বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০১৫

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিটি একান্তভাবে ভারতের করে নেয়ার প্রচেষ্টা

দুই নেত্রীর সমঝোতা ও মোদির ঢাকা সফর

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মাঝে মধ্যে বাঁক পরিবর্তন যেন একটি বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্য নানা উপকরণ ক্রিয়াশীল রয়েছে। তবে রাজনীতি বা ক্ষমতা দিয়ে যতটা কার্যকরভাবে এর নিয়ন্ত্রণ করা যায় ততটা অর্থনীতি বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে সম্ভব হয় না। যদিও অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার বা অন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতিকে আলাদা করা যাবে এমনটিও নয়। যেকোনো দেশের রাজনীতির ওপর বাইরের তথা আন্তর্জাতিক একটি প্রভাব সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলে এই প্রভাব থাকে খানিকটা বেশি। যেসব দেশ রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা, অর্থনীতি ও অগ্রগতির টেকসই ভিত্তি দিয়ে এই প্রভাবে ভারসাম্য নিয়ে আসতে সফল হয়, সে দেশের স্থিতি ততটাই নিশ্চিত হয়। আর ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে এর বিপরীতটিই দেখা যায়। রাষ্ট্র হয়ে পড়ে কোনো শক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল। বাংলাদেশে এই প্রবণতা এখন প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে।
২০০৭ সালের জানুয়ারির পর থেকে বাংলাদেশের ভারসাম্যে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নানা পরিবর্তন আসতে থাকে। এই পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখে রাষ্ট্রের শক্তিমান নানা অংশ এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রকদের অনেকে। ২০০৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। গত দু’টি কলামের একটিতে চলমান রাজনীতি এবং ঘটমান ঘটনার গন্তব্য নিয়ে আলোকপাত করা হয়। অপরটিতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতিতে বিভক্তি আনার একটি প্রচেষ্টা ও এর আন্তর্জাতিক অভিঘাতের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। শেষোল্লিখিত আলোচনাটির ফোকাসে ছিল একটি বিশেষ প্রচারণার কিছু ইস্যু। এ ক্ষেত্রে নয়া দিগন্তের পাঠকদের সাড়াও ছিল আশাতীত। বেশ কয়েকজন পাঠকের অনুরোধে এবারো আমার কলামের বিষয়কে অর্থনীতি ও বিশ্বপরিস্থিতির বিশ্লেষণ থেকে সরিয়ে এনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক গতিপথে নিবদ্ধ করা হলো।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আগামী পক্ষ বা মাস বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য হতে পারে বেশ ঘটনাবহুল একটি সময়। জুনের প্রথম সপ্তাহেই বাংলাদেশ সফরে আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। তার এই সফরের আগে বাংলাদেশের সাথে সীমান্তচুক্তি সংসদে অনুমোদন করা হয়েছে। তিস্তার পানিবণ্টনের মতো আরো কিছু ইস্যু নিয়ে কাজ হচ্ছে। সফরটিকে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক পরিবর্তন হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে নয়াদিল্লি। একই সাথে এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠিটি একান্তভাবে ভারতের করে নেয়ার প্রচেষ্টা থাকার লক্ষণও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশে দৃশ্যপটের অন্তরালে বা প্রকাশ্যে নানা ঘটনাই ঘটছে। ঢাকায় আমেরিকান উপমন্ত্রী ওয়েন্ডি ও সহকারী মন্ত্রী নিশা দেসাইয়ের সাম্প্রতিক সফরটি আপাতসাদামাটা মনে হলেও আসলে অতটা তাৎপর্যহীন ছিল না এটি। শেখ হাসিনার সরকার ২০১৩-১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বারিত টিফার কিছু শর্তে পরিবর্তন আনতে চাইছে। এসব শর্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক স্বার্থে হুমকি এবং মার্কিন নাগরিকদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়লে একতরফা সামরিক হস্তপে করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আমেরিকান পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তাদের সফরে এ নিয়ে কতটা কী আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তৃত জানার সুযোগ কম। তবে প্রকাশ্য বাদানুবাদ বা বাংলাদেশকে নসিহত করার আগে আমেরিকাকে নিজের চেহারা আয়নায় দেখে নেয়ার আহ্বান জানানো অথবা দেশটিতে পুলিশের গুলিতে প্রতি বছর দেড় হাজার মানুষ নিহত হওয়ার কল্পিত তথ্য উপস্থাপনের দৃশ্যমান বিষয় ছাড়াও অন্তর্বর্তী সম্পর্কেও কিছু টানাপড়েন লক্ষ করার মতো।
বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল আমেরিকায় বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্লগার অভিজিৎ নিহত হওয়ার ঘটনাটি। বাংলাদেশের পুলিশ কর্তৃপক্ষ ছাড়াও এ ঘটনার তদন্ত করছে এফবিআই। তাদের একটি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে; কিন্তু তাদের কাছে এ ঘটনার সিসিটিভির যে রেকর্ড ঢাকা কর্তৃপক্ষ থেকে হস্তান্তর করা হয়েছে তা নিয়ে রয়েছে অসন্তোষ।
আমেরিকান তদন্তকারীদের কাছে সরবরাহ করা ব্লগার অভিজিৎ হত্যার সিসিটিভি রেকর্ড পরীক্ষা করে তাতে রেকর্ড বিকৃত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, কিন্তু এর কোনো সন্তোষজনক জবাব তারা পায়নি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে আলকায়েদা যে দায়িত্ব স্বীকার করেছে, সেটিকে বিবেচনায় আনতে পরামর্শ দিয়েছে তারা। সিসিটিভি রেকর্ড বিকৃত করার এ ঘটনায় আমেরিকান তদন্তকারীরা সরকারের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে আলকায়েদার অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখতে বলেছে। বিষয়টির জটিলতা আরো বোঝা যায় গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ডা: ইমরান সরকারের এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যে। সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসের নির্মম খুনের পর ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, এর সাথে সরকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা ধর্মান্ধরা জড়িত রয়েছে। তার বক্তব্যের সাথে আমেরিকান পরামর্শের যেন কোথাও এক যোগসূত্র পাওয়া যাচ্ছে। আলকায়েদার চারণভূমির মধ্যে বাংলাদেশ ঢুকে পড়ার বিপত্তি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। আর ব্লগার হত্যার মতো ঘটনায় আলকায়েদার জড়িত থাকার বিষয়টি বাস্তব বা কল্পনা যা-ই ঘটুক না কেন, আমেরিকানরা আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপারে এই স্পর্শকাতর বিষয়টিকে সম্পৃক্ত করে যে বিবেচনা করতে শুরু করেছে তা স্পষ্ট।
বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে পাশ্চাত্যের প্রভাব দুর্বল করে দেয়ার প্রচেষ্টা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই লক্ষ করা গেছে। এখানকার রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের ব্যাপারে তাদের অবস্থানকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাত্তা দেয়া হয়নি। তারা ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনকে গ্রহণ না করার কথা বারবার বলেছে, কিন্তু সরকার ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা এখনো জোর দিয়েই বলে যাচ্ছে। সর্বশেষ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিব তারানকোর বাংলাদেশে আসার কথা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তার সফরকে ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। তাকে এই বলে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ সফরের জন্য এটি মোটেই উপযুক্ত সময় নয়। হয়তো বা নিকট ভবিষ্যতে তার বাংলাদেশে আসা না-ও হতে পারে। জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুনের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনে বেশখানিকটা উত্তপ্ত কথাবার্তায়ও তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। মহাসচিব চাইছিলেন বাংলাদেশের সৃষ্ট রাজনৈতিক সঙ্কট বিরোধী নেত্রীর সাথে আলোচনা করে প্রধানমন্ত্রী নিষ্পন্ন করুক।
