বুধবার, ২৭ মে, ২০১৫

তাওবা কবুলের পাঁচটি শর্তঃ

তাওবা করা বলতে আমরা সোজা বাংলায় যা বুঝি তা হলো মাফ চাওয়া । আরবিতে তাওবা (التوبة) শব্দটি এসেছে তা-আলিফ-বা অক্ষর সংশ্লিষ্ট ধাতু থেকে যার আভিধানিক অর্থ হলো – ফিরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা । ইসলামি পরিভাষায় তাওবা বলতে বোঝায় আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা থেকে আল্লাহ্‌র আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তনকরা । তওবার গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম । অসংখ্য কুরআনের আয়াত ও হাদীস থেকে এর গুরুত্ব সম্বন্ধে আমরা আঁচ করতে পারি ।
উদাহরণস্বরূপঃ “এবং হে ঈমানদারেরা সকলেই তাওবা করো আল্লাহ্‌র নিকট যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো ।” - আন-নূরঃ ৩১
“তোমাদের রবের নিকট ক্ষমাভিক্ষা করো এবং তার কাছে তাওবা করো ।” – হূদঃ ৩
“হে ঈমানদারেরা, আল্লাহ্‌র কাছে একটি খাঁটি তাওবা করো ।” – আত-তাহরীমঃ ৮

শেষোক্ত আয়াতটিতে আমরা দেখতে পাই আল্লাহ্‌ আমাদের খাঁটি তাওবা করতে বলছেন । প্রশ্ন হলো খাঁটি তাওবা কীভাবে করা যেতে পারে ? ‘আলেমদের মতে তওবা খাঁটি হতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয় । এই শর্তসমূহের সংখ্যার ব্যাপারে মতপার্থক্য রয়েছে । ইমাম আন-নওওয়ী তার বিখ্যাত রিয়াদুস-সালেহীন গ্রন্থে চারটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন । তবে শায়খ সালেহ ইবন আল-‘উসায়মীন বইটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও একটি শর্ত উল্লেখ করেছেন । আসুন তবে দেখে নেয়া যাক শর্তগুলো ।

