রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫

কামারুজ্জামানের জন্য শেরপুরের কান্না দেখেছি--


সবুজ ধানক্ষেত লাগোয়া একটি সতেজ কবর। ঢাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ১৭ এপ্রিল-শুক্রবার সকাল বেলা উপস্থিত হয়েছিলাম সেই কবরে। শেরপুর সদরের কুমরি বাজিতখিলা গ্রামের এতিমখানা সংলগ্ন রাস্তা, যার পাশে শুয়ে আছেন আমার প্রিয় দায়িত্বশীল শহীদ কামারুজ্জামান। আস্সালামুয়ালাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।
শহীদ কামারুজ্জামানের প্রিয়তমা জীবন সঙ্গীনি, তার স্নেহময়ী সন্তান ওয়ামী, ওয়াফী, শাফী ও আতিয়া নূর ঢাকা থেকে জনপ্রিয় লেখক ও সংগঠক আহসান হাবীব ইমরোজ, শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার সুযোগ্য উত্তরসূরী হাসান জামিল, দুই শহীদের শ্রদ্ধাভাজন সহযোদ্ধা আলী আহসান মু: মুজাহিদের পুত্র তাহকিক ও মাবরুর, জামান ভাইয়ের অন্যতম স্নেহভাজন সুহৃদ আনোয়ারুল ইসলাম রাজু , আমার একান্ত আপনজন তরুণ ব্যবসায়ী মেজবাহ উদ্দিন সাঈদ এবং আমি ছিলাম সহযাত্রী। আমরা গিয়েছিলাম চারটি আলাদা গাড়ীতে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকলেও কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই পৃথক ভাবে একটু আগে-পরে আমরা ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর সদরের বাজিতখিলায় পৌঁছাই।
নানা আশংকার কারণে এ যাত্রার খবর আগাম কাউকে জানানো হয়নি। কিন্তু শহীদ কামারুজ্জামান এর স্ত্রী ও সন্তানদের আগমণের খবর বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। এমনিতেই প্রতিদিন দুর-দুরান্ত থেকে মানুষের আনা-গোনা লেগেই ছিল, কিন্তু আজ যেন বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার! মুহুর্তেই চতুর্দিক থেকে গ্রামবাসী নারী-পুরুষের অভাবনীয় ভীড়। সকলের চোখে কান্নার ঢেউ আছড়ে পড়ে তাঁর সন্তানদের দেখে। কে কাকে সান্তনা দেবে? নারীদের বিলাপ ধ্বনিতে ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ। সন্তানরা বাবার জানাজা পড়তে পারেনি, পারেনি শহীদ বাবার কফিন ধরাধরি করে কবরে নামাতে, প্রিয়তম বাবার নিথর কপালে চুমু খেয়ে চোখের জলে শেষ বিদায় দেয়া হয়নি। স্ত্রী পারেনি শেষ সম্ভাষন- বন্ধু বিদায়’ বলতে। আজ তাই নীরব কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শত-সহস্র দিনের স্মৃতি বোবা কান্নায় উথলে উঠছে বারবার। শহীদ পরিবারের সাথে হাজারো মানুষের হাত তোলা আহাজারী- হে আল্রাহ তুমি বিচার কর। এই জুলুমের সবচেয়ে বড় স্বাক্ষী তুমি………।
চারিদিক থেকে মানুষের স্রোত ক্রমেই বাড়ছে দেখে শংকিত হলেন কেউ কেউ। হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে সৃষ্টি করবে ত্রাস। যেমন করেছিল সেদিন ভোর রাতে। তাই বাবার কবরের পাশে, গ্রামবাসী আপনজনদের সাথে থাকা হয়নি বেশীক্ষণ। আমাদের পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল বলে শহীদের বড় ভাই কফিল সাহেবের বাড়ীতে আমরা জামান ভাবী, ওয়ামী, ওয়াফী, শাফী এবং আতিয়াকে বিদায় জানাই। কিছুক্ষণ সকল নিকটাত্মীয়দের সাথে কথাবার্তা বলে তারা আবার রওয়ানা হন ঢাকার দিকে।