সম্প্রতি ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতায় যাওয়া নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সরকারের কাছ থেকেও বৈরী আক্রমণের মুখে পড়েছে মোদি সরকার। নেপাল ভারতীয় সামরিক বাহিনীর নিয়ে যাওয়া ব্যবহৃত ত্রাণসামগ্রী ফিরিয়ে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা চীনা নৌ উপস্থিতি প্রতিস্থাপন করতে আমেরিকাকে স্বাগত জানাতে কেরিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই ভারতীয়দের চীনা নৌ প্রতিস্থাপন করার অনুমতি দেয়া হবে না বলে জানিয়েছে।
শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বেশখানিকটা প্রতিকূল অবস্থা কাটাতে মোদি বাংলাদেশে তার বড় রকমের মিশন সফল করতে চান। জাতিসঙ্ঘ বা পাশ্চাত্যের উদ্যোগ যেখানে ব্যর্থ, সেখানে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে চান তিনি। মোদি দেখাতে চান, এখানকার রাজনৈতিক সঙ্কট দূর করতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতা বা বিরোধ নিষ্পত্তি তিনিই করতে পারেন। এটা প্রমাণ করতে আগেই এখানকার রাজনীতিতে পশ্চিমের যে প্রভাব রয়েছে সেটাকে গৌণ করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। এখন ভারতীয় প্রভাব এতটাই মুখ্য করার প্রচেষ্টা নেয়া হবে, যা শুধু সরকারি পক্ষ নয়, বিরোধী পক্ষকেও মোহাচ্ছন্ন করে রাখবে।
নরেন্দ্র মোদি তার মিশন বাস্তবায়নে অনেক বড় এজেন্ডা ও প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে আসছেন। বাংলাদেশে তার মেগা বিনিয়োগ প্রস্তাবের মধ্যে থাকছে- গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, সেন্টমার্টিনে বিশেষ পর্যটন জোন প্রতিষ্ঠা, ঢাকা হয়ে বেনাপোল থেকে আসাম ও ত্রিপুরা পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণ আর চট্টগ্রাম গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে ত্রিপুরা-মিজোরাম মহাসড়ক সংযোগ নির্মাণ। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে ট্রানজিট বা করিডোর ভারত চাইছিল, সেটি পুরোপুরি কার্যকর করা যাবে। বাণিজ্যিক প্রয়োজনের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা প্রয়োজনে এটাকে ব্যবহার করা গেলে এ অঞ্চলে চীন থেকে ভারতের প্রতি কোনো প্রতিরক্ষা হুমকি সৃষ্টি হলে তা সহজে মোকাবেলা করা যাবে। বাংলাদেশে এই মেগা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলোকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করবে নয়াদিল্লি।
এ ধরনের বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতি প্রতিষ্ঠা করার রয়েছে বিশেষ প্রয়োজন। এ জন্য ভারতের নীতিনির্ধারকেরা এত দিন যে অস্থির অবস্থা এখানে রাজনৈতিক সঙ্কটকে কেন্দ্র করে বিরাজ করছিল, তার অবসান ঘটা প্রয়োজন বলে মনে করছেন। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা নিজে উদ্যোগী হয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তিনি চাইছেন বাংলাদেশে ট্রানজিট অবকাঠামো নেটওয়ার্ক বা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপিও সমর্থন দেবে।
এ লক্ষ্যে মোদির সফরের আগেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বাংলাদেশে আসবেন। তিনি এখানকার সরকার ও বিরোধী পক্ষের সাথে বসবেন এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে সম্মত করতে তার উপস্থিতিতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করার প্রাককাজগুলো সম্পন্ন করবেন। এ জন্য সুষমা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি-প্রধানের সাথে বৈঠকে মিলিত হবেন। মোদির উদ্যোগে অনুষ্ঠিতব্য দুই নেত্রীর বৈঠকের সম্ভাব্য স্থান হলো হোটেল সোনারগাঁও। নরেন্দ্র মোদি ২০১৬ অথবা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাবে সম্মত করার চেষ্টা করতে পারেন। বিএনপির পুনরায় সংগঠিত হতে এবং নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা থেকে বেরিয়ে আসতে সময় দরকার হবে এই অজুহাত যুক্তি হিসেবে আসতে পারে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে উদারভাবে নেয়ার কথা বলে মোদি-সুষমা বিএনপি নেত্রীর বাড়তি সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দের একটি বড় অংশ এই ধারণাকে সমর্থন করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও বলছেন, ক্ষমতায় যেতে না পেরে শক্তিশালী বিরোধী দল হয়ে থাকতে হলেও সমঝোতায় যাওয়া দরকার।
দলের আরেকটি অংশ এমন কোনো নির্বাচন কাক্সিক্ষত মনে করেন না, যেখানে আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করবে। তারা চাইছেন, পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করতে। আর এই নির্বাচন জাতিসঙ্ঘ অথবা একটি নিরপে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং উভয় পক্ষের অনুমোদিত নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে। একই সাথে সব রাজনৈতিক নেতার অবিলম্বে জামিনে মুক্তির ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সব মামলার বিচারকার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়টিও তারা নিশ্চিত করতে চান। তারা বিএনপির এই অবস্থানের কথা মোদির সাথে আলোচনার সময় জোরদারভাবে তুলে ধরতে চান। তারা মনে করছেন, এসব প্রস্তাবের ব্যাপারে যেহেতু পশ্চিমাদের সমর্থন রয়েছে সেহেতু মোদিকেও এ ব্যাপারে সম্মত করানো যেতে পারে। আর ভারতের সমর্থনের ওপর সরকারের একতরফা নির্ভরশীলতার কারণে নয়াদিল্লি চাইলে এ ব্যাপারে তাদের পক্ষে নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ কঠিন হবে।
বিএনপি নেতৃত্বের এই অংশ মনে করছেন, এ কথা সত্যি যে ভারতের মতো একটি বৃহৎ পারমাণবিক প্রতিবেশী দেশের চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে উদাসীন থাকা বা তাদের উপো করা বিএনপির সাধ্যের বাইরে। অবশ্যই ভারতের সাথে যোগাযোগ বা বোঝাপড়ায় যেতে হবে; তবে সেটি দলের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। তারা মনে করেন, বিএনপি ১৯৯০ সালেও একটি সংগঠিত রাজনৈতিক দল ছিল না। এর সাংগঠনিক শক্তিও সুসংহত ছিল না। কিন্তু জনগণের সমর্থনের মধ্যেই ছিল দলের মূল শক্তি। মধ্যপন্থী উদার মুসলিম ভোটারদের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি দল হিসেবে বিএনপির ইমেজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই মূল বিষয়টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মতো কোনো সমঝোতায় যাওয়া কোনোভাবে যুক্তিসম্মত হবে না।
নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য হয়ে উঠতে পারে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ সফরে বাংলাদেশের রাজনীতির সার্বিক একটি অবয়ব দেয়ার প্রচেষ্টা থাকতে পারে। রাজনীতির সব পক্ষের সম্মতিতে এখানে ভারতের এজেন্ডাগুলোকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা থাকতে পারে। এখানকার যেসব স্পর্শকাতর বা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেশটির রাডারের পুরো নিয়ন্ত্রণে নেই, সেখানে পরিবর্তন এনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা থাকতে পারে। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ভারতে প্রশিক্ষণের পাইকারি ব্যবস্থা নিয়ে সর্বক্ষেত্রে প্রভাববলয় দৃঢ় করার প্রচেষ্টা থাকতে পারে। তবে এখানে এ স্বার্থের বিপক্ষের আন্তর্জাতিক শক্তির সক্রিয়তাও উপেক্ষা করার মতো নয়। হয়তো এ কারণে শ্রীলঙ্কা, নেপাল এমনকি মালদ্বীপেও ভারতের সর্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা বারবার বিফলে যেতে দেখা গেছে। বাংলাদেশে কী হয় সেটি দেখতে আরো কিছু সময় পরিস্থিতিকে অবলোকন করতে হবে। 
mrkmmb@gmail.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/22510#sthash.Zalqmhy0.dpuf

হজ্জের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যঃ


হজ্জের মুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, সমগ্র পৃথিবীর মুসলিমকে পবিত্র কুরআনের পতাকাতলে এনে ঐক্যবদ্ধ করা । মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সার্বিক উন্নতি বিধান করে তাদেরকে এক আল্লাহর গোলামীতে নিয়োজিত করা । এক আল্লাহর রশি অর্থাৎ ইসলামের বিধান অনুসরনে উজ্জীবিত করা এবং মহান আল্লাহর বিধান অনুসরণের মাধ্যমে আত্মিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করা । যতদিন পর্যন্ত মুসলমানগন হজ্জের মুল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন ছিলো ততদিন তারা সমগ্র পৃথিবীতে নিজেদেরকে একই উম্মাহ হিসেবে অনুভব করেছে এবং সমগ্র পৃথিবীতে তারা ছিলো অপরাজেয় শক্তি । হজ্জের মুল উদ্দেশ্য যখন মুসলিমগন ভুলে গিয়েছে, তখনই তাদের মধ্যে নানা ধরনের মত ও পথের অনুপ্রবেশ ঘটেছে । এর ফলে, মুসলিমগন নানা দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যেই রক্তপাত ঘটাতে শুরু করেছে ।

ইসলাম সংকীর্ণ বা ভউগলিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না, ইসলাম আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসি । মুসলিমগন পৃথিবীর যেখানেই অবস্থান করুক না কেনো, তারা পরস্পরে ভাই ভাই এবং একে অপরের সমস্যায় তারা বেদনানুভব করবে । আর এটাই ছিলো হজ্জের মুল লক্ষ্য উদ্দেশ্য । হজ্জের মুল লক্ষ্য ভুলে গিয়ে মুসলিমরা বর্তমানে ভউগলিক ও ভাষাভিত্তিক বা আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরেক দেশের মুসলিমদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়েছে । আর এই সুযোগে ইসলাম ও মুসলিমদের শ্ত্রুরা একের পর এক মুসলিম জাতি দেশ ধ্বংশ ও দখল করার সুযোগ পেয়েছে এবং মুসলিমদের সকল প্রকার সম্পদ লুন্ঠন করে নিজ দেশকে সমৃদ্ধ করছে । এই অবস্থা থেকে পরিত্রান পেতে মুসলমানদেরকে পুনরায় হজ্জের মুল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও শিক্ষায় নিজেদের সচেতন করতে হবে ।
সুত্রঃ "শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"

(চলবে)

বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

সালাহউদ্দিন ও সাঈদীর সাক্ষীর অপহরণ মিলে যায়

সালাহউদ্দিন ও সাঈদীর সাক্ষীর অপহরণ মিলে যায় ঃ  ডেভিড বার্গম্যান
বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদের সন্ধান পাওয়ার পর প্রখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তার ব্লগে একটি পোস্ট প্রকাশ করেছেন। সালাহ উদ্দিনের নিখোঁজ রহস্য নিয়ে সম্প্রতি অনুসন্ধান চালানো এই সাংবাদিক তার ব্লগে তিনটি বিষয়কে হাইলাইট করেছেন। নিচে সেগুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে তুলে দেয়া হলো-
প্রথমত, সুখরঞ্জন বালীর ঘটনার সাথে এ ঘটনার ব্যাপকভাবে মিলে যায়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস টাইব্যুনালের সাক্ষী বালীকে ২০১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ট্রাইব্যুনালের বাইরে থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ওইদিনই ট্রাইব্যুনালে দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে প্রমাণাদি উপস্থাপন করার কথা ছিল। তখন বালীর আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের লোক পরিচয় দিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে নিয়ে যায়।

