্যাঁয় মুসলমান হোনা " (চলবে)

সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০১৫

বাংলাদেশে ইসলামী পুনজাগরনে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদান

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী
মুক্তি পাগল জনতার কাছে শ্রদ্ধাভরে বারংবার উচ্চারিত একটি নাম- একটি আন্দোলন- একটি প্রতিষ্ঠান । মুসলিম বিশ্বে সুপরিচিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব । আল্লাহর কোরআনের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে তার অবদান মুসলিম বিশ্বের গন্ডি অতিক্রম করে অমুসলিম বিশ্ব তথা পাশ্চাত্য জগতেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । আপন মহিমায় ভাস্বর আল্লামা সাঈদীর একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও অসাধারন বাগ্মী । মুসলিম জাহানের চিন্তাশীল মহলে তার সম্মান ও মর্যাদা আকাশচুম্বী । এদেশের মুসলমানদের জন্য তার অবদান এতোটা বিশাল্ ও প্রশস্ত যে, তা ভাসার তুলিতে প্রকাশ করা আমার মতো নগন্য মানুষের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয় ।
বাংলাদেশের মুসলমানদের চরম দুর্দিনে তিনি মহাগ্রন্থ আল কোরআনের বিপ্লবি আহ্বান নিয়ে যে কোন ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হয়ে কান্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন । বাংলাদেশে আল কোরআনের রাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে তিনি যে জাগরন সৃষ্টি করেছেন, এমন কোন শক্তির বর্তমানে অস্তিত্ব নেই যে এই ইসলামী জাগরনকে আবদামিত করতে পারে । আল্লামা সাঈদী বাংলাদেশের নির্যাতিত জনতার বন্ধু শুধু নন, ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে ব্জ্র কঠিন আপোষহীন ভূমিকা গ্রহন করার কারনে গোটা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলমানদের কন্ঠস্বর হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করেছেন । জনপ্রিয়তার যে কোনো মানদণ্ডে উত্তীর্ণ আল্লাম সাঈদী গোটা জাতির কাছে যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী ।
১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ জাতি নিজের স্বকীয় আদর্শের ভিত্তিতে একটি সুন্দর সুখী সমৃদ্ধশালী জীবন ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলো । মধুর স্বপ্ন বুকে ধারন করে মরনপন যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছিলো । কিন্তু জাতির কুসুমাস্তীর্ণ পথ তৎকালীন সরকারের সরযন্ত্রের দানব সৃষ্ট প্রবল ভূমিকম্পে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বসে পড়লো । গোটা জাতি যেন নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢেকে গেলো । নিশা-মহানিশা নেমে এলো জাতীয় জীবনে । কোথাও সামান্যতম আলোর রেখাটুকু বাকি রইলো না । জাতীয় জীবনে সুখসূর্য স্বৈরাচারের পদতলে নিস্প্রভ হয়ে পড়লো । গোটা জাতির খরস্রোতা জীবন নদীর তলদেশে তৎকালীন সরকারের তৈরি দূষিত বর্জ্য আর শৈবালদাম ঘন ও স্তূপীকৃত হয়ে স্রোতস্বিনীর গতিকে  হরন করলো ।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সরকারের আমন্ত্রিত অতিথি ব্রাম্মন্যবাদ বাংলার মুসলমান তরুন, যুবকদের সমগ্র বোধশক্তির উপরে চিরতরে মহা বিস্মৃতির কৃষ্ণকালো অন্ধকারের যবনিকা টেনে দেবার যাবতীয় ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করলো । জাতীয় জীবনের যেখানে শুরু, সেখানেই নামিয়ে দেয়া হলো অভিশাপের সর্বগ্রাসী অনল প্রবাহ । দেশের সেও ক্রান্তিলগ্নে তওহীদি জনতার বিপ্লবী কন্ঠস্বর হিসেবে আল্লামা সাঈদী অকুতোভয়ে সিংহ গর্জনে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন । ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, নমরুদ যেখানে কথা বলার চেস্টা করেছে, ইবরাহীম (আঃ) সেখানে আবির্ভূত হয়ে নমরুদের বাকশক্তি রুদ্ধ করে দিয়েছেন । যেখানে ফেরাউন হামাগুড়ি দেয়ার চেস্টা করেছে, সেখানেই মুসা (আঃ) গর্জন করে উঠেছেন ।  যেখানে আবু জেহেল ফনা বিস্তার কপ্রার চেস্টা করেছে, সেখানেই ওমর, আবুবকর (রাঃ) সে ফনা দলিত মথিত করেছেন ।
আল্লামা সাঈদীর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বকে মুল্যায়ন করে কিছু লেখার সামান্যতম যোগ্যতা আমার নেই । তার চলমান বিশাল কর্মময় জীবনের স্মরণীয় ঘটনা সমুহ যতোটুকু জানি, জাতীয় জীবনে তার প্রভাব সম্পর্কে যা অনুভব করি, তা ধীরে ধীরে আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেস্টা করবো ইনশাআল্লাহ ।
আল্লামা সাঈদীকে ঘনিষ্ঠভাবে জানার জন্য দেশে বিদেশের অগনিত মানুষের বুকে রয়েছে অসীম পিপাসা । তার গৌরবময় জীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ব্যক্তিদের কিছুটা পিপাস দূর করবে আমার বিশ্বাস ।  (চলবে)



বাংলাদেশে ইসলামী পুনজাগরনে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদান