সোমবার, ১৭ জুলাই, ২০১৭

ট্রাইবুনালে সাঈদীর পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরু দিনের বক্তব্য

ট্রাইবুনালে সাঈদীর পক্ষে যুক্তিতর্ক শুরুর দিন বক্তব্য (১৮.১১.২০১২)

আইন ও বিচারের নামে অনিয়মের সবকিছুই ঘটেছে এ পবিত্র আদালত অঙ্গনে । স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলছেন বিচারকে দ্রুততর করা হবে । বিচার তাহলে কোথায় ? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইলো কোথায় ? আমাকে ৪০ বছর আগে সংঘটিত কিছু অপরাধের ব্যাপারে অভিযুক্ত করা হয়েছে ।
এসব অপরাধের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না । পিরোজপুরের লাখো মানুষ আমার এ কথার সাক্ষী । আমি এর আগেও আপনাদের সামনে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি । অভিযুক্ত হিসেবে অভিযোগের জবাব দেয়াটা ছিল আমার সাংবিধানিক অধিকার । কিন্তু আমাকে আমার এ অধিকার থেকে আপনারা বঞ্চিত করেছেন । আমাকে কথা বলতে না দিয়েই, অভিযোগের ব্যাপারে আমার জবাব না শুনেই আপনারা কথিত এ বিচার চালিয়ে যাচ্ছেন । অথচ, এ ট্রাইব্যুনালেই দিনের পর দিন কিছু সুবিধাভোগী সাক্ষী, এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ৯ দিন ধরে একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটরের আরগুমেন্ট আপনি শুনেছেন । শুধু আমার কথাই আপনারা শুনতে চাচ্ছেন না, কিন্তু আপনারা আমারই কথিত বিচারে ব্যস্ত আছেন । আজকে আমার পক্ষের আরগুমেন্ট শুরু হওয়ার দিন ধার্য আছে । এই ট্রাইব্যুনালে আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাব কি না তা আমার জানা নেই । তাই আজকে আমি কিছু কথা বলার জন্য মনস্থির করেছি ।
এরআগে এই তথাকথিত মামলার আইও এবং একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটর আমার ব্যাপারে নানাবিধ অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন । তারা একই অসত্য কথা বারবার বলছেন, আগেও বলেছেন এখনও বলছেন । আমি কোরআনে কারিমের সূরা বাকারার ৪২নং আয়াতটি এখানে উল্লেখ করতে চাই । আল্লাহতায়ালা বলেছেন (এ সময় চেয়ারম্যান বলেন, প্লিজ, প্লিজ সাঈদী সাহেব, শোনানোর দরকার নেই, এগুলো আমরা শুনেছি আগে।) (তখন সাঈদী বলেন,) আপনি কোরআনে কারিমের আয়াত কেন শুনবেন না ? (চেয়ারম্যান বলেন, এখন বইলেন না, পরে শুনব, এগুলো আগেও শুনেছি।) মাওলানা সাঈদী পবিত্র কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, কোরআনে কারিমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার পোশাক দিয়ে ঢেকে দিও না ।’ বিজ্ঞ প্রসিকিউটর যে কথাগুলো এখানে বলেছেন, যে কথাগুলোর সরাসরি উনার কোনো জ্ঞান নেই, নিজে দেখেননি, নিজে শোনেনওনি । তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে এসব অসত্য বক্তব্য গ্রহণ করেছেন । এ ব্যাপারে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যে ব্যাপারে তোমার সরাসরি কোনো জ্ঞান নেই, তুমি দেখনি সেই ব্যাপারে তুমি বলতে যেও না ।’ একটি হাদিসে সাক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, আমি নবী করীমকে (সা.) বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এমন এক মুসলমানের বিরুদ্ধে এমন স্বাক্ষ্য প্রদান করল যে অন্যায় সে করেনি, সে স্বাক্ষ্য প্রদানকারী ব্যক্তি নিজেই নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিল ।’
মাননীয় আদালত, সূরা হুজুরাতে আল্লাহতায়ালা কী বলেছেন দেখেন, (এ পর্যায়ে চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক আবারও থামার জন্য বললে সাঈদী বলেন,) -চেয়ারম্যান সাহেব আপনি শোনেন মেহেরবানী করে । সূরা হুজুরাতের ৬নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা যদি কোনো পাপাচারী, দুষ্ট প্রকৃতের লোক তোমাদের কাছে কোনো তথ্য নিয়ে আসে, তবে তোমরা তার সত্যতা পরখ করে দেখবে । (কখনও যেন এমন না হয়) যে, না জেনে তোমরা কোনো একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেললে এবং এর পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরই অনুতপ্ত হতে হলো।’ মহান আল্লাহ তায়ালা সুরা মায়েদার ৮ নং আয়াতে পুনরায় হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, (আরবি) ‘হে ঈমানদারগণ ! তোমরা সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও । কোনো দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেন এমন উত্তেজিত না করে দেয়, যার কারণে তোমরা যাতে ইনসাফ (তথা ন্যায়বিচার) থেকে সরে না যাও।’
মাননীয় আদালত, আমি আমার কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম আপনার কাছে, বিচারকদের অভিযুক্তের কথা শুনতে হয় । আপনি হজ্জ্ব করে এসেছেন, আপনাদের আমি ঈমানদার ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করতে চাই । আপনি একদিন বলেছিলেন, আমি ফজরের নামাজ পড়ে অমুক পত্রিকাটি পড়ি, আমি পত্রিকাটির নাম নিলাম না । আবার একদিন এই ট্রাইব্যুনালে আপনি বলেছেন, আল্লাহ আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন, এ দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে । সে প্রসঙ্গে নবী করীম (সা.) কী বলেছেন শোনেন, (আরবি) ‘হজরত আলী (রা) বলেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন : ‘যদি দুটি পক্ষ কোনো মোকদ্দমা তোমাদের কাছে নিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির অর্থাত্ অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শ্রবণ না করে অভিযোগকারীর অনুকূলে কোনো রায় দেবে না । হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.)-এর এই নির্দেশ আমি সারা জীবন পালন করেছি । সুতরাং আপনি বিচারক, আপনি বিচার করবেন কীভাবে ? একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ এলো আর অভিযুক্তের কাছ থেকে যদি তার কোনো কথা না শোনেন, জিজ্ঞাসাবাদ না করেন, তাহলে আপনি সঠিক বিচার কীভাবে করবেন !’ আর যেভাবে আপনি বিচার ত্বরান্বিত করছেন তাতে তো জাতি এটা ভাবতেই পারে যে, আগে তো সাধারণ মন্ত্রীরা বলতেন, আগে তো বুদ্ধিজীবীরা বলতেন, এখন তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন—বিচার দ্রুততর করা হবে । বিচার তাহলে কোথায় ? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইল কোথায় ?
এজন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করব, রসুলের বিশুদ্ধ এই হাদিস অনুযায়ী আমার কথা আপনার শোনা উচিত । আমি অভিযুক্ত; আমাকে বলা হয়েছে, আমি পনের বছর পালিয়ে ছিলাম । আমি কোথায় ছিলাম ? আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ আড়াই মাস পর্যন্ত যশোরে রওশনের বাড়িতে ছিলাম । সেই যশোরে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা রওশনের কাছ থেকে তার কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করেন নাই, তাকে সাক্ষী বানান নাই । তাকে সাক্ষী করা হয় নাই; কারণ মিথ্যা বলতে সে রাজি হয় নাই । সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতি-সেক্রেটারিকে সাক্ষী করা হয়েছে । বলা হচ্ছে, আমি ত্রিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছি, আমি পিরোজপুরে ঘরবাড়ি ভেঙেছি, নিয়মিত ধর্ষণ করেছি । এই কাজটা যে লোকটা করে, সেই লোককে সেই এলাকার মুসলমানরা তার পেছনে নামাজ পড়ে কী করে? তাকে ভোট দেয় কী করে ? আমি পিরোজপুরের এমন কোনো মসজিদ নাই যে মসজিদে আমাকে দিয়ে ইমামতি করানো হয় নাই । এসব কথা যদি আমার কাছ থেকে না শোনেন, তাহলে আপনারা সুবিচার করবেন কীভাবে ?
আপনি বিচারপতি । আপনার মানবিক সত্তার কাছে আমার দাবি, আপনার মুখের কথাই আইন । আপনাদের আল্লাহতায়ালা অনেক মর্যাদা দিয়েছে ন। যে ব্যক্তি আজকের প্রধানমন্ত্রী, অসম্ভব নয় তিনি আজকের এই কাঠগড়ায় আপনার সামনে এসে দাঁড়াবেন । আজ যিনি প্রেসিডেন্ট, অসম্ভব নয় তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে আসামির বেশে দাঁড়াবেন । আপনাদের এই ক্ষমতা আল্লাহতায়ালা দান করেছেন । এখন আপনি যদি আমার বক্তব্য না শোনেন, তাহলে আমি আজকের মতো শেষ হাদিসটি শোনাই আপনাদের । বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ শরিফে এই হাদিসটি বর্ণনা করা হয়েছে । নবী করীম (সা.) বলেছেন, ‘বিচারক তিন প্রকার হয়ে থাকে । তার মধ্যে শুধুমাত্র একশ্রেণীর বিচারক জান্নাত লাভ করবে । আর বাকি দুই শ্রেণী যাবে জাহান্নামে । যে বিচারক জান্নাতে যাবে সে এমন ব্যক্তি, যে প্রকৃত সত্যকে বুঝতে পেরেছে, অতঃপর সে অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করেছে । দ্বিতীয় সেই বিচারক, যে প্রকৃত সত্য জানতে বা বুঝতে পেরেও রায় দেয়ার ব্যাপারে অবিচার ও জুলুম করেছে, সে জাহান্নামে যাবে । আর তৃতীয় সেই বিচারক, যে অজ্ঞতাবশত ফয়সালা করেছে, সেও জাহান্নামে যাবে ।’
হাদিস বিশারদগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী বিচারকদের আসন যেন পুলসিরাতের ওপর স্থাপন করা, যার নিচে জাহান্নামের জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড আর সম্মুখপানে জান্নাত লাভের অফুরন্ত নেয়ামতের হাতছানি । এখন বিচারকবৃন্দ সুবিচার অথবা জুলুম করার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রকৃত গন্তব্য বেছে নিতে পারেন । এখন আপনারা ডিসিশন নিতে পারেন কোনদিকে আপনারা যাবেন । জুলুমের মাধ্যমে এটাকে শেষ করবেন, না আপনি জান্নাতের পথ বেছে নেবেন ।
আমার কথা বলার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম ।
আইন ও বিচারের নামে অনিয়মের সবকিছুই ঘটেছে এই পবিত্র আদালত অঙ্গনে । তারপরও আমি সুবিচারের প্রত্যাশায় আপনাদের ন্যায়পরায়ণতা ও হক বিচারিক সিদ্ধান্তের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি । একই সঙ্গে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ফয়সালার প্রতীক্ষায় আছি । মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে নবী আপনি বলুন ! সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা (চিরতরে) বিলুপ্ত হয়ে গেছে । অবশ্যই মিথ্যাকে বিলুপ্ত হতেই হবে ।


বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৬

৭ নভেম্বরঃ ইতিহাসের ইতিহাস -(২)

লে. কর্নেল তাহের যেহেতু সরাসরি জাসদ সৃষ্টির  গোপন প্রক্রিয়ার সাথে ছিলেন না, কিন্তু ‘র’ এর প্রেসক্রিপশনে বানানো জাসদের নেতাদের সাথে সরাসরি চাকুরীকালিন সময় থেকেই জড়িত থাকার কারনে একটি ঘোরের মধ্যে ছিলেন । সেনাবাহিনীতে চাকুরীরত অবস্থায় একসময় বিপ্লবী সিরাজ সিকদারের সাথে জড়িত এই তাহের ও তার ভাইদের বুর্জোয়া অবস্থানের কারনে বিপ্লবী সিরাজ সিকদার বিপ্লবের কোন দায়িত্ব দিতে অস্বীকার করলে তারা বের হয়ে যান । ‘র’ এর আর্থিক, লজিস্টিক সাপোর্টে গড়ে তোলা জাসদ ‘রুশ-ভারতের’ দালালেরা হুশিয়ার সাবধান শ্লোগান দিয়ে উঠতি বিপ্লবী যুব শক্তিকে বিভ্রান্ত করে দেয় । লে কর্নেল তাহের নিজেও সেইভাবে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন কিনা তা গবেষণার দাবী রাখে। তবে সেনাবাহিনীকে সৈনিকদের নেতৃত্ব নির্ভর করতে গিয়ে অফিসারদের হত্যাকাণ্ডের মত ধ্বংসযজ্ঞের কাজটির জন্য তার শাস্তি  অবধারিত ছিল ।
১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন বাকশালি শাসক শেখ মুজিবর রহমানের সরকার পতনের পরে একটি জাতীয় সরকার না হয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে আওয়ামী সরকার পুনর্বহাল হলে আগস্ট পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে অনেকেই সন্দিহান হয়ে পড়েন । সেই সন্দেহ সেনাবাহিনীর মধ্যে তীব্র গোলযোগ ও অনৈক্যকে উস্কে দেয় বাংলাদেশে অবস্থারত ভারতের স্লিপার সেলগুলো । সাথে বিভিন্ন খেলায় জড়িয়ে পরে অন্যান্য দেশগুলোর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যারা ১৫ আগস্টের আগে থেকেই নানানভাবে তাদের খেলা চালিয়ে যাচ্ছিল ।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশারফ নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা দিয়ে একটু ক্যু দেতা ঘটালে সেই সুযোগটি গ্রহন করে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা । তারা  সেনা অফিসার হত্যার কাজটি শুরু করে । ইতিমধ্যেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী সেনা অফিসার, সৈনিক ও জনতা পাল্টা রুখে দাড়ায় । তাহের গং খালেদ মোশারফের হাতে বন্দী থাকা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে নিজেদের পক্ষে নিতে চাইলেও ইতিমধ্যেই দেশপ্রেমিক পক্ষ জেনারেল জিয়াকে নিজেদের কাছে নিয়ে নেয় । জেনারেল জিয়াউর রহমান এদেশের মাটি ও মানুষকে চিনতেন, বুঝতেন বলেই তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের দালালদের পক্ষে না গিয়ে দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে চলে যান । জাতীয়তাবাদ একটি চেতনা । এই চেতনা আবহমানকাল থেকেই প্রতিটি জাতির মধ্যেই থাকে । জাতীয়তাবাদী বললেই অনেকে মনে করেন বিএনপি । এটি মূর্খদের স্বল্প জ্ঞানের পরিচায়ক । যাক ৭ নভেম্বরের এই ঘটনার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় ও চূড়ান্তভাবে জেনারেল জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে । এরপর ইতিহাস তাকে ধীরে ধীরে তার আসন নিশ্চিত করে দেয় আর সেই আসনে বসে তিনি সংগঠিত করেন ভারতীয় আদিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদীদের । নেতৃত্ব দেন এই শক্তির ।

বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা তথা গণবাহিনী ও জাসদের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবে ব্যর্থতার পরে স্বাভাবিকভাবেই শত শত হত্যাকাণ্ডের জন্য সামরিক আদালতে বিচারের আয়োজন করা হয় । এই হত্যাকাণ্ড গুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন পথ স্বাভাবিকভাবেই ছিল না । তারপরেও জেনারেল আব্দুর রহমানের মাধ্যমে কেউ কেউ ছাড়া পেয়ে যান । জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম । ধারনা করা হয় লো প্রফাইলে থাকার কারনে ভারতীয় পক্ষ থেকে তাকে মুক্ত করে নেয়া হয় ভিন্ন প্রক্রিয়ায় । জেনারেল মঞ্জুর সর্বদাই তাহেরের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। কিন্তু জেনারেল শফিউল্লাহ ১৫ আগস্ট ঘটনার পরেই তাকে দেশের বাইরে পোস্টিং দিয়ে দেন । যে কারনে সেই যাত্রা বেঁচে যান তিনি । তবে পরবর্তীতে জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যার সাথে তার সম্পৃক্ততা অনেক আগে থেকেই তার সংযুক্তিকে প্রমানিত করে ।
মূলত ৭ নভেম্বরের মাধ্যমেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী জাতির নব উন্মেষ ঘটে। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ । এরই ধারাবাহিকতায় জাতি পায় ‘বাংলাদেশী’ নামের একটি আইডেনটিটি । জেনারেল জিয়াউর রহমানের উত্থান ও সাফল্য বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বিপ্লবীদেরও গতিকে শ্লথ করিয়ে দেয় । ভারতীয় প্রেসক্রিপশনের কথিত বিপ্লবীদের বিদায় ঘটে । তাদের সাথে সত্যিকারের বিপ্লবের জন্য যারা জড়িয়ে গিয়েছিলেন তারা ফিরে এসে নিজেদের নিয়োগ করেন দেশ, জাতি ও পরিবার গড়ার কাজে । এইভাবেই ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লব ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি’ দিবসে পরিনত হয় ।  ভারতের সাথে ২৫ শালা দাসখতের বিপরীতে বাংলাদেশ নিজের পায়ে ঘুরে দাঁড়ায় । (শেষ)
লেখকঃ শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ (রাজনীতিবিদ এবং স্ট্র্যাটেজিক এনালিস্ট)

সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৬

৭ নভেম্বরঃ ইতিহাসের ইতিহাস -(১)

বাংলাদেশে ৭ নভেম্বর জাতীয়তাবাদীদের সৃষ্ট কোন দিন না হলেও এই দিবসটি নিয়ে জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে এক ধরনের চেতনা বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরেই । এই দিনটিকে জাতীয়তাবাদীরা স্মরণ করে সিপাহী জনতার বিপ্লবের দিন হিসেবে । জাতীয়তাবাদীদের মত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীরাও এই দিনটিকে পালন করছেন । ইতিহাসের খেলায় জেনারেল জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বরের নায়ক হলেন । অথচ তিনি ৭ নভেম্বরের উদ্যোক্তা ছিলেন না । মূলতঃ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রীদের দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল ৭ নভেম্বর । কিন্তু এটি তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় । কিন্তু কেনো ? কেনইবা ৭ নভেম্বর আজ জাতীয়তাবাদী তথা ভারত বিরোধী জনগোষ্ঠীর এক বিজয়ের দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে ?
ইতিহাস সবসময়েই বিজয়ীর পক্ষে এবং বিজয়ীর গুনগাথা ছাড়া কিছুই নয় । এটাই সত্য যে ৭ নভেম্বর জাতীয়তাবাদীদের সৃষ্ট কোন দিন নয় । ৭ নভেম্বরে জাতীয়তাবাদীদের অবদান কোথায় ?  সেই তথ্য নতুন প্রজন্মের সামনে কেউ তুলে ধরছেন না । স্রোতে গা ভাসানোর মত করেই সবাই এই দিবসটিকে পালন করে যাচ্ছেন । আমি এই দিবসটি নিয়ে বিশাল কোন ব্যাখ্যায় যাবো না । দিবসটির প্রকৃত তথ্য তুলে ধরবো । এক পক্ষকে আমি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী বলছি এই কারনে যে এই আদর্শের দল ‘জাসদ’ আজ বহুধা বিভক্ত একটি দল । এক সময়ে বিপ্লবের চেতনার নামে লাখো দেশপ্রেমিক তরুনের স্বপ্নকে ঐক্যবদ্ধ করে কয়েকটি জেনারেশনকে ধ্বংস করে দেয়া এই জাসদের সৃষ্ট ৭ নভেম্বরের চেতনাও আজ অন্যের দখলে । কিন্তু কেন এটি জানতে হলে জানতে হবে জাসদের জন্ম ইতিহাস । সেই সাথে বাংলাদেশের সৃষ্টির চেপে যাওয়া ইতিহাস; যা ইতিহাসের ইতিহাস ।
জাসদ জন্মের প্রক্রিয়ার সাথে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রক্রিয়া জড়িত । আর এর মূল নায়ক হলেন জাসদের প্রতিষ্ঠাতা ‘সিরাজুল আলম খান’; যিনি ১৯৬৩ সালের নভেম্বরে আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদকে নিয়ে ছাত্রলীগের ভেতরেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর সহায়তায় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ নামে ছোট একটা সেল বা চক্র তৈরি করেন । পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন দেশ হিসেবে গড়তে বুর্জোয়া সংগঠনের ভেতরে বিপ্লবী চেতনা প্রদানে ‘র’ চিত্তরঞ্জন সূতার ও কালিদাস বৈদ্যের মাধ্যমে পুর্ব-পাকিস্তানে সিরাজুল আলম খানকে দিয়ে এই চক্রটি তৈরি করে ।
ইতিহাসের পরিক্রমায় ভারতীয় এই চক্রান্ত টের পেয়ে চীন বিপ্লবী সিরাজ সিকদারকে সহায়তা দিলে তিনি প্রথম ”পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার’ দলিল প্রণয়ন করেন যাতে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হলে তা হবে ভারতীয় আধিপত্যে নিষ্পেষিত স্বাধীনতাকামী জাতি সমুহের স্বাধীনতার ভুল ভিত্তি ভূমি । এই দলিলের পরেই ভারতীয়রা তাদের পরিকল্পনা ভিন্ন ধারায় এগিয়ে নেয় । বিপ্লবী চেতনার পরিবর্তে বুর্জোয়া নেতৃত্বকে মূল শক্তিতে পরিনত করে। পরিকল্পনায় যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার একটি ডেস্ক । তাদের লক্ষ্য ছিল চীনের বিপক্ষে ভারতকে শক্তিশালী করতে ভারতের একটি সীমান্তকে নিরাপদ করা ।
যাই হোক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো । বুর্জোয়া নেতৃত্বরা গা ঢাকা দিলেন, শেখ মুজিবর রহমান নিজেই পাকিস্তানীদের হাতে ধরা দিলেন । ঠিক তখনি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বাংলাভাষী সেনারা  বিদ্রোহ করে এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান (তৎকালীন মেজর) স্বাধীনতা যুদ্ধের অফিসিয়াল ঘোষণা প্রদান করেন । তাকে এই যুদ্ধ ঘোষণা দেয়ার মত চ্যালেঞ্জিং কাজটি করতে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সহায়তা দেয়া হয়েছিল বলেও অনেক তথ্য পাওয়া যায় । তবে যাই হোক না কেন জেনারেল জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা তাকে ইতিহাসে অমর করে দিয়েছে । জেনারেল জিয়া সেদিন এই যুদ্ধ ঘোষণার কাজটি না করলে বুর্জোয়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব কখনোই স্বাধীনতা যুদ্ধকে বাস্তব রুপ দিতে পারতো না এবং ধীরে ধীরে স্বাধীনতা যুদ্ধটি কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের হস্তগত হয়ে এক দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধে পরিনত হতো আর তার সকল প্রাপ্তি ও ফসল যেতো চীন ও তার বন্ধুদের পক্ষে; যা ভারতের অখণ্ডতাকে অনেক আগেই ধ্বংস করে দিতো ।
রাজনীতিতে এই খেলাগুলো এমন জটিল যে সকলের পক্ষে এটি বোঝা সম্ভব নয়; জানাও সম্ভব না । কোন ঘটনার সাথে কোন দেশ কিভাবে যুক্ত হয় তা সবার পক্ষে জানাও সম্ভব নয় । তাই অনেকের কাছে সত্য ইতিহাস, ইতিহাসের ইতিহাসকে গাঁজাখুরি মনে হয় । এমনকি অনেক বিদ্বান পিএইচডি ডিগ্রিধারীরাও এসব বিষয়ে অজ্ঞতাকেই জাহির করেন ।
যুক্তরাষ্ট্র- ভারত বনাম চীনের এই দ্বন্দ্বের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সহায়তায় ভারত বাংলাদেশকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় ঘটিয়ে দিতে সক্ষম হলেও পাকিস্তান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের এই জনগোষ্ঠীকে ভারত বিরোধিতার ক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে না পারার কারনেই বাংলাদেশ সৃষ্টির ৩ মাসের মধ্যেই ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি ১৯৭২’ নামে একটি ২৫ বছর মেয়াদী চুক্তি করিয়ে নেয় ১৯৭২ এর ১৯শে মার্চ তারিখে ঢাকায় । এই চুক্তির অনুচ্ছেদ ৮-এ বলা হয়, “কোন দেশ অপর দেশের বিরুদ্ধে কোনরূপ সামরিক জোটে যোগ দিতে পারবে না এবং অপর দেশের বিরুদ্ধে কোন রকম সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারবে না এবং তার সীমানাধীন স্থল, জল এবং আকাশ অপর রাষ্ট্রের সামরিক ক্ষতি অথবা অপর রাষ্ট্রের সংহতির প্রতি হুমকিস্বরূপ কোন কাজে ব্যবহার করতে দিতে পারবে না ।” অনুচ্ছেদ ৯-এ বর্ণিত রয়েছে, “একপক্ষ অন্য পক্ষের বিপক্ষে কোন তৃতীয় পক্ষকে যে কোন সামরিক সংঘর্ষে কোন প্রকার সাহায্য দিতে পারবে না । যদি কোন পক্ষ আক্রমণের শিকার হয় কিংবা আগ্রাসনের হুমকির মুখাপেক্ষি হয়, তবে অনতিবিলম্বে দুই পক্ষই পারষ্পরিক আলোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে সেই আক্রমণ কিংবা আগ্রাসনের হুমকির মোকাবেলা করার জন্য । এভাবেই দুই দেশের শান্তি ও সংহতি বজিয়ে রাখা হবে ।” অনুচ্ছেদ ১০-এ বর্ণিত আছে, “এই চুক্তির পরিপন্থী কোন প্রকার অঙ্গীকার কোন পক্ষই অন্য কোন দেশ বা একাধিক দেশের সাথে খোলাভাবে কিংবা গোপনে করতে পারবে না ।”
এমন একটি চুক্তি করেও ভারত নিজেকে নিরাপদ ভাবতে ব্যর্থ হয় । কারন তাদের সমর্থিত আওয়ামী লীগ ও তার রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারে ভারত বিরোধী জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে । মুসলিম এই জনগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম এমনিতেই পাকিস্তান আমল থেকে বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ হতে শুরু করেছে । ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে চীনপন্থি বিপ্লবী দলগুলোর পক্ষে নতুন প্রজন্মের ব্যপক আকাঙ্ক্ষাকে ধ্বংস করতে ভারতের ‘র’ দুটো উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নিজেরাই একটি বিপ্লবী গোপন সংগঠন দাড় করিয়ে দেয়। গণবাহিনী নামের ঐ সশস্ত্র সংগঠনের গণ সংগঠন হিসেবে থাকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। চীনপন্থি বিপ্লবীদের প্রকাশ্য সংগঠন না থাকার কারনে জাসদের ও গণবাহিনীর পক্ষে গণজাগরণ বাড়তে থাকে। বুর্জোয়া ও সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার জনগোষ্ঠী জাসদকে নির্বাচনী সংগঠন ধরেই আগাতে থাকে। এর মধ্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের ভারত বিরোধী জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয়। বিপ্লবের নামে ভারত বিরোধী জনগোষ্ঠীর কয়েকটি জেনারেশন ধ্বংস করে দেয় জাসদ রাজনীতির নামে। আর এই ধ্বংসটি করায় আওয়ামী লীগকে দিয়ে।
এরপরেও যখন বিপ্লবের তাণ্ডব কমাতে ব্যর্থতা দেখা যায় কৌশলে তখন ভারত বুর্জোয়া সংগঠন আওয়ামী লীগকে সমাজতান্ত্রিক সংগঠনে পরিনত করার ব্যবস্থা হাতে নেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাথে নিয়ে কৌশলে সোভিয়েত পন্থীদের সাথে সংযোগ ঘটিয়ে ‘বাকশাল’ নামের সমাজতান্ত্রিক দল ও রাষ্ট্র গঠন করে দেয়। এতে করে তারা বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করে চীনপন্থি শিক্ষিত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে। আর মাঠে থাকে জাসদ ও সশস্ত্র গণবাহিনী। এরই মাঝে গড়ে তোলা হয় ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’; লক্ষ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়া। কারন ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ফেরত হাজার হাজার সেনা অফিসার ও সদস্য বাংলাদেশে ফিরে ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে’ যোগ দেন। এই বাহিনীর সবাই এমন এক প্রশিক্ষনের আওতায় গড়ে ওঠা যাদের কাছে ভারত হলো একমাত্র শত্রু রাষ্ট্র। তাই সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করতে দায়িত্ব আসে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লে কর্নেল তাহেরে কাছে। বিপ্লবের মন্ত্রে তিনি এগিয়ে যান একটি ৭ নভেম্বর গড়তে ।
লেখকঃ শেখ মহিউদ্দিন আহমেদ (রাজনীতিবিদ এবং স্ট্র্যাটেজিক এনালিস্ট) 

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৬

শেখ হাচিনা -ওবায়দুলকাদেরকে অভিনন্দন

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুই দিনব্যাপী ২০ তম জাতীয় সম্মেলন থেকে ঘোষণাঃ
বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হবে নাঃ প্রধানমন্ত্রী ।
🌷🌹
অষ্টমবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভানেত্রী হলেন শেখ হাচিনা এবং সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি ওবায়দুল কাদের আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক হলেন ।
🌻🌺 🌷
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পাশাপাশি ঘোষণা করা হয়েছে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের নাম । দলের গুরুত্বপূর্ণ এ কমিটিতে ঘোষণা করা হয়েছে ১৪ জনের নাম।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হলেন সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, কাজী জাফরুল্লাহ, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সাহারা খাতুন, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, নুরুল ইসলাম নাহিদ, আব্দুর রাজ্জাক, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, আব্দুল মান্নান খান, রমেশ চন্দ্র সেন ও পীযূষ কান্তি চক্রবর্তী।
এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেন, মাহবুব-উল-আলম হানিফ, দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান ।
কোষাধ্যক্ষ পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন এইচ এন আশিকুর রহমান ।
কাউন্সিল অধিবেশনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার জন্য দলীয় সভাপতি শেখ হাচিনার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেন কাউন্সিলররা ।
🌻🌺 🌷🌹
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাচিনা অষ্টমবারের মতো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এবং নতুন ও পুরনো সকল সভাপতিমন্ডলীর সদস্যদেরকে আন্তরিক অভিনন্দন ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানাচ্ছি ।
আশা করি নবগঠিত কমিটি গুম, খুনহীন, সন্ত্রাসমুক্ত দেশ গঠন, বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন ।
সকলের জন্য শুভ কামনা ।

মঙ্গলবার, ১১ অক্টোবর, ২০১৬

ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় হর কারবালা কি বাদ

কারবালার ইতিহাস আর আমাদের শিক্ষা

বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয় এবং মহররম মাস ও আশুরার (১০ই মুহররম) দিনটা মুসলিম জাহানের উপর চেপে বসা রাজা-বাদশাহ শেখ ও আমির শাসিত রাজতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যে একটা চরম বিব্রতকর দিন । রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারনে স্বৈরাচারী শাসক ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে ৬১ হিজরীতে এদিন মহানবীর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু শাহাদাত বরন করেছিলেন । ইসলামের ইতিহাসে অনেক নবী রসুলসহ খলিফা হযরত উসমান, হযরত আলীসহ হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর চাইতেও বেশী মর্যাদাপূর্ণ আরো অনেক বড় বড় মহান ব্যক্তির হত্যাকান্ডের ঘটনা থাকলেও ৬১ হিজরীর কারবালার ঘটনা এতোটাই পৈচাশিক ও নির্মমতম ছিল যে এটা যুগে যুগে কঠিন হৃদয়কেও নাড়া দিয়েছে, এখনো দেয় এবং নিঃসন্দেহ তা কেয়ামত পর্যন্ত জালিমদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতে ও ইসলামী শক্তির পক্ষে মুমীনদের উদ্ভূদ্ধ করায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে ।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল পূর্বে কাউকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাননি । তিনি জনগনের উপর তার উত্তরাধিকারী নির্বাচনের ভার ছেড়ে দিয়ে যান । সেইমতে প্রথম চারজন উত্তরাধিকারী তথা খোলাফায়ে রাশেদীন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জনগন কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলেন । কিন্তু উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুয়াবিয়া খিলাফত লাভের সাথে সাথে বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন । ৬৭৬ খ্রীষ্টাব্দে বসরার শাসনকর্তা হযরত মুগিরার প্ররোচনায় তিনি তার জ্যৈষ্ট পুত্র ইয়াজিদকে তার উত্তরাধিকারী মনোনীত করে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার মর্মমুলে চরম কুঠারাঘাত করেন । হযরত মুয়াবিয়া এবং হযরত মুগীরা উভয়েই সম্মানিত সাহাবী ছিলেন । যেহেতু তারা কোন নবী বা রসুল ছিলেন না, স্বাভাবিক কারনেই তারা ভুলের উর্ধ্বে ছিলেন না । কিন্তু তাদের এই ভুল ইসলামের ইতিহাসকে ক্ষত বিক্ষত, রক্তাক্ত ও কলঙ্কিত করে । ইসলামের শাসন পদ্ধতির মুলে চরম কুঠারাঘাত করে । ঐতিহাসিক আল-ফাখরী, ফন ক্রেমার এবং ইবনুত তিকতাকার মতে ইয়াজিদের রাজত্বকাল তিনটি দুষ্কর্মের জন্য বিখ্যাত-প্রথম বছরে সে মহানবীর আদরের দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যা করে, দ্বিতীয় বছরে মদীনাকে লুন্ঠন করে এবং তৃতীয় বছরে সে কাবার উপর হামলা করে । এই ইয়াজিদ-এর খলিফা হিসাবে মনোনয়ন অন্যরা মেনে নিলেও, ইসলামের ব্যত্যয় মহানবীর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু মেনে নিলেন না । হুসাইনের এই ন্যায্য দাবীকে আবদুল্লাহ-ইবনে যুবাইর, আবদুল্লাহ-ইবনে ওমর, আবদুর রহমান-ইবনে আবু বকর সমর্থন করেন । 

ইয়াজিদ ইসলামী শাসন ব্যবস্থার ব্যত্যয় ঘটানোয় ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর মত মুমীন ব্যক্তির পক্ষে সেটা মেনে নেয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিল না । খিলাফত ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনই ছিল ইমাম হোসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর সংগ্রামের মূল লক্ষ্য । মুসলিম জাহানের বিপুল মানুষের সমর্থনও ছিল তার পক্ষে ।

ইরাকের লোকেরা তার কাছে চিঠি/দূত পাঠিয়ে জানাল তারা তাকে খলিফা হিসেবে চায়, ইয়াজিদকে নয় । সমর্থকদের চিঠি পেয়ে হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠালেন অবস্থা দেখার জন্য । মুসলিম দেখলেন যে আসলেই অনেক মানুষ হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে খলিফা হিসেবে চাচ্ছে । তিনি হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে সেটা জানিয়েও দিলেন । ইতমধ্যে কিছু অত্যুৎসাহী লোকেরা হানী বিন উরওয়ার ঘরে মুসলিমের হাতে হুসাইনের পক্ষে বায়াত নেওয়া শুরু করল । সিরিয়াতে ইয়াজিদের কাছে এ খবর পৌছালে সে বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পাঠাল কুফাবাসীর বিদ্রোহ দমন করতে ।

উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে দেখে ঘটনা সত্যি । মুসলিম বিন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন । এ সময় উবাইদুল্লাহ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিয়ে মানুষকে ইয়াজিদের সেনা বাহিনীর ভয় দেখাল । কুফাবাসীরা ইয়াজিদের শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে সরে পড়তে লাগল । সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল দেখলেন, তথাকথিত হুসাইন  রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু সমর্থকদের কেউই অবশিষ্ট নেই । তাকে গ্রেপ্তার করে হত্যার আদেশ দিল উবাইদুল্লাহ । মুসলিম মৃত্যুর আগে হুসাইনের কাছে একটি চিঠি পাঠান –
 “হুসাইন ! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও । কুফা বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না । কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে । আমার সাথেও তারা সত্য বলেনি ।”



এদিকে মুসলিম বিন আকীলের মৃত্যু হলেও তার প্রথম চিঠির উপর ভিত্তি করে যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন । অনেক সাহাবী তাকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন । তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ বিন আমর এবং তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফীয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ।

সুফীয়ান আস সাওরী ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রা:) হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে বলেছিলেনঃ মানুষের দোষারোপের ভয় না থাকলে আমি তোমার ঘাড়ে ধরে বিরত রাখতাম । আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা:) হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে বলেনঃ  হুসাইন ! কোথায় যাও ? এমন লোকদের কাছে, যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে এবং তোমার ভাইকে আঘাত করেছে ?

যাত্রা পথে হুসাইনের কাছে মুসলিমের সেই চিঠি এসে পৌঁছুলো । চিঠি পড়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াজিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন । পথিমধ্যে ইয়াজিদের সৈন্যরা আমর বিন সাদ, সীমার বিন যুল জাওশান এবং হুসাইন বিন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর গতিরোধ করল । তিনি আগত সৈন্যদলকে আল্লাহর দোহাই এবং নিজের মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনটি প্রস্তাব দেন –

১. তাকে ইয়াজিদের দরবারে যেতে দেয়া হোক । 

২. অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক ।

৩. অথবা তাঁকে কোন ইসলামী অঞ্চলের সীমান্তের দিকে চলে যেতে দেয়া হোক । সেখানে তিনি জিহাদ করবেন এবং ইসলামী রাজ্যের সীমানা পাহারা দেবেন ।

ইয়াজিদের সৈন্যরা উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের ফয়সালা ছাড়া কোন প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না । এ কথা শুনে উবাইদুল্লাহর এক সেনাপতি হুর বিন ইয়াজিদ বললেনঃ  এরা তোমাদের কাছে যেই প্রস্তাব পেশ করছে তা কি তোমরা মানবে না ? আল্লাহর কসম ! তুর্কী এবং দায়লামের লোকেরাও যদি তোমাদের কাছে এই প্রার্থনাটি করত, তাহলে তা ফেরত দেয়া তোমাদের জন্য বৈধ হত না । এরপরও তারা খুব যৌক্তিক এই প্রস্তাবগুলো মেনে নেয়নি। 

অবশেষে ওবায়দুল্লাহ ইবেন যিয়াদের ৪ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী ইমাম হোসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে  অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং ফোরাত নদীতে যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয় । মাত্র ২০০ মানুষের বিপক্ষে ৪০০০ সৈন্য । পানি সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয়ায় ইমামের কচি সন্তানেরা প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাতর হয়ে পড়লে হযরত আব্বাস ফোরাতে যান পানি আনতে । নিজেও তিনি ভীষণ তৃষ্ণার্ত ছিলেন । আঁজলা ভরে পানি তুলে খেতে যাবেন এমন সময় তাঁর মনে পড়ে যায় ইমাম হোসেন এর তৃষ্ণার্ত শিশু সন্তানের কথা । পানি ফেলে দিয়ে মশক ভর্তি করে তাঁবুর উদ্দেশ্যে রওনা দিতেই শত্রুপক্ষের তীরে তাঁর এক হাত কেটে যায় । মশকটাকে তিনি অপর হাতে নিয়ে ইমামের তাঁবুর দিকে ছুটলেন । এবার অপর হাতটিও কাটা পড়ে । মশকটাকে এবার তিনি মুখে নিয়ে তাঁবুর দিকে যেতে চাইলেন । শত্রুর তীর এবার সরাসরি তার দেহে আঘাত হানে । এভাবে শহীদ হয়ে যান তিনি ।  এরপর অসম এই যুদ্ধে আলী আকবর শহীদ হয়ে যান । কারবালায় ৭২ জন সঙ্গী শাহাদৎ বরণ করেন, তাদেঁর মধ্যে রাসূলের প্রিয় সাহাবা হাবিব ইবনে মাজাহের, তাঁর প্রাচীন বন্ধু মুসলিম ইবনে আওসাজা, নওমুসলিম ওহাবসহ আরো অনেকেই ।

নিরুপায় হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু শেষবারের মত অনুরোধ করলেও, পাষান্ডদের মন গলেনি । ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর কারবালার প্রান্তরে এক অসম যুদ্ধ শুরু হলো । হুসাইনের ভ্রাতুষ্পুত্র কাশিম সর্বপ্রথম শত্রুর আঘাতে শাহাদাত বরন করলেন । তৃষ্ণার্ত হুসাইন শিশুপুত্র আসগরকে কোলে নিয়ে ফোরাত নদীর দিকে অগ্রসর হলেন কিন্তু ইয়াজিদ বাহিনীর নিক্ষিপ্ত তীর শিশুপুত্রের শরীরে বিদ্ধ হয়ে শিশুপুত্রটি শাহাদাত বরন করলে একাকী অবসন্ন হুসাইন  রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু তাবুর সামনে বসে পড়লেন । এমন সময় এক মহিলা তাকে এক পেয়ালা পানি এনে দিলো । কিন্তু শত্রুর তীর তার মুখ বিদীর্ণ করে দিলো ।



শিমার বিন যুল জাওশান নামের এক নরপশু বর্শা দিয়ে হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর শরীরে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেললো ।  শেষে ইয়াজিদ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে নির্ভীক এই বীর আল্লাহর লিখে রাখা ভাগ্যানুযায়ী শহীদ হলেন । শিমার বিন যুল জাওশান মুরাদি নিজে কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে অত্যান্ত নির্মমভাবে হত্যা করে । ওইদিন ছিল হিজরী ৬১ সনের ১০ মুহররম । হযরর ঈমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু অন্যায় কিছু বলেন নি, অন্যায় কিছু করেন নি । তার হত্যাকারী ও হত্যায় সাহায্যকারীদের আল্লাহর ক্রোধ ঘেরাও করুক, এরা ধ্বংস হোক ! আল্লাহ্‌ তায়ালা শহীদ হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু এবং তাঁর সাথীদেরকে আল্লাহ তায়ালা স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা আচ্ছাদিত করুন ।

ইতিহাসের পরবর্তী বিশ্লেষণঃ

ইয়াজিদ বেঁচে নেই । কিন্তু ইয়াজিদের প্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্র এখনো শীর্ষ মুসলিম দেশগুলো কব্জা করে রেখেছে । স্বৈরাচাররা মুসলমানদের বুকে চেপে বসে আছে । মুসলমানদের বোকা বানাবার জন্যে তাদেরও কিছু গৃহপালিত আলেম ইমাম পীর জাতীয় লোক আছেন । এরা চেষ্টা করছে কারবালার ইতিহাসকে ম্লান করে এর গুরুত্বকে খাটো করার । তারা ইনিয়ে বিনিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কায়দা করে বলতে চায়, ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু ক্ষমতার লোভেই নাকি কুফায় গমন করেছিলেন । তার এই যাওয়াতে নাকি ইসলামের কোন কল্যাণ ছিল না । এটা নাকি হক আর বাতিলের যুদ্ধ ছিল না । (নাউজুবিল্লাহ)। আল্লাহর লানত এইসব দরবারীর উপর । তারা ইয়াজিদের নৃশংসতাকে এবং ফোরাত নদীর পানি সরবরাহ বন্ধকে সহি নয় মর্মে প্রতিপন্ন করতে তৎপর । কেউ কেউ কারবালার এ ঘটনাকে কেচ্ছা কাহিনী বলতেও দ্বিধা করেনি । ইনিয়ে বিনিয়ে তারা দলীল পেশ করে কেবল দরবারী আলেমদের । তারা বুঝাতে চান, কারবালার ঘটনা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয় । এ নিয়ে মাতামাতি করে লাভ নেই । ইয়াজিদ হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর হত্যাকারী নয় । ইমাম হুসাইন  রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু মুসলিম জাতির নির্বাচিত আমীর বা খলীফা ছিলেন না । তাকে হত্যা করা জায়েজ ছিল বলেও তারা কৌশলে মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেন । কোন কোন আলেম তো ইয়াজিদের প্রতি অতিরিক্ত লিখতে গিয়ে তাকে ‘রাহমতুল্লাহ’বলতেও কুন্ঠিত হননি । তবে এইসব দরবারী আলেমরা বড়ই ধূর্ত । তারা প্রথমেই হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু-এর পক্ষে এমনভাবে বন্দনা করেন যে পড়ে মনে হবে তারা হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু-এর খুবই ভক্ত এবং পক্ষের লোক । প্রথমেই বোঝাতে চেষ্টা করেন ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর মহব্বতে তাদের কলিজা ভরপুর । কিন্তু ধূর্তামীর আশ্রয়ে 'প্রকৃত ইতিহাস' শেখাবার নামে এবং বড়ই চাতুর্য্যপূর্ণভাবে তারা ইয়াজিদের সাফাই গায় । তারা হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যার জন্য হযরত ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকেই দায়ী করেন । কেউ কেউ শীয়াদের দায়ী করেন । অথচ ঐসময় শীয়া মতবাদের সৃষ্টিই হয়নি । মোট কথা, যে কোনভাবেই যেন ইয়াজিদকে দায়ী করা না হয় । ইমাম হুসাইনের হত্যার দায় কুফাবাসীর উপরও চাপাতে চান । তারা বোঝাতে চান, ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু  কুফাবাসীর ফাঁদে পড়ে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন । অথচ কুফাবাসীদের প্ররোচনায় হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু ইয়াজিদের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন-এমনটা কোন মুসলমান মনে করতে পারে না । বরং ইমাম হুসাইন  রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু ইসলামী খেলাফতের পক্ষে এবং রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন । এটা ঠিক কুফাবাসীরা কথা দিয়ে কথা রাখেনি । তারা ইমাম পরিবারের সাথে চরম গাদ্দারী করেছে । দরবারী আলেমরা চরম ধূর্ততার আশ্রয়ে ইয়াজিদকে ভাল শাসক, ইসলামের খেদমতগার বলেও প্রতিপন্ন করতে চান । তাদের মতে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নাকি সহি নয় । তারা মানুষকে বোঝাতে চান, ইয়াজিদ হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ দিলেও হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যার নির্দেশ দেয়নি । পাঠক খেয়াল করুন ফাঁকিবাজিটা কোথায় । ইয়াজিদ যখন হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে হত্যার ঘটনা শুনলো তখন ইয়াজিদ ব্যথিত হয়েছিল বা হত্যাকারীকে শাস্তি দিয়েছিল এমন কোন দলীল তো পাওয়া যায় না । দরবারীরা বলে বেড়ান যে, হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর ছিন্ন মস্তক ইয়াজিদের দরবারে এলে সেখানে নাকি কান্নার রোল পড়ে যায় । কিন্তু হত্যাকারীকে তো ক্ষমতা থেকে সরিয়েও দেয়নি এবং কোন শাস্তিও দেয়নি । গর্ভনর ওবায়দুল্লাহ বিন জিয়াদ তো তার স্বপদে বহাল তবিয়তেই ছিল । তাহলে কি বোঝা গেলো ? দরবারীরা আরো বুঝাতে চান রাজতন্ত্র তেমন খারাপ কিছু নয় । যুগে যুগে এইসব দরবারীরা নানাভাবে মুসলমানদের সত্য ইতিহাস শেখাবার নামে নানাভাবে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করেছে । 


সম্মানীত সাহাবীরা কেন ইমামকে কুফা যা্ওয়া রুখতে চেয়েছিলেন ?

ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু যখন কুফাবাসীর পত্র পেয়ে কুফায় যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন অনেক সম্মানীত সাহাবী তাকে যেতে নিষেধ করেছিলেন । তারা কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন বলেই হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে যেতে নিষেধ করেছিলেন । কোনভাবেই ইয়াজিদকে সমর্থণ করে নয় । 

হুসাইন (রাঃ)-কে কেন ইমাম বলা হয় ?

পুরো মুসলিম বিশ্ব এক কথায় তাকে ইমাম বা নেতা মেনে নিয়েছেন । ইয়াজিদ জনতার উপর চেপে বসেছিল । ইয়াজিদ মুসলিম বিশ্বের নির্বাচিত নেতা ছিল না । সেই সময় থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা ইয়াজিদকে ইমাম বা নেতা হিসাবে মেনে নেয়নি নেবেও না । হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে ইমাম বলার অর্থ ইয়াজিদকে স্বীকার না করা । ইমাম বা নেতা হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুই । সেকারনে তখন থেকেই যুগে যুগে হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু-এর নাম নেয়ার আগে 'ইমাম' বলা হয় । ইমাম হাসান রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকেও বিষ প্রয়োগে অত্যন্ত কৌশলে হত্যা করা হয়েছিল । তিনিও মুসলিম জাতির ইমাম । ইয়াজিদের বংশধরদের যতই গা জ্বলুক, কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানেরা হাসান রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু এবং হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুকে ‘ইমাম’ হিসাবেই ঘোষনা দেবেন । 

আশুরার দিন যা বর্জনীয়

সুন্নি নামধারী কিছু লোক এদিন নানা জাতের খানাপিনা করেন, মহরম-এর বাদ্য বাজান, এদিনটাকে খুশীর আমেজে পালন করেন । আবার শীয়া নামধারী কিছু কুলাঙ্গার এদিন নানা জাতের মাতম করেন, বুকে পিঠে ছুরি মারেন, তাজিয়া মিছিল করেন । এসব কাজ অবশ্যই বর্জনীয় । এসব কখনোই ইসলাম অনুমোদন করেনি । কাজেই এগুলো বিদআত । এদের কিছু কিছু কর্মকান্ড শির্কের পর্যায়ভূক্ত । মুসলমানদেরকে অবশ্যই এসব বর্জণ করতে হবে । 

যা করনীয়

১। রোজা রাখুন । কেননা কারবালার এই মর্মান্তিক ঘটনা ছাড়াও এদিনটি ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ । হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ ।’
أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم
-সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭ 
ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই আশুরার দিনের উপর অগ্রাধিকার দিয়ে এত গুরুত্বসহকারে অন্য কোন দিন রোযা পালন করতে দেখিনি । (অর্থাৎ রামাযান মাস ছাড়া) (বুখারী)।

২। কারবালার এ বিয়োগান্ত ঘটনা স্মরন করে ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু ও তার পরিবার বর্গের জন্যে দোয়া করুন । আল্লাহপাক বলেছেন, ‘যাঁরা আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় শহীদ হন তাঁদেরকে কখনও মৃত মনে করো না । বরং তাঁরা নিজেদের রব তায়ালার নিকট জীবিত ও রিযিকপ্রাপ্ত।’ (সূরা আলে ইমরান-১৬৯)

৩। কারবালার ঘটনার চেতনায় উদ্ভূদ্ধ হয়ে রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, পীরবাদ, জালিম শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে মনেপ্রাণে ঘৃণা প্রকাশ করুন, 'ইসলাম' প্রতিষ্ঠায় নিজ করনীয় ঠিক করুন এবং তা পালনের দৃঢ় শপথ নিন । 

বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১৬

জুম‘আর ছালাত

 (صلاة الجمعة)
প্রথম হিজরীতে জুম‘আ ফরয হয় এবং হিজরতকালে ক্বোবা ও মদীনার মধ্যবর্তী বনু সালেম বিন ‘আওফ গোত্রের ‘রানূনা’ (رانوناء) উপত্যকায় সর্বপ্রথম প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুম‘আর ছালাত আদায় করেন । যাতে একশত মুসল্লী শরীক ছিলেন । তবে হিজরতের পূর্বে মদীনার আনছারগণ পরামর্শক্রমে ইহুদী ও নাছারাদের সাপ্তাহিক ইবাদতের দিনের বিপরীতে নিজেদের জন্য একটি ইবাদতের দিন ধার্য করেন ও সে মতে আস‘আদ বিন যুরারাহ রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর নেতৃত্বে মদীনার বনু বায়াযাহ গোত্রের নাক্বী‘উল খাযেমাত (نَقِيعُ الْخَضِمَاتِ) নামক স্থানের ‘নাবীত’ (هَزْمُ النَّبِيْتِ) সমতল ভূমিতে সর্বপ্রথম জুম‘আর ছালাত চালু হয় । 
সেখানে চল্লিশ জন মুসল্লী যোগদান করেন । অতঃপর হিজরতের পর জুম‘আ ফরয করা হয় । 
রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ জুম‘আর এই দিনটি প্রথমে ইয়াহূদ-নাছারাদের উপরে ফরয করা হয়েছিল । কিন্তু তারা এ বিষয়ে মতভেদ করে । তখন আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এই দিনের প্রতি হেদায়াত দান করেন । এক্ষণে সকল মানুষ আমাদের পশ্চাদানুসারী । ইহুদীরা পরের দিন (শনিবার) এবং নাছারারা তার পরের দিন (রবিবার) । 
যেহেতু আল্লাহ শনিবারে কিছু সৃষ্টি করেননি এবং আরশে স্বীয় আসনে সমাসীন হন, সেহেতু ইহুদীরা এদিনকে তাদের সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন হিসাবে বেছে নেয় । 
যেহেতু আল্লাহ রবিবারে সৃষ্টির সূচনা করেন, সেহেতু নাছারাগণ এ দিনটিকে পছন্দ করে । এভাবে তারা আল্লাহর নির্দেশের উপর নিজেদের যুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয় । 
পক্ষান্তরে জুম‘আর দিনে সকল সৃষ্টিকর্ম সম্পন্ন হয় এবং সর্বশেষ সৃষ্টি হিসাবে আদমকে পয়দা করা হয় । তাই এ দিনটি হ’ল সকল দিনের সেরা । 
এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন হিসাবে নির্ধারিত হওয়ায় বিগত সকল উম্মতের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় । কা‘ব বিন মালেক রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আযানের আওয়ায শুনে বিগলিত হৃদয়ে বলতেনঃ ‘আল্লাহ রহম করুন, আস‘আদ বিন যুরারাহর উপর, সেই-ই প্রথম আমাদের নিয়ে জুম‘আর ছালাত কায়েম করে নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা থেকে আগমনের পূর্বেই ।
শহর হোক বা গ্রামে হোক জুম‘আর ছালাত প্রত্যেক বয়স্ক পুরুষ ও জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের উপরে জামা‘আত সহ আদায় করা ‘ফরযে আয়েন’ । 
তবে রোগী, মুসাফির, শিশু ও মহিলাদের উপরে জুম‘আ ফরয নয় । 
বাহরায়েনবাসীর প্রতি এক লিখিত ফরমানে খলীফা ওমর রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহু বলেনঃ جَمِّعُوْا حَيْثُمَا كُنْتُمْ ‘তোমরা যেখানেই থাক, জুম‘আ আদায় কর’। কারাবন্ধী অবস্থায় অনুমতি পেলে করবে, নইলে করবে না ।

মুহাররম ও আশুরা

আরবী বছর শুরুর প্রথম মাস মহররম । 
মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও হাদীস শরীফে এ মাস সম্পর্কে যা এসেছে তা হল, এটা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ মাস । কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম ।
এ মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ।
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ ।’
أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم
-সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭
এর মধ্যে আশুরার রোযার ফযীলত আরও বেশি ।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি ।’
ما رأيت النبي صلى الله عليه وسلم يتحرى صيام يوم فضله على غيره إلا هذا اليوم يوم عاشوراء وهذا الشهر يعني رمضان
-সহীহ বুখারী ১/২১৮
হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন ? তিনি বললেনঃ এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম । উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ । কারণ, এটি আল্লাহর মাস । এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তা'আলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন ।’-জামে তিরমিযী ১/১৫৭
অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন ।’
صيام يوم عاشوراء أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله  -সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮
আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদীসে আছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ ।’
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ ‘আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব ।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯
মহররম ও আশুরা কেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার যেমন আছে তেমনি এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ।
আশুরাকে কেন্দ্র করে এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত । এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায় । এজন্য আবার অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে । বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার । মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো যখা, তওবা- ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল । এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য । আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন ।
এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু । বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয় । কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা-‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করিনা যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয় ।’ অতএব শাহাদাতে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য ।
পবিত্র আশুরা
আশুরা হলো মুহররম মাসের দশম দিবস । আরবীতে "আশারা" মানে ১০ আর সে কারণে দিনটিকে "আশুরা" বলে অভিহিত করা হয় । ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত কারণ বহু ঐতিহাসিক ঘটনা এই তারিখে সংঘটিত হয়েছিল । এই দিনে আখেরী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দৌহিত্র ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইসলামের তৎকালীন শাসনকর্তা এজিদের সৈন্য বাহিনীর হাতে ফোরাত নদীর তীরে কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করেছেন । 
হিজরী ৬০ সনে এজিদ বিন মুয়াবিয়া পিতার মৃত্যুর পর নিজেকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসাবে ঘোষণা করে । সে প্রকৃত মুসলমান ছিল না, সে ছিল মোনাফেক । সে এমনই পথভ্রষ্ট ছিল যে সে মদ্যপানকে বৈধ ঘোষণা করেছিল । অধিকন্তু সে একই সঙ্গে দুই সহোদরাকে বিয়ে করাকেও বৈধ ঘোষণা করেছিল । শাসক হিসাবে সে ছিল স্বৈরাচারী ও অত্যাচারী । হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এজিদের আনুগত্য করতে অস্বীকৃত হন এবং ইসলামের সংস্কারের লক্ষ্যে মদীনা ছেড়ে মক্কা চলে আসেন । উল্লেখযোগ্য যে, উমাইয়া শাসনামলে ইসলাম পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল । মক্কা থেকে তিনি কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । শেষ পর্যন্ত তিনি কারবালার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন । এ সময় উমর ইবনে সাদ আবি ওক্কাসের নেতৃত্বে চার হাজার সৈন্য কারবালায় প্রবেশ করে । কয়েক ঘণ্টা পর শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদির নেতৃত্বে আরো বহু নতুন সৈন্য এসে তার সাথে যোগ দেয় ৷ কারবালায় দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয় । নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । এই অসম যুদ্ধে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং তাঁর ৭২ জন সঙ্গী শাহাদৎ বরণ করেন । শিমার ইবনে জিলজুশান মুরাদি নিজে কণ্ঠদেশে ছুরি চালিয়ে হযরত ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে অত্যান্ত নির্মমভাবে হত্যা করে । ওইদিন ছিল হিজরী ৬১ সনের ১০ মুহররম ।
এদিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলের জন্য কুদরত প্রকাশ করেছেন । 

এইদিন নবী মুসা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমুদ্রে রাস্তা বের  নিরাপদে পার করে দিয়েছেন অপরদিকে শত্রু ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে নীল নদে  ডুবিয়ে মেরেছেন।-সহীহ বুখারী ১/৪৮১ ডুবিয়ে দেয়া হয় ।   
صوموا عاشوراء وخالفوا فيه اليهود، صوموا قبله يوما أو بعده يوما -মুসনাদে আহমদ ১/২৪১
ইসলামের ইতিহাস অনুসারে এই দিনটি আরো অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ । জনশ্রুত রয়েছে ১০ মুহররম তারিখে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছে । এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদিপিতা হযরত আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টি করা হয়েছিল ।  এই দিন  নূহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলো এবং তিনি জুডি পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন । এই দিনে দাউদ আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাওবা কবুল হয়েছিলো । নমরূদের অগ্নিকুণ্ড থেকে হযরত খলিলুল্লাহ ইব্রাহীম আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্ধার পেয়েছিলেন । হযরত আইয়ুব আলাইহি ওয়াসাল্লাম দূরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন । এদিনে আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা ইবনে মারিয়ম আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উর্দ্ধাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন । এই তারিখেই কেয়ামত সংঘটিত হবে ।