শহীদ পরিবার চলে যাওয়ার পর আমরা ভাবলাম, এবার মানুষের ভীড় কিছুটা কমবে। কিন্তু স্বল্প সময়েই ভুল ভাঙ্গলো আমাদের। মানুষ আসছে তো আসছেই। ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেন সোহেল এবং আমাদের আরেক সফরসঙ্গী লিটু ভাই সর্বক্ষণ জামান ভাইয়ের নানান স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন।
শহীদ পরিবার কে বিদায় দিয়ে জনতার ভীড় ঠেলে আমরা শহীদ কামারুজ্জামানের প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা প্রাঙ্গনে গিয়ে দাঁড়াই। সে রাতে কেমন করে তাঁর কফিন আনা হয়েছিল, কিভাবে তার জানাজা এবং দাফন সম্পন্ন হয়েছিল, সবিস্তারে জানালেন মাদ্রাসার সুপার মাঝ বয়েসী ভদ্রলোক। তার কাছে পুলিশ ও প্রশাসনের নির্দয় আচরনের বয়ান শুনে অবাক হলাম। একজন মৃত মানুষ ও তার নিরীহ গ্রামবাসীর প্রতি এত অমানবিক আচরণ হতে পারে তা অবিশ্বাস্য! একজন শিক্ষক জানালেন ফাঁসি কার্যকরের একদিন আগে পুলিশ এসে ১ ঘন্টার নোটিশে এতিমখানা খালি করে তালা মেরে দিতে বলে। এই অসহায় এতিমরা হঠাৎ করে কোথায় যাবে! কিছুই পুলিশ বিবেচনায় নেয়নি। তাঁরা কয়েকজন অবস্থান করতে চাইলে পুলিশ সেটারও অনুমতি দেয়নি।
পুলিশের নিষেধাজ্ঞা সত্বেও তিনি সহ কয়েকজন আশ-পাশে ঘুরাফিরা করে বহু কষ্টে সারারাত অবস্থান করেন। শত শত পুলিশের কড়া বেরিকেডের বাইরে হাজার হাজার গ্রামবাসী সাধারণ নারী-পুরুষ রাত জেগে বিভিন্ন দিকে অবস্থান নেয়। তাদের কান্না, আহাজারী, কাকুতি-মিনতি কোন কিছুই পুলিশের মন গলাতে পারেনি। পুলিশ কাউকেই জানাজা স্থলের কাছে ঘেষতে দেয়নি। বার বার লাঠিচার্জ করে সরিয়ে দিয়েছে। রাইফেল তাক করে গুলী করার হুমকি দিয়েছে। এক পর্যায়ে গ্রামের শোকার্ত যুবকেরা বুক পেতে দিয়ে পুলিশকে গুলী করার আহবান জানায়। বৃষ্টিস্নাত রাতের আধারে সে এক হৃদয়-বিদারক দৃশ্য। বলতে বলতে ভদ্রলোকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে। চোখ ছল ছল করে ওঠে আমাদেরও। কল্পনায় নিজেকে আমার সেই যুবকদের একজন ভাবতে ইচ্ছে করে……।
ভীড়ের মাঝে এক কিশোরের দিকে আমার চোখ আটকে যায়। সে আমাদের সামনে এসে বুক চিতিয়ে দাড়িয়ে বলে স্যার, পুলিশ আমাকে বহুবার তাড়িয়েছে। আমি এদিক দিয়ে গিয়ে ওদিক দিয়ে আবার লুকিয়ে লুকিয়ে অন্ধকারে ফিরে এসেছি। শেষ পর্যন্ত আমার সৌভাগ্য হয়েছে জানাজায় হাজির থাকার। ছেলেটার উজ্বল চোখগুলো চিক্ চিক্ করছিল। সে আরও জানালো পুলিশ কফিল চাচাকে (শহীদ কামারুজ্জামানের বড় ভাই) বলেছে মাত্র ২০ জনের তালিকা করার জন্য, উপরের নির্দেশ ২০ জনের বেশী একজনও যেন জানাজায় না থাকে। কফিল চাচা রাগ করে বলেছেন ঠিক আছে আপনারা পুলিশেরাই জানাজা পড়েন, দাফন করেন আমি-আমরা কেউ থাকবোনা। ক্ষোভে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন আমার নিরপরাধ ভাইকে তো আর পাবোনা, আপনারা যা খুশী তা করেন। শহীদের বড় ভাইয়ের এমন দৃঢ় মনোভাবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ উপস্থিত ১০০-১৫০ জনকে জানাজা পড়তে লাইন ধরতে বলে। প্রথমে কয়েকজনকে লাশ দেখার জন্য সুযোগ দিলেও পরক্ষণেই কফিনের বাক্স ঢেকে দেয়। সবার পকেট চেক করে মোবাইল বন্ধ করা নিশ্চত করে কোন ছবি তোলা বা ভয়েজ রেকর্ড করা যাবেনা বলে হুশিয়ারী দেয়। সে জানায় পুলিশ বেষ্টনীতে দুরে আটকে থাকা হাজারো জনতা আমাদের পাশাপাশি ৩টি পৃথক জানাজা পড়ে। তাদের গগণবিদারী কান্না ও তাকবীর ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয় আকাশ-বাতাস।
এতিমখানার দেয়ালে কয়েকটি রক্তাক্ত হাতের ছাপ আমাদের চোখে পড়লো। জানতে পারলাম শহীদ কামারুজ্জামানের কফিন আনার পর তার বুকের উপর তরতাজা খুন ছড়িয়ে ছিল। কফিনের বাক্স খোলার পর কোন এক তরুণ ছাত্র আবেগ প্রবণ হয়ে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে কাঁদতে কাঁদতে রক্তাক্ত কফিন
জড়িয়ে ধরে। তার হাতে শহীদের যে তপ্ত খুন লেগেছিল এগুলো তারই স্মৃতিচিহ্ন।

ইতোমধ্যে বহু মানুষ আমাদের চারপাশে এসে অবস্থান নিয়েছে। একজন একপাশে একটি টেবিলের উপর একটি শোকবই দেখিয়ে বললো, আসুন এখানে কিছু লিখুন। কি লিখবো! আমি যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, “আমার প্রিয় দায়িত্বশীল, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম ভাই মুহাম্মদ কামারুজ্জামান… এতটুকু লিখে আমার দুচোখ অঝোর ধারায় কান্নার জলে ভরে গেল। কলম আমার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেল। এরপর যা লিখলাম সব এলোমেলো । শুধু এতটুকু মনে আছে শেষে লিখেছি, ‘আমরা অঙ্গীকার করছি শহীদ কামারুজ্জামানের স্বপ্ন এবং নির্দেশিকা ইনশাআল্রাহ আমরা বাস্তবায়ন করবো’। এতিমখানার এককোণে শহীদ কামারুজ্জামানকে বহন করা কাঠের বাক্সটি দেখলাম। দেখে শিউরে উঠলাম, কত সরু বাক্স এটি! জামান ভাইয়ের শরীর এতে সংকুলান হবার কথা নয়, জেল কর্তৃপক্ষ এরকম একটি সংকীর্ণ দূর্বল বাক্সে তার লাশ কিভাবে ঢুকালো! একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন অনেকটা ঠাশাঠাসি করে মৃতদেহ ঢোকানো ছিল আমরা দেখতে পেয়েছি। হায়রে প্রতিহিংসা! এই নির্মমতার ফল একদিন অবশ্যই তারা ভোগ করবে।
কেউ একজন কানে কানে এসে বললো সিভিলে ডি.বি পুলিশের একটি টীম এসেছে, তারা সম্ভবত: এত মানুষ দেখে বিচলিত। এরই মধ্যে আরেক পশলা জনতার ঢল লক্ষ করলাম, জানতে পারলাম টাঙ্গাইল থেকে কয়েকশত মানুষ বাস বোঝাই করে এসেছেন। কবরের পাশে চললো আরেকদফা আর্তনাদ, আরশের পানে চেয়ে সে কি আকুতি। আমি শুধু ভাবছি শহীদেরা কতইনা সৌভাগ্যবান! নাড়ীর সম্পর্কিত না হয়েও নেতার জন্য, ভাইয়ের জন্য কেউ কি এভাবে আবেগে আত্মহারা হতে পারে? টাঙ্গাইল থেকে যারা এসেছে তাদের মাঝে বেশ পরিচিত কয়েকজন কে পেলাম। শহীদ জোবায়েরের বড় সহোদর জাকির ভাই এসে আছড়ে পড়লো আমার বুকে। দু’ভাই জড়াজড়ি করে কাঁদলাম অনেক্ষণ। এক শহীদের কবরগাহে আরেক শহীদের স্মৃতি উপলব্ধি করতে করতেই গাড়ীর হর্ণ কানে এলো।