সাত মাস পরে নিউ এইজ খবর প্রকাশ করে যে, তিনি ভারতের একটি কারাগারে বন্দি আছেন। জেল থেকে দেয়া তার একটি বিবৃতির খবরও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় যেখানে বালী বলেছিলেন, তাকে নিয়ে প্রথমে ছয় সপ্তাহ ধরে একটি জায়গায় রাখা হয়েছিল। তার ধারণা, জায়গাটি ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চের (ডিবি) কার্যালয় হতে পারে। এরপর ভারত সীমান্তের ওপারে ফেলে রেখে আসার পর অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তিনি গ্রেফতার হন। বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে প্রায় ছয় সপ্তাহ আটক থাকার পর পুলিশ তার চোখ বেধে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।
"আমাকে খাবার দেয়ার জন্য মাগুরার একটি হোটেলে তারা গাড়ি থামায়। তখন চোখের বাধন খুলে দিলে দেখতে পাই আমাকে একটি প্রাইভেট কারে করে নিয়ে আসা হয়েছে। খাওয়া শেষে আবারো আমার চোখ বেধে দিয়ে গাড়ি চালাতে থাকে। শেষপর্যন্ত বিকাল ৫টার দিকে আমাকে বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করে তারা চলে যায়", বালী তার বিবৃতিতে বলেন। তিনি জানান, বিএসএফ তার সাথে খুবই খারাপ আচরণ করে। 


মনে হচ্ছে, আইনশৃংখলা বাহিনী এই ক্ষেত্রেও (সালাহউদ্দিনের) একই ধরনের কৌশল এঁটেছে।
দ্বিতীয়ত, আমার সন্দেহ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায় সালাহ উদ্দিনের সাথে আসলে কী ঘটেছিল তা আমরা জানতে পারবো না। যদিও এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সালাহ উদ্দিনকে আইনশৃংখলা বাহিনীই উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবে বেশ কিছু বিষয় এখনো রহস্যঘেরা থেকে গেল। আবার এই সম্ভাবনাও কম যে, সালাহ উদ্দিন নিজে প্রকাশ্যে কিছু বলবেন। তার স্ত্রীও আজ (মঙ্গলবার) বলেছেন যে, স্বামী জীবিত আছেন তাতেই সন্তুষ্ট। আমি এ্ ব্যাপারে নিশ্চিত তার সাথে কী ঘটেছিল সে ব্যাপারে প্রকাশ্যে কিছু না বলার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো শর্তেই সালাহ উদ্দিনকে জীবিত থাকতে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া নিশ্চিতভাবেই তাকে কিছুদিনের জন্য ভারতের কারাগারে কাটাতে হবে (অবৈধ অনুপ্রবেশের জন্য)। আর দেশে ফেরার পর সম্ভাবনা আছে বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হবে।
এবং তৃতীয়ত, এভাবেই এই ধরনের অপহরণের মাধ্যমে সরকার মূলত ভিতি ছড়িয়ে টিকে আছে। পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে মিথ্যাচার, সুশীল সমাজের নিস্ক্রিয়তা এবং সমঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরব হয়ে যাওয়া তো রয়েছেই।


সোমবার, ১১ মে, ২০১৫

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে সবচেয়ে সমালোচিত মামলা

ঘটনাবহুল আলোচিত একটি মামলা
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে আলোচিত মামলা হিসেবে স্থান পেয়েছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম । আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলা হয়েছে তার মধ্যে নানা কারনে অন্যতম আলোচিত এবং ঘটনাবহুল মামলায় পরিণত হয় মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলা। ট্রাইব্যুনালে মাওলানা সাঈদীর মামলাটিই ছিল প্রথম মামলা । তবে এ মামলার প্রতি মানুষের অধীর আগ্রহের মূলে সেটা গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় ছিলনা । ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে অপহরন করা, স্কাইপ কেলেঙ্কারি, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী গণেশ চন্দ্র পক্ষ ত্যাগ করে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়াসহ নানা কারনে বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে এ মামলা ।
মামলার আসামী যেমন এ মামলায় মানুষের আকর্ষনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু তেমনি এ মামলার বিভিন্ন অভিযোগ এবং মামলাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত একের পর এক ঘটনা প্রবাহের কারনেও এ মামলার খবরাখবর পাঠকের কাছে ছিল গভীর আগ্রহের বিষয় । ইব্রাহীম কুট্টি হত্যার অভিযোগ, ‘সাঈদী’ এবং ‘দেলু শিকদার’ এসব বিষয়ও ছিল এ মামলার আলোচিত বিষয় ।

মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ১৯৭১ সালের ৮ মে তার নেতৃত্বে পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকজন পিরোজপুরের পাড়েরহাট বাজারের নিকটস্থ চিথলিয়া গ্রামে যায় এবং মানিক পসারীর বাড়ি লুট করে । এরপর সেখান থেকে ইব্রাহীম কুট্টি এবং মফিজউদ্দিন পসারীকে ধরে পাড়েরহাট বাজারে নিয়ে যাওয়া হয় । তারা ওই বাড়িতে কাজ করত । পাড়েরহাট নেয়ার পর মাওলানা সাঈদীর নির্দেশে পাকিস্তান আর্মি ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করে ।

বিচার চলাকালে আসামী পক্ষ আদালতে জানান, ইব্রাহীম কট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই পিরোজপুরে একটি মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় তিনি পাকিস্তান আর্মিসহ মোট ১৪ জনকে আসামী করেছিলেন। আসামীর তালিকায় আল্লামা সাঈদীর নাম নেই। ওই মামলার বিবরনে আরো বলা হয় ইব্রাহীম কুট্টিকে ১৯৭১ সালে ১ অক্টোবর তার শশুরবাড়ি নলবুনিয়ায় হত্যা করা হয়। আসামী পক্ষ অভিযোগ করে মমতাজ বেগম এখনো জীবিত কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হিসেবে হাজির করেনি । https://www.youtube.com/watch?v=kJvbKQ1tYlw&feature=youtu.be
মাওলানা সাঈদী একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মোফাসসিরে কোরআন এবং সুললিত কণ্ঠস্বরের অধিকারী হওয়ায় দেশে এবং বিদেশে অগণতি মানুষের নিয়মিত মনোযোগের বিষয়ে পরিণত হয় এ মামলার কার্যক্রম ।
মাওলানা সাঈদীর বিচারে যখন সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয় তখন এ বিষয়ক খবরের জন্য পাঠকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। জেরায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর মুখ থেকে আইনজীবী মিজানুল ইসলাম কি বের করে আনেন তা জানার জন্য পরের দিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করেছেন অগণিত পাঠক। পিরোজপুরের বর্তমান এমপি একেএমএ আউয়াল মাওলানা সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেন। মাওলান সাঈদীর পক্ষেও সাক্ষ্য দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তাছাড়া জেরায় রাষ্ট্রপক্ষের বেশ কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধে চুরি, জেল খাটাসহ আরো নানাবিধ তথ্য বের হয়ে আসে যা ছিল পাঠকের কাছে বেশ আকর্ষণীয়।
ট্রাইব্যুনাল থেকে এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে দেড়শতাধিক মানুষ জীবন দেয়। সারা দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিবাদে নেমে আসে রাজপথে।
বিচার চলাকালে এবং বন্দী থাকা অবস্থায় মাওলানা সাঈদী প্রথমে তার মাকে হারান। এরপর ২০১২ সালে জুন মাসে বিচার চলাকালে ট্রাইব্যুনালে বসে অসুস্থ হয়ে মুত্যৃর কোলে ঢলে পড়েন তার বড় ছেলে রাফিক বিন সাঈদী।

মামলা চলাকালে ২০১২ সালের পাঁচ নভেম্বর মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন সুখরঞ্জন বালী। সেদিন তাকে ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে নিয়ে যাওয়া হয়। বালী অপহরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলে। কারণ সুখরঞ্জন বালী ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তিনি পক্ষ ত্যাগ করে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। আরো একটি কারনে বালী অপহরন ঘটনা মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে সেটি হল তিনি ছিলেন বিশাবালীর আপন ভাই। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ ছিল তার নির্দেশে বিশাবালীকে নারকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যা করা হয়। সেই বিশাবালীর ভাই সুখরঞ্জন বালী এসেছিলেন মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে।
এরপর ২০১৩ সালের ১৬ মে ঢাকার দৈনিক নিউএজ পত্রিকায় প্রকাশিত ডেভিড বার্গম্যানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয় সুখরঞ্জন বালীর সন্ধান পাওয়া গেছে। তিনি ভারতের একটি কারাগারে বন্দী আছেন। বালী জানিয়েছেন তাকে আইনশঙ্খলা বাহিনীর লোকজন ট্রাইব্যুনালের সামনে থেকে অপহরন করে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর আবার নতুন করে শুরু হয় এ চাঞ্চল্যকর ঘটনা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।


গণেশ চন্দ্র সাহা ছিলেন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আরেকজন সাক্ষী। কিন্তু গনেশ রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য না দিয়ে উল্টো মাওলানা সাঈদীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে একটি মর্মান্তিক হত্যাকান্ড হল ভাগিরথী হত্যাকান্ড। বিধবা ভাগীরথীকে পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্পে আটকে রেখে ইজ্জত হরন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে ভাগিরথীকে পাকিস্তান আর্মি গাড়ির পেছনে বেঁধে টেনে হিচড়ে হত্যা করে। মাওলানা সাঈদীর সহায়তায় এই ভাগীরথীকে হত্যার অভিযোগ আনা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে। সেই ভাগিরথীর ছেলে হলেন সাক্ষী গনেশ চন্দ্র সাহা। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। কিন্তু তিনি কোর্টে এসে মাওলানা সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়ে বললেন মাওলানা সাঈদী তার মাকে মারেননি। পাকিস্তান আর্মিরাই তার মাকে মেরেছে। এ ঘটনা তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।
২০১২ সালের ছয় ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে এ মামলার সমস্ত কার্যক্রম শেষে রায়ের তারিখ ঘোষনা করার কথা ছিল। সেদিন দেশ বিদেশের অসংখ্য সাংবাদিক হাজির হন ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু সেদিন ফাঁস হল স্কাইপ কেলেঙ্কারীর খবর। ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নিজেই বিষয়টি ওপেন কোর্টে প্রকাশ করলেন সেদিন এ ঘটনা।
বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, ব্রাসেলসে বসবাসরত আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের কাছ থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রকৃয়া চলাকালে এবং বিভিন্ন আদেশের সময় সহায়তা নিয়েছেন তিনি। এ উপলক্ষে তাদের দুজনের মধ্যে স্কাইপের মাধ্যমে কথপোকথন হয়েছে। এ তথ্য হ্যাক করে ইকনোমিস্ট হস্তগত করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি ।
নয় ডিসেম্বর থেকে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে বিচারপতি নিজামুল হক ও ড. আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপ কথোপকথন। এ নিয়ে দেশে বিদেশে তুমুল ঝড় ওঠে। বিচারপতি নিজামুল হকের কথোপোকথনের বিষয়বস্তু পড়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা জাতি। বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা একে দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শুধু স্কাইপ সংলাপ নয় বিচারপতি নিজামুল হক এ বিচার বিষয়ে তার সাথে যেসব মেইল আদান প্রদান করেছেন তাও ফাঁস হয়ে যায়। বিচারের বিভিন্ন বিষয় বেলজিয়াম থেকে লিখে পাঠানোর ঘটনার চিত্র বের হয়ে পড়ে এতে । এ ঘটনার জের ধরে ১১ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি।
২০১২ সালের ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ৪৬ জন সাক্ষীর বিষয়ে একটি দরখাস্ত দাখিল করা হয় ট্রাইব্যুনালে । দরখাস্তে নিবেদন করা হয় ৪৬ জন সাক্ষীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা তাদের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তাই এসব সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হোক।
সাক্ষী হাজির করতে না পারার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় কেউ নিখোঁজ, কেউ পলাতক, কেউ অসুস্থ, কেউবা চলে গেছে ভারতে।
ট্রাইব্যুনাল ২৯ মার্চ ১৫ জন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দী প্রদান করেন তা তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে আদেশ দেয়।

এরপর ৩রা জুন আসামী পক্ষ সেফহাউজের (ঢাকায় যেখানে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী এনে রাখা হত) বিশাল ডকুমেন্ট ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়ে বলেন সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে কারণ দেখিয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সাক্ষীগন মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ তাদেরকে আদালতে হাজির করেনি। অনেক সাক্ষী তাদের হেফাজতেই ছিল এবং সেফহাউজের রেজিস্ট্রার বইয়ে তার প্রমান রয়েছে। কোন সাক্ষী কবে সেফহাউজে আসে, কতদিন থাকে, কে কয়বেলা খেয়েছে তার সমস্ত তথ্য রেজিস্ট্রার বইয়ে লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। আসামী পক্ষ রাষ্ট্রপক্ষের সেফহাউজ থেকে রেজিস্ট্রার খাতা সংগ্রহ করে ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষ তাকে জাল হিসেবে আখ্যায়িত করে।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার একেবারে শুরুতে বিতর্ক শুরু হয় ট্রাইব্যুনালের তখনকার চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হককে নিয়ে। বিচারপতি নিজামুল হক ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি (ঘাদানিক) গঠিত জাতীয় গণতদন্ত কমিশিনের সেক্রেটারিয়েট এর সদস্য ছিলেন।
এ তদন্ত কমিশন কারাবন্দী মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ মোট ১৬ জনকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করে দুই দফা তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করে ১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ সালে। মাওলানা সাঈদীর আবেদনে বলা হয় যিনি আগে থেকেই আসামীদের বিচারের সাথে জড়িত তার কাছ থেকে ন্যায় বিচার পওয়ার আশা করা যায়না। তাই তাকে সরে দাড়ানোর অনুরোধ করা হয়। এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে ওয়াকআউট করার ঘটনাও ঘটে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের।

রবিবার, ১০ মে, ২০১৫

হাজার বার ফাঁসির মঞ্চে যেতে রাজি আছি-


স্কাইপ কেলেঙ্কারি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হওয়ার পূর্বে গত ৬ ডিসেম্বর ২০১২ ছিল আমার আব্বা আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত শতাব্দীর নিকৃষ্টতম মিথ্যাচারে ভরা তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ মামলার শুনানির শেষ দিন । সেদিন স্কাইপ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগকারী বিচারপতি নিজামুল হক মামলাটি শেষ করার জন্য খুব তাড়াহুড়া করছিলেন । সেদিন সকল বিচারকের বিচারক, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর ভরসা করে নিজেকে বিশ্বাসের চূড়ান্ত এবং শেষ স্তরে সঁপে দিয়ে আল্লামা সাঈদী ট্রাইব্যুনালে পিন পতন নীরবতায় ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের উদ্দেশে ৫-৭ মিনিটের একটি বক্তব্য রেখেছিলেন । আল্লামা সাঈদীর স্বল্প সময়ের ঐ বক্তব্যের মধ্যে ফুটে উঠেছিল তার বিরুদ্ধে করা সরকারের ষড়যন্ত্র ও দায়ের করা মামলার কারণ । সকলের জ্ঞাতার্থে আল্লামা সাঈদীর ঐ বক্তব্য এখানে তুলে ধরছিঃ
‘মাননীয় আদালত, বিচার প্রক্রিয়ার প্রায় শেষ প্রান্তে এসে আজ আমি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েছি কিছু বলার জন্য । অত্যন্ত ত্রস্ততার সাথে সম্পন্ন করা এই বিচারের রায়ও হয়তো ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে । এমতাবস্থায় আসামি হিসেবে আমার বক্তব্য আপনার ন্যায়পরায়ণতা বোধের কাছে আবেদন রাখার জন্য কতটুকু সময় ও সুযোগ অবশিষ্ট আছে, তা অনুধাবনের চেষ্টা থেকে বিরত থেকে আমি আপনাদের সামনে কিছু কথা খোলামেলাভাবে বলার প্রয়াস পাচ্ছি । কথাগুলো যেমন আপনাদের জানা প্রয়োজন, একাধিক কারণে কথাগুলো আমারও বলা প্রয়োজন ।’
‘আমি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলার আপামর জনগণের অতি পরিচিত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী । আল্লাহ সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের রচিত দেলোয়ার শিকদার বর্তমান সাঈদী বা দেলোয়ার শিকদার ওরফে দেলু ওরফে দেইল্যা রাজাকার আমি নই ।’
‘মাননীয় আদালত, গণতন্ত্রের লেবাসধারী বর্তমান আওয়ামী সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত যুদ্ধাপরাধের দায় চাপানোর মিশন নিয়ে হেলাল উদ্দিনকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে । মিথ্যাচার প্রতিষ্ঠায় স্বনাম খ্যাত হেলাল উদ্দিন আমার বিরুদ্ধে ২০টি জঘন্য মিথ্যা অভিযোগ এনে সরকারি ও দলীয় আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য আমার নাম বিকৃত করেছেন । আমার পারিবারিক পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে লুটেরা, খুনি, ধর্ষক, নারী সরবরাহকারী, অগ্নিসংযোগকারী পাক বাহিনীর দোসর, দুর্ধর্ষ রাজাকার, এক কথায় এই তদন্ত কর্মকর্তা মনের মাধুরী মিশিয়ে ৪ হাজার পৃষ্ঠার নাটক রচনা করেছেন আমার বিরুদ্ধে ।’
‘কোন মুসলমানের কলিজায় সর্ব শক্তিমান আল্লাহর ওপর বিন্দু পরিমাণ বিশ্বাস থাকলে, মৃত্যুর ভয় থাকলে, পরকালে আল্লাহর নিকট জবাবদিহিতার ভয় থাকলে, জাহান্নামের কঠিন শাস্তির ভয় থাকলে অন্য কোন মুসলমানের বিরুদ্ধে শুধু আদর্শিক ও রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে এতো জঘন্য মিথ্যাচার করা আদৌ সম্ভব হতো না ।’
‘দেশবাসী সাক্ষী, রাজনীতিবিদ হিসেবে আমার কখনো কোনকালেই তেমন কোন ভূমিকা ছিল না । বরাবরই আমার বিচরণ ছিলো কুরআনের ময়দানে । জনগণকে কুরআনের দাওয়াত পৌঁছানোই ছিল আমার কাজ । আমার তাফসির মাহফিলগুলোতে হাজারো লাখো মানুষ অংশগ্রহণ করে । এসব মাহফিল থেকে অসংখ্য অগণিত মানুষ সঠিক পথের দিশা পেয়েছেন, নামাজি হয়েছেন । এটাই কি আমার অপরাধ ? দেশ-বিদেশের লক্ষ কোটি মানুষ আমার ওপর আস্থা রাখেন, আমাকে বিশ্বাস করেন, আমাকে ভালবাসেন । আমি সাঈদী লক্ষ কোটি মানুষের চোখের পানি মিশ্রিত দোয়া ও ভালবাসায় সিক্ত । এই ভালবাসাই কি অপরাধ ? বিগত অর্ধ শতাব্দী ধরে আমি কুরআনের দাওয়াত বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছি, এটাই কি আমার অপরাধ ? আমি কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছি, এটাই কি আমার অপরাধ ? মাননীয় আদালত এটা যদি আমার অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে, এ অপরাধে অপরাধী হয়ে হাজারবার ফাঁসির মঞ্চে যেতে আমি রাজি আছি ।’
‘মাননীয় আদালত, আজকের এই বিচারপ্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে দু’টি পর্বে শেষ হবে । একটি এই জাগতিক আদালতে আর অপরটি আখেরাতের আদালতে । আজ আমি এই আদালতের অসহায় এক নির্দোষ আসামি আর আপনারা বিচারক ।’
‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণে ক্ষমতার জোরে আমার প্রতি যদি জুলুম করা হয়, তাহলে আজকের দুর্দান্ত প্রতাপশালী ব্যক্তিবর্গ যারা একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে আদর্শিক কারণে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে আমার প্রতি জুলুমের প্রয়াস পাচ্ছেন তারা দ্বিতীয় পর্বের বিচারের দিন, কিয়ামতের দিন নিঃসন্দেহে আসামি হবেন । সেদিন আমি হবো বাদি । আর সর্ব শক্তিমান, রাজাধিরাজ, সম্রাটের সম্রাট, আকাশ ও জমিনের সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি, সকল বিচারের মহা বিচারপতি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, তিনিই হবেন সেদিনের আমার দায়ের করা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার বিচারক । সূরা আত তিনের ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়াল বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা কি সকল বিচারকের তুলনায় শ্রেষ্ঠ বিচারক নন ?” সূরা দোখানের ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “একদিন আমি এদেরকে অবশ্যই কঠোরভাবে পাকড়াও করব এবং নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেবোই ।”
‘মাননীয় আদালত, আপনাদের এই আদালতে বসে যাঁর হাতের মুঠোয় আমাদের সকলের জীবন, সেই মহাশক্তিধর আল্লাহ তায়ালার নামে শপথ করছি । তাঁর পবিত্র কুরআন স্পর্শ করে কসম করে বলছি, আমার নামে আপনাদের এ আদালতে যতগুলো অভিযোগ আনা হয়েছে তার হাজার কোটি মাইলের মধ্যে আমার অবস্থান ছিলো না । উত্থাপিত অভিযোগের একটি বর্ণনাও সত্য নয় । আল্লাহর কসম ! সব ঘটনা বা দুর্ঘটনার সাথে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার নাম যোগ করা হয়েছে । এ সকল অভিযোগের সাথে আমার দূরতম সম্পর্ক নেই ।’
‘সুতরাং আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পূরণে যিনি যতটা ষড়যন্ত্র করে, জঘন্য থেকে জঘন্যতর মিথ্যা মামলা দিয়ে, মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে, মিথ্যা সাক্ষীর প্রশিক্ষণ দিয়ে আমাকে মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছেন, দেশ-বিদেশে অসংখ্য অগণিত মানুষের কাছে কুরআনের বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আমাকে বঞ্চিত করেছেন, আমার প্রিয়জনদের কাঁদাচ্ছেন, কলঙ্কের তিলক পরিয়ে আমাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করেছেন, আমি দোয়া করি আল্লাহ তাদের হেদায়াত করুন । আর হেদায়াত যদি তাদের নসিবে না থাকে তাহলে আমার এবং আমার প্রিয়জন, আমার কলিজার টুকরা সন্তান, বিশ্বব্যাপী আমার ভক্ত অনুরক্তদের যত চোখের পানি ফেলানো হয়েছে তাদের সকলের প্রতিফোঁটা চোখের পানি অভিশাপের বহ্নিশিখা হয়ে আমার থেকে শত গুণ যন্ত্রণা, কষ্ট ভোগের আগে আল্লাহ তায়ালা যেনো তাদের মৃত্যু না দেন । মিথ্যাবাদী ও জালিমদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ অযুত ধারায় বর্ষিত হোক । আর জাহান্নাম যেন হয় এদের চিরস্থায়ী ঠিকানা ।’ 



বুধবার, ৬ মে, ২০১৫

রজব মাসে করণীয় ও বর্জনীয়


রজব মাস সম্পর্কে জ্ঞাতব্য...

আল্লাহ তাআলা বলেন,
আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন এবং পছন্দ করেন । (সূরা কাসাস : ৬৮)
অর্থাৎ স্বীয় সৃষ্ট বস্তু হতে কিছু মনোনীত করেন, শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার ঘোষণা দেন । যেমন তিনি মনোনীত করেছেন কয়েকটি দিন, কয়েকটি মাস ; সম্মান, শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা প্রদান করেছেন, অন্য সব দিন আসমান-জমিনের সৃষ্টি ও সূচনা লগ্ন হতেই আল্লাহর বিধান মতে মাসের নিশ্চিত সংখ্যা বারটি । তার মাঝে চারটি সম্মানিত । এ অমোঘ ও শাশ্বত বিধান ; সুতরাং এর মাঝে তোমরা (অত্যাচার-পাপাচারে লিপ্ত হয়ে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করো না । (তওবা-৩৬)
হাদিস শরীফে মাস চারটির নাম উদ্ধৃত হয়েছে -
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কাল-চক্রাকারে ঘুরে আসমান-জমিন সৃষ্টির প্রথম দিনের অবস্থায় ফিরে এসেছে । বারো মাসে বৎসর, তার ভেতর চারটি সম্মানি ত। তিনটি একসাথে-জিলকদ,জিলহজ ও মুহাররম । অপরটি মুযার সম্প্রদায়ের পঞ্জিকা মতে-জুমাদাল উখরা ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব। (বোখারি-মুসলিম)
 আল্লাহ তাআলা বলেন - হে মোমিনগণ,আল্লাহর নিদর্শনসমূহ (নিষিদ্ধ বস্তু) হালাল মনে করো না এবং সম্মানিত মাসসমূহকে। (মায়েদা-২)
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সংরক্ষিত, নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ-যেগুলোকে তিনি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং অনাধিকার চর্চা হতে বারণ করেছেন, সেগুলোকে তোমরা হালাল মনে কর না। যার ভেতর ভ্রান্ত বিশ্বাস, নিষিদ্ধ-কাজ _উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন -
এতে তোমরা নিজেদের উপর অত্যাচার (ক্ষতিসাধন) করো না। (সূরা তাওবা : ৩৬)
অর্থাৎ সম্মানিত মাস গুলোতে। যেহেতু আল্লাহ তাআলা এ মাস গুলোকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছেন, তাই এর সম্মান যথাযথ রক্ষা করা। এবং এর মর্যাদা ও পবিত্রতার লক্ষ্য করত: এতে কোন গুনাহে লিপ্ত না হওয়া। তদুপরি জমানার পবিত্রতার কারণে, অপরাধ হয় জঘন্য ও মারাত্মক। এ জন্যই আল্লাহ তাআলা উল্লিখিত আয়াতের মাধ্যমে নিজেদের উপর জুলুম না করার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় স্বীয় নফ্‌সের উপর জুলুম করা বা অন্য কোন গুনাহে জড়িত হওয়া, সব মাসেই হারাম ও নিষিদ্ধ।

রজব মাসকে কেন্দ্র করে কতিপয় নতুন আবিষ্কৃত আমল, বেদআত

১. রজব মাসের রোজা :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবাদের থেকে রজব মাসের রোজার ফজিলতের ব্যাপারে প্রামাণ্য কোন দলিল নেই। তবে অন্যান্য মাসের মত এ মাসেও, সপ্তাহের সোমবার, বৃহস্পতিবার, মাসের তেরো, চৌদ্দ, পনেরো তারিখ, একদিন রোজা রাখা, পরের দিন না রাখা- সওয়াবের, বৈধ ও সুন্নত। ওমর রা. রজব মাসের রোজা হতে নিষেধ করতেন। কারণ, এতে ইসলাম-পূর্ব কুসংস্কারাচ্ছন্ন জাহেলি যুগের সাথে সামঞ্জস্য বিদ্যমান ।
২. রজব মাসে ওমরা :

কোন হাদিসে প্রমাণ নেই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজব মাসে ওমরা করেছেন । এ জন্য নির্দিষ্ট ভাবে রজবে ওমরা করা কিংবা এতে ওমরার বিশেষ ফজিলত আছে-বিশ্বাস করা বেদআত ।
 শায়েখ মুহাম্মাদ ইব্রাহিম রহ. তার ফতওয়াতে বলেন, রজব মাসকে জিয়ারত ইত্যাদির মত আমল দ্বারা নির্দিষ্ট করার পিছনে কোন মৌলিক ভিত্তি নেই । কারণ, ইমাম আবু শামা স্বীয় কিতাবে كتاب البدع والحوادث প্রমাণ করেছেন, শরিয়তকে পাশ কাটিয়ে বিশেষ কোন সময়ের সাথে কোন এবাদত নির্দিষ্ট করা অনুচিত, অবৈধ। কারণ, শরিয়ত কর্তৃক বিশেষ কিংবা সাধারণ আমলের জন্য কোন সময় নির্ধারণ করণ ব্যতীত, সব দিন-ক্ষণ-সময় সমান মর্যাদার। এ জন্যই ওলামায়ে কেরাম রজব মাসে বেশি বেশি ওমরা করতে নিষেধ করেছেন। তবে কেউ যদি স্বাভাবিক নিয়মে (ফজিলতের বিশ্বাস বিহীন) রজব মাসে ওমরা করে, তাতে দোষ নেই। কারণ, এ সময়েই তার জন্য ওমরা করার সুযোগ হয়েছে।
৩. রজব মাসের ২৭ তারিখ রজনী লাইলাতুল মিরাজ মনে করে জমায়েত হওয়া ও মাহফিল করা :
মেরাজের রজনী কিংবা মেরাজের মাস নির্ধারণের ব্যাপারে কোন প্রমাণ দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি । এ নিয়ে অনেক মতভেদ আছে, সত্য অনুদ্ঘাটিত । তাই এ ক্ষেত্রে নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয় । মেরাজের রজনি নির্দিষ্ট করণের ব্যাপারে কোন বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়নি । যা বিদ্যমান আছে, সব জাল, ভিত্তিহীন । (বেদায়া নেহায়া ২:১০৭, মাজমুউল ফতওয়া ২৫:২৯৮) অতএব এ রাতে অতিরিক্ত এবাদত ধার্য করা, যেমন রাত জাগা, দিনে রোজা রাখা, অথবা ঈর্ষা, উল্লাস প্রকাশ করা, নারী-পুরুষ অবাধ মেলা-মেশা, গান-বাদ্যসহ মাহফিলের আয়োজন করা, যা বৈধ, শরিয়ত কর্তৃক স্বীকৃত ঈদেও না-জায়েজ-হারাম, এখানের তো বলার অপেক্ষা রাখে না ।


রজব মাসে করণীয় ও বর্জনীয়

 নিজের কিংবা অন্যের উপর জুলুম করা হতে বিরত থাকা, যার অর্থ - ইবাদতে আত্মনিয়োগ করা, বেশি বেশি নেক আমল করা, আল্লাহ কর্তৃক সংরক্ষিত ও নিষিদ্ধ বিষয় বস্তু পরিত্যাগ করা। অর্থাৎ নিখাদ তওবা করা, আল্লাহ তাআলার শরণাপন্ন হওয়া, রমজান মাসের ভাগ্যবান ও লাইলাতুল কদরের মুক্তিপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়া।
 সুপ্রিয় পাঠক, বর্তমান রজব মাস থেকে তৈরি হন। এবাদত, আনুগত্য, অনুসরণ এবং আল্লাহ বশীভূত হওয়ার জন্য অন্তর ও শরীরের অনুশীলনের ব্রত গ্রহণ করুন। 

সোমবার, ৪ মে, ২০১৫

অন্ধকার নিপীড়নের কারাজীবনে-হে আল্লাহ ! তুমি কোরআনের এই খাদেমের সাহায্যকারী হও ।

আমার আব্বা আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে জালিম সরকার উত্থাপিত তথাকথিত যুদ্ধাপরাধ অভিযোগের মূল বিষয় হল, আমার আব্বার নামের বিষয়টি । জালিম সরকার বলছে, আমার আব্বার নাম শুরুতে ছিল ‘দেলোয়ার শিকদার’। স্বাধীনতার পর তিনি নাম বদল করে ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’ হয়েছেন ।


আমরা হাজার বার ট্রাইব্যুনালে দালিলিক প্রমানাদি সহকারে বলেছি, আমার আব্বা জন্মলগ্ন থেকেই ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী’। এর প্রমান সহকারে ট্রাইব্যুনালে আমারা আব্বার ১৯৫৭ সালের দাখিল (এসএসসি) পরীক্ষার সার্টিফিকেট (২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় নমিনেশন পেপারের সাথে জমা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে ২৯/১১/২০০৮ সালে ঐ সার্টিফিকেটের দ্বি-নকল কপি তোলা হয়েছিল) এবং ১৯৬৪ সালে যশোরের একটি মাহফিলের লিফলেট আদালতে উপস্থাপন করেছি ।


কিন্তু নিজের বিবেককে ভিন্ন কোন জায়গায় বন্দক রাখা প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার আজ্ঞাবহরা এবং মাননীয় বিচারপতিগণ আমাদের সেই দালিলিক প্রমানাদি সামান্যতম আমলে না নিয়েই যুদ্ধকালীন পিরোজপুরের কোন এক ‘দেলোয়ার শিকদারের’ করা যাবতীয় অপরাধ আমার আব্বা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর উপর গায়ের জোড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন ।
বিতর্কিত আদালতের বিচারপতিরা আমাদের দালিলিক প্রমানাদি আমলে নেয়নি, কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি সকল বিচারকের শ্রেষ্ঠ বিচারক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদালতে আমাদের সকল বক্তব্য আমলে নেয়া হবে এবং জালিমেরা অবশ্যই সেদিন কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির মুখোমুখি হবে, ইনশাআল্লাহ ।