১. ইখলাস
ইখলাস বলতে উদ্দেশ্য বা নিয়তের শুদ্ধতা বোঝায় । ইসলামি পরিভাষায় কোনো সৎ কাজকে কেবল মাত্র আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি কামনার উদ্দেশ্যে করাকে ইখলাস বলা হয় । ইখলাস ব্যতীত কোনো কাজই আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য নয় । তাওবার কাজটি গ্রহণযোগ্য হতে হলে সেটিও করতে হবে পূর্ণ ইখলাস সহকারে । মানুষকে দেখানোর জন্য বা তাদের নৈকট্য লাভের আশায় তাওবার কাজটি হয়ে থাকলে সেটিকে খাঁটি তাওবা বলা যাবে না । অথবা কোনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বা কোনোরূপ কর্তৃপক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে তওবা সেটিও খাঁটি তওবা হিসেবে গৃহীত হবে না । অতএব তাওবার উদ্দেশ্য হতে হবে কেবল আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ ও আখিরাতের সাফল্য অর্জন । যাতে আল্লাহ্‌ তাওবাকারীর কৃত অপরাধ ক্ষমা করে দেন ।
২. অনুশোচনা বোধ করা
কৃত অপরাধ বা পাপটির জন্য অন্তরে অনুশোচনা বোধ করতে হবে । তার মধ্যে মরমে মরে যাওয়ার একটি বোধ কাজ করতে হবে এবং তাকে অনুভব করতে হবে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমাভিক্ষা করা ব্যতীত তার কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই । অনুশোচনা বোধ করা এই জন্যই শর্ত যে এ থেকেই বোঝা যায় যে ব্যক্তিটি আল্লাহ্‌র কাছে সত্যি সত্যিই খাঁটি তাওবা করতে প্রস্তুত ।
৩. পাপকাজটি থেকে এখনই বিরত হওয়া
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত । তাওবাকে তখনই খাঁটি হিসেবে ধরা হবে যদি তাওবাকারী পাপ কাজটি ইতিমধ্যেই বন্ধ করে থাকে । নতুবা এটি একটি তামাশা বই তো কিছু নয় ! আর যে ব্যক্তি পাপকাজটি অব্যাহত রেখেই আল্লাহ্‌র কাছে তাওবা করছে সে সত্যিকার অর্থে অনুশোচনা বোধ করছে না, করলে সে কাজটি অন্তত বন্ধ করত । পাপকাজ থেকে বিরত হওয়া দুই অর্থে – প্রথমত, সে একটি অন্যায় বা হারাম কাজ করছিল (যেমন মদ খাওয়া) – সেক্ষেত্রে তাকে সেটি থামিয়ে দিতে হবে । দ্বিতীয়ত, সে কোনো অবশ্য পালনীয় কাজ বা ওয়াজিব কাজ বন্ধ রেখেছিলো (যেমন নামাজ না পড়া) – এক্ষেত্রে পাপকাজ বন্ধ করার অর্থ হলো এই ওয়াজিব কাজটি নিয়মিত শুরু করে দেয়া ।
পাপকাজটির মাধ্যমে যদি কেবল আল্লাহ্‌র কোনো অধিকার বা হক নষ্ট করা হয়ে থাকে (যেমন নামাজ না পড়া বা রামাদান মাসে রোজা না রাখা) সেক্ষেত্রে কেবল আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করাই যথেষ্ট । এব্যাপারে অন্য কাউকে কিছু বলার নেই, ব্যাপারটি বান্দা এবং আল্লাহ্‌র মাঝে সীমাবদ্ধ । বরঞ্চ এক্ষেত্রে মানুষকে গুনাহ্‌র ব্যাপারে জানানোটা নিষেধ । নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে বলেছেন: “আমার উম্মতের প্রত্যেকেই ক্ষমাযোগ্য একমাত্র মুজাহিররা ব্যতীত ।” [১] মুজাহিরের ব্যাখায় হাদীসটিতে বলা হয়েছে: “একটি গুনাহ করে সেটি মানুষকে বলে বেড়ানো যে আমি এটা এটা করেছি ।”
অপরদিকে পাপকাজটি যদি হয়ে থাকে এমন যাতে অপর কোনো বান্দার হক নষ্ট হয়েছে; সেক্ষেত্রে কেবল তাওবা করাই যথেষ্ট নয় বরঞ্চ ওই বান্দার যে হকটি নষ্ট করা হয়েছে সেটি ফিরিয়ে দিতে হবে । এরকম কাজের মধ্যে রয়েছে – টাকা আত্মসাৎ করা, গীবত করা অথবা মারধোর করা বা গালি দেয়া প্রভৃতি । নষ্ট হকটি কী প্রকারে ফিরিয়ে দিতে হবে সে ব্যাপারে কথা বেশ লম্বা । আমরা পরবর্তী কোনো লেখায় সেই আলোচনাতে যাব ।
৪. পরবর্তীতে সেই কাজে ফিরে না যাবার সংকল্প
তাওবা খাঁটি হতে হলে পাপী ব্যক্তির মাঝে দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে যে সে এই কাজ আর করবে না বা এই অপরাধে আর প্রত্যাবর্তন করবে না । ধরুন কোনো ব্যক্তি একসময় ধনী ছিল । সে তার ধনদৌলত দিয়ে মদ খেত, জুয়া খেলত বা এমনকী ব্যভিচার করত (আল্লাহ্‌র কাছে পরিত্রাণ চাইছি এসব থেকে) । অতঃপর সহসা সে নিঃস্ব হয়ে গেল । সে তার পূর্বেকার পাপাচারে ফিরে যেতে পারছে না পয়সার অভাবে । এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে সে আল্লাহ্‌র কাছে তাওবা করলো কিন্তু সম্পদ না হারালে সে ঠিকই সেসব পাপাচার অব্যাহত রাখত । এই তাওবা তার কখনোই কবুল করা হবে না । তাওবা গ্রহণযোগ্য তখনই হবে যখন সে মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করবে সেই কাজটি ভবিষ্যতে না করার, কাজটি করার সুযোগ তার থাকুক আর নাই থাকুক ।
৫. সময়মতো তাওবা করা
তাওবা করার নির্দিষ্ট সময় রয়েছে । এই সময় পার হয়ে গেলে তাওবা আর কবুল হবে না । এই নির্দিষ্ট সময়কে আবার দুই ভাগে ভাগ করা যায় । ক) ব্যক্তিগত সময় ও খ) সার্বজনীন সময় ।
ক) ব্যক্তিগত সময়: ব্যক্তিগত সময় প্রতিটি ব্যক্তির জন্য আলাদা করে প্রযোজ্য । আর এসময়টি হলো যখন মৃত্যু অবধারিত ভাবে উপস্থিত হয় । আল্লাহ বলেন: “তাওবা তাদের জন্য নয় যারা মন্দ কাজ অব্যাহত রাখে সেই পর্যন্ত যখন মৃত্যু এসে হাজির হয় আর তারা তখন বলে আমি এখন তাওবা করলাম।”[২] অতএব মৃত্যু যখন নিশ্চিতরূপে উপস্থিত তখনকার তওবা উপায়ান্তর না দেখে করা তাওবা, এটি আল্লাহ্‌র কাছে গ্রহণযোগ্য নয় ।
খ) সার্বজনীন সময়: এই সময় যখন এসে উপনীত হবে তখন আর কারও তাওবাই গ্রহণীয় হবে না । সময়টি আমরা পাই নবীজী (ﷺ) এর একটি হাদীসে: “হিজরত ততদিন পর্যন্ত বন্ধ হবে না যতদিন তাওবা বন্ধ না হয়, আর তাওবা ততদিন পর্যন্ত বন্ধ হবে না যতদিন না সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদীত হচ্ছে ।” [৩] শেষ সময়ের যে বড় চিহ্নগুলো উল্লেখ করা হয়েছে কুরআন বা হাদীসে তার একটি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে ওঠা । ওপরের হাদীসটি থেকে আমরা জানতে পারি যে এই ঘটনা যখন ঘটে যাবে তখন ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ কারও তাওবাই আর গৃহীত হবার নয় । কুরআনেও এই ঘটনার ইশারা পাওয়া যায়: “যেদিন তোমার রবের কিছু চিহ্ন এসে উপনীত হবে (তখন) কোনো সত্তাই তার ঈমান দিয়ে আর উপকৃত হবে না যদি সে আগেই ঈমান না এনে থাকে …” [৪]

আল্লাহ্‌ আমাদের সঠিক সময়ে খাঁটি তাওবা করে তা অব্যাহত রাখার তাওফীক দিন ।

সোমবার, ২৫ মে, ২০১৫

নারীদের হজ্জ, তাদের ঋতুস্রাব এবং মুহরিম প্রসংগঃ

হজ্জ আদায় সক্ষম মুসলিম নারী-পুরুস উভয়ের প্রতিই ফরজ । হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহুআনহা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল ! আপনি জিহাদকে উত্তম কাজ বলে মনে করেন, আমরা কি জিহাদে শরিক হবো না ?  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ না । তোমাদের জন্য সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো হজ্জে মাবরুর । (বোখারী, মুসলিম)
আরেক হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে,  হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহুআনহা রাসুল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিহাদে অংশগ্রহনের অনুমতি চাইলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, তোমাদের জিহাদ হলো হজ্জ । (বোখারী, মুসলিম)

হজ্জের সময় নারীদের ঋতুস্রাব দেখা দিলে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, পাথর নিক্ষেপ, সাঈ, যিকর আযকার, তাকবীর তাসবীহ সবই করা যাবে । শুধু তাওয়াফ করা নামায আদায় করা এবং কুরআন স্পরশ করে তেলাওয়াত করা এবং মসজিদুল হারামে অবস্থান করা যাবে না । হজ্জ আদায়ের সময়  হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহুআনহার  ঋতুস্রাব শুরু হলে তিনি কাদছিলেন । বিশ্ব নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসয়টি অনুভব করে তাকে তাওয়াফ ও নামায আদায় ব্যতিত হজ্জের সকল কিছু পালন করতে বলেছিলেন । এরপর আয়েশ (রাঃ) যখন বললেন হে আল্লাহর রাসুল ! সকলে হজ্জ ও উমরা পালন করছে আর আমি শুধু হজ্জ পালন করলাম । ঋতুস্রাব বন্ধ হলে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিআল্লাহুআনহাকে তার ভাইএর সাথে তানঈম নামক স্থানে পাঠালেন, সেখান থেকে হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) ইহরাম বেধে কা'বা ঘরে এসে উমরা করলেন । তানঈম নামক ওই স্থানেই বরতমানে মসজিদে আয়েশা অবস্থিত । তবে অধিকাংশ  ইসলামী চিন্তাবীদদের মতামত হলো , হজ্জ বা উমরা সময় কোন অসুবিধা না হলে নারীগন  ওসুধের মাধ্যমে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখতে পারেন ।
মুহরিম পুরুস যদি থাকে তাহলে একজন নারী মুহরিম পুরুসকে সাথে নিয়ে হজ্জ আদায় করবেন । আর যদি মুহরিম পুরুস না থাকে তাহলে সেই নারী কিভাবে হজ্জ আদায় করবে এ সম্প্রকে ইসলাী চিন্তাবিদগন এ ধরনের সিদ্ধান্ত দিয়ছেন যে (এক) নারী যদি বয়স্কা হয় তাহলে কোন বিশ্বস্ত দলের সাথে হজ্জ আদায় করতে পারেন । (দুই) নারী যুবতী হয় আর সে যদি এক দল বিশ্বস্ত নারী পুরুস পায় তাহলে তাদের সাথে হজ্জে যেতে পারবেন । (তিন) নারী যদি যুবতী হয় আর সে যদি হজ্জে যাচ্ছে এমন একদল নারী পায়- যারা কোন দলের তত্ত্বাবধানে হজ্জে যাচ্ছে, তাহলে তাদের সাথে হজ্জে যেতে পারবেন । (চার) নারী যদি যুবতী হয় আর সে যদি আরেকজন বিশ্বস্ত নারী পায়, যিনি একদল বিশ্বস্ত পুরুস লোকের তত্ত্বাবধানে হজ্জে যাচ্ছেন, তাহলে তার সাথে হজ্জে যেতে পারবেন । (পাচ) নারী, যুবতী ব্রিধা হোক না কেনো, স্বামী, মুহরিম পুরুস বা উল্লেখিত কোন দলের অন্ত্রভুক্ত না হয়ে একাকী হজ্জের জন্য সফরে যেতে পারবেন না ।  ---(চলবে)
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী


রবিবার, ২৪ মে, ২০১৫

ফরজ হজ্জ আদায় না করা বড় ধরনের গোনাহ


যাদের ওপর হজ্জ ফরজ হয়েছে, তারা যদি হজ্জ আদায় না করে তাহলে তাদের প্রতি মহান আল্লাহ তা'য়ালা অত্যান্ত নাখোশ হন । এ সম্প্রকে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ আল্লাহর ঘর প্রযন্ত পউছার সামরথ যার আছে, হজ্জ আদায় করা তার ওপর আল্লাহর একটি অনিবারয নিরদিস্ট হক । এরপরেও যে ব্যাক্তি তা অমান্য করবে, তার জেনে রাখা উচিত আল্লাহ তায়ালা প্রিথিবীর কারো মুখাপেক্ষী নন । সুরা আল ইমরান-৯৭


হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের ওপর হজ্জ আদায় ফরজ হয়েছে, তারা যদি ইসলাম সম্মত কারন ব্যতিত হজ্জ আদায় না করে তাহলে তাদেরকে আখিরাতের ময়দানে কঠিনশাস্তির মুখোমুখি হতে হবে । হাদীসে এ ধরনের লোকদের ম্রিত্যুর বিসয় সম্পকে কঠোর সাবধানবানী উচ্চারন করা হয়েছে । হাদীসে বর্ণনা করা হয়ছে, হযরত আবু উমামা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নাবী করীম সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তির প্রকাশ্য কোন অসুবিধা নেই, কোন অত্যাচারী শাসক যার পথ রোধ করেনি এবং যাকে কোন রোগ অসা্ম্রথ করে রাখেনি, এরপরেও সে যদি হজ্জ আদায় নাকরে ম্রিত্যু বরন করে তাহলে সে ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান হয়ে মরতে পারে । (দারেমী)
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলে আকরাম সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ বিয়ে না করা ও হজ্জ আদায় না করে থাকা ইসলামে নেই । (আবু দাউদ)
হযরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলিহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর ঘর প্রযন্ত পউছার মতো যার থের সম্বল ও বাহন আছে, অথচ সে হজ্জ আদায় করেনি, তাহলে এ অবস্থায় সে ইয়াহুদী বা খ্রিস্টানের ম্রিত্যুবরন করুক তাতে কিছু যায় আসে না । ---(চলবে)
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী

শনিবার, ২৩ মে, ২০১৫

হজ্জ এবং উমরা, মিল ও অমিলঃ

হজ্জ আদায়ের জন্য প্রয়োজন হজ্জের মাস, হজ্জের মাস ব্যতিত হজ্জ হবে না । হজ্জ আদায়ের জন্য মিনা,  আরাফাত ও মুযদালিফায় যেতে হয় এবং কংকর নিক্ষেপ করতে হয় । আরাফাতের ময়দানে নিরদিস্ট সময় অবস্থান করে এবং যুহর ও আসরের নামাজ একত্রে আদায় করতে হয় । মুজদালিফায় এসে মাগরিব এশা নামাজ একত্রে আদায় করে রাত্রি অতিবাহিত করতে হয় । ফজরের নামাজ আদায় করে কংকর  নিক্ষেপের জন্য যেতে হয় । এরপর পশু কুরবানী করতে হয় । মিনার তাবুতে অবস্থান করতে হয় ।
কিন্তু উমরা আদায়ের জন্য মিনা, আরাফাত ও মুজদালিফায় যাওয়ার প্রয়োজন হয় না  বা কুরবানী দেয়া লাগে না । তবে হজ্জ বা উমরা উভয় ক্ষেত্রেই ইহরাম বাধতে হয়, পবিত্র কা'বাঘর তাওয়াফ করতে হয় এবং সাফা  মারওয়াতে সাঈ করতে হয় । মাথার চুল কাটাতে হয় । তারমানে উমরা আদায়ে শুধু মাত্র মক্কার মধ্যেই সীমাবব্ধ থাকে । মক্কার বাইরে যাবার প্রয়োজন হয় না । মক্কায় অবস্থানরত কোনো মানুস যদি উমরা আদায় করতে চায়, তাহলে তাকে মসজিদে আয়েশায় এসে ইহরাম বেধে পবিত্র কা'বাঘরে যেতে হয় । ইয়মরা আদায়ে অল্প সময়ের প্রয়োজন হয় । 
পবিত্র বায়তুল্লাহ তাওয়াফ, সাফা -মারওয়া সাঈ ও চুল কাটাতে যেটুকুন সময় ব্যায় হয় ততোটুকুন ই উমরা করতে লাগে ।  আর হজ্জ আদায়ে নিরদিস্ট কয়েকটি দিনের প্রয়োজন । যিলহজ্জ মাসের ৯ থেকে ১৩ তারিখ ছাড়া  বছরের যে কোনো সময়ই উমরা পালন করা যায় ।

হজ্জের ফরজ কাজ তিনটি । যথা (এক) নিয়ত করা, ইহরাম বাধা এবং তালবিয়া পাঠ করা । এই তিনটি কাজ একতেরি করা হয় । (দুই) জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখ যোহর থেকে মাগ্রিব প্রযন্ত আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা । (তিন) তাওয়াফে যিয়ারত করা,জিলহজ্জ মাসের ১০/১১ তারিখ কা'বাঘর তাওয়াফ করা । আর উমরার ফরজ দুইটি । (ক) ইহরাম বাধা (খ) কা'বা তাওয়াফ করা । হজ্জের ওয়াজিব ছয়টিঃ (১) আরাফাত থেকে ফেরার পথে মুজদালিফায় রাত্রি যাপন/ অবস্থান করা এবং সেখানে মাগরিব ও এশা নামাজ একত্রে আদায় করা । (২) সাফা -মারওয়া সাঈ করা । (৩) জিলহজ্জ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা । (৪) হজ্জে ক্বিরান ও তামাত্তু পালনকারীর জন্য কুরবানী করা । (৫) মাথা মুন্ডন করা বা চুল ছাটা, মহিলাদের চুলের অগ্রভাগ কাটা । (৬) মক্কার বাইরের লোকজনের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা । উমরার ওয়াজিব দুইটিঃ (এক) সাফা- মারওয়া সাঈ করা ।  (দুই) মাথা মুন্ডন করা বা চুল ছাটা, মহিলাদের চুলের অগ্রভাগ কাটা । ---(চলবে)

"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী

বুধবার, ২০ মে, ২০১৫

হজ্জে ইফরাদ, তামাত্তু ও হজ্জে ক্বেরান, কোন প্রকার হজ্জ উত্তমঃ ?

হজ্জ তিন ধরনের, হজ্জে ইফরাদ, হজ্জে তামাত্তু, হজ্জে ক্বেরান । শুধু মাত্র হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে ইহরাম বেধে তালবিয়া পাঠ করাকে ইফরাদ হজ্জ বলে । ইফরাদ হজ্জকারী হজ্জ শেস করে উমরা আদায় করতে পারবেন । 
হজ্জের মাস সমুহে উমরা পালন করে ইহরাম থেকে হালাল হয়ে দেশে না ফিরে সে বছরই আবার হজ্জের ইহরাম বেধে হজ্জ করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে । এধরনের হজ্জকে তামাত্তু হজ্জ বলার কারন হলো, তামাত্তু হজ্জকারী উমরা থেকে মুক্ত হয়ে উমরার ইহরামের কারনে নিসিদ্ধ জিনিস ভোগ করতে পারে । কারন তামাত্তু শব্দের অরথ হলো উপভোগ করা । উপক্রিত হওয়া বা ফায়দা অরজন করা ।

একই সাথে হজ্জ ও উমরার ইহরাম বাধাকে ক্বেরান হজ্জ বলে । ক্বেরান হজ্জ আদায়কারীকে শেস দিন পরযন্ত ইহরাম অবস্থায় থাকতে হয় । উমরা ও হজ্জ একটির সাথে আরেকটা জড়িত থাকে বিধায় একে ক্বেরান হজ্জ বলা হয় । কারন ক্বেরান শব্দের অরথ হলো মিলিত করা, যুক্ত করা, একত্রিত করা ।
এই তিন ধরনের হজ্জের মধ্যে কোন ধরনের হজ্জ উত্তম এ বিসয়ে ইসলামী চিন্তানায়কদের মধ্যে মত পারথক্য রয়েছে । হযরত আবু হানিফা (রহঃ) ও অন্যান্যদের মতে ইফরাদ ও তামাত্তুর চেয়ে ক্বেরান উত্তম । আর ইফরাদের তুলনায় তামাত্তু উত্তম । কারন নবী করীম সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জে ক্বেরানই করেছেন । হযরত ইমাম মালেক (রহঃ) ও অন্যান্যদের মতে ইফরাদ হজ্জ উত্তম । হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ও ইমাম শাফেঈ (রহঃ) এর মতে তামাত্তু উত্তম । একটি বিসয় স্বরনে রাখতে হবে যে, হজ্জে ক্বেরান ও তামাত্তু শুধু মাত্র বহিরাগতদের  জন্য । মক্কার অধিবাসীদের জন্য ক্বেরান বা তামাত্তু নেই ।-------------(চলবে)
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী

সোমবার, ১৮ মে, ২০১৫

হজ্জ ও উমরার ফজিলতঃ


ইসলামের পাচটি বুনিয়াদের মধ্যে হজ্জ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন যার সাথে জড়িত রয়েছেন আমাদের আদি পিতা হযরত আদম (আঃ), মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও সাইয়্যেদুল মুরসালীন বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ  সকল নবী ও রাসুল । পৃথিবীতে প্রেরিত অগনিত নবী রাসুল ও মহান আল্লাহর বন্ধুদের চোখের পানিতে সিক্ত হয়েছে হজ্জ আদায়ের স্থান সমূহ । এসব স্থানের সম্মান, মর্যাদা ও ফজিলত বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না । পবিত্র কুরআন ও হাদীসে হজ্জের অসংখ্য ফজিলতের কথা বর্ণনা করা হয়েছে । হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে হজ্জ আদায় করবে এবং হজ্জ আদায়ের সময় স্ত্রী মিলন ও এ সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে এবং কোন ধরনের গুনাহের কাজে লিপ্ত হবে না, সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতোই সে নিস্পাপ অবস্থায় ঘরে ফিরবে । (বোখারী, মুসলিম)

বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা মক্কায় গিয়ে হজ্জ আদায় করো, পানি যেমন ময়লা পরিস্কার করে তেমনি হজ্জও গুনাহ পরিস্কার করে । (বোখারী)
হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন দ্বারা হজ্জ আদায় করে পরিপূর্ণ মুমীনের ন্যায় জীবন যাপন করবে তার জীবনের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়ে তাকে জান্নাত দেয়া হবে । হাজীগন মহান আল্লাহর মেহমান এবং হজ্জ উত্তম আমলসমুহের মধ্যে একটি । হজ্জ হচ্ছে বৃদ্ধ, দুর্বল ও মহিলাদের জন্য জিহাদ আর হজ্জের বিনিময় হলো জান্নাত । মহান আল্লাহ তায়ালা হাজীর সুপারিশ কবুল করবেন এবং হজ্জের সফরে যারা মৃত্যুবরন করবে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাকে  বিনা হিসাবে জান্নাত দান করবেন । হজ্জের জন্য যে অর্থ ব্যায় করা হবে মহান আল্লাহ তার সওয়াব সাতশত গুন বেশী দান করবেন ।
উমরা আদায়ের অগনিত ফজিলত রয়েছে । নবী করীম মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা হজ্জ ও উমরা একই সাথে সম্পন্ন করো, কারন এগুলো দারিদ্র ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে, যেভাবে কামারের হাপর লৌহ, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ময়লা দূর করে দেয় । (তিরমিযী)
রাসুলে আকরাম সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হজ্জ ও উমরা আদায়কারী আল্লাহর মেহমান । তারা যদি আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করে তিনি কবুল করেন এবং যদি তারা ক্ষমা চায় তাহলে তাদের ক্ষমা করা হয় । (ইবনে মাজাহ)
সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রমজান মাসের উমরা, হজ্জের সমান । (বোখারী, মুসলিম)
আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, রমজান মাসের উমরা সেই হজ্জের সমান যা নবী করীম
সাল্লেল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আদায় করা হয়েছে । তবে এর মানে এই নয় যে, যাদের ওপরে হজ্জ আদায় ফরজ হয়েছে, তারা শুধু উমরা করবেন । হজ্জ ফরজ হলে অবশ্যই তাকে হজ্জ আদায় করতে হবে ।-------------(চলবে)
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী

শনিবার, ১৬ মে, ২০১৫

হজ্জ আত্মিক উন্নতির মাধ্যমঃ


যিনি হজ্জ আদায়ের জন্য ইহরাম বাধলেন তখন থেকেই সেই মানুষটি ইসলামের প্রত্যেকটি নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করতে হয়, এর ব্যতিক্রম করা যায় না । করলে হজ্জ বাতিল হয়ে যায় অথবা হজ্জ ত্রুটি পূর্ণ হয় । এজন্যে প্রত্যেক হাজী সাহেবই হজ্জ আদায়কালে মহান আল্লাহ তার রাসুলের (সাঃ) নির্দেশ সমুহ পালনে যত্নবান থাকেন । যেমন দাড়ি চুল আচড়ানো যাবে না, দেহের কোথাও চুলকালেও এমন সতর্কভাবে চুলকাতে হয় যে, যেনো দেহের কোন পশম ছিড়ে না যায় । সকল ব্যাপারে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে হয় । হিংসা বিদ্বেষ পরিহার করে এবং ভাষা ও বর্ণের পার্থক্য ভুলে সকল হাজী সাহেব একে অপরের আপনজনে পরিনত হয় । এ অবস্থায় কোনো প্রানীকে হত্যা করা যায় না । নিজের জৈবিক চাহিদাকেও দমন করে রাখতে হয় । মুখে কোন কটু বাক্য উচ্চারন করা যায় না । মিথ্যা পরিহার বর্জন করতে হয় । অন্যের স্বার্থে আঘাত দেয়া যায় না । অন্যের প্রয়োজন পুরনে এগিয়ে যেতে হয় ।

সেই সাথে সময়ের প্রত্যেক মুহূর্তে মহান আল্লাহ তায়ালাকে স্মরণ রাখতে হয় । কেঊ নফল নামায আদায় করতে থাকে, কেউ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকে কেউবা তাসবিহ তাহলিল পাঠে মশগুল থাকে । অর্থাৎ সময়ের প্রত্যেক মুহূর্ত মহান আল্লাহর যিকর বা তার স্মরনে অতিবাহিত করতে হয় । এভাবে একজন মানুষের অভ্যন্তর থেকে সকল প্রকার খারাপ দিক মুছে গিয়ে সে স্থলে তাক্ব্বয়াদারী ও পরহেজগারী সৃষ্টি হয় । আর এভাবেই মানুষ নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে নিজেকে মহান মালিক আল্লাহর নৈকট্যের দিকে অগ্রসর করিয়ে থাকে । এ জন্যই হাদীসে ব্লা হয়েছে, 'মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে যেভাবে নিস্পাপ অবস্থায় পৃথিবীতে আগমন করে, ঠিক তেমনি যে ব্যাক্তি হজ্জ আদায়ে সকল শর্ত যত্নের সাথে পালন করেছে, সে ব্যক্তি নিস্পাপ হয়ে যায়' । অর্থাৎ তার কোন গুনাহ অবশিষ্ট থাকে না । হজ্জ এভাবেই মানুষের আত্মিক ও চারিত্রিক উন্নতি ঘটিয়ে মহান আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ উম্মুক্ত করে দেয় ।
"শারঈ' মানদন্ডে
দোয়া-যিকির,হজ্জ ও উমরা"
Shameem Sayedee - শামীম সাঈদী
(চলবে)