আমরা সহ সবাই অপেক্ষা করছিলাম হাসান জামিল, তাহকিক, মাবরুর ও রাজু ভাইয়ের জন্য, বুঝলাম ওরাও এসে গেছে। তারা এসে নামতেই অন্যমাত্রার আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হলো। গ্রামবাসীর আরেকদফা আবেগ-উত্তেজনা! তাদের মোনাজাতে কান্নার রোল হৃদয় ছুয়েছে সবার। মোনাজাত শেষে শহীদ কাদের মোল্রা ও মুজাহিদ ভাইয়ের সন্তানদের সাথে হাত ও বুক মেলাবেন সবাই। শুনতে চান তাদের মুখ থেকে কিছু কথা। শেষ পর্যন্ত জনতার দাবীর মুখে তাহকিক ও হাসান জামিল একটি টেবিলের উপর দাড়িয়ে বললেন, "আমরা বিচলিত নই, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই ইনশাআল্রাহ"। একজন বয়স্ক মুরুব্বী ইমরোজ ভাই, মেজবাহ ভাই সহ আমাদের কে শহীদ কামারুজ্জামান প্রতিষ্ঠিত এতিমখানা ঘুরিয়ে দেখালেন। এতিমদের নিয়ে কামারুজ্জামান ভাই যে স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তিনি যেভাবে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদিত ছিলেন তা বিশদ বর্ণনা করলেন। আমরা তাদের কে আশ্বস্থ করলাম, ইনশাআল্রাহ যে জমিনে শহীদ কামারুজ্জামান শুয়ে আছেন সে জমিন ও প্রতিষ্ঠান একদিন বিশ্ব মুসলমানের জ্ঞান সাম্রাজ্যের বড় কমপ্লেক্স হবে।
ক্রমে যেভাবে মানুষের চাপ বাড়ছে আমরা অনুভব করলাম, এবার আমাদের ফেরা উচিত। তাছাড়া শেরপুরে কামারুজ্জামান ভাইয়ের দুই স্নেহধন্য সহযোগী সিদ্দিক ভাই ও সরওয়ার ভাই জোর করে ধরলেন যাবার সময় কামারুজ্জামান ভাইয়ের স্মৃতি বিজড়িত তাদের (শ্বশুরালয়) বাসায় একটু যেতে হবে। ময়মনসিংহ থেকে সরওয়ার ভাই, ভাবী এবং তার আদুরে দুই রাজপুত্র আমাদের পথ দেখিয়ে শেরপুর নিয়ে যান। আর সিদ্দিক ভাইয়ের যা গল্প শুনেছি তাতে আরও কিছুক্ষণ তাদের সঙ্গ পাওয়ার লোভ সামলাতে পারছিলাম না।
সাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়ীতে উঠার জন্য যেই পা বাড়াবো অমনি বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো, জামান ভাইকে রেখে চলে যাবো!
কবরের সাথে লাগানো সবুজ ধানক্ষেতের পাতাগুলো বাতাসে দুলছে। নীল পলিথিনে ঢাকা বালিমাটির কবরখানা যেন আমার ডাকছে। আমি ছুটে গেলাম আবার কবরের পাশে, হু হু করে বুকভেঙ্গে কান্না নেমে এলো। মাথা নীচু করে মহান রাব্বুল আ’লামীনের কাছে কিছু বলতে ইচ্ছে করলো। বিড় বিড় করে বললাম, হে আল্রাহ জামান ভাইকে রেখে যাচ্ছি, আবার কখন আসবো জানিনা। তোমার প্রিয় শহীদ কে তুমি বুঝে নাও, ফেরত দিও আবার বেহেশতের বাগানে ।




লেখকঃ 
মজিবুর রহমান মন্জু । নির্বাহী কর্মকর্তা-দিগন্ত মিডিয়া ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন